রুবি রহমান’র কবিতা

রুবি রহমান’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

 

জীবন

জীবনের সত্য লিখে রাখব বলে কাগজ কলম নিয়ে বসি
গব ছেড়েছুড়ে দূওে যেতে চাই, সরে যেতে চাই
ছিপছিপে মাছ যেন অতীত-ভবিষ্যতে সাঁতরে বেড়াই
চন্দনের কাঠ ভেবে শিল-নোড়ায় নিজেকে ঘষি।

টেবিলে জ্বালিয়ে আলো সারারাত জেগে
অস্থিমজ্জা গুঁড়ো করে জীবন রচনা করে তুলি;
সকালের আলো মেখে আমার মেয়েটি স্কুলে যায়
তার হাত ধরে দেখি টেবিলের পাশ ঘেঁষে
জীবন ছুটছে দ্রুত পায় ।
মানুষ কতটা অবিনাশ

পল্টনে সবুজ মাঠে পড়ে আছে রক্তে লাল লাশ
মানুষের খানিকটা অবিনাশ, বাকি বেধড়ক সর্বনাশ ।
পত্রিকা দু-চার লাইন জায়গা তাকে বরাদ্দ করেছে
মাটি দ্বিধা হয় কয় ফুট, সে মাটির ব্যাপার
মায়া ও মমতা কিছু সেকেলে; তাছাড়া আইন বেশ নির্বিকার

সূর্য উঠে আচমকা ভেবেছিল ফুটেছে পলাশ
এতো রক্ত মানুষ মেখেছে দুই হাতে !
তাই এক টুকরো মেঘে
মুখ ঢেকে সূর্য পাশ ফিওে শোয় পুবের আকাশে।
আলো আর উত্তাপে মানুষের নেই কোনো কাজ
অন্য কোনো পৃথিবীর দিকে সূর্য চলে যাবে, করছি আন্দাজ ।

যদি পারো দ্যাখো

তুমি ওকে ছেড়ে দাও, শুধু দ্যাখো, ও কী করতে পারে
চালচুলো নেই কান্ডজ্ঞানও নেই; তুমি ওকে বিবাহ কোরো না।
ওকি পারে সংসার চালাতে।
পারলে দ্যাখো একটু পরখ করে দ্যাখেঅ- ও কী করে উঠতে পারে।-
ব্যাঙ্কের তামাদি চেক ওর হাতে তুলে দিয়ে দেখো
ও ঠিক তোমার জন্য কিনে আনবে
রুমালের মতো চৌকো হলুদ সর্ষের খেত, নৃত্যপর নদী
ও বেশ কর্তব্যপরাষণ তুমি বিশ্বাস তো কর-
সেদিন সকালে দেখি এক গাড়ি ঝরাপাতা নিয়ে
ও চলেছে শব্জির বাজারে
টমেটোর লার রঙে লেটুসের সবুজ মিশিয়ে
কাইয়ুমের একটি ইজেল ও যে তুলে দেবে গৃহিণীর হাতে
এ কথা মানবে তুমি, ঠিকই মেনে নেবে।
তোমার ফ্ল্যাটের ঘরে কয়েক বাগান প্রজাপতি
এক মাঠ জোনাকির জ্বলা তুমি চাইলে তক্ষুণি এনে দেবে।

মাঝে মধ্যে দিও ওকে অনন্ত অনাদি মহাকাল থেকে
দু’চারটি সকাল
ভাতের থালার পাশে নীল রেকাবিতে রেখো একটুকরো চাঁদ
অভাবের পাশপাশি দিও ওকে ফাল্গুনের সব ক’টা কোকিল;
কেন দেবে জিজ্ঞাস ানা করে যদি পারো, দিও কিছু কিছু ছাড়।
আঁক-কষা সংক্ষিপ্ত বিবাহের বাইরেই রেখো তুমি ওকে
গ্লাসনস্ত ঘেঁটেঘুঁটে ও হয়তো এনে দেবে মানুষের প্রকৃত সমাজ;
বিশদ বিবাহ তুমি দিও ওকে, কিছু ছাড় দিও
সুন্দরের দিকে ওর পথ করে দিও।
একটিমাত্র

