মুহম্মদ নুরুল হুদা’র কবিতা

মুহম্মদ নুরুল হুদা’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

মুহম্মদ নুরুল হুদা সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম শীর্ষ কষ্ঠস্বর আমাদের সময়ের বহুমাত্রিক আলোকমানুষ মুহম্মদ নূরুল হুদা। তাঁর কাব্যপ্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিমানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্বমানুষ। জাতিসত্তার কবিরূপে বহুলনন্দিত তিনি দৈশিক ও বৈশ্বিক মানব-অস্তিত্বের নান্দনিক ভাষ্যকার। তাঁর সৃষ্টিসত্তা নানা নিরীক্ষা, প্রকরণ ও উদ্ভাসে নিয়ত নবায়নপ্রবণ। স্বোপার্জিত কাব্যমুদ্রা ও নন্দনলোকের বরপুত্র এই বাঙালিকবি সমকালীন বিশ্বকবিতারও এক তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃৎ।
মুহম্মদ নূরুল হুদা ১৯৪৯ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর বৃহত্তর চট্টগ্রামের কক্সবাজার জেলার পোকখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ সেকান্দর, মাতা আঞ্জুমান আরা বেগম। মূলত কবি তিনি। তবে কথাসাহিত্য, মননশীল প্রবন্ধ, কলাম ও অনুবাদসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তিনি বিচরণশীল। তিনি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সৃষ্টিশীল। অতিপ্রজ ও সব্যসাচী এই লেখকের স্বরচিত, অনূদিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসংখ্যা শতাধিক। তাঁর প্রিয় ক্ষেত্র কবিতা, নন্দনতত্ত্ব, মেধাস্বত্ত্ব ও লোকবিদ্যা।
সৃষ্টিশীলতার নানাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত ও পুরস্কৃত। তিনি বাংলা একাডেমীর ফেলো, আমেরিকান ফোকলোর সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ফোক ন্যারেটিভ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মানিত সদস্য। তাঁর কবিতাবলি পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত। কাব্যব্যপদেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন পৃথিবীর নানাপ্রান্ত।
জনাব হুদার শিক্ষাগত যোগ্যতা বি. এ. (অনার্স ১৯৭০) এম. এ. (ইংরেজি, ১৯৭২)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারে ১৯৮৫-৮৬ সালে রিসার্চ ইন্টার্ন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), যশোর সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), আবুল হাসান কবিতা পুরস্কার (১৯৮৩), আওয়ামী শিল্পী সংবর্ধনা (১৯৮৬), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কক্সবাজার পদক (১৯৮৮), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৪, উপন্যাসের জন্য), যুক্তরাষ্ট্রের আইএসপি ঘোষিত পয়েট অব ইন্টারন্যাশনাল মেরিট ও পয়েট অব দ্য ইয়ার (১৯৯৫), কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কর্তৃক প্রদত্ত নজরুল জন্মশতবর্ষ সম্মাননা (১৯৯৯), জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সম্মাননা (১৯৯৯), কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার (২০০১), সুকান্ত পুরস্কার (২০০৪), মহাদিগন্ত পুরস্কার (কলকাতা ২০০৭), চয়ন সাহিত্য পরস্কার (২০০৮),) দেশব্যাপী ষাটবর্ষপূর্তি সম্মাননা (২০০৯), নগরচাবি কক্সবাজার (২০০৯), ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি পুরস্কার (২০১০), একুশ-ঊনিশের ভাষাগৌরব সম্মাননা (ত্রিপুরা সরকার, ২০১২), নগরপ্রতীক কক্সবাজার (২০১২) ইত্যাদি।
১৯৯৭ সালে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি সুলেমান ডেমিরিল কর্তৃক তিনি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হন। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা দিয়ে। তারপর বাংলা একাডেমীতে তাঁর চাকরি বদল। এখানেই বিকশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়। তিনি এখন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব ও বাংলাদেশ রাইটার্স কপিরাইট সোসাইটির সভাপতি। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান ও মানবিক অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ কপিরাইট বিশেষজ্ঞ জনাব হুদা জেনেভাস্থ আন্তর্জাতিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ওয়াইপো) কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশ কপিরাইট বোর্ডের সদস্য। সমসাময়িক বাংলাদেশে লেখকদের অধিকার সুরক্ষা ও মেধাস্বত্ব আন্দোলনের তিনি পথিকৃৎ।
সাংবাদিক হিসাবেও জনাব হুদার অভিজ্ঞতা চার দশকের বেশি, কেননা সৃষ্টিশীল রচনার পাশাপাশি তিনি বরাবর সাংবাদিকতার কাজটিও করেছেন। সত্তুরের দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বঙ্গকণ্ঠ-এ তার সাংবাদিকতার শুরু। তার দীর্ঘদিন তিনি ’অধোরেখ’ ’বিশ্বাস’’ ‘বহুবচন’ ‘বাংলা একাডেমী পত্রিকা’, ‘বাংলা একাডেমী জার্নাল ’, ‘নজরুল ইন্সটিটিউট পত্রিকা’, ‘নজরুল ইনস্টিটিউট জার্নাল (ইংরেজি), ইত্যাদি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন পত্রিকা ‘বিডিনিউজ২৪.কম’-এর এডিটর আর্টস। এছাড়া তিনি বিশ্বব্যাপী নান্দনিক কাব্যান্দোলন ‘কবিতাবাংলা’-র সভাপতি।

