সেক্যুলারিজম বলে আদতে যে ব্যবস্থাটা ছিল, সেটা যে ধর্মের মতই বলপ্রয়োগী, ধর্মকেই...

সেক্যুলারিজম বলে আদতে যে ব্যবস্থাটা ছিল, সেটা যে ধর্মের মতই বলপ্রয়োগী, ধর্মকেই ব্যবহার করে একটা সময় খুবই স্পষ্ট হবে

ভাগ
PaidVerts
সাঈদ : হুম। কিন্তু এইটা তো খুব ইয়ে শব্দ – মানে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ এইটাতো খুব কাজের কিছু না। কাজের মনে করবো না এই কারণে দেখেন, ধরেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি যে আন্দোলনটা করছিলো রাষ্ট্রের ভাষায় সেটা ছিলো একটা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সেটা একটা সন্ত্রাসী আন্দোলন। কিন্তু যে রাস্তায় রাষ্ট্র সেই তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটাই দমন করেছে সেটা তো আমরা সমর্থন করতে পারি না এবং সেটাকে এক নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন না বলে অন্যভাবে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও মনে করি। সেটা আর বাংলা ভাই নিশ্চয়ই এক কাতারের জিনিস না। সেটা আমি কোনভাবেই বলছি না, কিংবা অস্ত্র আটকের ঘটনা নিশ্চয়ই একই রকম না। বিচ্ছিন্নতাবাদ বললে বোঝায় যে রাষ্ট্রের একটা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবার কথা। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি যে আমাদের মতো রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পোক্ত থাকে না। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে রাষ্ট্র এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণটা পোক্ত করতে পারে। আমাদের দেশে গণতন্ত্র ব্যবস্থা হিসাবে দুর্বল ব্যবস্থা, গণতন্ত্রকে চালাবার মত যথেষ্ঠ ট্যাঁকের জোর রাষ্ট্রের নেই। এটাও অবশ্য আমি categorically বলছি যে গণতন্ত্রকে চালাবার জন্য রাষ্ট্রের ট্যাঁকের জোর লাগে। ট্যাঁকের জোর লাগে উপরন্তু রাষ্ট্রের মিডিয়া দিয়ে বলেন, আর পাঠ্য বই দিয়ে বলেন রাষ্ট্রের মতাদর্শিক শাসনও রাষ্ট্রের পোক্ত করতে হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রগুলো দুর্বল, কেউ কেউ সেটাকে উপনিবেশিকতার ফলাফল বলছে, উপনিবেশিকতার হাত ধরে জন্ম হয়েছে বলেই হোক আর যেভাবেই হোক এই রাষ্ট্র জন্মলগ্ন থেকেই মতাদর্শিকভাবে জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই। অন্যদিকে ট্যাঁকের জোরও নাই জনগণকে খাইয়ে পরিয়ে রাখার। যে কোন অর্থে এই দু’টো কারণে বা এর যে কোন একটা বিশেষ কারণে হোক গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থা এইসব দেশে অকার্যকর। আরও বড় কথা হচ্ছে যে এই মধ্যপ্রাচ্য সংকটটির পরে, ইরাক যুদ্ধের পরে, যদি যুদ্ধ বলি এটাকে আমরা, ইরাক যুদ্ধের পরে আপনাদের কাছে নিশ্চয়ই মনে হয়েছে যে, গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটা তো একই সাথে আপেক্ষিক। বাংলাদেশে গণতন্ত্র তো আর বিদেশের গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন কিছু না। আর গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থার ঠিক উল্টো পিঠেই তো সাম্রাজ্যবাদ, সেসব চিন্তা করলে এ দেশে কি গণতন্ত্র থাকবে না থাকবে তা ঠিক আপনার আমার কিংবা আমাদের শাসকদের মর্জিরও ব্যাপার না। তাহলে আমরা আমাদের দেশে কেমন গণতন্ত্র রাখতে পারবো সেটা আমাদের হাতেও নাই। এটা শাসকদের হাতেও নাই, তাদের মর্জিরওব্যাপার না। তার অর্থ এই না যে, আমাদের শাসকদের কোন দায় দায়িত্ব নাই। কিন্তু আমি বলছি এটা আরো বৃহত্তর ব্যবস্থার একটা অংশ। সে কারণে এখানে রাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো, রাষ্ট্রের নগ্ন চেহারাগুলো অনেক বেশি চোখে দেখা যায়। অন্য দেশেও রাষ্ট্র এমন সরাসরি শাসন করে, বল প্রয়োগেই শাসন করে কিন্তু অন্য দেশে হয়তো বল প্রয়োগটা সুগার কোটেড থাকে। ওষুধের উপর যেমন সুগারের প্রলেপ থাকে, সুগার কোটেড থাকে বলে আপনি দেখতে পান না রাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপগুলো কিংবা দেখতে পান কেবল একটা বিশেষ মুহুর্তে। কিন্তু তাছাড়া দেখা যায় যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, যার যা করার কথা, পুলিশের যা করার কথা, রাষ্ট্রের যা করার কথা, বিচারকের যা করার কথা, রাষ্ট্রপতির যা করার কথা, কেউ কারো জায়গায় নাক গলাচ্ছে না। এটা তথাকথিত সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যায়। যেটা আমাদের মতো দেশে রাষ্ট্রের চাতুর্যগুলো অনেক বেশি শুরু থেকেই চোখে পড়ে। ফলে বাংলা ভাইয়ের কথা বলেন, একই সাথে যেমন মানুষ দেখছে রাষ্ট্রের কাছে সে কিছু পায় না। ফলে তাৎক্ষণিক বিচারটা সে নিজের হাতে নেয়, সেটা চাঁদাবাজকে গণপিটুনি দিয়েই হোক, নাটোরের সেই লাঠি বাঁশি সমিতি করেই হোক মানুষ কিন্তু নিজের হাতে সুরাহা করার চেষ্টা করে। দেয়ালের ভিতর মানুষের পিঠ ঠেকে গেছে। ঠেলতে ঠেলতে জনগণকে দেয়ালের ভিতর নিয়ে গেছে, ঘরের ভিতরও এমনকি বিবাদ না করে আপনি কোনভাবে থাকতে পারবেন না। আপনাদের ঘরে কিছুই নাই, তবু আপনে বাস করতে পারবেন না। টাকা পয়সা ঘরে কিছুই না তবু আপনি আপনার ঘরে থাকতে পারবেন না। সেই জায়গাগুলোতে মানুষের মধ্যে এক ধরণের নড়াচড়া তৈরী হচ্ছে। বাংলা ভাইয়ের পিছনে কতলোক যায়, মিছিলে কত লোক সমবেত হয়, তার পিছনে মন্ত্রী কত জন লোক জড়ো করে সেটা একটা তর্ক। অন্য তর্ক হচ্ছে এই লোকটাকে রাজশাহীর মানুষজন কিভাবে দেখে? রাজশাহীর সাহেব বাজরের মত শহরের একটা প্রাণকেন্দ্রে একটা বড় জমায়েত করে ফেলা, কিংবা লোকজনের মধ্যে তার অনুমোদন আছে কি না, যদি অনুমোদন থাকে সেটা, সবই বিশ্লেষনের ব্যাপার, কথার কথা, কেন বাংলা ভাইকে নিয়ে রাজশাহীর লোকজনও মাতোয়ারা। এখান থেকে বাম নেতারা গিয়ে মিটিং করছেন, জনগণ সে মিটিংয়ে আসছেও। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জনগণের সংখ্যার তুলনা করতে বসবেন না। তুলনা করলে এটা একটা ভয়ঙ্কর তুলনা। আপনি দেখেন যদি এগার দলের বা বাম দলের সমাবেশে কতজন লোক গেছে, আর কতজন লোক গেছে বাংলা ভাইয়ের সমাবশে। একই সাথে এটা অবশ্যই একটা সাজানো খেলা, বাংলা ভাইকে তৈরী করা, বাংলা ভাইকে সামনে নিয়ে আসা, নিশ্চয় রাষ্ট্র ও ঐ প্রশাসনের একদম প্রত্যক্ষ মদদে সংঘটিত। কিন্তু অন্যভাবে ভাবেন, রাষ্ট্রের এই মদদটা কাজ করলো কোন জমির উপরে? সেখানে বাংলা ভাইকে নিয়ে জনগণের ঘৃণা কতটা, আপনার আমার মতো সুশীল সভ্য মানুষজন, পত্রিকা পড়া মানুষজন শোনামাত্রই যেভাবে দেখি, রাজশাহীর সর্বস্তরের লোকজন বাংলা ভাইকে সেভাবে দেখে কি না, যদি না দেখেন সেই চৈতন্যকে আমি কি দিয়ে বুঝবো। জনগণের মধ্যে যদি বাংলা ভাইকে মনে হয় যে তিনি তাদের ত্রাতা, সেটা সর্বহারার লুটপাটের হাত থেকে বাঁচানোর নাম করে একতা হোক, কিংবা বাংলা ভাইকে যদি মনে হয় মুসলিম সে অর্থেই হোক, জাগ্রত মুসলিম জনতা, স্রেফ এই একটা নাম যদি মনে হয় কারো এটা বিরাট আস্থার নাম তাহলে তার রাজনীতিকে তখন বুঝতে হবে। স্রেফ এইটা কি আপনি তখন মৌলবাদের উপর দোষ চাপান কি চাপান না সেটা বড় কথা না, নতুবা যদি আপনে বলেন এটা মৌলবাদের উত্থান, সেই মৌলবাদ উত্থানের রাজনীতিকেও তো আপনার বুঝতে হবে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে জামাতে ইসলামীর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটছে, জামাতে ইসলামীর রাজনীতিকে কেউ বিশ্লেষণ করে নাই। জামাতে ইসলামের রাজনীতিকে কতগুলো ভারী ভারী বিশেষণ দিয়ে, ‘মধ্যযুগের রাজনীতি’, ‘হাত কাটা’, ‘রগ কাটা’, ‘প্রগতিশীলতার’ বাঁধা এইসব বলে একভাবে দেখা হইছে। কিন্তু এই রাজনীতি কী করে তার জনভিত্তি তৈরীর চেষ্টা করছে দীর্ঘ সময় ধরে তা বোঝা প্রয়োজন, কী করে কেন আপনি শহরের মানুষ জামাতে ইসলামীর নাম শুনলে বা আপনি লেখাপড়া জানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র জামাতে ইসলামীর নাম শুনলেই যেমন আঁতকে উঠেন, যেমন করে তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন বা যেমন করে জামাতে ইসলামীর প্রতিপক্ষ দাবী করে বলেন যে জামাত বল প্রয়োগের রাজনীতি করতে পারবে না, তেমন করে দেশের আপামর মানুষজনও ভাবে কি? এর ভাল দিক কি কি, হয়তো আমরা সেটা জানি বা জানতাম। কিন্তু এর খারাপ দিকটা হচ্ছে এতে করে জামাতকে আপনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে বুঝবার চেষ্টা করেন নাই। যে বল প্রয়োগের রাজনীতি জামাত করছে বলে আপনি দাবী করেন আর একটা পাল্টা বল প্রয়োগ দিয়ে, সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠের বল প্রয়োগ হতে পারে, আপনিও তেমনই জামাতকে রাজনীতি করতে দিচ্ছেন না। কিন্তু তাতে করে আপনি যেটা করছেন, জামাত যে প্রক্রিয়াতে রাজনীতি করছে, মৌলবাদ যদি বলেন তাহলে মৌলবাদ যে প্রক্রিয়াতে ছড়াচ্ছে, সেই রাজনীতিকে বুঝবার চেষ্টা করছেন না, আমরা বাংলাদেশে কেউ করি নাই। জনগণ কেন এই নির্দিষ্ট ধরণের রাজনীতিকে গ্রহন করে? আমরা ধরে নিচ্ছি জনগণ নিবে না ঐ রাজনীতি, গ্রামের লোক বোঝে না, তাই তাদেরকে টাকা পয়সা দিলে, দুটো টিউবওয়েল দিলে তাদেরকে কিনে নেয়া যায়। জামাত সম্পর্কে আমাদের এইতো assumption, জামাত সম্পর্কে আমাদের এই assumption না? এই assumption সত্য হলেও দেখেন, মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার জন্য লোকে ভোট চায়, লোকে তো ঐ শাড়ী দিয়ে হোক বা টাকা দিয়েই হোক ভোট কিনে, ফলে জামাত আর এই সকল রাজনীতিকে আমরা গুণগতভাবে ফারাক করবো কিভাবে ? সেটাও তো ভাবা জরুরী। বিএনপি-আওয়ামীলীগের মতো বুর্জোয়া দলগুলো টাকা পয়সা দিয়ে ভোট কিনে, জামাত টিউবওয়েল দিয়ে ভোট কিনে। দু’টোর মধ্যে অভিযোগটা এক কাতারের হয়ে গেল না? কিন্তু দু’টোর মধ্যে গুনগত একটা পার্থক্য আছে। জামাত একটি নির্দিষ্ট ধরণের রাজনীতির কথা বলে এবং সেই রাজনীতি হচ্ছে ধর্মের সাথে এক ধরণের ফ্যাসিস্ট উত্থানের যোগসূত্র স্থাপন করা। এক ধরণের বল প্রয়োগের রাজনীতি আছে এবং সেটা করা হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট প্রপঞ্চ, ধর্ম তার নাম দিয়ে। রাষ্ট্র বাঙালীর নাম দিয়ে ফ্যাসিস্ট হইছে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষজনেরউপর, অবাঙালীদের উপর। কিংবা আটকে পড়া পাকিস্তানীদের নিয়ে আমরা যা করি বা যা বলি সেগুলো খুবই বাঙালী রাষ্ট্রের সাথে সংগতিপূর্ণ এবং সেটা করে তখন, জাতিগতভাবে দমনমূলক প্রবণতা যে আমাদের মধ্যেও আছে, তা আমরা প্রকাশ করি। যখন আমরা সংবিধানে উপজাতি বাদে আর কিছু বলি না, এমন কি চুক্তি সইয়ের সময় আমরা যে উপজাতি শব্দটা উঠায় নেই না তখন আমরা প্রমাণ করি আমরা আদতে জাতিগত আধিপত্যের কথা বলি। এখন কথা হলো জামাত একটা নির্দিষ্ট ধরণের আধিপত্যশীল রাজনীতির কথা বলে, সেটা হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করা। সেই আধিপত্যশীল রাজনীতি জামাত কিভাবে ছড়াতে পারলো? শুধু টাকা পয়সা দিয়ে ছড়ালো? সামরিক শাসন ছিল, পেট্রো ডলার ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ ছিল, সেগুলো এক জিনিস, কিন্তু মানুষ জামাতের রাজনীতিকে কিভাবে দেখছে? যে জামাত করছে সে কিভাবে দেখছে?