একটিমাত্র জীবন আমার হাতে।
অর্ধেকেরও বেশিটা তার খরচা হয়ে গেলো
অপর অর্ধ নিয়ে এখন বল কোন সাহসে
মূর্খ জুয়ায় ছড়াই এলোমেলো।

‘জুয়া মানেই মূর্খ জুয়া’- শুদ্ধ হিতবাদ
অষ্টপ্রহর অনন্যোপায় পাহারাতে রাখে;
একটি তুচ্ছ ভোরের দেয়েল স্বপ্ন-মাখা চোখে
মাটাডোর-এর রুমাল নেড়ে ডাকে।
পড়ে রইলো

এক শতাব্দীর ডায়ালেকটিক আমাদের নিয়ে
টানা হেঁচড়া করে গ্যালো।
পড়ে রইলো মুথা ঘাস, পড়ে রইলো চাইবাসা, চুনারু ঘাটের
ডাকবাংলোর অপরূপ রাত; ব্লেকের বাঘের মতো
রাতে ও রহস্যে ডোরাকাটা
অরণ্যের উদ্দাম জ্যোছনা;
পড়ে রইলো সূর্য-ডোবা ফার্মগেট, দীর্ঘ মেহগনি-ঢাকা-রোড-
পড়ে রইলো, পড়ে রইলো কৃতার্থ হলো না।
কৃতকর্ম হাতগুলো উডুক্কু বাতাসে উড়ে যায়
তুলি উপচে পড়ে রঙ, ধরে রাখা যায় না ইজেলে
জানালায় উপচে পড়ে রূপালি আকাশ
চোখ ঝলসে যায়,
তবু কান্ট-হেগেল মুখ চুন করে বসে থাকে বেতের সোফায়।
এখানে রইলো পড়ে এই দীর্ঘ শতাব্দীর কাকচক্ষু দীঘিটির জল
এখানে রইলো পড়ে আমাদের ইট-কাঠ রঙ তুলি হাতুড়ি বাটালি।
রঙের কৌটো থেকে উপচে পড়ে রঙ, পকেটের কানাকড়ি
জারিজুরি ধান্দাবাজি পদ্মা-পাড়ের হু-হু হাওয়ার মতন উড়ে যায়
মগজের কোষে নড়েচড়ে বসে ডায়ালেকটিক
রহস্যের অতল আদ্যন্ত জেনে নেয়;
পড়ে থাকে শব্দকল্প ইট কাঠ আমাদের হুদয়ের কথা।
শব্দ থেকে স্বরে হাত ছুটে যায়, স্বর থেকে রঙের কৌটোয়
কৃতকাজ হাতগুলো তুমুল জলদ, তবু তিষ্টোতে পারে না
পদ্মা-পাড়ের হাওয়া তেড়ে আসে তাড়িয়ে বেড়ায়
গোলাপের অনুবাদ বছর-বছর ধরে অসমাপ্ত থাকে
ভাঙা জ্যোছনার নিচে পড়ে থাকে ভাঙাচোরা এ্যাকরোপোলিস।
ওখানে রইলো পড়ে জেগে-ওঠা সন্ধ্যার শহর
তোপখানা রোডে কোলাহলের উপরে ফোটা অগাধ গোধূলি
পড়ে রইলো আমাদের মুখোমুখি বসা।
ও চাঁদ

ও চাঁদ, তুমি থুত্থুরে চাঁদ যখন-তখন উথলে ওঠো
বর্ষা কি শীত খোঁজ রাখো না, কাল-অকালের ধার ধারো না
সিদুঁর মেধের খিড়কি খুলে এই যে হঠাৎ হড়বড়িয়ে
উঠে আসো আকাশ জুড়ে; কিছু কি বাছ-বিচার করো?