কবিতা নিয়ে ভাবনা
মুহম্মদ নূরুল হুদা

ভাবনা ছাড়া কবিতা লেখা যায় কি? না, এর যুৎসই কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, কবিতা কারণেও লিখি, অকারণেও লিখি। কারণে লিখি বললে কারণগুলো অন্ততপক্ষে তালিকায়িত করার প্রশ্ন আসে। প্রায় চার যুগ আগে একবার এই কারণগুলো বিবৃত করার চেষ্টা করেছিলাম। এখন মনে নেই সে-সব-কিছু। বয়স ও দিনযাপনের বাঁকে বাঁকে একজন ব্যক্তি ও কবির কাব্যভাবনা তো পাল্টে যেতেই পারে। আমারও যে যায়নি এমন নয়। এখন আমি ভাবি কীভাবে জন্ম নেয় একটি আনকোরা কবিতা। বিস্ময়ের গভীরতম উৎস থেকে, নাকি ব্যাখ্যাহীন আকস্মিকতা থেকে? যেভাবেই হোক, উৎসজাত কবিতাটি পূর্ণ কবিতা হিসেবে বিকশিত করার প্রক্রিয়াটি যে সচেতন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার ক্ষেত্রে সচেতন-অবচেতন-অচেতনের এই ধ্বনি-দৃশ্যময় এই উচ্চারণ-ব্যঞ্জনা শুরু হয়েছিলো আসলে শৈশব থেকেই।
গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হয়ে বছর দুই যেতে না যেতেই পরিচিত হই ছন্দোবদ্ধ বাণীর সঙ্গে। তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা আমাদের ছোটনদী এঁকেবেঁকে চলার কথা। শিশুমন আনন্দে নেচে উঠলো, আর একপায়ে তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যেসও শুরু হলো। কিংবা স্কুল ছুটির পরপরই সামনের ক্ষীণ¯্রােতা নদীতে নেমে জল-বালি-¯œান। সেইসঙ্গে কখন আমজাম, খালবিল, নদীনালা, দরিয়া, চর, চড়–ই, শামুক, লাটিমসহ প্রতিদিনের দেখা বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় খেলাচ্ছলে পদ মিলাতে শুরু করেছিলাম টের পাইনি। আমার ছোট্ট খাতার নানান পাতায় এসব পদ লিখিত হলো। আর বিপদ হলো তাতেই। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন সেই খাতা আগাগোড়া উল্টেপাল্টে দেখলেন। জানি, এর পরেই সেই প্রিয় শাস্তি আসবে। আমাকে হয়তো স্যারের নির্দেশে তালগাছের মতো একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ঘণ্টাখানেক। আর তাতে তো আমার আপত্তি নেই। এ-তো আমাদের এক প্রিয় খেলা।
কিন্তু স্যর আমার পিঠে ¯েœহের থাপ্পড় বুলাতে বুলাতে বললেন, ‘সাবাস, তুই তো দেখি এক ক্ষুদে কবি রে।’ বলেই তিনি আমার ‘মিথ্যা বলার ফল’ শীর্ষক বাঘ-রাখালের কাহিনীনির্ভর লেখাটি পাঠ করে শুনালেন সবাইকে। বললেন, মিল-টিল মোটামুটি চলে, তবে কবিতার ভিতর ছন্দ প্রয়োগের অঙ্কটা ভালো করে শিখে নিতে হবে। তুই যে একদিন কবি হবি, আমি নিশ্চিত। বলে রাখা ভালো, স্যার নিজেও কবিতা চর্চা করতেন। স্যারের এই মোহন প্রশ্রয় আমার লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। এই ফাঁকে এ-ও কবুল করতে চাই, নিজের ভেতরে ব্যাখ্যাতীত যে কারণটি ছিল সেটি অবশ্যই এক ধরনের সৃষ্টিশীল অনুকারিতার। যে গাছ দেখছি, তুলির বদলে কথা দিয়ে তাকে আঁকতে পারাতেই আমার আনন্দ। অর্থাৎ যা কিছু দেখছি বা অনুভব করছি তার কথাচিত্র, বাণীচিত্র বা ছন্দচিত্র বা অনুভূতিচিত্র তৈরি করা। এ যেন এক অন্তহীন খেলা। খেলা আর লেখা, লেখা আর খেলা। তাই বলতে হচ্ছে করে, খেলি বলেই লিখি, লিখি বলেই খেলি।
এভাবে চলতে চলতে আরো কিছু কারণ সামনে এস দাঁড়ায়। একসময়ে বুঝতে পারি আমার লেখাটি ভালো হোক মন্দ হোক, আমার মতোই হতে হবে। অর্থাৎ থাকতে হবে ‘আমি’-মুদ্রার ছাপ। এ-বড় কঠিন ব্যাপার। তবু সেই চেষ্টা থেকে বিচ্যুত হওয়ার উপায় নেই। তার পর আসে ব্যক্তি-‘আমি’র কারণের পথ ধরে সমষ্টি-‘আমি’র কারণ। সমষ্টি আমি মানে আমার সংশ্লিষ্টতা অন্যের সঙ্গে। অন্য ব্যক্তি, অন্য বোধ, অন্য মন, অন্য গোষ্ঠি, অন্য জাতি আর সবশেষে গোটা মানবগোত্রের সঙ্গে। তখন আমার লেখার প্রকরণের পাশাপাশি বিষয়টাও গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। রচনায় নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয় মানবিকতা। আমর রচনার অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে ব্যক্তিমানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্বমানুষ। মানুষের দুঃখকষ্ট, অপূর্ণতা, বিত্তবৈভব বা চিত্তসৌন্দর্য দেশকাল ও সীমানা পেরিয়ে আমার লেখার নিরীক্ষাপ্রবণ কারণ হয়ে ওঠে। এই নান্দনিক ও মানবিক সৌন্দর্যের অন্বেষণই আমার এইসময়ের লেখালেখির মুখ্য উৎস। আমি যেমন চলছি একলা, তেমনি চলছি সকলের সঙ্গেও। যে ডাক শোনে তার সঙ্গে আমি তো অবশ্যই আছি, যে ডাক শোনেনি তার সঙ্গেও আমি বিযুক্ত নই। আসলে এই যুক্ততাই আমার লেখালেখির আসল মুক্ততা।
১২.০৬.২০১৩

নির্বাচিত কবিতা:

০১. প্রভাবিনী
০২. যে শরতে ইলিশের বান
০৩. পোশাক বাকল নয়
০৪. ছয় পা বা দুই পা বা এক পায়ের দৌড়
০৫. শামুক
০৬. শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি (১২-১৭)
০৭. অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী (২৭, ৩০)
০৮. শিকড়গুলো
০৯. আমরা তামাটে জাতি
১০. মাতৃভাষা
১১. পরাজিত পূর্ব-পুরুষেরা
১২. আমার সাহস নেই টোকা মেরে সুন্দরকে উড়িয়ে দেবার
১৩. জব্বইজ্জার বলী খেলা পানির ভিতর
১৪. দিগন্তের খোসা ভেঙ্গে
১৫. নোখতা
১৬. মানবপদ্ম
১৭. ফ্রয়েড তাকিয়ে আছে

প্রভাবিনী

এখনো আমাকে তুমি প্রভাবিত করো,
যখন পালাতে চাই, মন টেনে ধরো;
একদা মৃন্ময়ী ছিলে, একদা দ্রাবিড়া,
আজন্ম অতনু হীরা, শুধু মনক্রীড়া;

সুদূর ইয়াংসি তীরে দেখেছি তোমাকে,
তোমাকে দেখেছি আমি আমাজন বাঁকে;
ধানসিড়ি নদীতীরে ছিলে অমরতা,
অসুখী কবির বুকে দুখী বনলতা।

আর কি বলার আছে, আর কি জানার!
কখনো মাপিনি দৈর্ঘ্য বিহঙ্গ ডানার।
কী সুখে করবো তবে তোমাকে ভ্রমণ?
আমার সম্বল শুধু ত্রিভুবন-মন।

চরাচরে বাড়িয়েছি সেই মন-ডানা:
কোথায় হারাবে তুমি? কোথায় ঠিকানা?
০৬-১৯.০৯.২০১৩
যে শরতে ইলিশের বান

