ভাস্কর চৌধুরী’র কবিতা

ভাস্কর চৌধুরী’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

পিতা: নুরুল ইসলাম

গ্রাম: ভবানীপুর, ডাকঘর: রাজারামপুর
জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জন্ম: ১৭ নভেম্বর ১৯৫২ ইং
চাকুরীর শেষস্থল : ঢাকা

মূলত গল্প ও উপন্যাস লেখক
লেখার মূল বিষয়: বরেন্দ্র মাটি ও মানুষের শত বছরের উপকথাবহুল জীবন ও সংস্কৃতি । আদিবাসীদের জীবনের সুখ দু:খ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:

গল্পপ্রন্থ:
রক্তপাতের ব্যাকরণ (১৯৮৪), বাষট্টি বিঘা নদী (১৯৮৭), কোথায় নিবাস (১৯৮৭), পনের সময় (১৯৮৮), শনিবারের বৃষ্টি (১৯৯৯)

উপন্যাস:
লালমাটি কালো মানুষ (১৯৯৮), স্বপ্নপুরুষ (১৯৯৮), মীমাংসা পর্ব (১৯৯৮), আষাড়–র জীবনদর্শন (১৯৯৯), ভূমি (২০১১), কৃষ্ঞপুরাণ (২০১১), কখনও কখনও এরকম ঘটে (২০১২), যুদ্ধে যাবার সময় (২০১৩)

কবিতা:
আমার কেবলই সমর্পণ (১৯৮৬), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম (২০১২), আমার ভেতরে আঁধার (২০১২), পরানের গহীন (২০১২), তোর বড় কষ্ট রে (২০১২), আমার যত ভালোবাসা (২০১৩), ভোরের কবিতা (২০১৩), গেরিলার মুখ (২০১৩), আঁধার নেমে আসে (২০১৩), এলোমেলো (২০১৩)

নির্বাচিত কবিতা:

০১. নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম
০২. রক্তবীজ
০৩. মুই মরিচ্ছু
০৪. প্রতিটা মিনিট মরে গেলে
০৫. আজ যদি শাহবাগ ছেড়ে যাও
০৬. মেঘ, একলা ঘরের মেয়ে
০৭. সাভার ট্রাজেডি
০৮. গল্পসল্প
০৯. আমার হৃদপিন্ড
১০. আনন্দ গোক্ষুরের ফণা
১১. এলি তুই ভেসে
১২. প্রঞ্জাবান
নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম

অনেক কথা লবার আছে আমার
তবে সবার আগে নিরঞ্জনের
কথা বলতে হবে আমাকে
নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম, আর কোন
নাম ছিল কি তার?
আমি জানতাম না।
ওর একজন বান্ধবী ছিল
অবশ্য কিছু দিনের জন্য
সে তাকে প্রীতম বলে ডাকত।
ওর বান্ধবীর নামছিল জয়লতা
নিরঞ্জন
জয়লতা সম্পর্কে আমাকে কিছু
বলেনি তেমন।
জয়লতাকে কখনো কোন চিঠি আমি দেখেছি
একটা চিঠি ছিল এরকম-
প্রীতম,
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। তুমি বলেছ, এখন দুঃসময়-
কিন্তু আমি জানি,সবসময়ই সুসময়
যদি কেউ ব্যবহার করতে জানে তাকে
আমি বুঝি বেশি দিন নেই যদি পার
এক্ষুনি তুলে নাও
নইলে অন্য পুরুষ ছিবড়ে খাবে আমাকে-
আমার ঘরে, বসে সিগারেট টানতে টানতে
নিরঞ্জন চিঠিটা চুপ
করে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, বিভু,
চিঠিটা পড়–ন।
আমি প্রথমে পড়তে চাইনি।
পরে ওইটুকু পড়ে তার
দিকে তাকিয়েছিলাম-
না-ওই সিগারেটের ধুয়োয়
আমি কোন নারী প্রেম-তাড়িত মানুষের
ছায়া দেখিনি-ভয়ানক নির্বিকার।
কিছু বলছেন না যে, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম
কি বলবো?
এই ব্যাপারে?
এই যে জয়লতা।
বাদ দিন।
আমি বাদ দিয়েছিলাম।
নিরঞ্জন আমার ঘরে বসে অনেকক্ষণ
সিগারেট টেনে টেনে
ঘরটাকে অন্ধকার করে চলে গিয়েছিল সেদিন।
জয়লতার সঙ্গে অন্য পুরুষের
বিয়ে হয়েছিল
আমি জয়লতা এবং অন্য
পুরুষটিকে দেখেছি বহুবার,
বিশ্ববিদ্যারয়েই। জয়লতা আরো দেমাগী
আরো সুন্দরী হয়ে উঠেছিল।
অন্য পুরুষ ছিবড়ে খেলে মেয়েরা বুঝি
আরো সুন্দরী হতে থাকে?
এ কথার সূত্রে সেদিন নিরঞ্জন
আমাকে বলেছিল,
মানুষকে এত ক্ষুদ্রাথে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।
আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।
হ্যাঁ, মানুষের মুক্তির জন্য
নিরঞ্জন মিছিল করতো।
আমি শুনেছি নিরঞ্জন বলছে…
তুমি দু®কৃতি মারো, গেরিলা-তামিল মারো
হিন্দু-মুসলমান মারো
এভাবে যেখানে যাকেই মারো না কেন
ইতিহাস লিখবে যে এত মানুষমরেছে
বড়ই করুণ এবং বড়ই দুঃখজনক
শক্তির স্বপ্নে তুমি যারই মৃত্যু উল্লেখ
করে
উল্লাস কর না কেন
মনে রেখো মানুষই মরেছে
এই ভয়ঙ্কর সত্য কথা নিরঞ্জন
বলেছিল
মিছিলে হাত উঠিয়ে বলেছিল,
এভাবে মানুষ মারা চলবে না।
মানুষকে বাঁচতে দাও।
নিরঞ্জন আমার বন্ধু।
নিরঞ্জন বাঁচেনি।
তার উদ্যত হাতে লেগেছিল
মানুষের হাতে বানানো বন্দুকের গুলি।
বুকেও লেগেছিল-যেখান থেকে ‘মানুষ’
শব্দটি
বড় পবিত্রতায় বেরিয়ে আসতো।
সে লাশ-
আমার বন্ধু নিরঞ্জনের লাশ,
আমি দেখেছি
রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন লাশ,
মানুষ কাঁধে করে
তাকে বয়ে এনেছিল মানুষের কাছে।
জয়লতা সে লাশ দেখেছিল কিনা
সে প্রশ্ন উঠছে না।
দেখলেও যদি কেঁদে থাকে
সে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে
তাতে নিরঞ্জনের কোন লাভ হয়নি।
মানুষ কেঁদেছিল
আমি জানি তাতে নিরঞ্জনের লাভ ছিল।
নিরঞ্জন প্রমাণ করতে পেরেছিল
গতকাল মিছিলে
আইন অমান্যের অভিযোগে
যে দুষ্কৃতিকারী মারা গিয়েছে
সে আসলে ‘মানুষ।’
রক্তবীজ

আমি অনেক রক্ত দেখেছি
স্বাধীনতার ময়দানে
আমি আমার সামনে মরতে দেখেছি
অনেক মানুষ
আমি মরি নাই।
আমি অনেক রক্ত ঝরতে দেখেছি
স্বাধীনতার ময়দানে
আমিতোমার রক্ত দেখি নাই প্রভু
আমি নিজেই নিজের শরীর কেটে
আমার রক্ত দেখেছি
ঠান্ডা জলের গ্লাসের বাইরের
ঘামের মত ফুটে উঠছিল
আমি যুদ্ধের ময়দানে
আমার রক্ত দেখি নাই।
প্রভু, তুমি মারছ আড়াল থেকে অবিরাম
আমি রক্ত ও লাশ আর দেখি নাই।
কোথায় তাহারা চলে গেল