রা-জীবুল : শুরুতেই আমরা যে বিষয় নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে যে কিছুদিন আগে দোতলা বাস আগুনে পুড়ে গেলো। এর মাধ্যমে এক ধরণের ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে’ আমরা সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত হই। আবার ঠিক তার আগেই চিটাগাংএ যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের ভাণ্ডার ধরা পড়লো, চোরাচালানের জায়গা থেকে এইটা একটা প্রসঙ্গ, আর সাম্প্রতিক সময়ে হচ্ছে উত্তর বঙ্গে বাংলা ভাই বলে এক মৌলবাদী তথা ধর্মীয় আধ্যাত্মিক নেতার সংগঠনকে পত্রিকায় বিভিন্নভাবে highlight করা হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে দু’টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুঁজে পায় যেটা নিয়ে মাদ্রাসার ধর্মীয় মৌলবাদকে জড়িয়ে আবার মিডিয়া প্রচার চালাচ্ছে। এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে আপনার একটা মতামতের জায়গা জানতে চাচ্ছি।
সাঈদ : একটা হচ্ছে তো আমি যেভাবে বুঝি যে, প্রথম হচ্ছে রাষ্ট্রের ভূমিকা। মানে আমরা রাষ্ট্রকে কিভাবে চিনি। রাষ্ট্র যদি হয় জনগণের দেখভাল করা, দায়িত্ব নেয়ার কর্তৃপক্ষ, সেটা হতে পারে রাষ্ট্র। অন্যভাবে, রাষ্ট্র শাসন করে কে, সরকার চালায় কে, তারা জনগণের কাঁধে ভর করে জনগণের স্বার্থকে বেচে খায় কি না। বিষয়টা তাহলে কি? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এগুলোতো আর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না যে দীর্ঘসময় ধরে স্বাধীনতার পরে, স্বাধীন রাষ্ট্র বলেই বাংলাদেশে যা তৈরী হয়েছে মানে সরকার একের পর এক যারা এসেছে তারা জনপ্রতিনিধিত্ব করে না। শুধু তাই না, এটা যে বাংলাদেশের একার সংকট তাও না, এটা গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থার সংকট, বাংলাদেশের মতো দেশে হয়তো তা অনেক অনেক বেশি প্রকটভাবে ধরা পড়ে। অন্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশে হয়তো এত evidently ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে না সেই সব দেশে, যেসব দেশে গণতন্ত্র চালাবার মতো যথেষ্ট ট্যাঁকের জোর সরকারের আছে বা রাষ্ট্রগুলোর আছে। যারা অন্য রাষ্ট্রগুলো থেকে যথেষ্ট আত্মসাৎ করে নিজেদের ভাণ্ডার বড় করতে পারছে তারা তাদের জনগণকে খাইয়ে-পরিয়ে জনগণকে subsidize করে গণতন্ত্র নামক একটা ব্যবস্থা চালাতে পারে। কিন্তু যেসব দেশ গরীব, যেসব দেশে এই অর্থনৈতিক ভর্তুকি, কল্যাণের ভর্তুকি রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে দেয়া সম্ভব না, সেইসব জায়গায় গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটা কার্যত: অচল। আবার যেই রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ব্যাপারে নাক গলায় সেই রাষ্ট্রেও গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা রাষ্ট্রের ভেতরে না হলেও বাইরের দিক থেকে অচল। ধরা যাক মার্কিন যুুক্তরাষ্ট্র, তার নিজের ভিতরেও যে সংকট, সেগুলোকে সে মিডিয়া দিয়ে, প্রচারণা দিয়ে বা নানা ধরণের রাস্তায়, যেমন সেই খানে টাকা পয়সার সংকটতো আর আমাদের মতো না, এক ধরণের নিরাপত্তা টিরাপত্তার কথা বলে- জনগণের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এগুলোর কথা বলে রাষ্ট্র একভাবে তার জনগণের উপর নিয়ন্ত্রন রাখতে পারে। কিন্তু ধরা যাক welfare দেশে জনগণের উপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আরও পোক্ত, ইউরোপের যেসব দেশ কল্যাণকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তারা তাদের জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালীভাবে রাখতে পারছে এবং সেইটা করতে পারছে গণতন্ত্র নামক শাসন ব্যবস্থা দ্বারা। আমাদের মতো দেশে যেখানে ট্যাঁকের জোর নাই সরকারের, গরীব দেশ, যেই রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রগুলোর উপর খবরদারী করার ক্ষমতাও নাই সেইসব দেশে কার্যত: গণতন্ত্র যে একটা ঠুঁটো ব্যবস্থা সেইটা যেকোনভাবেই ধরা পড়ে। দুু’টো কারণে ধরা পড়ে, যখন রাষ্ট্র জনগণকে খাওয়াতে পরাতে পারে না, জনগণের দেখভাল করতে পারে না, নিরাপত্তা দিতে পারে না, আইডিয়ালী রাষ্ট্রের যা করার কথা, তখন আসলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে গণতন্ত্র এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কিভাবে জনগণের উপর তার নিয়ন্ত্রণটাই রাখতে চায়, এর চেয়ে বেশি কিছু না। নিয়ন্ত্রণই রাখে, অন্যরা তা ঢেকেঢুকে রাখতে পারে। অন্যরা সেটা কল্যাণের কথা বলে হোক, দেখভালের কথা বলে হোক, নিরাপত্তার কথা বলে হোক, জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা বলে হোক, পারে। কিন্তু আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলো সেটা পারে না। এখন দোতলা বাসে অগ্নি সংযোগের কথা বলেন কিংবা অস্ত্র বাংলাদেশে আসছে এবং বেরিয়ে যাচ্ছে সে কথা বলেন আর বাংলা ভাইয়ের কথা বলেন, এগুলো সবই খুবই তৃতীয় বিশ্বের প্রপঞ্চ। তৃতীয় বিশ্বে তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে হয়তো আপনি এই ঘটনাগুলো ঘটতে দেখবেন। অন্যত্র হয়তো দেখবেন না। প্রথম বিশ্বের একটা রাষ্ট্রে হয়তো আপনি এগুলো ঘটতে দেখবেন না। সেটার একটা বড় কারণ যে, প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্র তার জনগণকে ঐ দূর পর্যন্ত আশ্বস্ত করতে পারে যে হ্যাঁ আমরা তোমার দেখভাল করতে পারি বা সত্যি সত্যি দেখভাল করে, যদিও তার বিনিময়ে নাগরিকের স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি থাকে, social security number দিয়ে একজন নাগরিকের যাবতীয় হাঁড়ির খবর রাষ্ট্রের হাতে সব সময় থাকে, চাহিবামাত্র নাগরিককে তলব করা, এবং তাকে হাজতে ভ’রে দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকে এবং সেটি একটা বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে বের হয়। সেটি জার্মানের নাগরিকই হোক, মার্কিন নাগরিকই হোক, তার আল-কায়দা কানেকশন আছে কি-না এটা জানা মাত্র, সন্দেহ করা মাত্র, কোন আইনের ধার না ধেরে তাকে জেলে ভ’রে দেয়া সম্ভব একটা রাষ্ট্রের পক্ষে। সেগুলো একটা বিশেষ মুহুর্তে ঐসব দেশে বের হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রের এই নগ্ন চেহারা প্রতি মুহুর্তে বের হয়, কেননা রাষ্ট্রের ট্যাঁকের জোর নেই, অপর্যাপ্ত এবং দুর্বল ট্যাঁকের জোর নিয়ে, দুর্বল শাসন কাঠামো নিয়ে সে কাজ করে। সে কারণে গণতন্ত্রের অসারতা এখানে অনেক বেশী দেখা যায় এবং সরকারগুলো বার বার নিজেদের ব্যর্থতাকেই ঢাকতে চেষ্টা করে এবং পারে না। এখন দোতলা বাসে আওয়ামীলীগ অগ্নিসংযোগ করলো না বিএনপি করলো সেটা আমাদের দেশে liberal রাজনীতিতে একটা বড় বিতর্কের বিষয়। আপনি কিংবা আমি কিন্তু প্রথম তর্কটা করি এটা নিয়ে যে এটা কি আওয়ামীলীগের কাজ, নাকি বিএনপির কাজ। এটা আওয়ামীলীগের কাজই হোক আর বিএনপির কাজই হোক কাজটা তো একটা জিনিসকে কেন্দ্র করে, সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াই কোথায় নাই। জর্জ বুশের ইলেকশনে জেতাটাতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতারলড়াই-ই ছিল। কোর্টের কাছে ধর্না দিয়ে ইলেকশনে যে জিতে আসে সেটাতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াই-ই ছিল। ওখানকার রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের উপর এই প্রভাবটা তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল যে কোর্টকাচারীর বিচারটা সহি বিচার। আর আমাদের দেশের মানুষের সুবিধাটা হচ্ছে আমরা এত ঠেকে শিখি জন্ম থেকে যে, আমাদের কাছে খুব পরিষ্কার, কোর্টকারচারীতে গেলে আপনি কোন বিচার পাবেন না; বা পত্রিকায় যা আসতাছে সাথে সাথেই আপনি ভাবতাছেন যে এটার একটা re-reading হওয়া দরকার। ওসব দেশের মানুষ CNN-এর যে version-টা দেখে, মানে মার্কিনের মানুষ CNN-এর যে version দেখে ইউরোপের CNN-এর version থেকে তা খুবই আলাদা, মানে খুবই রাষ্ট্রের মুখপাত্র গোছের। আমার মার্কিনী বন্ধুবান্ধব যারা ইউরোপে পড়তে আসছে তাদের কাছ থেকেই শোনা, তারা ইউরোপে এসে যে CNN দেখতেছে তাতে তাদের চোখ-কান অন্য রকমভাবে খুলে যাচ্ছে। সেটা মার্কিনে বসে সম্ভব না। মার্কিনে CNN এর চরিত্র সম্পূর্নই আলাদা, সেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী এবং রাষ্ট্র জনগণকে এতটাই আশ্বস্ত করতে পারে যে, হ্যাঁ জর্জ বুশ তো ঠিকই বলছে কথাটা। আমাদের দেশে এই বিতর্কগুলো অনেক আগে থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। আমাদের দেশের মানুষ যেহেতু ঠেকে শিখে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষের বঞ্চনার অভিজ্ঞতা যেহেতু খুবই বার বার ঘটে, সেহেতু আমরা জানি এটা যে, রাষ্ট্রের কাছে গেলে, সরকারের কাছে গেলে, আইনের কাছে গেলে কি পাবেন আর কি পাবেন না। আমরা শুরু থেকেই জানি যে প্রেসনোট এর ভাষ্য হচ্ছে মিথ্যা, আমরা শুরু থেকেই জানি যে পত্রিকা হচ্ছে কোন না কোন পক্ষকে represent করে এবং সেটার পেছনে নির্দিষ্ট স্বার্থও কাজ করে। যমুনা গ্র“পের চেয়ারম্যান আসামী হতে পারেন বা নাও হতে পারেন, তাকে নিয়ে যে হুজ্জত এই সরকার করতেছে বা পত্রিকাকে নিয়ে, তাতে খুব পরিষ্কার যে এইসব দেশে গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের উপর সওয়ার হয়ে যে সরকারগুলো আসে এগুলো তাদের সংকট। ফলে অন্যভাবে ভাবেন বাংলা ভাইয়ের ঘটনাটা। বাংলা ভাইয়ের ঘটনায় রাষ্ট্র কতটা সরাসরি involved, মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, রাজশাহীর মন্ত্রী, নাটোরের উপমন্ত্রীর সেখানে কতটা হস্তক্ষেপ আছে সেটা আপনে তদন্ত করে বের করতেই পারেন। আপনে চাইলেই তা বের করতেই পারেন, যে হ্যাঁ সত্যিই তো মন্ত্রীর যোগাযোগ আছে, আপনি খুঁজে বের করতে পারেন যে কোন মন্ত্রী প্রকারান্তরে ব্যাপারটিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু অন্যভাবে ভাবেন, যদি এর মধ্যে এসব মন্ত্রী-টন্ত্রী না থাকতো তাহলে কি ঘটতো। জনগণের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট ধরনের নিরপত্তাহীনতার বোধ আছে, অতৃপ্তিও আছে। জনগণ জানে যে তারা রাষ্ট্রের কাছে কিছু পাবে না। গণপিটুনির ঘটনা এখানে যত ঘটে, এই রকম দেশে যতটা ঘটে, আর একটা দেশে এমন হয় না কেন? কারণ ঐ জনগণ জানে যে, পুলিশের কাছে গেলে এর একটা সুরাহা হবে, আপনি আইনের কাছে গেলে এর একটা সুরাহা হবে।
রাজীবুল : শাসন ব্যবস্থা যে কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান সেইটার সঙ্গে আসলে সন্ত্রাসবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী, তাদের ক্ষমতার চর্চা এইটাতো প্রকট। অস্ত্র আমদানী বলি, বাংলা ভাই বলি বা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বলি বা বাসে অগ্নিসংযোগের কথাই বলি – সবই আসলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিতর রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
সাঈদ : হুম। কিন্তু এইটা তো খুব ইয়ে শব্দ – মানে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ এইটাতো খুব কাজের কিছু না। কাজের মনে করবো না এই কারণে দেখেন, ধরেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি যে আন্দোলনটা করছিলো রাষ্ট্রের ভাষায় সেটা ছিলো একটা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সেটা একটা সন্ত্রাসী আন্দোলন। কিন্তু যে রাস্তায় রাষ্ট্র সেই তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটাই দমন করেছে সেটা তো আমরা সমর্থন করতে পারি না এবং সেটাকে এক নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন না বলে অন্যভাবে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও মনে করি। সেটা আর বাংলা ভাই নিশ্চয়ই এক কাতারের জিনিস না। সেটা আমি কোনভাবেই বলছি না, কিংবা অস্ত্র আটকের ঘটনা নিশ্চয়ই একই রকম না। বিচ্ছিন্নতাবাদ বললে বোঝায় যে রাষ্ট্রের একটা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবার কথা। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি যে আমাদের মতো রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পোক্ত থাকে না। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে রাষ্ট্র এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণটা পোক্ত করতে পারে। আমাদের দেশে গণতন্ত্র ব্যবস্থা হিসাবে দুর্বল ব্যবস্থা, গণতন্ত্রকে চালাবার মত যথেষ্ঠ ট্যাঁকের জোর রাষ্ট্রের নেই। এটাও অবশ্য আমি categorically বলছি যে গণতন্ত্রকে চালাবার জন্য রাষ্ট্রের ট্যাঁকের জোর লাগে। ট্যাঁকের জোর লাগে উপরন্তু রাষ্ট্রের মিডিয়া দিয়ে বলেন, আর পাঠ্য বই দিয়ে বলেন রাষ্ট্রের মতাদর্শিক শাসনও রাষ্ট্রের পোক্ত করতে হয়। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রগুলো দুর্বল, কেউ কেউ সেটাকে উপনিবেশিকতার ফলাফল বলছে, উপনিবেশিকতার হাত ধরে জন্ম হয়েছে বলেই হোক আর যেভাবেই হোক এই রাষ্ট্র জন্মলগ্ন থেকেই মতাদর্শিকভাবে জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই। অন্যদিকে ট্যাঁকের জোরও নাই জনগণকে খাইয়ে পরিয়ে রাখার। যে কোন অর্থে এই দু’টো কারণে বা এর যে কোন একটা বিশেষ কারণে হোক গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থা এইসব দেশে অকার্যকর। আরও বড় কথা হচ্ছে যে এই মধ্যপ্রাচ্য সংকটটির পরে, ইরাক যুদ্ধের পরে, যদি যুদ্ধ বলি এটাকে আমরা, ইরাক যুদ্ধের পরে আপনাদের কাছে নিশ্চয়ই মনে হয়েছে যে, গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটা তো একই সাথে আপেক্ষিক। বাংলাদেশে গণতন্ত্র তো আর বিদেশের গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন কিছু না। আর গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থার ঠিক উল্টো পিঠেই তো সাম্রাজ্যবাদ, সেসব চিন্তা করলে এ দেশে কি গণতন্ত্র থাকবে না থাকবে তা ঠিক আপনার আমার কিংবা আমাদের শাসকদের মর্জিরও ব্যাপার না। তাহলে আমরা আমাদের দেশে কেমন গণতন্ত্র রাখতে পারবো সেটা আমাদের হাতেও নাই। এটা শাসকদের হাতেও নাই, তাদের মর্জিরওব্যাপার না। তার অর্থ এই না যে, আমাদের শাসকদের কোন দায় দায়িত্ব নাই। কিন্তু আমি বলছি এটা আরো বৃহত্তর ব্যবস্থার একটা অংশ। সে কারণে এখানে রাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলো, রাষ্ট্রের নগ্ন চেহারাগুলো অনেক বেশি চোখে দেখা যায়। অন্য দেশেও রাষ্ট্র এমন সরাসরি শাসন করে, বল প্রয়োগেই শাসন করে কিন্তু অন্য দেশে হয়তো বল প্রয়োগটা সুগার কোটেড থাকে। ওষুধের উপর যেমন সুগারের প্রলেপ থাকে, সুগার কোটেড থাকে বলে আপনি দেখতে পান না রাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপগুলো কিংবা দেখতে পান কেবল একটা বিশেষ মুহুর্তে। কিন্তু তাছাড়া দেখা যায় যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, যার যা করার কথা, পুলিশের যা করার কথা, রাষ্ট্রের যা করার কথা, বিচারকের যা করার কথা, রাষ্ট্রপতির যা করার কথা, কেউ কারো জায়গায় নাক গলাচ্ছে না। এটা তথাকথিত সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে দেখা যায়। যেটা আমাদের মতো দেশে রাষ্ট্রের চাতুর্যগুলো অনেক বেশি শুরু থেকেই চোখে পড়ে। ফলে বাংলা ভাইয়ের কথা বলেন, একই সাথে যেমন মানুষ দেখছে রাষ্ট্রের কাছে সে কিছু পায় না। ফলে তাৎক্ষণিক বিচারটা সে নিজের হাতে নেয়, সেটা চাঁদাবাজকে গণপিটুনি দিয়েই হোক, নাটোরের সেই লাঠি বাঁশি সমিতি করেই হোক মানুষ কিন্তু নিজের হাতে সুরাহা করার চেষ্টা করে। দেয়ালের ভিতর মানুষের পিঠ ঠেকে গেছে। ঠেলতে ঠেলতে জনগণকে দেয়ালের ভিতর নিয়ে গেছে, ঘরের ভিতরও এমনকি বিবাদ না করে আপনি কোনভাবে থাকতে পারবেন না। আপনাদের ঘরে কিছুই নাই, তবু আপনে বাস করতে পারবেন না। টাকা পয়সা ঘরে কিছুই না তবু আপনি আপনার ঘরে থাকতে পারবেন না। সেই জায়গাগুলোতে মানুষের মধ্যে এক ধরণের নড়াচড়া তৈরী হচ্ছে। বাংলা ভাইয়ের পিছনে কতলোক যায়, মিছিলে কত লোক সমবেত হয়, তার পিছনে মন্ত্রী কত জন লোক জড়ো করে সেটা একটা তর্ক। অন্য তর্ক হচ্ছে এই লোকটাকে রাজশাহীর মানুষজন কিভাবে দেখে? রাজশাহীর সাহেব বাজরের মত শহরের একটা প্রাণকেন্দ্রে একটা বড় জমায়েত করে ফেলা, কিংবা লোকজনের মধ্যে তার অনুমোদন আছে কি না, যদি অনুমোদন থাকে সেটা, সবই বিশ্লেষনের ব্যাপার, কথার কথা, কেন বাংলা ভাইকে নিয়ে রাজশাহীর লোকজনও মাতোয়ারা। এখান থেকে বাম নেতারা গিয়ে মিটিং করছেন, জনগণ সে মিটিংয়ে আসছেও। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জনগণের সংখ্যার তুলনা করতে বসবেন না। তুলনা করলে এটা একটা ভয়ঙ্কর তুলনা। আপনি দেখেন যদি এগার দলের বা বাম দলের সমাবেশে কতজন লোক গেছে, আর কতজন লোক গেছে বাংলা ভাইয়ের সমাবশে। একই সাথে এটা অবশ্যই একটা সাজানো খেলা, বাংলা ভাইকে তৈরী করা, বাংলা ভাইকে সামনে নিয়ে আসা, নিশ্চয় রাষ্ট্র ও ঐ প্রশাসনের একদম প্রত্যক্ষ মদদে সংঘটিত। কিন্তু অন্যভাবে ভাবেন, রাষ্ট্রের এই মদদটা কাজ করলো কোন জমির উপরে? সেখানে বাংলা ভাইকে নিয়ে জনগণের ঘৃণা কতটা, আপনার আমার মতো সুশীল সভ্য মানুষজন, পত্রিকা পড়া মানুষজন শোনামাত্রই যেভাবে দেখি, রাজশাহীর সর্বস্তরের লোকজন বাংলা ভাইকে সেভাবে দেখে কি না, যদি না দেখেন সেই চৈতন্যকে আমি কি দিয়ে বুঝবো। জনগণের মধ্যে যদি বাংলা ভাইকে মনে হয় যে তিনি তাদের ত্রাতা, সেটা সর্বহারার লুটপাটের হাত থেকে বাঁচানোর নাম করে একতা হোক, কিংবা বাংলা ভাইকে যদি মনে হয় মুসলিম সে অর্থেই হোক, জাগ্রত মুসলিম জনতা, স্রেফ এই একটা নাম যদি মনে হয় কারো এটা বিরাট আস্থার নাম তাহলে তার রাজনীতিকে তখন বুঝতে হবে। স্রেফ এইটা কি আপনি তখন মৌলবাদের উপর দোষ চাপান কি চাপান না সেটা বড় কথা না, নতুবা যদি আপনে বলেন এটা মৌলবাদের উত্থান, সেই মৌলবাদ উত্থানের রাজনীতিকেও তো আপনার বুঝতে হবে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে জামাতে ইসলামীর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটছে, জামাতে ইসলামীর রাজনীতিকে কেউ বিশ্লেষণ করে নাই। জামাতে ইসলামের রাজনীতিকে কতগুলো ভারী ভারী বিশেষণ দিয়ে, ‘মধ্যযুগের রাজনীতি’, ‘হাত কাটা’, ‘রগ কাটা’, ‘প্রগতিশীলতার’ বাঁধা এইসব বলে একভাবে দেখা হইছে। কিন্তু এই রাজনীতি কী করে তার জনভিত্তি তৈরীর চেষ্টা করছে দীর্ঘ সময় ধরে তা বোঝা প্রয়োজন, কী করে কেন আপনি শহরের মানুষ জামাতে ইসলামীর নাম শুনলে বা আপনি লেখাপড়া জানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র জামাতে ইসলামীর নাম শুনলেই যেমন আঁতকে উঠেন, যেমন করে তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন বা যেমন করে জামাতে ইসলামীর প্রতিপক্ষ দাবী করে বলেন যে জামাত বল প্রয়োগের রাজনীতি করতে পারবে না, তেমন করে দেশের আপামর মানুষজনও ভাবে কি? এর ভাল দিক কি কি, হয়তো আমরা সেটা জানি বা জানতাম। কিন্তু এর খারাপ দিকটা হচ্ছে এতে করে জামাতকে আপনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে বুঝবার চেষ্টা করেন নাই। যে বল প্রয়োগের রাজনীতি জামাত করছে বলে আপনি দাবী করেন আর একটা পাল্টা বল প্রয়োগ দিয়ে, সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠের বল প্রয়োগ হতে পারে, আপনিও তেমনই জামাতকে রাজনীতি করতে দিচ্ছেন না। কিন্তু তাতে করে আপনি যেটা করছেন, জামাত যে প্রক্রিয়াতে রাজনীতি করছে, মৌলবাদ যদি বলেন তাহলে মৌলবাদ যে প্রক্রিয়াতে ছড়াচ্ছে, সেই রাজনীতিকে বুঝবার চেষ্টা করছেন না, আমরা বাংলাদেশে কেউ করি নাই। জনগণ কেন এই নির্দিষ্ট ধরণের রাজনীতিকে গ্রহন করে? আমরা ধরে নিচ্ছি জনগণ নিবে না ঐ রাজনীতি, গ্রামের লোক বোঝে না, তাই তাদেরকে টাকা পয়সা দিলে, দুটো টিউবওয়েল দিলে তাদেরকে কিনে নেয়া যায়। জামাত সম্পর্কে আমাদের এইতো assumption, জামাত সম্পর্কে আমাদের এই assumption না? এই assumption সত্য হলেও দেখেন, মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার জন্য লোকে ভোট চায়, লোকে তো ঐ শাড়ী দিয়ে হোক বা টাকা দিয়েই হোক ভোট কিনে, ফলে জামাত আর এই সকল রাজনীতিকে আমরা গুণগতভাবে ফারাক করবো কিভাবে ? সেটাও তো ভাবা জরুরী। বিএনপি-আওয়ামীলীগের মতো বুর্জোয়া দলগুলো টাকা পয়সা দিয়ে ভোট কিনে, জামাত টিউবওয়েল দিয়ে ভোট কিনে। দু’টোর মধ্যে অভিযোগটা এক কাতারের হয়ে গেল না? কিন্তু দু’টোর মধ্যে গুনগত একটা পার্থক্য আছে। জামাত একটি নির্দিষ্ট ধরণের রাজনীতির কথা বলে এবং সেই রাজনীতি হচ্ছে ধর্মের সাথে এক ধরণের ফ্যাসিস্ট উত্থানের যোগসূত্র স্থাপন করা। এক ধরণের বল প্রয়োগের রাজনীতি আছে এবং সেটা করা হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট প্রপঞ্চ, ধর্ম তার নাম দিয়ে। রাষ্ট্র বাঙালীর নাম দিয়ে ফ্যাসিস্ট হইছে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষজনেরউপর, অবাঙালীদের উপর। কিংবা আটকে পড়া পাকিস্তানীদের নিয়ে আমরা যা করি বা যা বলি সেগুলো খুবই বাঙালী রাষ্ট্রের সাথে সংগতিপূর্ণ এবং সেটা করে তখন, জাতিগতভাবে দমনমূলক প্রবণতা যে আমাদের মধ্যেও আছে, তা আমরা প্রকাশ করি। যখন আমরা সংবিধানে উপজাতি বাদে আর কিছু বলি না, এমন কি চুক্তি সইয়ের সময় আমরা যে উপজাতি শব্দটা উঠায় নেই না তখন আমরা প্রমাণ করি আমরা আদতে জাতিগত আধিপত্যের কথা বলি। এখন কথা হলো জামাত একটা নির্দিষ্ট ধরণের আধিপত্যশীল রাজনীতির কথা বলে, সেটা হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করা। সেই আধিপত্যশীল রাজনীতি জামাত কিভাবে ছড়াতে পারলো? শুধু টাকা পয়সা দিয়ে ছড়ালো? সামরিক শাসন ছিল, পেট্রো ডলার ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ ছিল, সেগুলো এক জিনিস, কিন্তু মানুষ জামাতের রাজনীতিকে কিভাবে দেখছে? যে জামাত করছে সে কিভাবে দেখছে?
রাজীবুল : কিন্তু এইটার সাথে তো এইটাও মানতে হয় আমাদের যে জামাতের রাজনীতিকে বুঝতে না চেয়ে জামাতের রাজনীতিকে আমরাই বড় করে তুলি আমাদের মিডিয়ার মাধ্যমে।
সাঈদ : হুঁ। সেটা সত্য।
রাজীবুল : আমরা যখন জামাতকে বলি যে রগ কাটার রাজনীতি করে তার মানে আমার অবস্থানে জামাত অবস্থিত না হলেও খুব অসচেতনভাবে আমি জামাতকে ভয় পেতে শুরু করি।
সাঈদ : সেটা একটা জিনিস। আমি ভয় দিয়ে বুঝবো না। আমি বলবো হ্যাঁ ভয় তো বটেই এবং এই ভয় হচ্ছে মানে…।
রাজীবুল : এটা কি জামাতকে এক ধরণের ক্ষমতায়ন না ? যেমন করে বাংলা ভাইকে রাজশাহীর context এ…
সাঈদ : আমি ঠিক ক্ষমতায়নও বলবো না। আপনি বলতে পারেন ক্ষমতায়ন। আমি বলবো ঐ জায়গাটায় আমি ঠিক ১০০ ভাগ একমত, আপনি যেটা বলছিলেন যে জামাতের নাম শুনে আমরা আঁতকে উঠি। আমরা ভয় পাই। ভয় পাবো কি পাবো না, ভয় পাওয়ার আছে কি নাই, সেটা একটা প্রশ্ন। আবার যেমনি করে আমরা জামাতকে ভয় পাই তেমনি করে কি আমরা বিএনপির একটা সন্ত্রাসীকে ভয় পাই? আওয়ামীলীগের একটা সন্ত্রাসীকে ভয় পাই ? কাটা রাইফেল নিয়ে ক্যাম্পাসে যে দৌঁড়াচ্ছে তাকেও আমি ভয় পাই ? দিনের পর দিন যে চাঁদাবাজি করতেছে নীলক্ষেতে তাকে কি আমরা ভয় পাই একই রকম করে? পাই না তো। জামাত যেন একটা বিশেষ ধরণের ভয়। ঐ একটা বিশেষ ধরণের রাজনীতির প্রতি একটা বিশেষ ধরণের ভয় তৈরী হওয়া আমার কাছে মনে হয় সমস্যাজনক। সেটাকে পৃথক করা জরুরী এবং সেটার প্রতি আঁতকে না উঠে সেটার রাজনীতিকে বুঝবার চেষ্টা করা উচিত। সেটার রাজনীতিকে আপনি যদি উন্মোচন করতে পারেন, আপনি যদি ধরতে পারেন যে এই এই কারণে বিএনপি এই ধরণের রাজনীতি করে, জামাত আরেক ধরণের রাজনীতি করে, তা হবে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামীলীগ এই ধরণের রাজনীতি করে, মানে আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধ বিক্রি করে আর জামাত ধর্ম বিক্রি করে পার্থক্যটা এখানে। তারপরে দু’টো রাজনীতির মধ্যে কি ধরণের ফ্যাসিস্ট উপাদান আছে সেটা এক জিনিস কিনা তাও বিবেচ্য। কিন্তু এ ধর্মকে ব্যবহার করে বলেই আমরা আঁতকে উঠি, কেননা আমরা হলাম আধুনিক সভ্য মানুষ। এইখানে তালাল আসাদের কথা ব্যবহার করতে হয়, এগুলো হচ্ছে সভ্য উদারনৈতিক সমাজের মানুষের ভয় যারা কিনা ধরে নিয়েছে যে ধর্ম হচ্ছে জীবন হতে একটা separate বিষয়। ধর্ম এবং ক্ষমতার যোগ ঘটলেই আমরা ভয় পাই, কিন্তু ধর্ম এবং ক্ষমতার যোগ অনেক ক্ষেত্রেই self liberating হতে পারে। ধর্ম এবং ক্ষমতা যোগ করে আপনি একদম ভিন্ন ধরণের রাজনীতি করতে পারেন এবং সেটা এমন বল প্রয়োগী নাও হতে পারে। ধর্ম ও রাজনীতি যোগ হলেই সেটা বল প্রয়োগী হবে আর সেক্যুলার রাজনীতি বল প্রয়োগী না এই ভাবনাগুলো সমস্যাজনক একই সাথে। বরং সেক্যুলার রাজনীতি বল প্রয়োগী না, সেক্যুলার রাজনীতি গণতন্ত্রে কাজ করে, এভাবে দেখাটাই বিভ্রান্তমূলক। মানে কোথায় গণতন্ত্র? পার্টির ভিতর বড় দলের গণতন্ত্র কোথায়? সেক্যুলার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তো বল প্রয়োগীই। আপনি খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন না শেখ হাসিনার আস্থাভাজন তার উপর ভিত্তি করে দলে আপনার অবস্থান নির্ভর করে। তাই যদি হয় তাহলে সেক্যুলার রাজনীতিও বলপ্রয়োগী ছাড়া ভিন্ন কিছু না। সেক্ষেত্রে কেবল আরেক রকম বল প্রয়োগের রাজনীতি জামাত করতেছে। ফলে জামাতকে নিয়ে আঁতকে উঠাটা হচ্ছে সভ্য ভদ্র শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়ার আঁতকে ওঠা, খুবই উদারনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠা মানুষের আঁতকে ওঠা। এটা নিয়ে আঁতকে না উঠে এই রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওটাকে মধ্যযুগীয় না বলে বরং মনে রাখা উচিত ধর্ম ও রাজনীতির যোগসূত্র সেক্যুলার সমাজের ভিতর দিনের পর দিন ছিল; আছে। ক্রিশ্চিয়ান সমাজগুলোতে, পাশ্চাত্য সমাজগুলোতে যেগুলোতে রাষ্ট্রকে সেক্যুলার মনে করা হয় তার ভিতর ধর্ম ও রাজনীতির যোগযোগ নিরন্তর ছিল, সব সময় ছিল। সেখানকার রাষ্ট্র কোন না কোন বিশেষ ধর্মকে উৎসাহিত করে সব সময়। সেগুলো আমরা ভুলে যাই। এগুলো এই মুহুর্তে হয়তো অনেক সহজে চোখে ধরা পড়ে। একটা ইরাক আক্রমণের পরে অনেক বেশি সহজবোধ্য, বোঝা যায় যে কোন জায়গাতে, কেন, জর্জ বুশের ইসলাম বিরোধী একটা বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলতে হয়। ইসলামকে পছন্দ করেন কি করেন না ব্যক্তি হিসাবে তা না, এই পশ্চিম উদারনৈতিক ব্যবস্থা কাকে প্রতিপক্ষ বানাচ্ছে এবং এই ব্যবস্থা তাহলে নিজ পক্ষ হিসাবে কাকে দেখছে? ফলে ধর্ম ও রাজনীতিরযোগসূত্র সেক্যুলার ব্যবস্থার মধ্যেও ছিল। Itself তখন সেগুলো প্রশ্নের উদ্রেক করে যে গণতন্ত্র যেমন প্রশ্নাতীত নয় সেক্যুলারিজমও ব্যবস্থা হিসাবে প্রশ্নাতীত কি-না। এইগুলো খুবই বিপদজনক ও স্পর্শকাতর প্রশ্ন আমাদের জন্য। কেননা আমরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল ভাবি। কেননা আমরা ধরে নিয়েছি সেক্যুলারিজম একটা আরাধ্য বিষয়। আমরা ধরে নিয়েছি গণতন্ত্র একটা আরাধ্য বিষয়। সেক্যুলারিজম এখন যত