ভাদ্র এলো আশ্বিন এলো অথচ শরৎ এলো না,
কাশফুল ফুটলো চরে চরে, অথচ বর্ষণ গেলো না;
যেহেতু দরজায় এসে গজরাতে থাকলো কামিনী দামিনী,
যেহেতু ভয়ে ভয়ে এই বুকে সেঁধিয়ে গেলে তুমিও অশণি,
তা-নাহলে এই নাতিউষ্ণে কে আর জলাঞ্জলি দেয় বলো
অমন তুলতুলে ঠোঁট, সিগ্রেটের জ্বলজ্বলে হলাহলও
যার কাছে তুচ্ছ ঠেকে চুমুকে চুমুকে; তুমি খুব রোদে
ঘুরতে ঘুরতে যখন ধরা পড়লে বন্য এক অবরোধে,
আমি তখন মন বাড়িয়ে দিলাম শরীরকে অমান্য করে,
স্তনাগ্র পেরিয়ে লালপিঁপড়েও কামড় বসালো সুভদ্রা অধরে;

যেহেতু জোছনাভুক আমি
পেয়ে গেলাম মনপাজেরো এক মহাদামী,
সেহেতু ডুবন্ত তোমাকে পাঁজাকোলা করে ডুব দিলাম পদ্মার চরে;

আহা, সেই খুশিতে সেবার ইলিশের বান ডাকলো ঘরে ঘরে।
০৩.০৯.২০১৩

পোশাক বাকল নয়

যদিও যে কোনো গোত্র, জন্মসূত্রে মূলত মানুষ।
ধর্ম খায় বর্ণ খায় মানুষেরা জাতপাত খায়।
একাঙ্গে মিলিয়ে সব ঋষি-কৃষি খ্রিস্টিয়-বৈদিক
জ্বেলেছো ব্রহ্মের বাতি পিতৃজমি ছাতিমতলায়।

মিলন সহজ নয়, ধু ধু শুধু বিরহ মঙ্গল।
একা মানুষের পাশে যদিও-বা একাকি মানুষী
জন্মের দরদী সেজে শুয়ে থাকে শাদা বিছানায় –
মৃণালিনী মিথ্যে নয়, কাদম্বরী-রূপে মন খুশি।

সাম্যবাদ কাম্য বটে, বাদ শুধু সমর-নিনাদ,
কাম্য কারও বিশ্বব্যাপী সৎসঙ্গ শান্তিদেবতার;
পৃথিবী কি ওম-শান্তি, রাষ্ট্রবিশ্বে যদি থেমে যায়
চিৎকার, শীৎকার, মিথ্যাচার আর ভৃত্যাচার?

যে শুঁকেছে সে অসুখী, সুখী নয় যে জন শুঁকেনি;
সে কি সুখী, কেবল নিজের মধ্যে যে সুখ খোঁজেনি?


বুকের পকেটে তুমি, কায়া নও মায়া নও, ছায়া
তোমাকে রাখবো বলে দিনরাত হিসাব-কিতাব
মিচেল ফুকোর কাছে, কখনো-বা দেরিদার কাছে
আছে-নেই নেই-আছে বস্তু আর অবস্তুর খাব।

আয়না বায়না দিয়ে ত্রিভুবনে ভাসাই শাম্পান;
আমি কি বয়েৎ তবে দরিয়ার ফেনা-দেবতার?
ভাসুক হাসুক কিম্বা অক্কা পাক জাহাজী কাপ্তান,
আমি তো রইবো জেগে নিরাকার, সকল আকার।

এ বড় প্রাচীন কথা, তুমি আর তোমার সুন্দর!
অধরে অধর আর পুষ্ট বুকে আ’েরাহী কদর
কী আর নতুন বলো, জন্ম-মৃত্যু, গদ্যপদ্যকথা :
যেহেতু কমেছে কবে মরলোকে রমণীর দর?

পোশাক বাকল নয়, তবু কেন খুলে খুলে যায়
যখন দুঠোঁট রাখি তৃপ্তিহীন মগ্ন নগ্নতায়!


সেহেতু পড়েছি ঝুঁকে বারবার তোমার কিনারে
যে তুমি চলেছো ছুটে মাথা কুটে রাতে পুলসেরাতে,
যখন মুহূর্ত এসে বাঘা লাফে অনন্তের গ্রীবা
মানুষখেকোর মতো মটকায় বাঘিনীর পাতে;

ওসবে পরোয়া নেই, আমি খুঁজি আমার ঘরোয়া
সংসারের তিনকালে যে আমাকে চুশনি বানায়;
আমি কি দেইনি মেলে নিশিরাতে আমার জড়োয়া
যখন কুন্তলা এসে বাহুভঙ্গে জোছনা নামায়?

পৃথিবী বীর্যের সাক্ষী, তুমি আমি সাক্ষী মগ্নতার,
পাহাড়ি ঢলের মতো গলগল নামে খল জল,
দেহের কলসে তুমি ভরে নাও বাৎস্যায়ন ফেণা,
ত্রিভঙ্গ খৈয়াম নাচে উল্কি পায়ে ত্রিভুবন-তল।

মগ্ন হও হে নগ্নতা, নগ্ন নও হে মগ্নতা তুমি
মুর্শিদ হেগেল নয়, আরও আছে এমরে বা রুমী।

১১.০৫.২০১৩-৩১.০৭.২০১৩
ডায়মন্ড হারবার ও ঢাকা
ছয় পা বা দুই পা বা এক পায়ের দৌড়

ছয়পায়ের ক্ষুদে এক পিপীলিকা
বিরামহীন দৌড়ে যাচ্ছে আমার লেখার টেবিলে,
একসময়ে সে উঠে এলো
আমার আঙুল বেয়ে আমার কলমের নিবে;
তারপর সুস্বাদু আহার্য ভেবে
আমার বলপয়েন্টের কালিতে মুখ ডোবালো সে।

অগত্যা পিপীলিকাটির প্রতি নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে
আমি বলপয়েন্টটা তুলে রাখলাম তার বিদায়ের অপেক্ষায়,
পাছে কলম ও কাগজের সংঘর্ষে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়;
ওদিকে আরেকটি পিপীলিকা কখন আমার মুখ বেয়ে
নিচের ঠোঁটে কামড় বসিয়েছে আমি টের পাইনি।

বাম কনুইয়ের উপর পলায়নপর আরেকটি পিপীলিকা চোখে পড়তেই
আমার অজান্তে আমার ডানহাতের আঙুল তাকে পিষে মারলো;
পরমুহূর্তেই আমার কাঁধের শাহ-রগের উপর
কামড় বসালো অরেকটি ছয়পায়া;
আমি দেখলাম, আমার নোটবুকের কী-বোর্ডের ফাঁকে ফঁাঁকে
অ্যামবুশ করে আছে রাশি রাশি পিপীলিকা;
আমি জানালা গলিয়ে বাইরে চোখ রাখতেই লক্ষ্য করলাম
জানালার শিক বেয়ে মাটিতে ছুঁয়ে আমার ভিটেবাড়ি পার হয়ে
আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে সেই পিপীলিকার সারি;
তাকে অনুসরণ করছে পৃথিবীর গর্ভজাত তার অজ¯্র বংশধর;
আর সবার আগে আছে যে পিপীলিকাটি, তার শরীর
বড় হতে হতে গ্রাস করে ফেলছে পুরো আকাশটাকেই;