ছেলেবেলার উঠোন ভরে হাসতে কবে, মনে কি পড়ে?
সেই উঠোনের রাঙা ভবনখানির তলে কান্না ছিল
মনে কিপড়ে, এতোলবেতোল চৈত্রদিনের আকুল রোদন-
সেই রোদনের খুব গভীরে সুখের পদচারণ ছিলো।

থুথুরে চাঁদ তোমার হাসি সর্বনাশী। ভেতর ভাঙে।
বুকের ভেতর পাতাল-ঘরে কিছু দুঃখ, কয়েকটি সুখ
ছেড়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র গভীর মন্ত্র ঘুমিয়ে থাকে
তোমার হাসি জীয়ন-কাঠি, বুকের মধ্যে হল-বিদারণ।

একটি মুখের করুণ হাসি; ঝাঁপির মধ্যে সাপের ফণা
ওই হাসিটি ভোলাই ভালো; ও চাঁদ তুমি আর হেসো না।
সময় আজো

মাঘ নিশীথে এখানো ডাকে পাখি
সারা সকাল হাওয়ার প্রতিরোধ
রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রোদ
সময় আজো রাখে না কোনো ফাঁকি।
দেখি না শুধু তোমার যাওয়া-আসা
রক্তে তাই জাগে না সেই ভাষা।

এখানো তবু স্বর্ণ চাঁপা ফোটে
বাতাসে ভাসে কিসের সুঘ্রাণ
জীবনের এরা আনে না কোনো গান;
রক্ত শুধু মোচড় দিয়ে ওঠে
যখন বুকে কষ্টে বাঁধে বাসা
হৃদয়-খোঁড়া তোমার ভালোবাসা!
এই অপরাহ্ন জানে

আমার বুকের মধ্যে কিছু বাষ্প রেখেছিলো কেউ
রেখেছিলো শিল্প-জল-নিশীথের মতন প্রগাঢ়
গূড় বিষ্ময় কেউ রেখেছিলো
রেখেছিলো মুগ্ধ চন্দ্রোদয়-
আজ তারা চৈত্রের পাতার মতো বুকের উপর উড়ে যায়-
আজ এই অপরাহ্নে উদাসীন মন্দিরা বাজায়
এই অপরাহ্ন আজ অঘ্রাণের মতো
তির্যক অলস হ’য়ে ঢ’লে পড়ে গাছের মাথায়
হেলে পড়ে পানা-পুকুরের থির জলের সবুজে
গুল্মলতার ভিড়ে ডুবে-দেয়া হাঁসটির অনার্দ্রা ডানায়;
নির্বিকার ঝুলে থাকে অতি দূর বাড়ির কার্নিশে
অপরাহ্ন অনড় অপার।

তবু এই অপরাহ্ন জানে কেউ আসে
বড় দূর পথ অতিক্রম ক’ের আসে
যদি দিতে পারে না আর কেউ কোনদিন
শীতল কঠিন হাতে তাই নিয়ে একদিন আসে।

সন্তানের জন্ম দিতে পূর্বাহ্নে মানবী জানে তার
জন্মলগ্ন: মানুষের আবির্ভাব হয়।
এ কোন আবির্ভাবে কাঁপি আমি এই অবেলায়-
এই অপরাহ্ন জানে!
হয়তো সে এসে গ্যাছে অতি কাছে
পিঠের উপর তার নিঃশ্বাসের প্রগাঢ় উষ্ণতা;
হয়তো এখনও তার আসবার হয়নি সময়-।
গভীর নিমগ্ন ঘুমে কোনো-কোনো রাতে
রোমশ কঠিন ঠান্ডা তার হাত বুকে এসে লাগে।

এই অপরাহ্ন-বেলা নিরুদ্বেগ ¯œানমুখ রোদ
সুদীর্ঘ শীতল হাতে বহুদুর থেকে
অকস্মাৎ চেপে ধরে আমার মলিন দীর্ণ হাত;
লগ্ন উপস্থিত হ’লো আমি কি জেনেছি!
এই অপরাহ্ন জানে-
এই অপরাহ্ন সব জানে ॥