স্পর্শকাতর, গণতন্ত্রকে নিয়ে কথা বলা এখন তত স্পর্শকাতর না, কেননা গণতন্ত্র নামক ব্যবস্থার ফাঁক ফোকরগুলো বার বার আমাদের সামনে চইলা আসতেছে, বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আসতেছে, নিজের দেশে আমরা দেখতেছি, নিজের দেশে আমাদের গণতন্ত্রের যে অভিজ্ঞতা সেইখান থেকে আমরা দেখছি। ’৯০এর পর থেকে চারটা সরকার আসতে যাচ্ছে, আগামীতে চতুর্থ সরকার আসছে নিরপেক্ষ ব্যক্তি-টেক্তি বসায়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে। তার ফলে কি গণতন্ত্র পাচ্ছেন তা আপনে দেখতে পারছেন এক, অন্যভাবে বৃহত্তর ব্যবস্থায় বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্র যে অসার সেটাও আপনি দেখতে পারছেন। ফলে গণতন্ত্র নিয়ে এই প্রশ্নটা আপনি ৩১ বছর আগে করতে পারতেন না। সেক্যুলারিজম এখন যতটা স্পর্শকাতর বিষয়, ৩০ বছর আগে গণতন্ত্র তেমন স্পর্শকাতর বিষয়ই ছিল, কেননা প্রচুর দেশ তখন গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে। সাবেক উপনিবেশগুলো তখন মুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের দিকে ছুটছে। যাতে করে গণতন্ত্র তখন তো ছিল আরাধ্য বিষয়। এখন ৩০-৪০-৬০ বছর, বড় জোর ৬১ বছরের অভিজ্ঞতায়, ৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় আপনি বুঝতে পারেন যে গণতন্ত্র একটা অসার ব্যবস্থা। আপনি এখানে বসে যেটা বুঝতে পারেন আপনি পাশ্চাত্যে যান, পাশ্চাত্যে এ কথা বলে তা প্রতিষ্ঠিত করা আপনার জন্য খুব কঠিন যে গণতন্ত্র ব্যবস্থা হিসাবে অসার। পাশ্চাত্যের দু’একজন চিন্তাশীল মানুষই এমন মত লেখেন বটে, তাদের পিছনে খুব বেশী মানুষজন নেই। যারা যুদ্ধ বিরোধী র‌্যালীতে যাচ্ছে তারাও যে গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে তা না কিন্তু। তারাও মনে করে যে আসলে একটা গণতন্ত্র আছে। এইটা তৃতীয় বিশ্বে আমরা বুঝতে পারি যে গণতন্ত্র নাই, কেননা আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা শুরু থেকেই গণতন্ত্রের অসারতা দেখতে পাই। আমি নিশ্চিত বা আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন সেক্যুলারিজম যে ব্যবস্থা হিসেবে অসার অন্তত: ইরাক যুদ্ধ তার একটা বড় ধাক্কা দিছে। সেক্যুলারিজম বলে আদতে যে ব্যবস্থাটা ছিল সেটা যে একই রকম বলপ্রয়োগী, ধর্মের মতই বল প্রয়োগী, সেটা যে প্রকারান্তরে ধর্মকেই ব্যবহার করে এটা একটা সময় খুবই স্পষ্ট হবে। খুবই পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেই প্রক্রিয়াটা, সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরণের সময়টা এখন আমরা পার হচ্ছি। এটা আমার নিজের কাছে মনে হয়। আমরা এমন একটা সময় পার করতেছি যে সময়টায় রূপান্তরণটা হচ্ছে। এই রূপান্তরণ আপনাকে মধ্যযুগে নিয়ে যাবে কি-না, আপনি আবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বৈধতা দেয়ার কথা বলছেন কি-না, সেটা মূল প্রসঙ্গ না। প্রসঙ্গটা হচ্ছে অন্তত: এটুকু যে যারা ধর্ম বিযুক্ত রাষ্ট্রের কথা বলেছে তারা যে আসলে সত্য কথা বলে নাই সেটা এখন চোখের সামনে দেখা যাবে। এটা হচ্ছে সেই সময়।
রাজীবুল : মানে, এখানে যেটা প্রত্যেকটা প্রসঙ্গেই আসছে সেটা হচ্ছে যে আপনি কখনও রাষ্ট্রকে অস্বীকার করছেন না। গণতন্ত্র কি, সেক্যুলারিজম কি এইটা নিয়ে আপনার প্রশ্নের জায়গাটা। কিন্তু রাষ্ট্র যে কোন শাসন ব্যবস্থায়ই, যে কোন পদ্ধতিতেই একই ধরণের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের এক ধরণের বল প্রয়োগের …।
সাঈদ : হ্যাঁ। রাষ্ট্র একটা বল প্রয়োগী প্রতিষ্ঠান।
রাজীবুল : এইটা নিয়ে তো আমরা কখনও ঐ রকম উচ্চবাচ্য করি না। যেমনটা রাষ্ট্রের …।
সাঈদ : আপনি বলতে চাচ্ছেন যে গণতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্রের অভিব্যক্তি বা শাসন ব্যবস্থা হচ্ছে রাষ্ট্রের অভিব্যক্তি। কিন্তু আপনে বলতে চাচ্ছেন রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে খোদ আমি সমালোচনামুখর নই, যেমন সমালোচনামুখর গণতন্ত্র নিয়ে কিংবা রাষ্ট্রের শাসন নিয়ে। প্রথম কথা হচ্ছে যে, রাষ্ট্রকে যে আপনি অস্বীকার করছেন আপনি কোন বাস্তব মানুষ? রাষ্ট্র কি প্রতিষ্ঠান হিসাবে অবাস্তব? রাষ্ট্রকে আপনি কি পর্যায়ে অস্বীকার করবেন, conceptually অস্বীকার করবেন? conceptually আপনি বলবেন রাষ্ট্র বল প্রয়োগী তাই রাষ্টের প্রয়োজন নাই, এ কথা কেউ বলেছেন পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যে রাষ্ট্রের প্রয়োজন নাই? তাহলে ব্যবস্থাটা কি ? তাহলে শাসনটা কি ?আপনে তো আর বলবেন না একটা ঐতিহাসিক রূপান্তরণ ঘটবার পরে আবার আগের জায়গাতে ফিরে যাবে পৃথিবী, এমন তো ঘটার না।
রাজীবুল : না। আমি সেইটার জায়গায় বলছি না। যেমন ভিন্ন রাষ্ট্র …।
আফজাল : আমি একটু যোগ করতে চাচ্ছি, কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কিন্তু পৃথিবীতে আছে। নাই যে তা কিন্তু না। ইউরোপের ছোট্ট একটা দেশ আছে যেখানে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নাই।
সাঈদ : যেমন …।
আফজাল : নামটা আমার এই মুহুর্তে ঠিক খেয়াল আসতাছে না। ইউরোপের ছোট্ট একটা দেশ আছে যেখানে এই রকম কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থাটা নেই।
সাঈদ : হতে পারে, আমার জানা নেই। কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম। কারণ রাষ্ট্রের উৎপত্তিই হইছে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার উপর। কি যেন বলছিলেন।
রাজীবুল : আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র যখন নিজেদের জাতীয়তা বা identity নিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন আসলে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ, দু’টি পক্ষ। দু’টো পক্ষ হলেই আসলে দু’টো শক্তির লড়াই, এটা সব সময়ই থাকবে। তাহলে যেহেতু রাষ্ট্রই আছে ক্ষমতার সন্ত্রাসবাদী আচরণ নিয়ে সেখানে রাষ্ট্রের ভিতরের সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমকে আমি কিভাবে দমনের কথা বলি।
সাঈদ : রাষ্ট্র কি আসলে দমনের কথা বলে? দেখেন কতগুলো জিনিস, একটা হচ্ছে যে, transborder যেসব concept সেটা গণতন্ত্র হতে পারে, গণতন্ত্র শুধু রাষ্ট্রের ভিতরকার concept তো না। জর্জ বুশ তো তার নিজের দেশের গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন না, তার রাষ্ট্র তার ভাষায় তো গণতান্ত্রিকই। জর্জ বুশ লড়তাছেন সারা বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য, তাই তো? সেটাতো তার জনগণ খাচ্ছে, তার জনগণতো এহেন যুক্তিতে আস্থাশীল। অন্য যুক্তি হচ্ছে দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি আছে মানেই সব সময় বিবাদ করছে এটা স্বত:সিদ্ধ সত্য নয়। একটা বৃহত্তর স্বার্থের ক্ষেত্রে দুইটা রাষ্ট্র গাঁটছাড়া বাধঁতাছে। বাঁধতাছে না? একটা তৃতীয় রাষ্ট্রকে আক্রমণ করার জন্য, ধরেন সেটা মধ্যপ্রাচ্য, সেটা কখনও রাষ্ট্র অর্থে প্যালেষ্টাইন, কখনও ব্যর্থ রাষ্ট্র অর্থে ইরাক, কখনও রাষ্ট্র অর্থে ইরান। এসব করতে দুই রাষ্ট্রতো গাঁটছাড়া বাঁধছ। মধ্যপ্রাচ্যকে দখল করার জন্য যুদ্ধ করতেছে কারা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সাথে আছে ব্রিটেন। পিছনে আছে ইউরোপের নৈতিক সমর্থন। মানে এই যদি হয় ব্যবস্থা, সব সময় তো আপনি এটাও বলতে পারছেন না রাষ্ট্রগুলো পরস্পর মারামারি করতাছে। হ্যাঁ, রাষ্ট্র বল প্রয়োগী, আপনার এই পয়েন্টের সাথে আমার কোনো দ্বিমত নেই যে রাষ্ট্র একটা বল প্রয়োগী ব্যবস্থা এবং হ্যাঁ সেটাইতো আমি বলছি যে রাষ্ট্র বল প্রয়োগ করে দু’টো রাস্তায়। একটা হচ্ছে রাষ্ট্র মানুষকে খাইয়ে পড়িয়ে মানুষকে তুষ্ট করে বল প্রয়োগের অধিকারটা নিজের হাতে নেয়। দেখ তোমাকে খাওয়ায়ে পরায়ে রাখতে হলে তো তোমার security number টা আমার রাখতে হব। সেটা একটা দিক। আর একটা দিক হচ্ছে টাকা পয়সা দিয়ে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করে, যেমন তোমার চাকরি নাই বেকার ভাতা দিয়ে আর একটা মতাদর্শিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে যে আমি তোমাকে দেখভাল করি, খাওয়াই-পড়াই, তোমাকে এটা এটা মানতে হবে। এবং এটা ঠিক জনগণ তা মানে। মতাদর্শিকভাবেই হোক আর টাকা পয়সা দিয়ে হোক রাষ্ট্র কি করে, তার বলপ্রয়োগকে বৈধতা দেয়, সেটা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নাই। আপনি যদি বলেন সেটাকে আমরা কিভাবে ভাঙ্গবো, সেটাকে কিভাবে আমরা প্রশ্ন করবো, তার উত্তর কিন্তু আমাদের জানা নেই। ইতিহাসের যদি অভিজ্ঞতা নেন তাহলে এর উত্তর আমাদের জানা নেই। অবশ্যই রাষ্ট্র আসার আগে তার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল। ভিন্ন ধরনের কেন্দ্রীয় শাসন ছিল। কিন্তু আধুনিকতা যে নির্দিষ্ট ধরনের রাষ্ট্রকে ‍shape করছে এবং কালক্রমে সেই রাষ্ট্রকে সেক্যুলার করছে সেই সেক্যুলার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বা আমি এখন কথা বলছি সেক্যুলার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। কিন্তু ঐটা সত্যি যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বা সেক্যুলার না হলেই যে সংকট থাকবে না এমন বলা যায় না। যদি আপনি বলেন, রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক না হলে কী বল প্রয়োগী থাকবে না- তার কোনো নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব না।
রাজীবুল : আমার প্রশ্ন সেইখানেই…
সাঈদ: সেটাতো অবশ্যই। রাষ্ট্র কেন্দ্রীয়ভাবে যখন থেকেই শাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে, যখনই রাষ্ট্র তৈরী হইছে তখন থেকেই সে বল প্রয়োগী প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র নামক ব্যবস্থা যতদিন টিকে থাকবে ততদিনই সেটা বল প্রয়োগী থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নাই । আমি কথা বলছিলাম এই নির্দিষ্ট মুহুর্তে রাষ্ট্রের বল প্রয়োগের অভিব্যক্তি কি তা নিয়ে এবং আমরা এখন লড়াই করছি সেইগুলো নিয়ে। বা সেগুলোকেই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। রাষ্ট্রের কতগুলো নির্দিষ্ট ধরণের মতাদর্শকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।
রাজীবুল: এবং সেই সাথে এইটাও তো সত্য, সরাসরি না হোক একটা রাষ্ট্র আরেকটা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরী করে তার ক্ষমতার চর্চা করতে পারেন, মানে যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা জাপান আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে কতগুলো আইন বেঁধে দেয় সেই ক্ষেত্রে আমরা আমাদের মতো রাষ্ট্র ঐ রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনা ঐ অর্থে করি না।
সাঈদ : আমি আপনাকে শুধু এটাই বলছি, রাষ্ট্র রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয় সেটা সত্য। কিন্তু একই সাথে সত্য নয়ও তা, মানে এত সরলও না সম্পর্কটা। মানে কে কার প্রতিপক্ষ হয়? বাংলাদেশের জনগণ কি জাপানের জনগণের প্রতিপক্ষ হয়, নাকি জাপানের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের প্রতিপক্ষ হয়? তাতো না। অর্থনীতি এবং রাজনীতি এই দুইটা হচ্ছে শাসনের তরিকা। প্রতিপক্ষ হয় হচ্ছে আসলে জনপ্রনিধিত্বের নামে যারা, গণতন্ত্রের নামে যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করছে তারা, ভূরাজনৈতিক স্বার্থে, ভূরাজনৈতিক শক্তিতে অন্য রাষ্ট্রের উপর দখলদারিত্ব তৈরী যারা করছে তারা। প্রয়োজনে এই দখলদারিত্ব রাখবার জন্য তারা অন্য আরেক রাষ্ট্রের সাথে মৈত্রীও স্থাপন করছে। কাউকে পেটানোর জন্য কাউকে সাথে নিয়েছে। কারও উপর শাসনকে জারি রাখতে তারা গাঁটছাড়া বাঁধছে। এখন আমার বক্তব্য হচ্ছে যে হ্যাঁ সে কথাতো অবশ্যই সত্যি যে রাষ্ট্র বলপ্রয়োগী। তবে তা খুবই স্থান কাল নির্দিষ্ট সত্য। মানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র একভাবে বলপ্রয়োগী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্র অন্যভাবে বল প্রয়োগী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র একভাবে বল প্রয়োগ করে তার ভিতরের জনগণের উপর, বাইরের অন্য রাষ্ট্রকে নিয়ে বলবার ক্ষমতা বা এখতিয়ার কোনটাই তার নাই। মার্কিনের রাষ্ট্র তার জনগণের উপর বল প্রয়োগ করে একভাবে, শাসন জারী করে একভাবে, মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তার করে একভাবে, বৈশ্বিকভাবেও সেটা সে করবার চেষ্টা করে। বৈশ্বিকভাবে সেটা করার মত জোর, ক্ষমতার জোর মানে ভূরাজনৈতিক বস্তুগত জোর তার অছে। সে কারণে রাষ্ট্র অবশ্যই বল প্রয়োগী তাতে কোন সন্দেহ নাই।
রাজীবুল : সেটাও তো যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো তার রাষ্ট্র ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যই কাজটি করে।