আমি বেশ বুঝতে পারলাম,
একটি প্রতিদ্বন্দ্বী পিপীলকাকেও নিবংশ করার শক্তি নাই
আপাতত পারমাণবিক শক্তিধারী
আমার মতো বিমানবিক মানুষেরও;

অগত্যা একটি দুই পায়ের পিপীলিকা হয়ে আমিও
সেই পিপীলিকার সারিতে দৌড় শুরু করলাম।

কী আশ্চর্য, আমার পেছন পেছন দৌড় শুরু করলো
কোটি কোটি বছর এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা
বিশ্বব্রহ্মা-ের তাবৎ বৃক্ষগুল্মগুলো।
২২.০৭.২০১৩

শামুক

গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই সুখ
রোদ-দুপুরে পুড়বে না আর বুক

বুকের তলে হৃদয় নামক আঁখি
টের পাবে না তীর-শিকারী পাখি

গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই ভালো
গহন সুখে জ্বলবে জ্বলুক আলো

শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি

১২
যে কোন ব্রীজের পাশে শুরু হয় আমাদের শৈশবের খেলা
যে কোন ব্রীজের বুকে গড়ে ওঠে আমাদের যৌবনের মুখ
যে কোন ব্রীজের শেষে পড়ে থাকে আমাদের বার্ধক্যের স্মৃতি
ইতিহাস গড়ে ওঠে ব্রীজে ব্রীজে সময়ের ধ্রƒপদ সিঁড়িতে

এখন অসংখ্য ব্রীজ ছিন্নভিন্ন গৃহযুদ্ধে উড়ে আসে বোমারু বিমান
আমার শৈশব যায় আমার যৌবন যায় বার্ধক্যের স্মৃতি মুছে যায়
ইতিহাস ছিন্ন হয় দূরত্ব বিস্তৃত হয় ক্ষুব্ধ হয় অন্তিম বিলয়
আবার ব্রীজের কাজ শুরু হলে, কি আশ্চর্য, ফেরে নাকি বহতা সময়

১৩
বিচিত্র বসন্ত যায় তোমাকেই খুঁজি আজো হে রমণী, দ্রাবিড় রমণী
ভস্মীভূত সৌধসাধ, স্তুপাকার, আমাদের কামনা ও বাসনার মতো
হাঁটি একা, -আদিগন্ত ফণা তোলে কালোসাপ, কালের তর্জনী
যেন এ বধ্যভূমি প্রেতবাস পরিহিত রাগী মহাকাল।

হানাদার আততায়ী নিমজ্জিত জানে না যে এদেশ জলের
তাদের বিষাক্ত অস্থি জমে আছে স্তরে স্তরে পলির আড়ালে
তোমার অপাপ রক্তে তার পাপ-স্পর্শ আছে, তাই
আরোপিত দোষে দোষী, ভ্রান্তিময়ী, আজো, পলাতকা?

১৪
আমি তো রক্তের সাক্ষী, যে রক্ষে ফুটে ওঠে দিনের কমল
আমিতো রক্তের সাক্ষী, যে রক্ষে খুলে যায় হরিৎ তোরণ
আমিতো রক্তের সাক্ষী, যে রক্তে ফিরে আসে হারানো স্বজন
রক্ত নয় কোনো দ্বিধা, রক্ত এক অবিমিশ্র জীবন শপথ

তোমার দ্রাবিড় রক্তে অন্য কোনো পুরুষের স্পর্শ লেগে নেই

দুঃস্বপ্ন কুটিল হাতে ছুঁয়েছিলো হয়তো-বা তোমার শরীর
তোমার বিশাল স্বপ্ন জ্বলে উঠি পরিব্যাপ্ত সবুজে শ্যামলে
আলোর পর্দায় কাঁপি এক রক্ত এক গ্রুপ আমরা দুজন।

১৫
হয়তো প্রান্তর জুড়ে শুয়ে আছে আমাদের সব স্মৃতিকথা
উজ্জ্বল মুক্তোর মতো জোসনায় পড়ে আছে স্বজনের হাড়
তন্ময় জীবনানন্দ, খুঁজে খুঁজে এই সব নীল শস্যকণা
এখনো কি চোখে জ্বালে অন্তহীন অমারাত্রি, বিপন্ন বিস্ময় !

তোমার স্মৃতিতে আজ লেখা হয় জীবনের লাল ইতিহাস তোমার হাড়ের বহ্নি তাপ দেয় গৃহে গৃতে শীতার্ত নিশীথ
ধানসিঁড়ি জেগে ওঠে কল্লোলিত জীবনের লোহিত প্লাবন
হে শ্যামলী, অবাক নদীর জলে আবার খোঁজার পালা মুখের আদল।

১৬
তোমার সুতনু প্রভা, মনে রেখো, আজ এক শ্যামল মশাল
তীর্থযাত্রী মানুষেরা যেমন আবেদভরে সমর্পিত হয়
তেমনি তোমার দেহ আজ রাতে দীপ্ত এক শিখার আধার নিঃশব্দে জ্বলবে তুমি বাক্যহীনা-অটল, অনড়।

জ্বলো তুমি, জ্বলে জ্বলে অবশেষে শিখা হয়ে ওঠো
আনত শরীর থেকে লুপ্ত হোক কলঙ্ক বিষাদ
তোমার অনিন্দ্য শিখা শোভাযাত্রা অনন্ত নিশীথে
জ্বলে ওঠে মোড়ে মোড়ে, তুমি যেন অনির্বাণ ট্রাফিকের চোখ।

১৭
বিশাল তিমির মতো একটি নতুন দ্বীপ
আজ রাতে জাগবে সাগরে,
ক্রমে ক্রমে বাড়বে ভূভাগ-
শ্যমল বৃক্ষের সারি,পাখিডাকা বন আর

দৃপ্ত জনপদ
বাড়বে ক্রমশ-

তুমিও কিশোরী ছিল, এখন যুবতী;
শব্দ শোনো, শব্দ মিছিলের-অনাদি মিছিল আজ
যাবে সেই দ্বীপে-

স্বদেশস্বজনহীন এই সব অনাত্মীয় মানুষের ভিড়ে
অবশেষে মিশে যেতে হয়; এসো সাথী হই;
জলমগ্ন হে দ্রাবিড়া,আমাদের যুগলাঙ্গ যাত্রা
শুরু হোক।

অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী
২৭
জল
ওই স্থির রশ্মিকুন্ডে তোলে কোলাহল;
আছো, তবু আছো,
কবিতা-কল্পনা-লতা উদয়াস্ত বুনে বুনে বাঁচো
পান করে মেঘামৃত, তীব্র হলাহল।

হলো কাল অনন্ত-বিগত;
(তথাগত, কবে পুণ্য পাদপদ্মে অশ্র“-নমস্কার
জীবনান্তে সঁপেছিলো প্রভা; তার
অর্পণা-প্রতিমা তনু খুঁজেছিলো জলের আধার;