নিরঞ্জন উঠে আয়
সেই কালে কতলোক চলে গেল
ইটের ভাটার চুলায়
কত লোক সিমেন্টের জমানো বস্তায়
রূপসার তলার মাটি কামড়ে আছে
কত লোক এখানে ওখানে গলিতে
কত লোক এখানে ওখানে নদীর পাড়ের কাদায়
কত লোক এখানে ওখানে হাওয়ায় হাওয়ায়
উড়ে গেছে পুড়ে গেছে ডুবে গেছে
আমি তাহাদের লাশ দেখি নাই।

নিরঞ্জন উঠে আয়
একবার মিছিলে দাঁড়িয়ে বল
প্রভু, স্বাভাবিক মৃত্যু চাই।
মুই মরিচ্ছু

মেয়েটির কানে ধরা মোবাইল
পিঠে গাঁথা লোহা
ডাকছে সে- মা , আমায় নিয়ে যা
— মুই মরিচ্ছু ।

মেয়েটির কানে মোবাইল ধরা
পিঠে ইটপাঁজা
ডাকছে সে- মা , আমায় নিয়ে যা
— মুই মরিচ্ছু ।

মেয়েটির কানে মোবাইল, আলগা
পিঠে বিঁধে রড , ইটের পাঁজা
ক্ষীণ স্বরে শেষ ডাক , মা লিয়ে গেলি না ?
— মুই মরিচ্ছু ।
প্রতিটা মিনিট মরে গেলে

একটি মিনিট মরে গেলে মরে গেছে একেকটি কবিতা এভাবে বিয়াল্লিশ বছর! বাংলাদেশে কতো না মানুষ মরে গেলো খুনের অনলে- ধর্ষণে, সংসারের চিপাচাপায়। তারা প্রত্যেকে ছিলো হাজার কবিতা এইভাবে প্রতিটা মিনিটে একেকটি খুন, বাস, ট্রাক, লরি, লঞ্চ আর দালালের খপ্পরে বঙ্গোপসাগরে! তাদের প্রতিটা বুকে ছিলো হাজারটি কবিতা। এইভাবে বিশ্বজিৎ, এইভাবে কতো নারী, তুলোর মতন পরী তাদের লালসার আগুনে পুড়ে মরে গেলো। তারা সকলেই ছিলো হাজার কবিতা…
শকুনের থুতনিতে রোদ হলো রক্ত! বাজপাখি উড়ে চলেছে দিনেরাতে… কাকে ছোঁবে, কাকে নেবে? আমরা জানি না। আমরা লুকিয়ে আছি, আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আমরা ধানের জমিনে যাই, আমরা সাগরে যাই… আমরা আর কোথায় যাই? আমরা কি মৃত্যু প্রসব করি? আমরা নিয়ত মরে যাচ্ছি, মরে যাচ্ছি, মরে যাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ অবধি বাজপাখি উড়ছেই। বাজপাখি উড়ছে, শকুন উড়ছে, চাপাতি-পিস্তল উড়ছে। প্রতিটা মিনিটে হাজার কবিতা ঝরে পড়ছে। প্রতিটা মিনিটে একেকটি মানুষ- রক্তে ভেসে, জলে ভেসে, অগ্নিতে ভেসে মরে যাচ্ছে। আমরা কারো জন্যে একটিও শোকগাথা লিখিনি। আজ শাহবাগ চত্বর থেকে বলছি, একাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত এইসব মৃত্যুর জন্যে… আমি প্রতিটি মৃতের জন্য শোকগাথা লিখে- তোমাদের ঘরে ঘরে প্রতিরোধের পাথর বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি বলছি, হবে; হতেই হবে! আমি শাহবাগ চত্বর থেকে বলছি, এরূপ প্রতিটি মৃত্যুর, প্রতিটি কবিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া হবে।
কুত্তা ও বাজপাখি সাবধান!!! আর একটি লাশ যদি ফ্যালো একশত বাজপাখির মৃতদেহ জমিনে ফেলে দেবো, কবরে দেবো না। কুত্তাকে ডেকে বলে দেবো, খা। সুখ করে খা। আরামে বসে খা। ঠিক যেভাবে খেয়েছিলি একাত্তরে!
শকুনকে বলে দিলাম, খা। কাককে বলে দিলাম, ওদের চোখ, নাক, মুখ ঠুকরে ঠুকরে খা। কুত্তা বলে দিলাম, খা খা, রাজাকারকে খা। যারা মেরেছে আর মারছে, ধর্ষণ করেছে আর করছে- সকলের লাশ খা। আজ নষ্টদের লাশ খা।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আজ যদি শাহবাগ ছেড়ে যাও