সাঈদ : হ্যাঁ। এবং আমি যখন সেক্যুলারিজম নিয়ে কথা বলছিলাম বা গণতন্ত্রের অসারতা নিয়ে কথা বলছিলাম তখন এই assumption থেকে কথা বলছি না যে এগুলো না থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসাবে বল প্রয়োগহীন হবে। ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র তৈরীই হয়েছে বল প্রয়োগ করতে পারে এমন শর্তের উপর। বল প্রয়োগ যদি না করতে পারতো তাহলে তো রাষ্ট্র তৈরীই হতো না। ঐ জোর যদি তার না-ই থাকতো যে সে একজনের consent, সেটা মতাদর্শ দিয়েই হোক আর জোর করেই হোক আদায় করতে যদি না পারতো তাহলে সে ব্যবস্থা হিসেবে টিকতো না। যখন রাষ্ট্র সেটা করতে পারে নাই তখন তাকে মার খাইতে হইছে। মানে যত দিন পর্যন্ত কলোনীগুলোর উপর বল প্রয়োগ করে রাখতে পারছে, সেটা তার জন্য economically feasible হইছে ততদিন সেতো বল প্রয়োগ করেই রাখছে। যখন সে আর পারে নাই তখন তাকে চলে যাইতে হইছে। ফলে বল প্রয়োগ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথেই শর্তযুক্ত। বল প্রয়োগ করবে, এটা তার অস্তিত্বের একদম অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু আমি আসলে কথা বলতে চাইছিলাম ভিন্ন জায়গায়। যেটা নিয়ে আমি বলতে চাইছিলাম যে যদি অন্য ধরণের রাষ্ট্রের কথা বলেন সেখানে কি ঘটেছে? সমাজতন্ত্র ঠিক ছিল কি-না, ঠিকভাবে কায়েম হইলো কি-না। সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলো তো বল প্রয়োগীই ছিল যে কোন অর্থে। তার জনগণের উপর নিপীড়নমূলক ছিল। সে কারণে রাষ্ট্র মাত্রই যে বল প্রয়োগী সেটা নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কোন সংকট থাকার কথা না। এখন আপনি যদি আমাকে বলেন এর বিকল্প কী ? এর বিকল্প আমার জানা নাই। ইতিহাসের কোন পর্যায়ে আমরা কোথায় গিয়ে উপনীত হচ্ছি তা আমাদের জানা নাই। এর থেকে আমাদের মুক্তি আছে কি-না তারও কোন আভাস আমাদের কারোর সামনে নাই। যেমন আমরা বলছি যে গণতন্ত্র অসার, কিন্তু গণতন্ত্রের পরে কি আমরা সত্যি সত্যি জানি না। অন্যভাবে ভাবেন একটা historical pattern হিসাবে গণতন্ত্র অসার, একটা historical category হিসাবে গণতন্ত্র অসার। কিন্তু অন্যভাবে পৃথিবীর বহু সমাজে জনগণের সম্মতি নিয়ে শাসন করবার বহু নজির ছিল। একটা uniform নজির ছিল এমন না, ব্যালট বাক্সে ভোট দিয়ে গণতন্ত্র হবে এমন না। কিন্তু পৃথিবীতে জনসম্মতি নিয়ে শাসন করবার বহু রকমের তরিকা ছিল। সামন্ত শাসকরাও জনগণের দেখভাল এবং welfare, মানে আপনি যদি ভাবেন যে জনহিতকর কাজ করা তা করতেন। ভারতের ঐ প্রাক রাষ্ট্রিক সামন্ত পর্যায়ের শাসক যারা, তারা বা রাষ্ট্রের ভিতর যেসব জমিদার ছিল, যারা খুব দিল-দরদী জমিদার ছিল, জনগণের জন্য যাদের দিল কান্তো, তারা ভাল ভাল কাজ করতেন। এখন অন্য ভাবে ভেবে দেখেন, welfare কি তার চাইতে কিছু আলাদা? তাহলে নানা রকমের গণতন্ত্র, নানা রকমের জনহিতকর কার্যতো ছিলই। কিন্তু historical pattern হিসাবে একটা সময় গণতন্ত্র চেনা এবং সেটাকে সার্বজনীন করে ফেলা সেইটার সংকট নিয়ে আমরা কথা বলছি। ফলে রাষ্ট্র যে বল প্রয়োগী এটা নিয়ে বোঝার আমার কোন সংকট নাই, কিন্তু আপনি যদি বলেন এর থেকে উত্তরণ কি, আমি জানি না, আমি জানি না যে রাষ্ট্রের পরে কি, কিংবা রাষ্ট্র না হইলে আসলে আমরা কি ধরনের ব্যবস্থা তৈরী করবো, কিভাবে আমরা একটা কেন্দ্রীয় শাসনও রাখবো আবার সেটা বল প্রয়োগী হবে না। হয়তো এক ধরণের কেন্দ্রীয় সমন্বয় থাকবে, যেটা আমরা আশা করতে পারি যে আদর্শিকভাবে রাষ্ট্র বড় জোর একটা ভাল সমন্বয়ক হবে। কিন্তু এতো আর সব সময় ব্যক্তির সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল না। এই ব্যবস্থার ভিতরে, যে ব্যবস্থা আপনাকে এক ধরণের বুর্জোয়া শাসন দিচ্ছে, যে ব্যবস্থা আপনাকে একটা নির্দিষ্ট দলের আধিপত্য দিচ্ছে, যে ব্যবস্থা আপনাকে বিশ্বের অপরাপর আধিপত্যশীল গোষ্ঠীগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখবার শর্তে আবদ্ধ করছে, সে ব্যবস্থার ভিতর আপনি কিভাবে বল প্রয়োগহীন রাষ্ট্র পাবেন বা তৈরী করবেন সেটা সত্যি সত্যি আমাদের জানা নাই। জনগণ রাষ্ট্রের ভিতরে যে গুণগত পরিবর্তন আনবে, যদি আনে, সেই পরিবর্তনের পরে যথা একটা সফল জনগণের অভ্যুত্থানের পরে যে রাষ্ট্র আসবে, ধরেন ব্রাজিলের লুলার কথা, ব্রাজিলের লুলা কি জনগণের শাসন কায়েম করতে পারবে? মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর বিরুদ্ধে সে কতদূর পর্যন্ত লড়াই করতে পারবে? রাষ্ট্র বল প্রয়োগী সেটা অন্যভাবে খুব সত্য, ধরেন globalization-এর যুগে বসে আমরা যখন বলি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এগুলো একদম বানোয়াট কথা। আমরা বলি না যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর কাছে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? ধরেন আমাদের দেশে বহু বামপন্থী বুদ্ধিজীবি এ প্রশ্নে এসে স্বীকার করেন globalization হচ্ছে পুঁজিবাদের এমন এক অভিব্যক্তি যেখানে ছোট ছোট পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো ক্ষমতাহীন হয়ে যাচ্ছে। এবং বলবেন না কিন্তু assumption থাকবে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো কে? কোথাকার? মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর পেছনে কে? কোন কোন নিজ সীমানা অতিক্রম করে যাওয়া রাষ্ট্র কি নাই? আমরা যখন বলি বিশ্বায়নের যুগে এসে রাষ্ট্র অসার, রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে কোম্পানীগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে – এগুলো আমার কাছে খুব বিভ্রান্তিকর মনে হয়। কোম্পানীগুলো বড় হচ্ছে সেটা সত্য। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে কতগুলো রাষ্ট্রই তা শাসন করছে, কতগুলো নির্দিষ্ট ধরণের রাষ্ট্রের শাসন আরো পোক্ত, দৃশ্যমান হচ্ছে। কতগুলো নির্দিষ্ট ধরণের রাষ্ট্রের কোম্পানী, আপনি দেখেন, কোন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী তৃতীয় বিশ্ব থেকে যেয়ে সারা পৃথিবীকে শাসন করছে? সবই তো আসছে একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে। মানে সেটা আপনি ষাটের দশকের উন্নয়ন-অনুন্নয়ন-নির্ভরশীলতা তত্ত্ব আর যাই-ই দিয়েই বোঝেন, একটা পৃথিবী থেকেই তো আসছে। সেটা হচ্ছে কোম্পানীগুলো প্রথম বিশ্বের। ফলে রাষ্ট্র একা বল প্রয়োগী হয়ে উঠতে পারতো তাও না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্র একা বল প্রয়োগী হয়ে উঠতে পারতো তাও না, যদি বল প্রয়োগের জন্য বৈশ্বিক মিত্র সে তৈরী না করতে পারতো। রাষ্ট্র তাই যৌথ একটা ব্যবস্থা। একই ভাবে নিজের ভিতরে শুধু একটা একক শাসন চালায়, বাইরের শাসন করবার জন্য, বাইরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক পুলিশী রাষ্ট্রের বৃটেন নামক মিত্রের দরকার হয় কিংবা ইউরোপ নামের মিত্রের কখনও কখনও দরকার হয়। ফলে বাইরে যখন রাষ্ট্র বল প্রয়োগী তখন সেই রাষ্ট্র একা বল প্রয়োগ করে না, সে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে বল প্রয়োগ করে। এবং এইটা একটা ক্ষমতারsyndicate এর মতো। সারা পৃথিবীতে এগুলোর বিরুদ্ধে মানুুষ লড়াই করছে, WTO এর বিরুদ্ধে লড়াই করতাছে এবং সে লড়াইগুলো কোনভাবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বহীন তা না। কিন্তু সে লড়াইগুলো একটা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোন মৌলিক খোলসের বদল আনতেছে না। ধরেন WTO অধিকতর উদার রূপ ধারণ করতাছে, অধিকতর মানবিক মুখচ্ছবি নেয়ার চেষ্টা করতাছে, সেটাও খুব প্রবলভাবে বিশ্বের মানুষের কাছে উম্মোচন হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রের শাসনগুলো থাকছে এবং সেগুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো, বড় বড় রাষ্ট্রগুলো। এইখানে গুণগতভাবে আলাদা করা উচিত, রাষ্ট্র বল প্রয়োগী বলে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র আর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোকে এক কাতারে ফেলা ঠিক না আমাদের। দু’টো নিশ্চয়ই বল প্রয়োগী, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র বল প্রয়োগী, মার্কিন নামক রাষ্ট্রও বলপ্রয়োগী, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র যেভাবে তার সীমানার বাইরে বল প্রয়োগ করে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের বাস্তব কারণেই সেই রকম বল প্রয়োগ করবার ক্ষমতা নাই। থাকলে সে বল প্রয়োগী হতো কি না সেটা একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু দু’ ধরণের রাষ্ট্র তাহলে আমরা পাচ্ছি। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্র নামক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে এবং বড় রাষ্ট্রগুলোরে গাঁটছড়া বেঁধে সেই ধরণের শাসনকে বা কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ করার চেষ্টা করছে এবং কতগুলো প্রতিষ্ঠান তৈরী করছে যেগুলো আপাত: অর্থে পৃথিবীর দেখভাল করে কিন্তু আসলে বড় রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করে, সেটা জাতিসংঘ-ই হোক, সেটা আই.এম.এফ-ই হোক, যাই হোক, এবং সেগুলো কতগুলো রাষ্ট্রের purpose কে সার্ভ করে। বৃহত্তর অর্থে, বিমূর্ত অর্থে ব্যবস্থা হিসাবে সেটা সাম্রাজ্যবাদকে বা পূঁজিবাদকে সার্ভ করে।
রাজীবুল : আরেকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলি, সেটা হচ্ছে এযাবৎ কালে রাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ হিসাবে যেভাবে ইসলামী মৌলবাদকে identify করে, ঠিক সেই ভাবে কেন খ্রিষ্টিয় মৌলবাদকে ব্যাপকভাবে identify করে না?
সাঈদ : এটার উত্তর তালাল আসাদ একভাবে দিয়া দিছেন। আমি একটু আগে বলছিলাম না যে নানা ধরণের গণতান্ত্রিক শাসন পৃথিবীতে এক সময় ছিল, ঐতিহাসিক রূপান্তরণের একটা পর্যায়ে নির্দিষ্ট একধরণের ব্যবস্থাকেই কেবল গণতন্ত্র হিসাবে চেনানো হলো। এই একটা নির্দিষ্ট ধরণের গণতন্ত্র, অন্যভাবে বললে একটা নির্দিষ্ট ধরণের modernity, একটা নির্দিষ্ট ধরণের চিন্তা প্রক্রিয়া তৈরী করছে। তার মধ্যে গণতন্ত্র বলতে আমরা এই চিনি, রাষ্ট্র বলতে আমরা এই চিনি, সেটা তৈরী হইছে ঐতিহাসিকভাবে একটা নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডে যারা অন্য সবাইকে ‘অন্যভাবে’ categorize করছে। যদি সে নিজেকে সভ্য categorize করে, অন্যকে সে অসভ্য categorize করছে। সেই ‘এক’ হচ্ছে পাশ্চাত্য আর তার ‘অন্য’ হচ্ছে যাবতীয় অপাশ্চাত্য, তার মধ্যে এখন ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট করে পাশ্চাত্যের ‘অন্য’ হয়ে উঠল ইসলাম। এই মুহুর্তে যে নির্দিষ্টভাবে ইসলাম এবং নির্দিষ্টভাবে খৃষ্টধর্ম না তার উত্তর তালাল আসাদের কাছে হবে যে সেক্যুলারিজম বা গণতন্ত্র ব্যবস্থা হিসাবে খুবই খ্রিষ্টিয় বা ঐতিহাসিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র যেখানে তৈরী হইছে সেখানে প্রতিষ্ঠান হিসাবে খৃষ্টধর্ম টিকেছিল। একদিকে ঐ সব সমাজে ধর্ম ছিল ব্যক্তিক ব্যাপার যেটা আমরা adapt করার চেষ্টা করছি। যে কারণে আমরা ধর্মের পাবলিক চর্চা দেখলে আঁতকে উঠি, আমরা ভাবি যে এটা মধ্যযুগীয়, কিন্তু অন্যভাবে ভাবলে এই চর্চাগুলো, তালাল আসাদ বলছেন যে ইসলাম নামক ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মের পাবলিক চর্চা হবে না এটা ভাবাটাই একটা অবাস্তব ব্যাপার। অন্যভাবে ভাবেন, যেটা তাবলীগিরা একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে করে, সারাক্ষণ নিজে পালন করা এবং অন্যকে বলা। ফলে ইসলাম এমন একটা ধর্ম যেটা চর্চার দিক থেকে খুবই সামষ্টিক হবার কথা। ক্রিশ্চিয়ানিটিকে একটা নির্দিষ্ট সময় পরে রাষ্ট্র একভাবে বলতে গেলে collective চর্চা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে, প্রমাণ করতে চেয়েছে যে এগুলো সব জনগণের বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ব্যাপার। তালাল আসাদ বলছেন যে এর মধ্য দিয়েই তারা ধর্মকে দুর্বল করছে। অন্যভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে দিয়ে তারা শাসনও করছে, ক্রিশ্চিয়ানিটিকে টিকিয়ে রেখে তারা শাসনও করছে। ফলে ক্রিশ্চিয়ানিটির স্বার্থে ঐতিহাসিক গাঁটছড়া বেঁধে সেক্যুলার রাষ্ট্রের বা এখনকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। যে কারণে তার প্রতিপক্ষ হচ্ছে অখ্রিষ্টিয় সমাজ। এই মুহুর্তে তা ইসলাম যাতে করে তার পক্ষে সহজে দেখানো সম্ভব হয় ইসলামী বা মুসলিম সমাজ বল প্রয়োগী, গণতন্ত্র নাই, ইসলাম ধর্ম হিসেবেও বল প্রয়োগী। মধ্যপ্রাচ্যের তাবৎ শাসকদের দেখিয়ে বলা সম্ভব হয় এই শাসকগুলো অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক, এই খানে জনগণের অধিকার নাই ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনই categorize হচ্ছে, বিপরীতে পশ্চিম বলতে পারে আমাদের রাষ্ট্রটা দেখেন এখানে জনগণের অধিকার আছে। তারা একসাথে দুটো কাজ করে, একদিকে অন্যকে শাসন করার কাজটাকে সহজ করে, ইসলাম হোক বা অন্য যে কেউ হোক তাকে শাসন করার কাজটা সহজ হয়, অন্যদিকে তাদের জনগণকে বুঝানো সম্ভব হয় যে ওরা তো ওরকম বল প্রয়োগী, অগণতান্ত্রিক। কিন্তু আমরা তো ওরকম না, আমরা তো তোমাদের সম্মতি নেই। যখনই আপনি ‘অন্য’কে দেখিয়ে ‘নিজে’কে তৈরী করেন, অন্যকে শাসন করে নিজেকে দাঁড় করান, তখন আপনি নিজেকেও বোঝাতে পারেন, ঐ ‘অন্য’ হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক, আর তার মানে হচ্ছে আমরা স্বৈরতান্ত্রিক নই। কিন্তু তালাল আসাদ বলছেন ‘অন্য’ স্বৈরতান্ত্রিক হতেই পারে কিন্তু সেটাই কোন শেষ কথা নয় কোন সমাজ সম্পর্কে। মানে সৌদি আরবে আমরা বলবো না যে সেখানে শাসনে জনগণের সম্মতি আছে বা সৌদি আরবের শাসকগণ জনগণের কথা খুব একটা শোনেন টোনেন বলে আমরা মনে করি না। তালাল আসাদ দেখাচ্ছেন সৌদি আরবের মতো খুবই কর্তৃত্বপরায়ন রাষ্ট্রেও যেখানে শাসকরা খুবই জনবিচ্ছিন্ন সেই রকম রাষ্ট্রেও এমনকি ধর্মকে ব্যবহার করেই ঐ শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতাছে ওখানকার মানুষ। ধর্ম প্রবল একটা রাষ্ট্র হলেই, ধর্মভিত্তিক