অবশেষে চিরকুটে ভাষণ সন্নত-
‘যে দিয়েছে অনাদি সাঁতার
প্রতিপ্রভ করো তাকে,সেই হোক তুমুলাঙ্গী
কবিতা তোমার।’)

সে প্রভা প্রতিশা আজ-কবি-তার-প্রেরণাসম্মত।

শূরে‌্য-
জলে-স্থলে সুদূরে-নিকটে
কে যায় ?
নহলি নদীর তীরে
অশ্বারূঢ় অশ্বঘোষ আজো অপেক্ষায়।

৩০
এ বৈশাখে ঝড় আসবে না। মৃন্ময়ী, এ বৈশাখে আমি এসেছি।

তুমি খুব সন্তর্পণে বন্ধ করেছো দরোজা-জানালা,

খোঁপায় মালা পরেছো, বিশ্ববিহারী সার্চলাইটের মতো
সারা ঘরে জ্বেলে রেখেছো জোড়া চোখ-
তোমার স্বচ্ছ জানালায় প্রতিরোধক কাচ।
কাচ কি ঝড়েরও প্রতিরোধক,মৃন্ময়ী ?

অন্তত তোমার ঘরের দেয়ালে,জানালার কাচে
আমি কোনো প্রতিরোধ দেখিনি, যখন ঘরে ঢুকি
তোমার বিশ্ববিহারী সার্চলাইটে বিদ্যুতের বড় অভাব ছিলো,
তুমি ঘূণাক্ষরেও টের পাওনি আমার উপস্থিতি।

উচ্ছে ছিল তোমাকে চমকে দেবো।
কিন্তু চমকিত হওয়ার আরেক অর্থ আবস্কারের আগে
দেখলাম তুমি বড় নিস্পৃহ,
ধ্যানমৌনা অরণ্য-কন্যার মতো তোমার নির্লিপ্ততা,
বিশ্বাসে ও অবিশ্বাসে সমান নরাসক্তি।

যেন কোনো উপস্থিতিই অর্থবান নয়, না ঝড়ের
না আমার; অগত্যা
নিজেকে আবিস্কার করি শব্দে,শব্দের লীলায়িত তরঙ্গে;
খনার বচনের মতো অনর্গল সত্যভাষণে ব্রতী হই
মন্ত্রোচ্চারণের মতো সম্মোহনী ছড়াই;
আমার একএকটি শব্দ সারা ঘরময় গুঞ্জন তোলে,
উলকআর মতো নিক্ষিপ্ত হয়,গ্রহাণুপুঞ্জের মতো
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

অনন্তর এক-একটি শব্দ ঐশ্বরিক অভিধায়
তোমার সম্মুখে সৃজন-রহস্যের জট খুলতে থাকে।
কোন অতীন্দ্রিয় অভিমানে
তুমি মৌন থাকো, মৃন্ময়ী ?
এ কেমন অভিমান ?
ব্রহ্মান্ডের কোন মহৎ দরকারে আসিনি, তুমি জানো,
বর্তমানের অলিখিত ইতিহাসের ক্ষণিক আলোয়
আমি তোমার দর্শনার্থী নই;

আমার প্রতিটি উচ্চারণে হাজার বছরের ঐতিহ্য,
আমার প্রতিটি ভঙ্গিতে ইতিহাসের ফেনিল উন্মত্ততা,
আমার প্রতিটি নিশ্বাসে
মানুষের বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের প্রথম দহন।

অন্তত নিজের দিকে মুখ ফেরাও, মৃন্ময়ী। দেখো,
তোমার মৌনতার শিরায় শিরায় উন্মথিত সমুদ্র-স্বর, শোণিত-গর্জন
তোমার বুকের গভীরে জীবনের অশান্ত মৃদঙ্গ,
সারা শরীরে পলিপ্রবণ উর্বরতা,
পেশেিত বীর্যান্বেষী হাহাকার।

কত রূপকথার জন্ম হলো, কত সোনার কাঠি
জীবন-কাঠির কর্মকার হলাম।
সমুদ্রের অতল গভীরে মাছের উদরে ঢুকলে,

সোনাদানা হয়ে খনিতে-
মোজেজা-সম্পন্ন নবীর মতো তোমাকে তুললাম,
শ্রমিকের সবল হাতে মাটি খুঁড়লাম।

তবু এক-একটি মুহূর্তে এসে আমাকে গ্রাসকরে
তোমার মৌনতা দিয়ে তুমি যার রসদ যোগাও; তখন
বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমিও মারমুখী হই,

পৃষ্ঠদেশের নিষঙ্গ থেকে হাতে নেমে আসে ধনুক,
মস্তিস্ক থেকে আগ্নেয় ফরমুলা, ক্রুদ্ধ দু’চোখ থেকে
ঠিকরে বেরোতে থাকে সর্বনাশী তাপমাত্রা।
ঝড়ের উপস্থিতি অস্বীকার করে যে কোমল
প্রতিশ্রুতি নিয়ে তোমার অস্তিত্বে এসেছিলাম,
সে রইল চির-অলক্ষিত।

মুহূর্তেই জন্ম-জন্মান্তরের তাপকান্ডে
ভস্মীভূত হলো তোমার সাধের আলয়, তোমার
গাত্রবাস পুড়ে পোড়া চামড়ার নীচ থেকে

বেরিয়ে পড়লো বীভৎস কঙ্কাল,
পাথরের মতো দু’চোখ থেকে যুগল রক্তস্রোত।

তোমার পোড়া মুর্তি তবু নড়লো না; শুধু
বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল তুলে তুমি নির্দেশ করলে
সম্মুখে; ততক্ষণে

দিগি¦দিক ছড়িয়ে পড়েছে নিসর্গের করালী আগুন,
মানুষগুলো একে অন্যের পিছু-ধাওয়া করছে, আর
বিশালকায় কে একজন
নগর-রাখালের মতো বাঁশিতে উদাস সুর তুলেছে।

মৃন্ময়ী, তখন আমার পালাবার সময়।
নিখিল-নিসর্গে-দু’বাহু বাড়িয়ে
আমিতখন পালাচ্ছি তোমার সমুখ থেকে,
যেমন আদিপিতা পালিয়েছিলেন ঈপ্সিত উদ্যান থেকে।

শিকড়গুলো

অনার্য এই শিকড়গুলো
অনাদ্যন্ত শিকড়গুলো বুনতে বুনতে বুনতে বুনতে
শিকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

বৃক্ষ তুমি জমজ ভ্রাতা
পাখি তুমি বোন
মা গঙ্গা ভগীরথী
শিকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

জন্মজমি জন্মজাতি
জলতরঙ্গ পললভূমি
স্তরে স্তরে বর্শালাঙল
শিকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

মাটি আকাশ, পাখি শিকড়
বঙ্গভূমি অনাদিকাল
উড়তে উড়তে উড়তে উড়তে
শিকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।