আজ যদি শাহবাগ ছেড়ে যাও
আজ যদি শাহবাগ মরে যায়
এমৃত্যু হবে আসলে তোমার ।

আমিই কাল বললাম ,
শাহবাগ মরে গেলে
এ হবে তোমার মরণ ।
শুনলে না । কার কথায় কাল ঘুমের ঘোষণা দিলে ?
কাল ঘুম কেড়ে নিলো বন্ধুর প্রাণ ।
কবে কে শুনেছে ,
ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে ঘুমুতে যায় ?
তুমি ভুল করেছিলে
আর নয় একটু বিরাম
যুদ্ধে গেলে ফল নিয়ে ফিরতে হয়
মরণ কিংবা জয় ।
মেঘ, একলা ঘরের মেয়ে

মেঘ আমার আলো । যদিও সকলের ঘর আঁধার করে । শব্দ করে । কাঁদে । জল ফ্যালে । তোমরা আমায় আমায় জিজ্ঞেস করো প্রায় মেঘ তোমার কে ? আমি বারবারই বলেছি মেঘ আমার মেয়ের নাম ।

তোমরা থুব স্বাভাবিক ভাবেই শিউলী অথবা বকুল ফুল ভালোবাসো । তোমাদের মেয়েরা ভোররাতে কোঁচা ভরে সেসব ফুল কুড়িয়ে আনতে পারে । তারা আকুন্দা বা বৈচি বনে যেতে পারে । তারা পুতুল নিয়ে খেলতে পারে পুতুলের বিয়ে দিয়ে তোমাদের বাড়িতে ছোটখাট বাচ্চাদের নেমন্ত্রন হয় । তোমরা খুব সুখী ও স্বাভাবিক জীবনে আছো । ভালো আছি ।

মেঘ আমার মেয়ের নাম । বেতারা নদীর তীরে থাকে । একা অনেক মেয়ের সাথে থাকে । সেখানে ফুলের বাগান আছে । লেখা আছে , ফুল ছেঁড়া অপরাধ । মেঘ ফুল কুড়োতে জানে না । তাদের সদর দরজা আছে । ভোররাত আছে । তবু তারা ভোররাতে সদর দরজায় যেতে অপারগ । আর ভেতর দুটো শেফার্ড কুকুর সারারাত তাদের পাহার দেয় ।

তাদের জীবনে পড়াশুনো ছাড়া আর কিছু নেই । বাবা মা নেই । মাসে একদিন একবার আমি তাকে সারামাসের দামী চিপস মুড়ি চানাচুর ফুল ও গ্রাফপেপার কিছু খাতা বই কিনে দিয়ে আসি।

আমরা তাকে ফুলের তোড়া দিই সে বলে , ফুল মৃতদের জন্যে শুধু আমি মরি নাই ।

তোমরা আমায় ফেলে রেখে গেছো তোমরা এখানে বারো’শো বাচ্চাকে মেরে তাদর গোরস্থানে ফুল দিয়ে যেও ।

এই বলে মেঘ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে । এর মাঝে ঘন্টা পড়ে । মেঘ ফুলটা ফেরত দিয়ে তাড়াহুড়ো করে হোস্টেলে কাঁদতে কাঁদতে হাত ছেড়ে চলে যায় ।

তোমরা যে বলো মেঘের কবিতা লেখো ক্যানো ? মেঘ আমার একলা ঘরের মেয়ে ।

সাভার ট্র্যাজেডি

গতকাল সকালের আগে ওদের কেউ কেউ সারারাত জেগেছিলো । গতকাল ভোররাতের আগে কেউ কেউ কাউকে কাউকে সোহাগ করে বলেছিলো , দূর পাগলি , হবে । সব হবে । একটু ধৈর্য ধর । আর মেয়েটা আদর পেয়ে তার পুরুষের বুকে মুখ ঘুষে ঘুষে ঘুমিয় পড়েছিলো । একদিন হবে । সব হবে । নিশ্চিন্তি ।