একটা রাষ্ট্র হলেই, একটা রাষ্ট্রের ভিতর একটা ধর্ম এবং সে ধর্মটা ইসলাম হলেই সে আদ্যোপান্ত বল প্রয়োগী হবে, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বপরায়ন হবে কথাটা সত্য না। রাষ্ট্র বল প্রয়োগী, কিন্তু রাষ্ট্রের সাথে লড়াইটাও ওখানকার মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করেই করছে। অন্যদিকে যারা ইসলামকে দেখিয়ে গণতন্ত্র-সেক্যুলারিজমের চর্চা করছে তারা নিজের ভিতরে একদিকে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে public life থেকে সরায়ে ফেলছে, অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে public life এর ছত্রে ছত্রে আনছে। আপনি দেখেন বছরে ধর্মভিত্তিক ছুটির দিনগুলি এবং সেটা কোন্ ধর্ম ? আপনি বাংলাদেশে বসে বড় দিনের ছুটি পান, পূঁজার ছুটি পান, ঈদের ছুটি পান-এগুলো খুবই মোটা দাগের উদাহরণ, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট বুঝবার জন্য। ঈদ বলে কোন জিনিস আছে কি পশ্চিমা বিশ্বে ? পাবেন যে না তার কারণ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট ধরণের ধর্মকে, তার আচার অনুষ্ঠানকেই কেবল ওখানে জায়গা দেওয়া হয়। তখন বলা হয় যে এটাতো ধর্ম না, এটাতো ফান, এটাতো কালচার, তখন এটা আর ধর্ম না। যেভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তখন সেটা হচ্ছে বড় জোর ফান, বাচ্চাদের জন্য, উৎসবটা বাচ্চাদের জন্য, তখন সেটা বড় জোর কালচার। কিন্তু প্রেসিডেন্টকে অভিসিক্ত করার জন্য আর্চ বিশপকে আসতে হয়, আসতে যে হয় সেগুলো ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আছে বলেই আসতে হয় এবং সেটা একটা নির্দিষ্ট ধরণের রাষ্ট্রে ঘটে। এই বিবাদটা যেটাকে স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন Class of Civilization, ওরকম Class of Civilization না। এ বিবাদটা হচ্ছে এডওয়ার্ড সাইদ যেভাবে বলছেন অক্সিডেন্ট যেভাবে অরিয়েন্টকে তৈরী করছে এবং এই মুহুর্তে সেটা ইসলাম, যেভাবে ইসলামকে তৈরী করছে। সেটারও আবার নানা রকম খুব লিবারেল ব্যাখ্যা আছে। যখন কেউ কেউ পাশ্চাত্যকে এনকাউন্টার দেয়ার জন্য বলছে ইসলামকে এভাবে তৈরী করা হচ্ছে এটা ঠিক না, সাইদ এটাকে orientalism দিয়ে বলছেন। অন্যরা কেউ কেউ বলছে ইসলাম বলেতো একটা অখন্ড কিছু নাই, সারা পৃথিবীতে অজস্র রকম ইসলাম এবং তার অজস্র রকম ব্যাপ্তি, তাই ইসলামকে categorize করা যায়না এবং categorize করাটা ঠিক না। এগুলো খুব লিবারেল যুক্তি যে অজস্র ইসলাম, আপনি কি বলেন যে অজস্র গণতন্ত্র ? আপনি কি বলেন যে অজস্র পূঁজিবাদ ? বলেন তো না। অজস্র হতে পারে, কিন্তু in essence তারপরেও তো কতগুলো জিনিস আছে যেগুলো ইতিহাস নির্দিষ্টভাবে তৈরি; স্থান কালভেদে তার অভিব্যক্তিতে ভিন্নতা থাকতে পারে। তেমনি essence এর দিক দিয়ে সেক্যুলারিজমকেও অবশ্যই essentialize করা যায় এবং পশ্চিম sentimentalized হয়ে ইসলামকে কোণঠাসা করতেছে এই মুহুর্তে, সেটা পশ্চিমের ক্ষমতা। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিম যে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরী করছে, যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা পশ্চিম তৈরী করতে পারছে যেটা অপশ্চিমের মানুষের কাছে আরাধ্য, এই রকম করে পোশাক পরা, ওখান থেকে ডিগ্রী নেয়া, কথার কথা, বা পশ্চিমের তৈরী করা আধুনিকতা, বিজ্ঞানের পধঃধমড়ৎু কে ব্যবহার করা আমাদের কাছে আরাধ্য। আর এভাবেই আমাদেরকে আধুনিক মানুষ হয়ে উঠতে গেলে আমরা জানি ধর্মকে আমাদের জীবন থেকে বাদ দিতে হবে। পশ্চিম সার্থক এই খানে যে আমরা বাংলা ভাইকে অন্যভাবে ভয় পাই না, স্রেফ ভয় পাই বাংলা ভাইয়ের দাড়ি আছে এবং তার ব্যানার হচ্ছে ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’। তার ফ্যাসিষ্ট শক্তির চাইতেও একটা ভিন্ন ব্যঞ্জনা হচ্ছে তার ধর্মভিত্তিক পরিচয়। পশ্চিম সফল এইখানেই যে সে প্রমাণ করতে পেরেছে যে এই ধর্ম হচ্ছে একটা মধ্যযুগীয় ব্যাপার। এই যে আমরা পত্রিকায় দুম করে লিখে দেই ‘মধ্যযুগীয়’, পশ্চিম প্রমাণ করতে পেরেছে বা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যে ধর্মকে public sphere এ আনাই হচ্ছে ‘মধ্যযুগীয়’। ঠিক এই কারণেই উল্টোদিক থেকে পৃথিবীর বহুদেশ আছে যেখানে পশ্চিমকে রুখবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করা। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ধর্মভিত্তিক ঐক্য তৈরী করা, ধর্মকে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিকতাকে প্রত্যাখ্যান করা। সেটা আরেক ধরনের আধিপত্য তৈরী করছে, সেটাও সত্য। নিজ দেশের ভিতরে আরেক ধরণের আধিপত্য সেইটা তৈরী করছে। শাহকে যখন ইরানের মানুষ পশ্চিমের প্রতিনিধি হিসাবে দেখলো তখন খোমিনীর শাসন আসার পথ সেখানে সুগম হইছে, সেইটা আরেক ধরণের আধিপত্যকে নিশ্চিত করছে। কিন্তু ঐ মুহুর্তের ঐ লড়াইটা পশ্চিমের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল এবং ইরানের মানুষ তাতে সম্মতি দিছে। ফলে একদিকে নিরন্তর পশ্চিম চেষ্টা করে ধর্ম public sphere এর না, ধর্ম মানেই মধ্যযুগীয়, ধর্ম মানেই হচ্ছে পশ্চাৎপদতা; ইসলামের ক্ষেত্রে তা করতে তার সংকট হয়, কেননা ইসলাম তার বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়েই খুবই পাবলিক ধর্ম, সামষ্টিক ধর্ম এবং ইসলাম তার চর্চার মধ্যে সেটা ensure করছে যে সে কালেক্টিভ, যে কারণে ইসলামকে পশ্চিমের প্রতিপক্ষ বানাতে হয়। অন্যভাবে এই লড়াইয়ের সাথে পশ্চিমের অপরাপর বৈশ্বিক যোগাযোগগুলো তৈরী করতে হয়। একটা নির্র্দিষ্ট অঞ্চলে দখলদারিত্ব তৈরী করা, সেটাকে আপনি তেলের যুদ্ধই বলেন আর যাই বলেন, historical একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। যখন মুসলিম জঙ্গীরা বলে দেখেন যত অমুসলিম হাত এক সাথে হইছে, ভারত আর ইসরাইল এক সাথে হইছে। অ্যারিয়েল শ্যারন যখন বাজপায়ীর সাথে হাত মেলালেন তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটা statement আকারে বলে যে আমাদের এক বন্ধু যখন আরেক বন্ধুর সাথে হাত মেলায় তখন তা আমাদের উৎসাহিত করে। এখান থেকে একজন মুসলিম জঙ্গীর পক্ষে খুবই সহজেই বের করা সম্ভব হয় যে সারা বিশ্বটা হচ্ছে মুসলিম বনাম অমুসলিম, তার মধ্য দিয়ে আর একবার হান্টিংটন সত্য হন। কিন্তু এডওয়ার্ড সাইদ অন্য দিক থেকে বলেন, বিষয়টা ঠিক এমন নয়, দুই দলের লড়াই হচ্ছে তা নয়, বিষয়টা হচ্ছে কে কাকে তৈরী করছে। যে কারণে আমি বলছিলাম ইরাক যুুদ্ধ, যুদ্ধ নয়। কারণ সাদ্দাম হোসেন তো গিয়ে যুদ্ধ করেন নাই। ইরাকের জনগণ গিয়ে মার্কিনের বাড়ীঘর আক্রমণ করে নাই,তাদের ঘরে এসে অন্য কেউ বোমা ফেলছে। তখন তারা এই আধিপত্য, এই আক্রমনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। প্যালেষ্টাইনের মানুষতো বেড়া ডিঙ্গিয়ে ইসরাইলের মানুষকে হামলা করে নাই। এই ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আপনি যদি বলেন Clash of Civilization, তখন দুইটা এক কাতারে মিশে গেল না? মনে হতে পারে সমান ক্ষমতাধর দু’টি প্রতিপক্ষ বা তুল্য ক্ষমতাধর দু’টি প্রতিপক্ষ লড়াই করেছে, তা আদতে সত্য নয়। Clash of Civilization এর সমস্যাটা হচ্ছে এইখানে। স্যামুয়েল হান্টিংটন তার থিসিসের মধ্যে Essentialism যে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন করবার কিছু নাই। Essentialism থাকবারই কথা, যে কোন পরিচয়কে apply করার জন্য এক ধরণের Essentialism লাগে। আপনি যখন রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তখন জম্মু জাতীয়তাবাদ আপনাকে তৈরী করতেই হবে, এই Essentialism আপনাকে প্রয়োগ করতেই হবে। আপনি যখন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তখন নারীর Essentialist অবস্থান আপনাকে তৈরী করতেই হবে। Essentialism টা কোথাও না কোথাও আছে, তা নির্দিষ্ট সমাজ ইতিহাসের প্রেক্ষিতে তৈরী হয়, তাই একই সাথে সেটাও খুব fragmented; মানে ইসলাম খুবই fragmented কিন্তু ইসলামের একটা essential ঐক্য এই মুহুর্তে তৈরী হচ্ছে বা হইছে। কারণ প্রতিপক্ষ হিসাবে অন্যকেউ তার উপর আধিপত্য তৈরী করছে। ফলে এটা ঠিক Clash of Civilization না যেমন করে হান্টিংটন বলছেন। হান্টিংটন খুঁজবার ক্ষেত্রে সমাজ ইতিহাসের প্রেক্ষিতকে উপেক্ষা করেছেন। বরং সাইদের কাছ থেকে এটুকু নেয়া যে এটা হচ্ছে খুবই orientalist approch; আর যদি আসাদের কাছ থেকে বলেন, একটা নির্র্দিষ্ট সময়ে পশ্চিম আধুনিক, এই সেক্যুলার, এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই মুসলিম, এই ইসলাম বিরোধী ব্যবস্থাকে পোক্ত করছে, ইসলামকে টার্গেট করছে। ইসলামী রাষ্ট্রগুলো সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক কি-না সেটা একটা স্বতন্ত্র বিতর্কের বিষয়, কিন্তু সেটাকে একভাবে represent করা, সেটাকে homogenous হিসাবে নির্মাণ করা, ইসলাম আর গণতন্ত্র একভাবে যায় না – এই ইমেজটা তৈরী করা, সেটা পশ্চিমের অভিপ্রায়।
রাজীবুল : বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসাবে ঠিক ইসলামী রাষ্ট্র থেকে ভিন্ন। ‘৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধ কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বাঙালী জাতীয়তাবোধের essence তৈরী করছে। তো এই জায়গা থেকে আমাদের এখানে অনেক বেশী হিন্দু মুসলিম সহবাসের কারণে, হিন্দু কালচার আমাদের মধ্যে যেমন আছে, মুসলিম কালচারও ওরকমই আছে। একটা পর্যায়ে দেখা যায় যে এরশাদের আমলে বাংলাদেশকে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষনা করা হয়, তো এই যে একটা রাষ্ট্র আস্তে আস্তে বাঙালী জাতীয়তাবাদ থেকে ইসলামের দিকে চলে আসলো এবং সেই রাষ্ট্রের ভিতরে এখন আমরা সরকার হিসাবে পাচ্ছি চারদলীয় জোট সরকারকে যেখানে একটা বড় অংশ হচ্ছে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী দলগুলো। প্রশ্ন হচ্ছে আস্তে আস্তে কিভাবে একটা রাষ্ট্র বাঙালী জাতীয়তাবাদকে সরিয়ে ইসলামী জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠছে?
সাঈদ : প্রথম কথা হচ্ছে মনে রাখা দরকার, যা হলো, যে পরিবর্তনগুলো হলো তা নিয়ে আমাদের অনেকের আহাজারী থাকতে পারে, কিন্তু এই পরিবর্তনে গুণগত বদল কি ঘটলো? আমাদের অনেকের খারাপ লাগার থাকতে পারে। আমাদের বুদ্ধিজীবিরা দিনের পর দিন প্রাণপাত করছেন, মুক্তবুদ্ধির কথা আমরা যারা বলি সত্যিই দুঃখ পাচ্ছি যে বাংলাদেশের এই রকম কেন হলো। ভারতে যখন কংগ্রেস আবার জিতলো তখন আমাদের ভাল লাগে, হ্যাঁ ঠিক আছে, বিজেপি নামক ধর্মভিত্তিক শাসন হতে অন্তত: ভারত মুক্ত হইছে। মূল বক্তব্যটা হচ্ছে যে গুণগতভাবে কি কি ফারাক হলো, যখন বাঙালীর সেক্যুলার রাষ্ট্র ছিল তখন এটা কি জনগণের রাষ্ট্র ছিল? আমি বলছি না এটা খুব কাম্য কিছু। আমি এই পরিবর্তনটা কাম্য কি কাম্য নয় এই বিতর্কে যাচ্ছি না। সেই পরিবর্তনের রাস্তাটা তৈরী হইলো কিভাবে, সেখানে নানা ধরণের বৈদেশিক ইন্ধন থাকতে পারে, যেসব ষড়যন্ত্রের কথা আমরা বলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে শেখ মুজিবকে মারতে, আমরা সামরিক জান্তার সাথে ধর্মের যোগসূত্রের কথা বলি, সেগুলো হচ্ছে এক ধরণের উপরের জিনিস। তলায় কি হলো জনগণের ক্ষেত্রে, জনগণের এই ধর্মের দিকে যাত্রা কিভাবে? আপনি আমি এটা নিয়ে যেভাবে কাতর বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগণ কি সেটা নিয়ে কাতর? প্রশ্ন করবার বিষয়। আবার অন্যদিকে আপনি আমি পড়াশুনা দিয়ে যেমন করে বুঝি, একজন হিন্দুর বাড়ী পোড়ানো, সে হিন্দু বলেই তার বাড়ী পোড়ানো ঠিক নয়, বাংলাদেশের মানুষ কি একটা সময়, তারা লেখাপড়া করুক আর না করুক, তারা গণতান্ত্রিক হোক আর না হোক, তারা সেক্যুলার হোক আর না হোক তারা কি এক সময় এটা জানতো না? তারা কি হিন্দু-মুসলিম প্রভেদ করতো ঐতিহাসিকভাবে? এখানে যখন এই রকম আধুনিক রাষ্ট্র ছিল না, এখানে যখন এই রকম গণতন্ত্র ছিল না, ইতিহাসের সেই পর্বে যখন এখানে এই রকম রাষ্ট্রই ছিল না, যখন এ রকম এখানে কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না, ইতিহাসের সেই পর্বে এখানকার মুসলিম আর হিন্দু, এমনকি মাত্র দু’শো বছর আগে কি এখানে মুসলিম আর হিন্দু কি পাশাপাশি বসবাস করে নাই? করছে তো, কি মুসলিম কি হিন্দু সেটা পরিচয়ের ক্ষেত্রে বড় হয়ে উঠে নাই, খাঁটি ধার্মিক মনে প্রাণে ধর্ম পালন করেও সারা জীবন সব ধর্মের মানুষ কিএকসাথে চলে নাই ? চলছে তো, এখন কেন সেটা অসম্ভব হয়? এখন যে এটা অসম্ভব মনে হয় তার কারণ হচ্ছে ধর্ম যে একটা বিশেষ বিষয় সেটা মানুষকে মনে করায়ে দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মানুষের জীবনের একটা বিশেষ অনুষঙ্গ এভাবে এটা মনে করানোটা কার কাজ? কে করলো? সেটা ভেবে দেখবার বিষয়। কেন ? কোন সময় থেকে ধর্মীয় পরিচয়টা এত বড় হয়ে উঠলো সেটা ভেবে দেখবার বিষয়। ফের অন্য দিক দিয়ে দেখলে আওয়ামীলীগ মানেই হচ্ছে ভারত, ভারত মানেই হচ্ছে হিন্দু – এই পরিচয়টাতো একটা নির্দিষ্ট সময় তৈরী হলো, সেটা আওয়ামীলীগ subscribe করুক আর না করুক, এখনকার জোট সরকার সেটাকে তুলুক আর না তুলুক, মূল সংকটটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে বাঙালী জাতীয়তাবাদ থেকে, তথাকথিত সেক্যুলার রাষ্ট্র থেকে আমরা একটা ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের ছায়ার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি বা একটা