বাড়ী খোঁজ

চিরকালের উদ্বাস্তু আমি
চালচুলোর ঠিক ছিল না কস্মিনকালে
বাসা-বদল নিয়ে কবিতা লিখেছি, সেও তো এক যুগ হলো
এসব-ই নাগরিক মানুষের নিয়তি।

শুক্রবারের ইত্তেফাক হাতে আমি চষে বেড়িয়েছি
তাজমহল রোড, কলাবাগান, ঝিকাতলা
শহরের আর্ট গ্যারারিগুলোতেও আমি গেছি বাড়ি খুঁজতে
একবার ভ্যান গঘের একটা ছবির ভেতর
রোজ-ঝলমলে হরদে রঙের একটা বাড়ির আভাস পেয়েছিলাম
কী খোলামেলা, অবারিত আর অশেষ সে বাড়ির রাস্তা
কিবরিয়ার রঙ আর আলোর মধ্যেও ছিল একটা জুতসই বাসা।
এক সন্ধ্যায় গান শুনতে গিয়ে
ঝরনাতলায় আর একটা বাড়ির পাকা খবর পেয়ে গেলাম
মনে হলো আমরা কেউ বিপন্ন হা-ঘরে নই।

কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাট তেমন নিরাপদ নয়
কেমন যেন ধড়িবাজ চাউনি কারো কারো চোখে
আর শহরে নানা হুজ্জোত খুনোখুনি জমিদখল ঋণ খেলাপ
আর ফি-বছর ভাড়া বাড়ানোর বাহানা।
তো তুমি বাসায় থাকবে-এসব বেদনা পোহাবে না,
মাশুল দেবে না, সে কি হয়!

আমি তাই আজিজ মার্কেটে বইপাড়ায় যাই
ঘুরে বেড়াই লাইব্রেরিতে, বইয়ের দোকানে
আঁতিপাঁতি করে খুঁজি বইয়ের পাতায়, মলাটে, কাগজপত্রে
আর এভাবেই একদিন আমি পেয়ে যাই
লাগসই বাড়িটির খোঁজ।
একটি গানের তান আমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল
কয়েকটি কবিতার পঙক্তির মাঝ বরাবর হেঁটে
সুলতানের ক্যানভাসের নিকানো উঠোনের কানাচ ঘেঁষে
ওই আমার বাড়ি!
রোদে ভেসে যাচ্ছে বাড়ির ব্যালকনি
উজ্জ্বল বোগেনভেলিয়ার পাশে
রোদে পেতে-রাখা একখানা ইজিচেয়ার
তার ওপর তিরতির করে কাঁপছে এক চিলতে অমরতা।

আগুন-ভরা হেমন্ত রাত

তিরিশ বছর আগের একটি হেমন্ত দিন হেমন্ত রাত
আজকে তোমার পড়ছে মনে?
সরষে রঙের হেমন্ত দিন পার্পল রঙ হেমন্ত রাত
আজ তো তোমার পড়বে মনে
ক্যালেন্ডারে দ্যাখো, তোমার রেলিং ধরে অঘ্রান মাস
রোদের আলোয় হীরের কুচি;
হলদে পাতা ঝড়ছে, হাওয়ায় উড়ছে কিন্তু আজকে তোমার
কোথায় ধান্য কই নবান্ন
আজকে তোমার রুপালি চুল, রুখুসুখু হেমন্ত দিন
বিচ্ছেদ তার বার্তা রটায়।