তাতেই ডাক এলো । গোটা পাড়া জাগে হুলুস্থুল বাধিয় কেউ কেউ অপ্রস্তুত । বাধ্যতামূলক স্নানও সারতে পারলো না । চলে যেতে হলো । ছোট ছোট বুকে , ছোট ছোট আশা বড় বড় ভালোবাসা বেসেছে তারা কেউ কেউ হাতের মেহদি না শুকাতেই গুচ্ছ কাজের ডাকে সারে চারহাজার মানুষ ঢুকে গেলো রোজকার মত কাজে।

কোথাও ছিলো না ভুল তাতেই টেনে নিলো টর্নেডোর মত উপর থেকে নিচে ঝরে পড়লো এতোবড় আশাবাড়ি মুহুর্তেরই থেতলে গেলো শত শত প্রাণ চিড়ের মত চ্যাপ্টা হতে থাকলো হাজারো মানুষ ।

জীবিতে আর মৃতে এখন তফাত বড় কম । বাতাসে চিকতার ভাসছে , মোবাইল থেকে মোবাইলে ভেসে আসছে ভেংগে পড়া আশাবাড়ির খোদল থেকে শব্দ আমাদের বাঁচান স্যার আমাদের বাঁচান স্যার আমাদের দিক তাকান স্যার ।

মোবাইল বেজে চলছে এখনো এখনো কোন এক খোদলে কোন কোন থেকে ভেসে আসছে আর্তি আর্তনাদ আমাদের বাঁচান স্যার । আমাদের টেনে বের করে নিয়ে যান ।

ভেতরে ভেতর রক্তস্নান ভেতরে ভেতর বাঁচার আহবান আমাদের বাঁচান স্যার আমাদের টেনে তুলে একবার মাত্র একবার বাঁচিয়ে দিন ।

এর পরেও আঁধার রাতটা চলে গেলো খোদলের তলা থেকে আজ হয়তো তাদের ভেতর কেউ কেউ ফজরের আজান এইমাত্র শেষবার শুনলো . . . . আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম. . . . . . .

গল্পসল্প

ছেলেটার পায়ে
আর মেয়েটার গায়ে
পাথরের ছাউনী ।
চাপ চাপ শ্বাসকষ্ট দূর করতে
মেয়েটা ছেলেটি দিকে
যে হাত এতোকাল বাড়ায় নি
আজ বাড়িয়ে দিয়ে বললো
ছুঁয়ে দ্যাখ তো ?
তাপ আছে ?
ছেলেটা ছুঁতে গেয়ে কয়েক ইঞ্চি
সরতে পারলো না ।
না ছুঁয়ে বললো , ডেকেছিলাম
আসলি নে এতোকাল
আজ দ্যাখ আল্লাহর অগাধ করুণা
আমাদের এইঠে বাসর করে দিলো ।

মেয়েটা চর্মপুতুল , হাসলো ।
ছেলেটাও তাতে যোগ দিলো ।

তাদের ছোট চিপাঘরে
স্পর্শঅযোগ্য বাসরটা
আজ হয়ে গেলো ।
ছাদটা আরেকটু নূয়ে
পুরোটাই আজ চেপে দিলো ।

বাইরে মেঘ বজ্র ফাটে
এখন ঘন ঘোর বৃষ্টিতে ।
আমার হৃৎপিন্ড

ফুডগ্রেড হৃদয় আমার
আরএফএল এর লাল বালতিতে
যতনে রেখেছি ।
ওদিকে রক্ত , পূজ , পরাজয়
কুত্তাতে খাক ।
তুমি এদিকে থাকো
তুমি নিরামিষ কিমাভোগী
আমার পাথরের মত
পৌরুষ
কালো এঁটেল মাটির মত
কষ্টিপাথর রং
পেশীর পেছনে পিঠ
তুমি খামছে ধরো
তোমার জমি অনাবাদী
আবাদও করে নিয়ে যাও ।

ঐ লাল হৃতপিন্ড
লাল এফ এল বালতিতে
চুবানো আছে , রক্ত পূজে
শতটা সেলাই এ
ওটা কুত্তায় খাক ।

