মঈন চৌধুরী’র কবিতা

 মঈন চৌধুরী’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

জন্মতারিখ : ২৫শে বৈশাখ, ১৩৫৪ সাল
জন্মস্থান : কোলকাতা
পেশা : ভু-প্রকৌশল উপদেষ্টা, শিক্ষকতা, শিল্পী

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

১. এ কেমন ভালবাসা (১৯৮৮),
২. ইন্দ্রজালে আপেক্ষিক (১৯৮৯),
৩. জীবন শব্দ রেখা (১৯৯০),
৪. কবিতা ও ড্রইং (১৯৯২),
৫. প্লাবন ও অন্তঃবৃক্ষের গান (১৯৯৪),
৬. কমলার ফুল জলপাই চাই (১৯৯৬),
৭. শব্দের পদ্মফুল (২০০৪),
৮. অন্তর সুন্দর স্বপ্ন (২০০৫),
৯. অর্পণ দর্পণে দেখা (২০০৭),
১০. রাইনা পরী রাধা (২০০৭),
১১. অ ঔড়ঁৎহবু রিঃয গরঃধ (২০০৮)

প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ :

১. সৃষ্টির সিড়ি (১৯৯৭),
২. বাঙ্গাল জাতীয়তাবাদ (১৯৯৮),
৩. ফুকোর মানব (১৯৯৯),
৪. হ্বিটগেন্সটাইনের দর্শন (২০০০),
৫. ইহা শব্দ (২০০৪),
৬. অল্প স্বল্প হলুদ গল্প (২০০৬),
৭. শব্দের সম্ভাবনা (২০০৭),
৮. বাংলা বানান সংস্কার (২০০৮),
৯. ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও বাঙ্গাল/বাঙালি সংস্কৃতি (২০০৯).
১০. প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১২)।

সম্পাদনা : সম্পাদক, প্রান্ত – সাহিত্য ও দর্শন বিষয়ক ছোট কাগজ (১৯৮৮ – ১৯৯৮)।

শিল্প প্রদর্শনী : সালজবুর্গ, অস্ট্রিয়া (১৯৭৪); প্যারিস, ফ্রান্স (১৯৭৫); এথেন্স, গ্রীস (২০১৩)

কবিতা কেন লিখি:

’সৃষ্টিও ব্যক্তিগত, ধ্বংসও ব্যক্তিগত’- এ সত্যকে মেনে নিয়ে আমি যখন আমার ভাষার সীমাবদ্ধতা বুঝে কোনো এক আপেক্ষিক মিথ্যার জগত সৃষ্টি কওে কোন এক নতুন ভাষা বিন্যাসে আমার চেতনা ও চৈতন্যেও সত্যকে প্রকাশ করি তখন তাকেই আমি কবিতা বলি । তবে আমি যে ’আপেক্ষিক মিথ্যার’ জগত সৃষ্টি করে ’কবিতা’ লিখি, তার সবগুলো যে কবিতা হয় তা কিন্তু নয়। হঠাৎ কওে যদি একটা বা দুটো কবিতা হয়ে যায়, তাতেই আামি খুশি ।

কবিতা সৃ্িষ্টর প্রেক্ষাপট নিয়েও কিছু বলি । আমরাতো জানিই যে শব্দের সম্ভাবনা অনেক । সাতটি রঙ দিয়ে যেমন বিশ্ব আঁকা যায়, মুছে ফেলা যায়, ঠিক তেমনিভাবে অসংখ্য শব্দের উচ্চারণে প্রতীকী শব্দ ও নৈ:শব্দ তৈরী করা যায় । দাবা খেলার চৌষট্টি ঘরে মাত্র বত্রিশটি ঘুটির প্রথম দশটি চাল হতে পাওে ১৬৯, ৫১৮, ৮২৯, ১০০, ৫৪৪, ০০০, ০০০, ০০০, ০০০, ০০০ রকম । মাত্র চৌষট্টি ঘরে বত্রিশটি ঘুটি নিয়ে এ অবস্থা, তবে ভাষার হাজার হাজার শব্দ দিয়ে কত রকম চাল দেয়া যায় তা কি চিন্তা করা সম্ভব ? সবাই হয়তো এ ব্যাপারে চিন্তা করতে চাইবে না , কিন্তু যে অল্পস্বল্প এ বিষয় নিয়ে ভাববে, সেই হয় কবি । আর এই কবি শব্দের চঞ্চল সম্ভাবনার সাথে আপেক্ষিকতা মিশিয়ে যা লেখা হয় তাই কবিতা ।

আমি কেন কবিতা লিখি তা আমি বলেছি, যদিও এসব বলতে আমি বাধ্য নই । তবে সত্য কথা বলি, বলতে আমার ভালোই লাগে ।

নির্বাচিত কবিতা:

০১. রূপকথা
০২. গ্যালাকটিকা
০৩. দূর
০৪. সমুদ্র কাতর
০৫. ফরমালিন
০৬. তুমি ভেসে যাও
০৭. আবার আসিব ফিরে
০৮. কল্পলতা
০৯. বৃষ্টিতে বর্ষায়
১০. চক্ষুশূল
রূপকথা