আমার ভূমা আমার সীমা
জাতিস্মর এই ফসলিমা
আদ্যোপান্ত আবহমান
শিকড়-কথা চারিয়ে দিলাম
তামাটে এক দ্রাবিড় গ্রিয়ট
গল্পগুলো চারিয়ে দিলাম।
আমরা তামাটে জাতি

রোদ্দুরে নেয়েছি আর বৃষ্টিতে বেড়েছি
সহস্র শতাব্দী দিয়ে নিজেকে গড়েছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছ।

আগমনী স্মৃতি হয়ে লেগে আছে আঠালো জীবন
আমাদের জন্মনগ্ন জাতিস্মর পায়
যৌবন-ঘুঙুর হয়ে যায় বেজে যায়
ব্রহ্মান্ডের মত এক স্বয়ম্ভু স্বপন-
সব স্মৃতি সব ধ্বনি একাঙ্গে পুষেছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।

কেউ কেউ তূণধারী, কেউ কেউ বেহালাবাদক
কারো হাতে একতারা কারো হাতেধারালো ফলক
অনন্ত সময় জুড়ে জমিজমা জুড়ে
আমরা তো উৎসবে মেতেছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।

সমুদ্রের তলরূপী,গুহারূপী,মাতৃগর্ভরূপী
হৃদয়ের স্বপ্নশয্যা ছেড়ে
সঙ্গিন-সদৃশ সব লাঙ্গল উঁচিয়ে
মার্চ পাস্ট করতে করতে আমরা এসেছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।
এই আসা এই গতিভাষা
এ পথে রচিত হলো আমাদের সব ভালোবাসা।

ভালোবাসা জোসনারাতে অশ্রান্ত বর্ষণ
ভালোবাসা তীব্রতাপে ভুবন-কর্ষণ
ভালোবেসে জীবনকে আনগ্ন চেয়েছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।
রাজধর্ম পিছে ফেলে, পিছে ফেলে গোত্রের আরতি
লোকধর্মে লোকসঙ্ঘে সুদীক্ষা নিয়েছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।

মাতৃভাষা

মানুষেরা নদীর নয়, মানুষের বুকে তবু নদীর পিপাসা;
গাঙেয় পিপাসা নিয়ে বায়ান্নোর যে যুব-শোণিত
দ্রাবিড় ব-দ্বীপ জুড়ে হয়ে গেলো মানবিক নদী
তাদের পলিতে, দেখো, গড়ে ওঠে অনার্য স্বদেশ
অন্তত ঝর্ণার মতো বুকে তার সবুজ মানুষ;
নদীর শব্দের সাথে জেগে থাকে মানুষের প্রিয় মাতৃভাষা
মাতৃভাষা, মাতৃভাষা।

পরাজিত পূর্ব-পুরুষেরা

মাঝরাতে নিশির ডাকে অর্থাৎ আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা অর্থাৎ
আমাদের অমলধবল অর্থাৎ পরমাত্মজনের অর্থাৎ
আসমান সমান অর্থাৎ শাদা অস্তিত্বের কাছে অর্থাৎ
নতজানু অর্থাৎ
তাদের ধারালো বর্শাগুলো অর্থাৎ বিছানার পাশে অর্থাৎ
ঠায় দন্ডায়মান অর্থাৎ
তাদের স্ত্রীপুত্রকন্যাগণ অর্থাৎ গভীর নিদ্রায় মগ্ন অর্থাৎ
তাদের লাঙ্গল ও গবাদি পশু অর্থাৎ প্রকৃতির মতো নিরবনিথর অর্থাৎ

মাঝরাতে নিশির ডাকে অর্থাৎ
আমাদের পূর্ব-পুরুষের কণ্ঠে অর্থাৎ ইসমে আযম অর্থাৎ
শ্রেষ্ঠ মন্ত্র অর্থাৎ
তাদের গলায় অর্থাৎ রুদ্রাক্ষ অর্থাৎ সারি সারি
তসবিহর মালা অর্থাৎ

মাঝরাতে নিশির ডাকে অর্থাৎ আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা অর্থাৎ
হন্তদন্ত অর্থাৎ ঘর-ছাড়া অর্থাৎ
যখন দিন সমাগত অর্থাৎ
সূর্যের অসহনীয় আলোকসম্পাতে অর্থাৎ
যখন তমিস্রা কর্তিত অর্থাৎ
তখন আমাদের অর্থাৎ আত্মজনের অর্থাৎ
আত্মার অন্ধকার অর্থাৎ ভূমন্ডলে প্লাবিত অর্থাৎ
যখন অঙ্গের ভিতর অনঙ্গ অর্থাৎ

হে আমার উত্তরপুরুষবৃন্দ অর্থাৎ
আমি তোমাদের কাছে অর্থাৎ লালনের কথা অর্থাৎ
হে আমার উত্তর-পুরুষবৃন্দ অর্থাৎ
আমি পীর আউলিয়া অর্থাৎ দরবেশদের কথা অর্থাৎ
অধ্যাত্মবাদের সহজিয়া সড়ক বেয়ে অর্থাৎ

যে সব পুণ্যবান মনীষীর যাত্রা অর্থাৎ অনন্ত-অবধি প্রসারিত অর্থাৎ
আমি ঘূর্ণাক্ষরেও তাদের কথা অর্থাৎ
আমি শুধু আমার পূর্ব-পুরুষের কথা অর্থাৎ

যাঁরা আত্মার মাঝে দেহকে অর্থাৎ যাঁরা দেহের মাঝে আত্মাকে অর্থাৎ
যারা ঘরের মাঝে বাহিরকে অর্থাৎ যারা বাহিরের মাঝে ঘরকে অর্থাৎ
যাঁরা শক্রর মাঝে মিত্রকে অর্থাৎ যারা মিত্রের মাঝে শত্রুকে অর্থাৎ
হে দিগন্ত বিস্তৃত অর্থাৎ কল্লোলিত জলরাশি অর্থাৎ

তুমি আমার পূর্ব-পুরুষের অর্থাৎ অনন্ত যাত্রার সাক্ষী অর্থাৎ
হে সুর্যচন্দ্রখচিত অর্থাৎ সুনীল শূন্যতা অর্থাৎ
তুমি আমার পূর্ব-পুরুষের অর্থাৎ ঝড় ও বঞ্ঝার প্রত্যক্ষতা অর্থাৎ

হে চির সুধাময়ী অর্থাৎ রসামৃত বর্তুল বিশ্ব অর্থাৎ
তুমি আমার পূর্ব-পুরুষের অর্থাৎ অস্তিত্বমানবতার অর্থাৎ
বৈষয়িক উৎস অর্থাৎ
আমার যা জ্ঞাত অর্থাৎ তোমাদের অনেকেরই তা অজ্ঞাত
অর্থাৎ
তোমরা সবাই নিক্ষিপ্ত অর্থাৎ শূন্যগর্ভ এক অর্থাৎ
কূপের ভিতর অর্থাৎ
তোমরা সবাই নিক্ষিপ্ত অর্থাৎ পরাজয়ের অর্থাৎ
অবিমিশ্র গ্লানির ভিতর অর্থাৎ