তুমি খাও হিম
কষ্টিদানা ও গরম পাথর ।
আমার পেশীতে
আর যা কিছু আছে ।
আনন্দ গোক্ষুরের ফণা

তুমি যে নামেই হেঁটে যাও
ফণা তুললেই তোমার ফণার চক্র
বলে দেয় তুমি সেই সাপ
যে আমাকে দংশন
করে যায় প্রতি মধ্যরাতে।
অব্যক্ত যাতনায় কেটে রাত
সকালে লাগাই গুড়
পানপাতা রস।
তুমি কবে কার ডালে কৃষ্ণ সেজে
বিাক্ত নিঃশ্বাসে
বাঁশি বাজিয়ে যাও।
কেউ বুঝতে পারার আগেই
কুমারীর স্তন থেকে তুমি টেনে আনো সেই রস,
সে স্তনে আর দুধ আসে না কখনো।

তোমার কুড়ি নাম জানি।
একুশতম নাম আজ জানা হলো।
আর সেদিন মাঝ রাতে তোমার
ফনায় সাতটি বিজাতীয় মুদ্র
আমাকে বলে দিলো,
তুমি সেই সাপ
যে আমাকে দংশন করতো
প্রতিরাতে।

কুমারীর স্তনের বে^াট থেকে
চুষে নেয়া রস তোমার ঠোঁটের লিপজেল হয়ে
জ্বলজ্বল করে ঠোঁটের লালসা,
আর গাভীর ওলানের
বোঁটা ফেটে ঝরে পড়ে রোজ
সুস্বাদু দুধের বদলে রক্তপুজ লহুর
সমুদ্দুর।

অনন্ত অনাদি সন্তান কাঁদে দুধহীন মায়ের ক্রোড়ে।
আমি তোমায় চিনি হে
আনন্দ গোক্ষুরে।
এলি তুই ভেসে

বিচার আচার নেই কিছু
তোর জন্যে বরাদ্দ প্রেম
যা ছিলো যামিনীর শেষে।
কোথা গেলি ভেসে?

গৌতম গৌতম যায়
হেসে যায় বেসে যায়
অসীম সাহসে।

বার বার চুনকাম করা
সাদা দেয়াল
শিল্পীরা রোজ রাতে লাল রক্তে
এঁকে যায় ছবি
নকশাল নকশাল।
আর কতকাল ?

ফাঁসির আসামি বলেছিলো
মরবার আগে
কবে ?
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
তাহের তাহের।

কে থামায় এই শিল্প ?
মারে।
রক্তে পড়ে হিম।
চেনো তারে ?
কে মারে ?

নদী গুলো নদী
গৌতমের বাড়ির
পাশ দিয়ে বয়ে যায়
নিরবধি।

বন্ধু গৌতম
মরে গেলো বলে বুঝি
না চেনার ভান ?
এখন জোয়ারের টান।

উত্তাল উত্তাল
সাদা দেয়ালে গৌতমের রক্ত
লেখে নকশাল নকশাল।

চাঁপাই এর লালমাটি
খেতুর রোডে ঝরেছিলো
তখন ছিয়াত্তুর
উনচল্লিশ লাশ
কেউ পায় নি খবর
মেরেছিলো দালালে
আড়ালে।

সমস্ত সাদা দেয়ালে
সেই রক্ত আঁকে
অপরূপ শিল্প
ইনকিলাব নকশাল।

গৌতম গৌতম নদীজল
তাতে ভেসে যায় ছলচল
কেউ বললো না কিছু
ভেসে গেলো কতকাল
কাহার কঙ্কাল?

বহতো নদী
বহে যায়
গৌতম বুকে তার
মহা ভার
ইনকিলাব ইনতিজার।

গৌতম গৌতম
আমার বন্ধু গৌতম
তার দেহের মত সাদা দেয়াল
লেখা আছে রক্তে
চিরঞ্জীব নকশাল।

আঁচালি প্যাচালি গায়
কত জনে কথা কয়
বীরের গল্প কুকুরে শোনায়
গৌতম কোথাও নাই।

খেতুর রোড যায় নাচোলে
কত কথা লেখা আছে কাকনে
সাঁওতালের লাল আঁচলে
যামিনী সূরে গায়
গৌতম তুই ফিরে আয়
খেতুর রোডের
লাশগুলো কই ?