কিন্তু তিরিশ বছর আগের হেমন্তের এক দিনরাত্রি
তোমার মনে পড়ছে তো ঠিক
কমলা দিন, মেরুন রাত্রি, অপার্থিব এক শিউলিতলা
আলোর ঝালর উৎসব রাত
জরির বুটি, শাড়িটি লাল, তারায় জ্বলল মশাল;
পৃথিবীতে একটি ঘরে রাত্রি হলো
কেবল দুটি মানুষ তাদের গহন নিবিড় রাত্রি হলো
মেরুন নাকি পার্পল রাত
জন্মচিহ্ন পাল্টে-দেয়া কঠিন তুমুল উত্তাল রাত
এখন তোমার পড়ছে মনে?
একটি ঠোঁটে আরেকটি ঠোঁট ঘষে জ্বলা অশেষ আগুন
সেই অক্ষয় অনন্ত রাত
একটি দেহে অন্য দেহের জেগে-ওঠা আরেক জীবন।
এই হেমন্তে পড়ছে মনে
হেমন্ত-না-বসন্ত সব ভুলিয়ে-দেয়া অতল আঁধার
উজ্জ্বল এক অন্ধ আঁধার
রঙ-চটা এই কৃশ করুণ অঘ্রানকে জাগিয়ে দিলেন
দিনযাপনের রঙ ফেরালো।

তিরিশ বছর আগের একটি আগুন-ভরা হেমন্ত রাত
আজ কি তোমার পড়ছে মনে!

দিকচিহ্নহীন রাত

আজ রাতে আমার কেউ নেই বলে আমি তোমাদের ডেকে এনেছি
ও আমার ধূলিমলিন বইয়েরা!
গমস্ত পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নিলে
ছাপোষা নাস্তিক যেমন আল্লাকে ডাকে
রাজ রাতে আমার কেউ নেই, আমি তোমাদের ডেকেছি।

আজ রাতে আমার জানালার শার্সিতে নেচে উঠেছে রাত
আজ রাতে আমার সন্তানেরা
নিজের নিজের স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়েছে,
আমার পুরুষ বসেছে তার ব্রত নিয়ে,
আজ রাতে আমার বোনেরা
যে যার খামারবাড়ির জোছনায় দাঁড়িয়ে
রাজ রাতে আমার কেউ নেই কেবল এই অবিশ্বাস্য রাত ছাড়া।
গৃহের বাইরে ঝোড়ো বাতাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বুনো ঘোড়ার মতো
থেকে থেকে বাতাসের তীব্র শিস রাতকে খানচুর করে দিচ্ছে
পৃথিবীর অতল থেকে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত
যেন কী রহস্যময় বিদ্যুচ্চমক বয়ে চলেছে এই রাতকে ঘিরে।
এমন রাতে মানুষ যোজন যোজন দূরের নক্ষত্রের সাথে
অস্তিত্ব বদল করে নেয়।
বাতাসের ঝাপটায় কেঁপে উঠছে জানালার শার্সি
কাঁপছে তারার আলো। কাঁপছে আমার পৃথিবী।
এই রাত আমাকেও আমূল কাঁপিয়ে তুলেছে,
আজ রাতে আমার আমি ছেড়ে যাচ্ছে আমাকে
যে আমি-র শক্ত খোলস পৃথিবীর হো হো হা হা হাওয়ার হাত থেকে
এতোদিন ঢেকে রেখেছিল আমাকে
নিয়তির কৈফিয়তহীন কাজে, সকলের মতো
সেও আমাকে ফেলে চলে গেল।
কেবল এই আদিম অবিশ্বাস্য রাত
তার হাওয়া-মাতাল বুকের ওপর আমকে ধরে রেখেছে
মহাকাশে নিরালোক এক ছায়াপুঞ্জের মতো।

ও আমার ধূলিমলিন বইয়েরা
তোমরা কি জ্বালিয়ে দেবে সেইসব আলোকিত পঙ্ক্তি
মোমের শিখার মতো,
জাগিয়ে তুলবে সেই বিস্মৃত, লুপ্ত, নিহত সময়কে
যার দ্যুতিময় দূরত্বে দাঁড়িয়ে
আমার চলে-যাওয়া আমি-র ফেলে-যাওয়া দীর্ঘশ্বাসটি তুলে আনবে
এই দিকচিহ্নহীন রাত।