সমুদ্রের তেজী সওয়ারী অর্থাৎ যে-সব বহিরাগত অর্থাৎ
তোমাদের মাঝে প্রবিষ্ট অর্থাৎ যারা অস্ত্রধারী অর্থাৎ
নির্বস্ত্র অর্থাৎ
নিশির ডাকে অর্থাৎ আমাদের পূর্ব-পুরুষের অর্থাৎ
উন্নত মস্তক অর্থাৎ
আক্রমণকারী অর্থাৎ জলদস্যুর অর্থাৎ
খড়গাঘাতে অর্থাৎ খন্ডবিখন্ড অর্থাৎ

আমার সাহস নেই টোকা মেরে সুন্দরকে উড়িয়ে দেবার

রাইসরিষার মাঠ, ঘাসফড়িং, নদীতীর আর বাতাবিলেবুর প্রহরা এড়িয়ে
এই সাতসকালে, এই অগত্যা নগরে, কেন এলে কেন এলে কেন এলে

এলে যদি, কেন ঘাপটি মেরে বসে পড়লে রঙবেরঙের পাখা ছড়িয়ে
আমার দাডিকাটার আয়নায়, কেন বসে পড়লে কেন বসে পড়লে কেন

আমিএমন কোন ব্রতচারী নই যে হাওয়ায় ধুলিঝড়ে শুদ্ধ করবো আমার মনডানা
আমার হাতের ক্ষুদে কাঁচিখানা আমাকে তাক করে একবার খুলছে একবার বন্ধ হচ্ছে
অথচ তোমাকে তাড়াবার কোন কৌশল আমার আয়ত্তে নেই,
আমার সাহস নেই টোকা মেরে সুন্দরকে উড়িয়ে দেবার

আমাকে অসহায় রেখে দুধারী কাঁচির মতো তুমি একবার খুলে
আবার বন্ধ করলে তোমার অনশ্বর ডানা
তুমি না পাখি না পুষ্প, কংক্রীটের ঘেরাটোপে চুপচাপ বসে আছো স্বেচ্ছাবন্দী
না ফেরেশতা না মানুষ, তোমাকে পাহারা দিচ্ছি আমি রাতকানা দিনকানা

জব্বইজ্জার বলী খেলা পানির ভিতর

মাইনসে কইলো, ‘আইবো তুয়ান।’
বাজান চিক্কর দিলো, ‘আইয়ক, আইয়ক।’
পেড়র ভিতর যার হামিশা তুয়ান
দইজ্জার মউজর লগে বাঁধা তার জান;
আইজ তয় হাঁচা হাঁচা আইয়ক তুয়ান।’

কলিজা বাইরে বাঁধি মাঝ-দরিয়াত
হেই রাইতেও সোনাদিয়া আছিলো বাজান,
লগে তার জোয়ানকী, হিম্মত সাম্পান;
বাজানর সিনা’খানও গইরর নাহান।

যখন বাইড়লো পানি, বাজান কইলো,
‘দরিয়া রে, তর বুক চিরি চিরি
চালিশ বছর ধরি আঁর দানাপানি,
তর খাই তর লই বাইজ্জে এই শরীল আঁর;
আইজ্জা তুই হাঁচা হাঁচা ডালী লবি তার?’

হাঙ্গর মাছর মতন হা গরিল দরিয়া তহন
বাজান চিক্কর দিল, দরিয়া গজ্জন।

জব্বইজ্জার বলী খেলা শুরু অইলো পানির ভিতর
এক বলী বাজান আর, অইন্ন বলী বঙ্গুয় সাইগর।

দিগন্তের খোসা ভেঙে

মৈন পাহাড়ের চূড়া থেকে ওড়ে জোড়া জোড়া।
প্রথমে ওড়ে না ডানা,
ওড়ে শুধু ডিম;
আলোর লাটিম
দিগন্তের খোসা ভেঙে দিলে
পাখিরা সাঁতার কাটে আকাশের নীলে;
তখনো শাবক;
শ্যামল শুশ্রুষা তাকে দিয়ে যায়
মারমা তরুণী,
চুলে যার থোকা থোকা
নীল বা বেগুনি
হিম বাঁশফুল,
বুকে যার জলধারা বিহঙ্গ-ব্যাকুল।
পাহাড় বিশাল বাসা, তুষারে আবৃত।
সাতরঙা ডিম নামে পাহাড়ি বাসায়।
অদূরে সাপের চলা, ছুটন্ত ফোয়ারা,
সুবিশাল কাছিমের গ্রীবা,
বোয়ালের ঊর্মিনাচ কুমের তলায়।

তলায় কেবল বালি, নুড়ি-ভাঙা বালি,
বালি-কাঁকড়ের ফাঁকে শঙ্খচূড় ফণা,
ফণার খোড়লে জমে তরল অনল,
হলাহল বেঁকে যায় দূর সমতলে।

চ্ছলোচ্ছল
জলেশ্বরী থামে না, থামেনা।
শীর্ণ তার তনু জুড়ে জল:
বয়ে যায় মাছেদের নীড়।
মৈন পাহাড়ের চূড়া থেকে

জলনীড়ে
উড়ে আসে শিকারি পাখিরা,
সাতরঙা সাত মাছরাঙা,
জলে ও আকাশে জমে
শিকারির ক্রীড়া।

খেলা করে পাখিদের ঠোঁট,
ঠোকরায়, খোসাকে ছাড়ায়,
ক্ষুদে ঠোঁট, ঈষৎ বাঁকানো,
ঈষৎ রঙিন,
আসে পাখি, আসে প্রতিদিন।

মৈন পাহাড়ের ঢালু বেয়ে
গড়ায় শরীর;
ধারাজলে স্নান সেরে,
গিরিতে টক্কর খেয়ে
জন্ম নেয় ঈগলের পা,
হাঁটুভাঙা, ভাঁজভাঙা পা;
তারপর বিশাল উড়াল।
উড়ন্ত পাখির পায়ে উড়ন্ত নখর,
পায়ে নেই খড়,
পাহাড়ের গায়ে গায়ে নখের আঁচড়।
ছলকায় গিরির শোণিত।
মৈন পাহাড়ের বিশাল শরীর
তড়পায় গুলি-খাওয়া বাঘ,
মুখে তার নিরব হালুম,
বুকে তার পিপাসা, পিপাসা,
চোখে তার শিকারির তূণ,
বিশাল পাহাড় যেন উড়ে আসে
বিশাল শকুন।
ভয়, শুধু ভয়।
কেউ কারো নয়।
এক পাখি তখন অনেক।
হাজার ডানার পাখি হাজার হাজার
ছিটকায় বেগবতী জলে,
ডুব দেয়,
রশ্মিময় ডুব,
অথবা খোঁড়ায়।