গৌতম ভেসে যায়
কত গৌতম গেছে ভেসে
কে নেবে খবর হেথা এসে ?
ভালোবেসে… ?

রাজধানীর সাদা দেয়ালে
আঁকে শিল্পী রক্তে লাল
গৌতম গৌতম
নকশাল প্রতিপল।
প্রজ্ঞাবান

আমার তখন বয়েস বা কত?
বিয়ের দশদিন পর কুশী ভাবী
এক হরিৎ সকালে
আমার পাশ দিয়ে যাবার সময়
আমি এক অধরা মাতাল গন্ধ
পেয়ে আজো ভুলতে পারি নি।

তারপর থেকে আমিতার
প্রতি স্নানে পাশে গেছি,
চওড়া পিঠ থেকে
কাপড় সরিয়ে বলেছে কোনদিন,
আয় পিঠে সাবানটা কচলে দে।
আমি সেখানে পেতাম
সেই মাতাল সুবাস।

এই ভাবে বছর বছর কুশী ভাবী
বড় দিদি, জরিনা জরিনা
বিয়ের পর সকালে
পুকুর থেকে ফিরলেই
সে সুবাস আমাকে বদ্ধ মাতাল
করে দিত।

এই কথা একদিন দুপুর বেলায়
পিসিকে বলতেই পিসি আমায়
কাঠের খড়ম দিয়ে
হালকা পেটালো
লম্বা চুলে বড় জ্ঞানী জ্ঞানী কথা,
তেরো বছরেই চোখে চশমা দিয়ে
পন্ডিত হয়ে গেলি?
আমি সেইদিন দুপুরে
পিসির খোলা পিঠে সাবান
ডলেছি।
এতোটুকু গন্ধ আসেনি।
আমার পিসি অনূঢ়া।
একে কি জ্ঞান বলে?
প্রজ্ঞা বলে?

তেরো বছরেই আমিতবে
প্রজ্ঞাবান?

এই কথা মাকে বলতেই
মা হায় ভগবান বলে
চাপা কণ্ঠে দিলেন চিৎকার।
আমার অপরাধ কি?
এ কথা আর কাউকে
বলো না বাবুন।

সেই থেকে বিবাহিত নারীর
প্রথম বছরের স্নানের গন্ধ
সিদ্ধ ধানের গন্ধ,
শুকনো মাটি বর্ষার জল পেলে
ছড়ানো ভাপের গন্ধ,
নতুন ফোটানো চালের গন্ধ
বেদনার বেতফল,
বনের কামিনী,
ঘোয়ালঘরে কাকার
নিত্য যাওয়া আসার গন্ধ
দাঁত ও হাতের ফাঁকের গন্ধ
কোথাও কিসের না জানা গন্ধ
পেতে পেতে বুঝে গেছি আজ
সব কিছুর মাঝখানে
গন্ধ বিরাজিত।

আমি চাষী হলে লাঙ্গলের ফাল
প্রথম ঢোকাতেই জল খাওয়া
দু’ফাক মাটির মাঝ থেকে
যে গন্ধ পাই
সেই গন্ধ ছিলো
কুশীভাবী আর দিেিদর গায়ে।
আমি হাতে মাটি তুলে বলেছি
ধরণী, তুমি আমাকে গ্রহণ করো
ছায়া দিও, মায়া দিও, অন্ন দিও
সারাটা জীবন।

আজ কুশী ভাবীর স্নান গন্ধ নাই
আজ মাতাল মাধুরী গন্ধ ছোটে
কেবলি মৃত্তিকায়।

আমি আজ হাল চাষের
গুপ্তবাণী জানি
আজ আমি বিবাহ স্নান জানি
আজ আমি কামিনীরা
কেনো যে কামিনী
সে খবর জানি।
একে তুমি জ্ঞান বলো?
প্রজ্ঞা বলো?
শুনি।

PaidVerts