হাত বাড়ালেই ঘর, পা বাড়ালেই পথ
পথের মাঝে দাড়িয়ে আছে একটা কালো রথ।
যেতেই হবে, যাচ্ছি আমি, হাট্টিমা-টিম-টিম
তেপান্তরে ভাঙছে আকাশ ফট-ফটা-ফট-দ্রিম।
একটা রূপকথার সুড়ঙ্গ দিয়ে চলতে চলতে, হাতের বায়ে
মধুমালার বিছানায় হাত বুলিয়ে যখন রাজপুত্রের দেখা
পাওয়া গেল, তখন দেখি তার হাতে আমার প্রান ভোমরা।
আমি ভাবলাম, আমার মরণ হবে, ধারা ৩০২, আমি শেষ। আমি
কিন্তু মরলাম না। মধুমালার বিষে রাজপুত্রের হঠাৎ কি যেন
হলো, মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় বলা যেতে পারে। তত্ত্বহীন আমি
বর্তমানে চলে এলাম, আমার প্রাণ ভোমরাটা গুন গুন গান
গেয়ে প্রমিলা সংঘে হুল ফুটিয়ে দিল।

তারপর আর তারপর রইলো না। আমি আর প্রমিলা এখন
প্রেমান্ধ অব্যয়, মাঝে মাঝে আমরা কবিতায় সত্য কথা বলি,
কোমলতা আর কাঠিন্য পর্যালোচনা করে আমরা লিখি—

হাত বাড়ালেই বুক, পা বাড়ালেই নদী
জলের মাঝে দুবে ভাসে কানা বগের ছা,
প্রাণ ভোমরা করছে বাসা মন পবনের গাছে
রং-কোমলে লাগছে আঠা, প্যাচতো খোলে না।

গ্যালাকটিকা

তুমি আলো জ্বলা শতভিষা নক্ষত্রের মেয়ে
কখনোবা খেলাছলে পা ফেল এনড্রোমিডায়,
অথচ তোমাকে আমি চাই দোলনচাঁপায়
বাতাসে ভেসে আস তুমি প্রাণে সুগন্ধ হয়ে
এই ছিল চাওয়া হৃদকোমলের স্বপ্নবিলাসে।

পারলেনা তুমি গ্যালাকটিকা, দুঃখ নেই তাতে জানি,
জলের ছোঁয়াতে হয় আগুনের ধ্রুব পরাজয়,
দূরে থেকে বুঝো হৃদয় সিক্ত মহাজাগতিক প্রেমে
বিরহকে নিয়ে ভালবাসা একদিন নক্ষত্রই হয়।

দূর

মাঝে মাঝে তুমি এতটাই কাছে, যেন তুমি হলে আমারই কায়া।
…অস্থির লাগে!
তুমি দূরে চলে যাও নদীটার কাছে,
অথবা পাহাড়ে অথবা তুমি বনবাসে যাও,
কিছুদিন থাকি একা তোমার সুগন্ধ নিয়ে,
বুঝিনা কিছুটা ইতিহাস বলে কাকে!

কেন কাছে থেকে পরমাণু হও কোয়ান্টাম ধাপে,
কেন তুমি হও আঠালো গ্লুয়ন?
ভালবাসা ভালবাসি তাই তোমাকেই বলি
—একবার তুমি দূর মহাকাশ হয়ে যাও।
সমুদ্র কাতর

সেদিন ঝড় হয়েছিল রজনীগন্ধা বনে,
আজ সুনামিতে রজনী বিফলে যায়।

চলে আস ফুল শুকনো বকুল তুমি,
জল দিয়ে প্রান দেব সুনামির শেষে
ছিন্নভিন্ন আমি। নিশ্বাসে বিশ্বাস রেখে
এসে দেখ রাত জেগে বসে আছে ঐ
বেলা অবেলার প্রেম, সমুদ্র কাতর,
রজনীর শেষে আর তাকেতো পাবেনা।
ফরমালিন

কেমন আছ বাসন্তী ? আমি ভাল নাই,
বহুদিন যাবত নিজের লাশে ফরমালিন দিতে দিতে
এমন কান্ড হইছে যে এখন আর পচি না,
কি যে বিরম্বনা, কি যে মুশকিল!

কী করি কী করি চিন্তায় অস্থির আমি,
তবে তোমাকে বলি, ভুলেও তুমি
তোমার ঐ লাশে ফরমালিন দিওনা।
মনে রাইখো তুমি ভালবাসা
মনোজগতের সাথে মিশে যাওয়ার মজাই আলাদা।
তুমি ভেসে যাও

আবার যখন বৃষ্টি হবে,
তুমি ভেসে যেতে পার পূর্ণতার সমুদ্রে, যদি তা আসলেও থাকে।
তোমাকে আমি আমার অদ্রাব্য পাথর সত্তার কথা আগেই বলেছি,
আমি পাথর হয়েছি এই মহা দুর্যোগের কালে।