ধর্মভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা ঢুকে যাচ্ছি। কাম্য কি কাম্য নয় সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে যে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনটা, যদি আপনার আমার খারাপ লাগে আর দেশের সিংহভাগ মানুষের তা নিয়ে মাথা ব্যথা না থাকে তাহলে তো অবশ্যই আমাদের চিন্তা করবার বিষয় কেন মাথা ব্যথা নাই? এ কথা তো সত্য যে বিষয়টা নিয়ে আপনি-আমি যতটা ভাবিত, দেশের সিংহভাগ মানুষ ভাবিত না। যদি ভাবিত না হয় তাহলে প্রশ্ন করবার বিষয় তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষ শাসনের মধ্যে এমন কিছু ছিল কি-না, তথাকথিত বাঙালী জাতীয়তাবাদের এমন কিছু ছিল কি-না বা বাঙালী জাতীয়তাবাদী শাসনের মধ্যে এমন কিছু ছিল কি-না যা এদেশের জনগণকে তুষ্ট করতে পারে নাই। বাঙালী মুসলিম বাঙালী হিন্দুর চাইতে ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠা একটা category, সেটা ভারত হোক কি বাংলাদেশ হোক, সীমানা হয়ে যাওয়ার পরে, ‘৪৭ এর পরে ওপারের বাঙালী মুসলিম আর এপারের বাঙালী মুসলিম এক না। সীমানা হয়ে যাওয়ার পরে কতগুলো নির্দিষ্ট অর্থ তৈরী হয়ে গেছে, রাষ্ট্রের কারণে কতগুলো অর্থ আরোপ হইছে, ফলে ওপারের বাঙালী হিন্দু আর এপারের বাঙালী হিন্দু এক না। এপারের বাঙালী হিন্দু নির্যাতিত, আর ওপারের বাঙালী হিন্দু কখনও নির্যাতক। যদি তাই হয় ব্যবস্থাটা তাহলে রাষ্ট্র হওয়ার পরে ব্যবস্থাটা ভিন্ন ব্যঞ্জনা পেয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে বাঙালী হিন্দু আর বাঙালী মুসলিমের গঠন, যেভাবে liberal দলগুলো, সেটা কংগ্রেসই হোক আর মুসলিম লীগই হোক তৈরী হলো সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে, কংগ্রেস যেভাবে হিন্দু মহাসভার ভোটগুলো পকেটোস্থ করলো, মুসলিমলীগ যেভাবে কংগ্রেস হিন্দু ভদ্রলোকী ভোট ব্যাংকের বাইরে স্বতন্ত্র ভোট ব্যাংক তৈরী করতে পারলো – নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্যে ধর্মভিত্তিক উপাদান মিশে ছিল তখন কেউ দেখে নাই যে কংগ্রেস কিভাবে প্রধানত: হিন্দুদের দল হলো। আপনি যদি জয়া চ্যাটার্জির Bengal Divide পড়েন তাহলে দেখবেন, এই বইগুলো হচ্ছে বঙ্গভঙ্গ নিয়ে এবং ‘৪৭ নিয়ে এক ধরণের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ (এটা বাংলায় UPL থেকে বেরিয়েছে)। একটা সময় পর্যন্ত দোষারোপ করা হইছে মুসলিম লীগারাই হচ্ছে ভারত বিভাগের জন্য দায়ী। তারাই মুসলিমদের জন্য একটা স্বতন্ত্র আবাসভূমি চাইছে। জয়া চ্যাটার্জী পাল্টা বললেন যে কিভাবে কংগ্রেস যেকোন অর্থেই তার জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দু ভোট গুলোর প্রতি মনোযোগী ছিল, কি করে হিন্দুত্বের উপাদান একদম এর মধ্যে শুরু থেকে ছিল এবং কিভাবে সেটা মানে কিভাবে কংগ্রেস হিন্দু মহাসভার সাথে জোট বাঁধছে। পরে হিন্দু মহাসভার প্রার্থীরা কংগ্রেসের হয়ে গেছে, কিভাবে সে হিন্দু মহাসভাকে প্রান্তিক করছে, আবার ঐ হিন্দু মহাসভার agenda গুলোকেই কংগ্রেস ব্যবহার করছে। আপনি কি ভাবেন বিজেপি সরে গেছে আর তার কিছু agenda কংগ্রেস আর বামদলীয় জোটের শাসনে কোথাও কোথাও থাকবে না? একবার এক ধরণের গুণগত পরিবর্তন হলে তার রেশ তো কোথাও না কোথাও থাকবে। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, কেন ‘৮৭ সালে এসে ইসলামী রাষ্ট্র করে ফেলতে পারলো এরশাদ সাহেব আর সেটাই কেন টিকে গেলো, সেটা নিয়ে কি খুব বড় কোন অসন্তোষ হইছে কোথাও? দেখি নাই তো, অনেক কিছু নিয়া গণঅসন্তোষ হইছে, এরশাদ সাহেবের বহু কিছু নিয়া গণঅসন্তোষ হইছে, হইছে না? পরবর্তীতে কেউ এসে সংবিধানে হাত দিছে? রাষ্ট্র ধর্ম change করছে? করে তো নাই, কেন? কারণ জানে এখানে হাত দিলে বিপদ আছে। বিপদটা কি তাহলে? তাহলে ঐ ইসলামী পরিচিতির সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিজেকে খুঁজে পায় কি-না? সেটা একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলে তার নিশ্চয় অনেক সংকট হতে পারে, কেননা এখানে মুসলিম ছাড়া অন্য আরও অনেক ধর্মের মানুষ আছে এই ভূখণ্ডে। কিন্তু যদি ঐ পরিচয়ের সাথে জনগণ নিজেকে খুঁজে পায় তাহলে জোর করে তা তো অস্বীকারও করা যাবে না। তাহলে এটা এমন একটা ইসলামী রাষ্ট্র হতে পারে, কথার কথা, যে রাষ্ট্র সমানভাবে অপরাপর ধর্মের মানুষজনের দিকে নজর দিবে। হতে পারতো, বা এমন জাতীয়তাবাদ এখানে দাঁড়াতে পারতো যেটা একই সাথে বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিমেরও জাতীয়তাবাদ, কথার কথা। যেহেতু liberal রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনই চলতেছে। ভারতেও প্রকারান্তুরে তা-ই দাঁড়াচ্ছে শেষ পর্যন্ত, particularly মুসলিম constituency গুলোতে একটা মুসলিম প্রার্থী দেয়া ছাড়া এমনকি বাম দলগুলোও খুব একটা মুসলিমদের জন্য দ্যাখে ট্যাখে বলে মনে করবার কোন কারণ নেই। মুসলিম constituency গুলোতে সেটা দিতে হয়, সেটা বিজেপিরও দিতে হয়, সেটা অন্যদেরও দিতে হয়। আমার কথা হচ্ছে সেটা ঘটতে পারে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মনে করে হ্যাঁ আমরা মুসলিমও, এটাও আমাদের একটা পরিচয়। আপনি তো সেটা গায়ের জোরে অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনি যদি মনে করেন যে সেক্যুলার হওয়াটাই আরাধ্য, সেক্যুলার হওয়াটাই ঠিক মনে করতে পারেন কিন্তু মানুষজন ভিন্নভাবে ভাবলে ইতিহাসের চাকা তাহলে আপনাকে ভিন্ন দিকে নিবেই। কোন ব্যবস্থাইতো ideal না, আমার মনে হয়েছে এইগুলো একভাবে ছিল এখানে, এই ধর্মভিত্তিক ব্যাপারটা এখানে ছিল। এমন না যে মানুষজন মনে প্রাণে ধর্ম পালন করেছে, মানুষজন তেমন ছিল না কখনোই এই ভূখন্ডে। এই ভূখন্ডে তো অন্য ধরণের ইসলাম চালু হইছিলো, সুফীইজম, এই ভূখন্ডে তো পীর পয়গাম্বর ব্যবস্থা, মানে যেটা কি-না প্রথাগত ইসলামে ভীষণ দূষনীয়, তা চালু ছিল। প্রথাগত ইসলাম saint কে মনে করে ভীষণ সমস্যাজনক। হ্যাঁ, পুরো সেমেটিক অঞ্চলে যেখানে saint এর কদর নাই, আমাদের এখানে সেটা আছে এবং সেটাই ছিল এখানকার ইসলাম। সেটা এমন ইসলাম যেখানে খাজাবাবার দরবারে আপনি হিন্দু হন আর মুসলিম হোন যেতে পারেন কিংবা এমন যে একজন মুসলিম হয়েও একজন সাধুকেও ভাল মানুষ মনে করতে পারেন। কথার কথা, ধর্মগুলো পালন করবো সেটা পাবলিক পরিসরেই পালন করবো, অন্যকে নিয়ে পালন করবো। কিন্তু সহনশীলভাবে অন্যের সাথে পাশাপাশি বাস করবো। এই উপাদান তো এই ভূখন্ডের মানুষের মধ্যে বহু আগে ছিল। কিভাবে আমরা সেক্যুলার প্রজেক্ট হাতে নেওয়াতে ধর্মকে প্রথমে নিজের থেকে আলাদা করছি, ধর্মের পরিচয়গুলোকে বড় করে তুলছি এবং তারপরে সেইটা নিয়া যাবতীয় সংকটের মধ্যে আমরা পড়ছি। ব্যাপারটা সরল করে বললে এমন যে আমি মুসলিম এবং হিন্দুদের প্রথমে পৃথক করছি, করে এখন বলতাছি হিন্দুদের অধিকার দিতে হবে, দিতে হবে বা এই ভূখন্ডে তাদের অধিকার আছে। যেটা ছিল, মুসলিমেরও ছিল হিন্দুর সাথে একত্রে বাসের অভ্যাস, হিন্দুরও ছিল একত্রে বাস করবার অভ্যাস। আমরা প্রথমে সেইটা গায়ের জোরে পৃথক করছি, সেটা কংগ্রেসই করুক, আর মুসলিমলীগই করুক আর ব্রিটিশরাই করুক, আর আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ঐ সেক্যুলার ভাবনা দিয়েই হোক। আমরা বলতে চাইছি, না আমরা কেউ মুসলিম না, আমরা কেউ হিন্দু না। একটা পর্যায়ে মানুষের চর্চার মধ্যে মানুষ এই পর্যায়ের সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করে নাই। সেটা ভারতের ক্ষেত্রে সত্য, সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সত্য; করে নাই। কারণ সেক্যুলারিজম যে জাযগায় তৈরী হইছে ঐতিহাসিকভাবে সে জায়গায় সেটার অর্থ থাকতে পারে, সেটার চর্চা হতে পারে। সেটাও তালাল আসাদ বলছেন, সেই সেক্যুলারিজম সেখানেও খুব ক্রিশ্চিয়ান, কিন্তু সেই সেক্যুলারিজম প্রকল্প হিসাবে এইখানে fail করে। এবং করে যে সর্বনাশটা এখানে হয়, এখানে যে সহনশীলতা ছিল, ধর্মগুলোর মধ্যে পাশাপাশি বাস করবার সেক্যুলারিজম আমদানীর মধ্য দিয়া আমি সেই সহনশীলতাকেও উৎখাত করছি। কারণ সেক্যুলারিজম আমদানীর পর প্রথম আমি সনাক্ত করি যে ও হিন্দু তাই ওকেও আমার সমান অধিকার দিতে হবে। এইটা পুরোপুরি অর্থহীন। কারণ এই অধিকারগুলো সকলের ছিলই। কিন্তু আমি সেক্যুলারিষ্ট প্রজেক্ট আনবার মধ্যে দিয়ে ওগুলোকে প্রথমে দৃশমান করতে চাই, ধর্মীয় পরিচয়টাই আসলে পুনারারোপ করি। সেটা ছিল সেক্যুলার ব্যবস্থার একটা বড় সংকট, ফলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ যখন সেক্যুলারিষ্ট হাওয়া ধারণ করতে গেছে সেইটা বুদ্ধিজীবীদের কাছে যৌক্তিক মনে হইছে, জনগণ সেইটার সাথে কতটা একাত্ববোধ করছে? অন্যদিকে জামাতে ইসলামী যে ধরণের ইসলামকে ছড়াতে চাইছে জনগণ সেটার সাথেইবা কতটা একাত্মবোধ করে? আদৌ করে কি-না? ‘৭১ সালে যখন পাকিস্তানীরা মানুষজন মারছে, তাদের পরিচয় আমরা হানাদার বলি, যাই বলি, পাকিস্তানী সৈন্যরা যখন মানুষজন মারছে তখন তো একটা বড় প্রশ্ন এ দেশের মানুষের এটাই ছিল, যে কারণে তারা রুখে দাঁড়াতে পারলো সেটা হচ্ছে যে, এরা কেমন মুসলমান যারা আর এক মুসলমানের গায়ে হাত দেয়?
রাজীবুল : মুসলমান পরিচয়টা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না।
সাঈদ : এক অর্থে কোন মাথা ব্যথা ছিল না। ফলে ধর্মীয় পরিচয়টা এক হওয়া সত্বেও মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াইছে। ধর্মীয় পরিচয়টা কি তা জানা বড় কথা না। অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনেই আগ্রাসনকে রুখতে চাইছে। সেক্যুলারিষ্ট যুক্তি তর্কানুযায়ী এটা তো হবার কথা না। মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতাছে, আবার রুখে দাঁড়াচ্ছে এমন ঘটবার কথা না। প্রশ্ন হতে পারে তাহলে ঐতিহাসিকভাবেই কি আমরা সেক্যুলারিষ্ট? আমাদের এখানে যে ভিন্ন ধরণের সহনশীলতা ছিল, ধর্মীয় পরিচয়ে, একটা ভিন্ন ব্যঞ্জনায় ছিল সেটার প্রমাণ দেখা গেছে। সেটা মুসলিম হউক আর হিন্দু হউক সেটা বিষয় ছিল না। ঠিক কি না? ফলে এটা যে সেক্যুলারিজম আমদানী হইছে সেই আমদানী করা সেক্যুলারিজমের সংকট। আপনি এক ধরণের সেক্যুলারিজম আমদানী করছেন, সেটা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করছে। কিন্তু রাষ্ট্র এবং ধর্ম যুক্ত না থাকলে কোন সমস্যাই ছিল না। যদি না কি না যে সহনশীলতার উপাদান এখানে ছিল সেটাকে উৎখাত না করা হইতো। সেটাকে যত্ন করে উৎখাত করেছে এই পার্টি ব্যবস্থা, এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, এই সেক্যুলারিষ্ট ব্যবস্থা। কংগ্রেস সেক্যুলারিষ্ট হইছে কিন্তু হিন্দু মহাসভার agenda গুলো আত্মীয়করণ করছে তার জন্মলগ্নে। একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটে। শেখ হাসিনাকে বার বার স্কার্ফ পরতে হয় মাথায়। ফলে সেটা হচ্ছে একটা উদার রাজনীতির বড় দুর্বলতা। আমাদের খারাপ লাগতে পারে, আমাদের বুদ্ধিজীবিদের খারাপ লাগতে পারে যে, মানুষ কিচ্ছু বোঝে না। কিন্তু মানুষ তার মত করে বোঝে, মানুষ তার মত করে ধর্মও বোঝে, মানুষ তার মত করে অন্য পরিচয়ও বোঝে। আপনি যদি এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে বলেন যে, আমরা যুদ্ধ করেছি সেক্যুলারিজমের জন্য, আমাদের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরাও এই কথাই বলছেন যে, আমরা যুদ্ধ করেছি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য। এই কথা সাধারণ মানুষের কাছে কোন ভাবেই যোগাযোগ তৈরী করে না। আমরা যুদ্ধ করছি কারণ আমাদের মারছে। কে মারছে, সেটা পাকিস্তানীরা মারছে। তখন আগ্রাসী মুসলিমের বিরুদ্ধে লড়াই করছি তাই বলে মুসলিম identity প্রত্যাখান করছি বা জীবনের সবক্ষেত্রে তা করবো সেটা তো নাও হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের মধ্যে এই বোঝাবুঝির সংকট ছিল কি না, বাঙালী জাতীয়তাবাদ বাঙালী মুসলমানের agendaকে ধারণ করতে পারলো কি না সেখানে সম্ভবত: সংকটগুলো ছিল। সেই জায়গাটায় আপনে ভিন্ন ধরণের ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাজনীতি আনতেছেন, আপনে আনতেছেন জামাতেরে, সেটা সমস্যার সমাধান হয়তো নয়, সেটাও নিশ্চয় সময়ে দেখা যাবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে আমদানী করা ধারণা, বাইরে থেকে আমদানী করা ধারণা যা এই অঞ্চলের ধর্মভীরু মানুষজনের যে সম্প্রীতি, যে সহনশীলতা ছিল, তাকে নষ্ট করে । ভারতে এক ধরণের যে ধর্মীয় tolerance ছিল, অবিভক্ত ভারতে যে ধর্মীয় tolerance ছিল তা কোনভাবেই সেক্যুলারিস্ট না। কিন্তু আমরা এইখানে সেক্যুালারিজম আমদানী করতে গেলাম এবং তার সংকট আমরা শুধু বাংলাদেশে দেখলাম তা না, সেই সংকট আমরা ভারতেও দেখলাম। এইটা আমার কাছে মনে হয় কোনভাবেই ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া নয়। বিষয়টা ঐ জায়গাতেই ছিল, কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে হিন্দু মহাসভা না আইসা কংগ্রেস আসছে এইটাকে আমি তেমন কোন অগ্রগতি মনে করি না। কেননা কংগ্রেস কিভাবে আসছে, এখন যদি আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে মাথায় ফেট্টি বেঁধে এবং আল্লাহু আকবার লিখে যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে কি গুণগত ফারাক হবে আপনি আমাকে বলেন। ফলে এইটা আমার কাছে অগ্রগতি না, এইটা আমার কাছে পশ্চাতে যাওয়াও না, এইটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াতে বাঙালী মুসলিমের identity কে যদি ধারণ করতে না পেরে থাকে তাহলে এই