কান পেতে আছি

কুয়াশা আর শিশির গুটিয়ে নিয়ে শীত চলে গেছে
আর বসন্ত রাজার চালে
ঢুকে পড়ছে শহরের কানাগলিটিতেও
বাতাস তো সমীরণ হয়ে হা হা করে বয়ে যাচ্ছে
ফুটপাতে বারান্দায়
বসন্ত এসেছে। কিন্তু একবারও কোকিল ডাকেনি
আমি সারা মাঘ মাস কান পেতে আছি
তোমার মুখের দিকে তোমার চোখের দিকে চেয়ে
ফাল্গুনের প্রথম প্রহর থেকে কান পেতে আছি
কিন্তু একবারও কোকিল ডাকেনি
আমি তোমার ঠোঁটের দিকে চেয়ে কান পেতে আছি
একটিবার হেসে ওঠো তুমি
তোমার চোয়ালের ভাঁজের দিকে চেয়ে আছি আমি
একটি তরুণী তার তরুণকে যা বলতে পারে
তার সবটুকু আমার কলমে ভরে
আমার বুকে ভরে
আমাদের পাঁচশো বছরের ঘরসংসারের ওপর দাঁড়িয়ে
আমি কান পেতে আছি।

জানি এই রাক্ষসীবেলায় বাতাস অখুশি
আকাশে ত্রাস, ফুলেরা ঠিক কুসুম নয়
দ্রাম দ্রাম করে ভেঙে পড়ছে বিদ্যুতের গ্রিড
পাখা ঝাপটে ফিরে চলেছে অতিথি পাখিরা
এই ভিড় ঠেলে চোখ কান বুঁজে
তোমার সন্তানের হাত শক্ত করে ধরে
তোমার সন্তানকে আমি পেটে করে কোলে করে বুকে করে
তার পায়ের শব্দ পৌঁছে দিয়েছি অন্তরীক্ষে
এখন ঈশান-নৈঋত, ঊর্ধ্ব-অধঃ সবদিক থেকে
আমাদের সন্তানদের পায়ের শব্দ
ছুটে আসছে ছুটে আসছে

আর আমি তাকিয়ে আছি তোমার চোখের পলকের দিকে
একবারটি খুশি হও তুমি, ফেলে দাও দুঃখ
দ্যাখো ফুলের মতো ফুটবে বসন্ত, ডানা মেলবে বাতাস
আমাদের পাঁচশো বছরের ঘরগেরস্থালি কাঁপিয়ে
ডেকে উঠবে দশ হাজার কোকিল!

কবি ও কামলা

কবিকে কামলা তুমি বলতেই পারো
কবি ও কামলার বাস্তবিক কোনো তফাৎ তো নেই।
মুটে-মজুরের মতো কবিও সকাল-সন্ধ্যা খেটে
শব্দের রহস্যময় মোট বয়ে রাত্রি পার করে;
শব্দ সোনা, শব্দ হীরে, শব্দ গনগনে লাল লোহা
শব্দ নিষিদ্ধ ধাতু, ছুঁলে হাত জ্বলেপুড়ে ছাই।
এক ফোঁটা জল ঢালবে কার কমণ্ডলু
ছাই মেখে পথে পথে ঘোরে কবি যেন লালুভুলু
যেনবা ফিসিক্স পাখি যেনবা ভিখিরি
ঝলসানো আগুন থেকে পুড়তে পুড়তে বেঁচে ওঠে রোজ,
এক হাঁটু ধুলোকাদা ঘেঁটে, নোংরা ঘেঁটে
হাটুরের মতো হেঁটে, কুলি-কামিনের মতো খেটে
কবিতার মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে জেনে নেয় অমৃতের খোঁজ।

কবিকেও দিতে হবে ন্যূনতম ন্যায্য মজুরি
ওয়েজ কমিশনে এই বিষয়েও বিবেচনা হবে
মুঠো মুঠো ধুলো, গায়ে থুতু, ছিছিক্কার সব বন্ধ করা হবে
যদিও মূর্খ কবি এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছে
হিসেব করেনি কানাকড়ি।

PaidVerts