সময় জানে আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম
তৃষ্ণা ছিল আমার সেই বসন্ত কোকিলের প্রথম আন্দোলনের মতো,
কিন্তু হঠাৎ বজ্রপাতে এসে গেল লাশ আর লাশ
রক্তে ভিজে রক্ত দিয়ে ভালবাসাকে আর লিখতে পারলাম না সম্ভবে।
তারপর ঝড়, এখনও ঝড়, জলঘূর্ণিতে দেখি ভাঙ্গনের ছবি
ঊাস্তবতার দিনান্তে ভালবাসা সহ হয়ে গেলাম মেটামরফিক রক,
তোমাকে কাছে আনতে চেয়েও হলনা কিছুই।

আবার যখন বৃষ্টি হবে, নামবে বৃষ্টি অঝোর
আমি একা আকাশের নিচে দাড়িয়ে ভিজবো,
তুমি ভেসে যেও পূর্ণতার সমুদ্রে, যদি তা আসলেও থাকে।
আবার আসিব ফিরে

আবার আসিব ফিরে এই বাংলায় আগামী অন্ধকারে,
সেই তখনের গোরস্থান, শ্মশান আর নদীটা পেড়িয়ে
বারবার খুঁজিব তোমার দেহ,
ধর্ষিতা তুমি পড়ে আছ কোন কুয়াশায় রক্ত মাখা স্তনে
আমি তাহাই দেখিতে চাই,
আমি জানি এই বাংলায় আর কিছুই দেখার নাই
ছেড়াফাড়া তুমি ছাড়া সময়ে তখন কান্নাই অবিরত।

কোথায় তোমাকে পাবো সেই কালো সন্ধ্যায় তুমি বল
হায়নায় খাওয়া খন্ড খন্ড দেহ সব নিয়ে যাবে চিলে,
তুমি নাই তুমি নাই চিৎকারে
আমাকে গুনতে হবে হায়নার মৃতদেহ,
তারপর কিছু নাই কিছু নাই সত্তায় ফিরে যাব শূন্যের ঘরে, ‘
আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’ এই কথা লিখা রবে শুধু
সেই কবেকার অন্ধকার কবিতার বইয়ে।

কল্পলতা

কী আছে কল্পলতা, কী আছে তোমার
অপূর্বের রূপ নিয়ে অচেনার গায় ?
কি এমন অর্ঘ্য প্রাণে এঁকেছো কবিতা
শূন্য থেকে বস্তু এনে প্রাণ বর্ষায়!

স্বপ্ন তুমি সৃষ্টি কণা, অজৈব পরশ
কালোতে আলোক দিয়ে ফোটন প্রবাহ,
তীর্থে তুমি এঁকে দাও অজানা গণিত
অবুঝ বরফ দেহে ফুটে ওঠে দাহ।

পোড়াও মনের ঘর, ভাষার পৃথিবী
দ্যোতকে দ্যোতনা দাও, মনোজাত রীতি,
অসীমের কল্পলতা স্পর্শে আনো সুখ
এবং ইজেলে আনো আবারও জ্যামিতি।

কে তুমি কল্পলতা ? সত্য করে বল
কী দিয়ে ছড়িয়ে দাও দেহ মাঝে ছবি ?
আছে কী তোমার মাঝে বলে দাও
আজ শব্দহীন পিপাসায় যাচ্ছে মরে কবি।
বৃষ্টিতে বর্ষায়

ভেসে যাচ্ছেতো সব, ভাসছে পৃথিবী বৃষ্টি হয়েছে খুব
খরকুটো, পথ, বৃক্ষের শাখা বিড়ালের পচা লাশ,
দুধের কৌটা, তরিতরকারি বিষ্ঠা মেশানো পানি
ভেসে যাচ্ছেতো সব, ভাসতেই হবে বৃষ্টি হয়েছে খুব।

হঠাৎ করেই খুঁজে পাচ্ছি না পাইনি যাহাকে খুঁজে
তবে কি তাহাও ভেসেই গেল বৃষ্টিকে ভালবেসে ?
হতে তো পারেই, ভেসেই গেছে আমারই অবিশ্বাস
পাইনি খুঁজে যে বায়ু তরাসে ভেসেছে তাহারই লাশ।
ভেসে গেল সব, ভাসতেই হবে ভাবছি বিলাপে হায়,
আমিও কি তবে ভেসেই গেলাম বৃষ্টিতে বর্ষায়?
চক্ষুশূল

এখানে এখন বিপরীত শুধু আছে
ডানার উড়াল দিতে পারিনাতো সই,
কেমন যেন ক্ষুধা এক চারপাশে
বোঝা যায় শুধু আমিতো আমার নই।

নিজেকেই তাই কেটেছিরে খুঁজে দেখি
হৃদয়ের ঘরে ধরেছে প্রছুর ঘুন,
সুদিন আমার অচল সময়ে মেকী
নোনা রক্তের দেহে জমেছে অসীম নুন।

ছিনেছি তো আমি ফসিলের কারুকাজ
বলেছি প্রমাকে—দেখেছ চক্ষুশূল ?
পোড়া মরা দেহে যেখানে পড়েছে বাজ
সেখানে অবাক সবাকে ফুটেছে ফুল।

PaidVerts