মুসলিম identity কোন দিক দিয়ে বের হবে ? অন্য কোন রাস্তা খুঁজবে বের হওয়ার, অন্য কোন রাস্তায় সে নিজেকে প্রকাশ করবে। কিন্তু সেই রাস্তা যদি বল প্রয়োগী হয়, সেই রাস্তা যদি জনগণের কল্যাণ না করে সেটাও টিকবে না। এটা কোন নিয়তিবাদী কথা না। যদি জামাত এখন ক্ষমতায় আসে, আর জামাত যদি জনগণের agenda কে ধারণ না করে, অন্যভাবে বলতে পারেন জামাত যদি ভাঁওতা দিয়েও জনগণকে বোঝাতে সক্ষম না হয়, যেমন করে মার্কিন যুুক্তরাষ্ট্র তার জনগণকে ভাঁওতা দেয়, জর্জ বুশ তার জনগণকে ভাঁওতা দেয়, আমি বলছি তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে ভাঁওতা দেয়া খুব কঠিন। কেননা ট্যাঁকের জোর, মতাদর্শের জোর কোনটাই রাষ্ট্রের থাকে না। ফলে জামাতে ইসলামী যদি সেই রকম শাসক হয় এবং ভাঁওতা দেয়ার চেষ্টা করে তবে পারবে না। ঐতিহাসিকভাবে তাকেও হারতে হবে এবং তখন প্রমাণ হবে বাংলাদেশের মানুষ জামাতে ইসলামীর জন্য আসলে দাঁড়ায় নাই। এই মুহুর্তে একটা জাগ্রত মুসলিম জনতা দাঁড়াচ্ছে অপরাপর উদারনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো (তা সেক্যুলারই হোক আর সাম্প্রদায়িকই হোক) fail করছে বলে, সেটা বাঙালী জাতীয়তাবাদ ব্যবস্থা হিসেবে fail করছে, সেটা বাঙালী জাতীয়তাবাদ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতাছে না। বিএনপি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতাছে না বলে জনগণ জাগ্রত মুসলিম জনতা ব্যানার দেখলে হয়তো খুশীই হয়। তবে এখন ঐ সকল উদার রাজনীতি fail না করলে কি হতো – বাংলা ভাই আসতো না নাকি, এই ব্যর্থতা ঐ উদার রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি তা ভেবে দেখবার বিষয়। এইটাই শেষ কথা নয়। আর এই খুশী হওয়াকে আপনি পশ্চাৎপদতা, অন্ধকারাচ্ছন্নতা এইগুলো বলে দূর করতে পারবেন না। আপনাকে বুঝতে হবে যে, অপরাপর লিবারেল চর্চাগুলো কি করে ব্যর্থ হয়। তার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে জাগ্রত মুসলিম জনতার উত্থানকে বুঝবার চেষ্টা করতে হবে এবং নিশ্চয়ই একটা সময় একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেগুলো দেখতেও পাবো। ফলে আমি হতাশাবাদী নই যে, জাগ্রত মুসলিম জনাতার উত্থান ঘটছে মানে আমি মনে করি না যে বাংলাদেশ থেকে চিরকালের জন্য সমস্ত শুভ বুদ্ধির এবং মুক্ত বুদ্ধির চর্চা বিলুপ্ত হলো আর এসে দাঁড়ালো ধর্ম। আর এই হতাশাবাদী না হবার কারণ এই নয় যে আমি সেক্যুলার হতে চাই। ধর্ম এবং মুক্ত বুদ্ধির চর্চাকে এমন পরস্পর বিরোধী দুই মেরুতে দাঁড় করানো খুব সমস্যাজনক। একজন মানুষ ধার্মিকও হতে পারেন, মুক্ত বুদ্ধির চর্চাও করতে পারেন। এই অঞ্চলের মানুষতো সেই সহনশীলতার পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে দিছে। এই অঞ্চলে ধর্মীয় সহনশীলতা ছিল এবং মানুষ এখানে মুুক্ত বুদ্ধিরও ছিল। আপনি কি বলতে চান এ অঞ্চলের যে মানুষজন ছিল তারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে নাই? অন্যদিকে দেখেন আপনি রবীন্দ্রনাথ কিংবা আরো অনেক হিন্দু ভদ্রলোকই এক সময় কি মুসলমান বিরোধী স্বারকলিপিতে সই করেন নাই? অর্থাৎ সেক্যুলার মানুষজনও ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিতে পক্ষ নিয়েছেন। তার অর্থ এই বলছি না তার জীবনের অন্য সব অর্জন মুসলিম বিরোধী। সেক্যুলারিজম যে কথা বলে সেটা তার নিজের ভূখন্ডে রাজনীতি করছে, সেক্যুলারিজম অন্যভাবে এখানে হিসাব করছে। অন্যভাবে যারা সেক্যুলার না, যারা সেক্যুলারিজমের ধার ধারে না, ধরেন বিএনপি সেক্যুলারিজমের কথা বলে না, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বলে, অন্য ধরনের জাতীয়তাবাদের কথা বলে, তারাও যদি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতো, দুর্নীতি নির্মূল করতে পারতো তাহলে জামাতের কি একই রকম উত্থান ঘটতো? অর্থাৎ সেক্যুলারিজম বাদেও আমি এবারে বলছি এহেন বাংলা ভাই বা জামাতের উত্থান খোদ উদারনৈতিক রাজনৈতিক গণতন্ত্রেরই সংকট। কেন মানুষ অন্য একটা দিকে পা বাড়াচ্ছে এবং সেখানে মুসলিম পরিচয়টা উঠতেছে? কেননা এতদিন মনে করা হইছে এইটা আনা যাবে না। সেইটা ছিল সংকট, যে মুসলিম সে মুসলিম বললে ক্ষতিটা কি? আমাদের সংকটটা ছিল যে আমরা মুসলিম হয়েও আমরা বলতে চাইছি আমরা মুসলিম না। আমরা তো ‘৭১ সালে যুদ্ধ করছি ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য, এইটার কোন অর্থ নাই। একজন ধর্মভীরু মানুষের কাছে এই কথাটার কোন অর্থ নাই, যে ‘৭১ সালে যুদ্ধ করছে তার উপর আগ্রাসন হইছে বলে, তারবাড়ীঘর লুট হইছে বলে সে চাইছে দেশটা স্বাধীন হোক, মুজিবে দেশটা স্বাধীন করুক, সে আওয়ামীলীগকেও হয়তো বিশ্বাস করে নাই বা ঐ মুহূর্তে করছে, তারপর সে দেখছে আওয়ামীলীগকেও বিশ্বাস করা যায় না। সে পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করছে বলে সে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করছে তা কখনই সত্য নয়। এগুলো আমাদের বোঝাবুঝির সংকট অথবা বুঝেও আমরা এগুলো করছি, কেননা আমাদের এখানে সেক্যুলার রাষ্ট্র করতে হবে যদি আমরা আধুনিক রাষ্ট্র তৈরী করতে চাই। ফলে সংকটটা ছিল আমরা যেভাবে আধুনিকতা, আধুনিক রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে চাইছি, আমরা যেভাবে সেক্যুলারিজমকে, গণতন্ত্রকে intall করতে চাইছি, সংকটটা ঐতিহাসিকভাবে সেখানে। সেটা শুধু ‘৭১ সালে ছিল না, তারও আগে ‘৪৭ বা প্রাক‘৪৭ পর্যায়ে যখন কি-না কংগ্রেস মুসলিমলীগের গঠন হইছে, তখনও ছিল।
রাজীবুল : শেষ প্রশ্ন, সেটা হচ্ছে, আমরা বলছি রাষ্ট্রের যে ধারণা জনগণের ভিতর ছড়িয়ে যায়-এইটার পিছনে মূল কাজ করে হচ্ছে মিডিয়া।
সাঈদ : মানে রাষ্ট্রের মতাদর্শিক আধিপত্যকে নিশ্চিত করে মিডিয়া।
রাজীবুল : তো এই মিডিয়া তার নিজের প্রয়োজনে বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কতটুকু জনগণের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজ করে?
সাঈদ : মিডিয়া তো কোন homogenous গ্রুপ না, প্রথম কথা। মিডিয়া বলতে শুধু ‘দিনকাল’ নামক একটা গ্রুপ আছে বা ‘ইনকিলাব’ নামক একটা গ্রুপ আছে আর অন্যরা নাই তা না। মিডিয়াতে ধরেন এখন print media তে প্রথম আলো আছে, digital mediaতে আছে ntv, যে কি-না মোসাদ্দেক আলী ফালুর ntv যা বঙ্গবন্ধুর কথাও বলে। এই যুগে এসে এইগুলো জায়েজ হইছে। আগে যেমন আপনে বুঝতে পারতেন এটা মোসাদ্দেক আলী ফালুর টিভি এটা কোনভাবেই বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে পারে না। একটা সময় পর্যন্ত তো নিশ্চয়ই সেটাই ছিল। এখন সেগুলো পাল্টে গেছে। যাকে অধিকতর গণতান্ত্রিক মনে হতে পারে। এই বদলের একটা কারণ মিডিয়া তার বাণিজ্যিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরী করতে চায়। অন্যদিকে মিডিয়া নিরন্তর তার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রের অন্যত্র যে দখলদারিত্বের লড়াই আছে, শাসকদের দখলদারিত্বের লড়াই আছে এবং শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই আছে সে জায়গায় নিশ্চয়ই মিডিয়ার প্রভাব আছে। শাসকরা যেমন অন্যান্য জায়গায় মঞ্চ দখল করে রাখে, মিডিয়াতেও তেমনি শাসকরা বা শাসক হবার যাদের অভিপ্রায় আছে – তারা, আবার শাসকদের যারা চ্যালেঞ্জ করছে সেই গুটিকয় মানুষজন, সেই চ্যালেঞ্জটা মিডিয়াতে তারা কোথাও কোথাও করবার চেষ্টা করছে। পুরো পত্রিকাটি হয়তো পুরুষতান্ত্রিক কিন্তু একটা নারীদের পাতা আছে। সেটা কি, নারীদের পাতা একটা থাকতে হয় বলে আছে, অথবা হয়তো সত্যি সত্যি কিছু মানুষজন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে খুব sincerely কাজ করছে। এখন কিছু মানুষজন সত্যি সত্যি মিডিয়ার মধ্যে জনগণের জন্য কাজ করছে। মিডিয়া না থাকলে তারা হয়তো অন্য জায়গায় জড়ো হতো, মানে জনগণের জন্য লড়াইতো কিছু মানুষজন সর্বত্রই করছে, কিছু মানুষজন জনগণের জন্যই সব সময় লড়াই করছে। কিছু মানুষজন আধিপত্যের বিরুদ্ধে, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে, সেটা রাষ্ট্রের ভিতরের আধিপত্য হোক বা বাইরের আধিপত্য হোক, তাকে চেনানোর জন্য, তাকে মোকাবেলা করবার জন্য নিরন্তর কাজ করছে। সেই হাতে গোনা সংখ্যার মানুষ মিডিয়াতেও আছে। কিন্তু মিডিয়া হচ্ছে ঠিকই রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রের মুখপাত্র এক এবং দুই হচ্ছে অথবা আগামীতে যারা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে আসবে তাদের মুখপাত্র, মোদ্দাকথা শাসক শ্রেণীর মুখপাত্র। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের বাইরে বৈশ্বিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টা একইভাবে সত্য। রাষ্ট্রের ভিতরে কর্তৃত্ব নিয়ে যারা বিবাদ করছে তাদের লড়াইয়ের জায়গাটা হচ্ছে মিডিয়া। বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে বিএনপি-জামাত-আওয়ামীলীগের লড়াইয়ের জায়গা। ফলে সত্যিকার অর্থে এই মিডিয়ার প্রধান প্রবণতা জনগণের কল্যাণ না করা, এই মিডিয়ার প্রধান প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা। সেটা একেবারে দলভিত্তিক ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা। ধরেন বিএনপির ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা, আওয়ামীলীগের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা, জামাতের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা – সেইটা হচ্ছে একটা দিক। অন্যদিকে এই উদারনৈতিক রাজনীতির মধ্যে বসে বা দলভিত্তিক রাজনীতির ভিতর যারা একটা উদারনীতির হাওয়া তৈরী করতে চান, তারা একটা আধুনিক রাষ্ট্র চান। সেটা বিএনপিতে বা আওয়ামীলীগে যারাই হোন, তারা এই হাওয়াগুলো তৈরী করতে চান মিডিয়ার মধ্য দিয়ে যে না সত্যিকার সুশাসন, জনগণ, সিভিল সোসাইটি আনতে হবে। ফলে তারা মিডিয়াকে এক ধরণের কল্যাণকর ভূমিকায় আনতে চান, যারা কিনা রাষ্ট্রকে একটা কল্যাণকর ভূমিকায় দেখতে চান। কিন্তু সেই ভূমিকা কোনভাবেই জনগণের নাড়িকে ধরতে পারে কি-না, জনগণের সাথে communicable কি-না, সেটা জনগণকে স্বার্থ নিয়ে committed কি-না সেটা নিয়ে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন। যারাই কি-না সুশাসন, সিভিল সোসাইটি এগুলো নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুক বা না করুক, তারা আসলে কতটুকু জনগণের কল্যাণ করেন, কতটা করতে চান, সেটা মিডিয়াতে কতটা প্রতিফলিত হয়। ফলে মিডিয়াতে আপনি জনস্বার্থ নিয়ে যেসব কথাবার্তা দেখেন তার একটা দিক হচ্ছে তা ক্ষমতা অভিপ্রায়ীদের লড়াই। সেই কারণে তারা জনগণের এজেন্ডাকে সামনে নিয়ে আসে। আজকে আহ্সান উল্লাহ মাষ্টার মারা গেলেন তো তাকে নিয়ে আওয়ামীলীগের এই আহাজারি। আর বিএনপি বলতে চাইলো যে, আওয়ামীলীগ বিএনপিকে ডোবাতে চায় বলে। কথার কথা, কি নূর হোসেনকে নিয়ে দুই পক্ষ বড় বড় কথা বলতাছে। তাহলে জনকল্যাণমূলক কথাবার্তা যখন মিডিয়াতে দেখেন এটার একটা দিক হচ্ছে এটা ক্ষমতা অভিপ্রায়ীদের লড়াইয়ের অভিব্যক্তি। অন্য একটা ব্যাপার হচ্ছে যে, যারা সত্যি সত্যিই এই ব্যবস্থাটাকে একটু কার্যকর করতে চান, গণতন্ত্রের উপর যাদের আস্থা আছে বা যারা আস্থা রাখতে চান, যারা রাষ্ট্রকে একটা অর্থবহ প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চান, যারা মনে করেন যে, রাষ্ট্রের আইডিয়া দিয়ে অর্থবহ প্রতিষ্ঠান হবার কথা, যারা মনে করেন যে পৃথিবীতে অর্থবহ গণতন্ত্র আছে, তারা মিডিয়াকে জনকল্যাণ মূলক করে তুলতে চান বা সেই চেষ্টাটা করেন। ফলে তারা কিছু জনকল্যাণমূলক কথাবার্তা বলেন। যদিও সেগুলো আদতে জনগণের কাজে লাগে কি-না, আদতে সেটা জনগণের সাথে কমিউনিকেট করে কি-না, কোনো ধরণের সিভিল সোসাইটি জনগণের নাড়িকে ধরতে পারে কি-না বা জনগণ সিভিল সোসাইটি বলে কোন কিছু দেখে কি-না, চায় কি-না, সেটা একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু তারা সে চেষ্টাটা করেন। তা বাদে সত্যি সত্যি কিছু মানুষজন যারা কিনা সর্বত্র দখলদারিত্ব, আধিপত্য এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে তারা মিডিয়াতেও সেই লড়াইটা করে। তবে তারা নিশ্চয়ই সংখ্যালঘু গ্রুপ। ফলে সাধারণ জনগণ আমরা মিডিয়াতে জনস্বার্থের যে টোন দেখি তা সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থের টোন বলে আমি মনে করি না। তা ঠিকই এই রাষ্ট্রের বিবাদমান পক্ষগুলোর কণ্ঠস্বর এবং তারা একজন আরেকজনকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করবার জন্য, নিজের মঞ্চ দখল করবার জন্য কিংবা তথাকথিত উদারনৈতিক রাষ্ট্রকে আরো নিচ্ছিদ্র করবার জন্য তারা কেউ কেউ কাজ করছে। সে কারণে আমরা জনস্বার্থের কথাবার্তা মিডিয়াতে দেখি, খুব বেশিদূর এর চাইতে ভিন্ন কিছু না।
রাজীবুল : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাঈদ : রাজীবুল, আফজাল আপনাদেরকে ধন্যবাদ।
—————————————————-
সাঈদ ফেরদৌস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে একই বিভাগে শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন ১৯৯৫ সাল থেকে। সম্প্রতি আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে মাস্টার্স করে এসেছেন। তাঁর আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সামাজিক ইতিহাস, নৃ-বিজ্ঞানের ইতিহাস, জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক, ঔপনিবেশিকতা, উন্নয়ন রাজনীতি ইত্যাদি।
যোগাযোগঃ ‍shouptik@yahoo.com
ছবি: জাহিদুল করিম সেলিম
PaidVerts