মাছরাঙা তখন ঈগল,
বালির বাসায় তার হিম
ডিম জন্ম দেয়
পানকৌড়ি
আর লেজঝোলা,
লেজঝোলা জন্ম দেয়
শালিক চড়–ই,
চড়–ইয়ের ডিম থেকে
কাক চিল ময়না ও টিয়া
আর বালিহাঁস…
প্রণাম, প্রণাম,
আলোকপ্রণাম;
তখন আকাশ
জাতিস্মর যাযাবর
পাখির আবাস।
নোখতা

না, কেউ না, আমিই আমাকে, আর তুমিই তোমাকে
না, কেউ না, আমি তুমি আমাকে-তোমাকে
আমরা উড়ে যাচ্ছি, না, আমরা হিজরত করছি
এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নে, সত্য থেকে সত্যান্তরে,

না, স্বপ্নের কোনো দ্বিতীয় নেই, দ্বিতীয় নেই সত্যেরও,
না, আমার কোনো দ্বিতীয় নেই,দ্বিতীয় নেই তোমারও
স্বপ্ন এক
আমি এক
তুমি এক
আমিস্বপ্নসত্য তুমিসত্যস্বপ্ন
তুমি স্বপ্নসত্য আমিস্বপ্নসত্য
সত্য আমিস্বপ্ন সত্য তুমিস্বপ্ন
স্বপ্ন তুমি সত্য স্বপ্ন আমিসত্য

বলো, এই কুলমখলুকাতে আমি আর তুমি আমারই উত্তরাধিকার
বলো, এই কুলমখলুকাতে আমি আর তুমি আমারই অংশিদার
বলো, আমার আগে আর কোনো আমি নেই, না আমার পরে

বলো, এই কুলমখলুকাতে তুমি আর আমিতোমারই উত্তরাধিকার
বলো, এই কুলমখলুকাতে তুমি আর আমি তোমারই অংশিদার
বলো, তোমার আগে আর কোনো তুমি নেই, না তোমার পরে
আদিসত্য
আদিস্বপ্ন
আসলেই
বিন্দুসত্য
চিহ্নসত্য
ধারণসত্য
ধারণাসত্য
সত্য ডানা
স্বপ্ন ডানা
এক ডানা
স্বপ্ন ডানা
একডানা একজোড়া
ডানা হয়ে
বেড়ে যায়
জোড়ায় জোড়ায়

বেজোড় থেকে জোর তারপর জোড়বেজোড় তারপর বেজোড়জোড়
না, জোড়বেজোড়ের কোনো শরীক নেই শরীকানা নেই।

আদিতে বেজোড়, অন্তরে আয়নাজোড়,শরীরে ডানাজোড়
আদির আগে অনাদি,অর্থাৎ আদিচিহ্ন, তারও আগে অনাদিচিহ্ন

আ-কার বসিয়ে ই-কার এ-কার
তার আগে কে-কার কে-কার

তুমি না-সময় না-সময়হীনতা
আমিনা-সময়হীনতা না-সময়
তুমি-আমি না-চিহ্ন না-চিহ্নহীনতা

আমি তুমি একসঙ্গে বিস্ফোরিত এক স্বপ্নে
আমরা ডানাহীন উড়ে যাই স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে
সত্য স্বপ্ন আমি অনাদি চিহ্ন অচিহ্ন বিরাম অবিরাম
আকার নিরাকার
কার কার
কা কা
ক ক
অ অ

আলিফ বে
বে আলিম
নোখতা

নোখতা আছে নোখতা নেই নোখতা আছে
আমি আছি তুমি আছি আমি আছি
আমি নিরাকার তুমি সাকার তুমি-আমি নোখতার

নোখতা গোল ভূগোল
তুমি আমি নোখতার দুলদুল।
মানবপদ্ম

আকাশ পাড়ি দেয়ার আয়োজনে ব্যস্ত শিশু সূর্য।
তার চোখে তেজ, গোল পায়ে ঘূর্ণিগতি,
রেগে সে আগুন, শাসাচ্ছে পাখি ও প্রকৃতি।
হাঁটুভাঁজ করে ডানা গুটিয়ে সে হামাগুড়ি দেবে
পূর্ব পশ্চিম
উত্তর দক্ষিণ
দশদিগন্ত।

ও-সব দেখার আগ্রহ নেই বিজয়ের,
সে সুর্যের দিকে তাকায় না,
তাকাবার তোয়াক্কা করে না।
সে ভোরে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে ঝর্ণার জলে যায়।
ঝর্ণার জলে যায়।

পাহাড়েরর গা বেয়ে খরগোশের মতো লাফাতে লাফাতে
কাঠবেড়ালির মতো লেজ ঘোরাতে ঘোরাতে
নামছে ঝিরি নামছে জলসিঁড়ি,
বিজয় গ্রাম ছেড়ে নগর ছেড়ে সেই সিঁড়ির কাছে যায়।

ফেনাপুঞ্জে ঝলসায় আলোমাতা।
আকাশে একসূর্য কোটি সূর্য হয়ে
জলকেলি করছে এই গিরিভূমে,
তাকে পান করছে সিংহ ও সিংহী
হরিণী ও বাঘিনী,
তাকে নিয়ে পূর্ণ হয় বিজয়ের অঞ্জলি;

এক সূর্য পাড়ি দেয় অনন্ত আকাশ,
কোটি সূর্য বাধা পড়ে বিজয়ের হাতে।
বিজয় মুঠি ভরে কুড়ায় সূর্য,
ছুয়ে মারে উত্তর পশ্চিম পূর্ব দক্ষিণ দশদিগন্ত,
বিজয় যেন আজ সন্ত,
সে বসে পড়ে বটপাকুড়ের তলায়,
অজর অমর অক্ষয়
সোনাইছড়ির রামকোর্ট কিয়াঙে বুদ্ধের মুদ্রায়
সে ধ্যানমগ্ন হয়।

আজ বিজয়ের ভোর,
আজ আকাশ সূর্য কাল মহাকাল
ইতিহাস নক্ষত্র আদি ও অন্ত
আপন প্রাণবৃন্তে কুড়িয়ে
বিজয় ফোটায় নিজেকে
মানবপদ্ম

তার দলগুলো উড়ে যায়
কোটি সূর্যের ডানায়
উত্তরদক্ষিণ
পূর্বপশ্চিম
দশদিগন্ত
বিজয় আজ পদ্ম,
মানবপদ্ম !

ফ্রয়েড তাকিয়ে আছে

শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষ
না মানুষ থেকে শিম্পাঞ্জি
এটা কোনো আবশ্যিক তর্ক নয়;
আজকাল অবশ্য ভুখা-নাঙ্গা
তৃতীয় বিশ্ব থেকে
পয়লা পৃথিবীর অতিভোজী পর্যন্ত
মানব-দুনিয়ায় প্রায় নেতাই
শিম্পাঞ্জির কসরৎ শেখায়।

তাইতো ফ্রয়েড তাকিয়ে আছে আলোকবর্ষের দিকে;
ভাবছে, আর কত আলোকবর্ষ
অতিক্রান্ত না হলে
মানুষকে মানুষ বলা
সঙ্গত হবে না।

PaidVerts