ভাষার জন্মকথা: ভাষা ভাবনা ।। ভাস্কর চৌধুরী

ভাষার জন্মকথা: ভাষা ভাবনা ।। ভাস্কর চৌধুরী

ভাগ
PaidVerts

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

ভিন্নচোখের এক আড্ডায় ছোটভাই মেধাবী মুন্সি সোহাগ শাহি বলেছিলো, জীবন সৃষ্টির আগে সুরের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটা দুমড়ালে ম্যালা কিছু হয়। সোহাগ সাদা কথাতে বলেছিলো, নদী বা সমুদ্রের, বাতাসের ধ্বনি অথবা নদীর কুলুকুলু সুরের কথা। কেউ শোনে নি সে সুর। আজো নদী বয়ে যায় এবং সেই কুলুকুলুু সুর থেকে অনেক সুর, বৃষ্টির সুর থেকে মনোহর সুর মানুষের কন্ঠে  এখন বাজে। অতঃপর যদি  জীবনের কথা আসে? এই পৃথিবী জলবায়ু তাপে তো জীবন মিলিয়ে যায় এই চার ভূতে। এ হলো চার্বাক  দর্শনের কথা। কিন্তু  জীবন যখন তৈরি হয়, গুহাবাসী মানুষের ভাষাগুলো কিভাবে লিখিত হতো? এটা ভাষাতাত্ত্বিক বললে বুঝবো এমন কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। তখন গুহা ও মাটি খোদাই করে তারা জীবজন্তুর ছবি আঁকতো। তাতে অস্ত্রের মতো কিছু, লাঠি, তীর, কুঠার বা এমনতর অনেক বস্তুর তারা ছবি আঁকতো। এগুলোতে তাদের আদি শিল্পকল্পের চেয়ে ভেতরের কমুনিকেটিভ ভাষাকেই তারা মূর্ত করে তুলতো। তারা কিভাবে ভাষা তৈরি করেছিলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। জীবের ছবি অস্ত্রের ছবি বা অনেক সময় কাপড়হীন নারীÑপুরুষের ছবি এঁকে তারা এগুলো ধারাবাহিক ভাষার একটা চিহ্নে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলো। কাম ও কৌশল জাগ্রত হয়ে তারা আদি মিলন ঘটিয়ে সন্তানের মা বাবা হয়েছিলো। তাদের ভেতর প্রেম ও মায়া জন্মেছিলো একদা। তারা হয়তো পাতার জামা পরে স্পর্শকাতর জায়গা ঢেকে, নারীর  কাছে পুরুষ নতজানু হয়ে কাম প্রার্থনা করেছিলো। ক্রমাগত তাপের ভেতর থেকে রাতের চেয়ে দিনের সূর্যের তেজকে থামাতে তারা সূর্যপূজো করেছিলো। পৃথিবীতে আগুন পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে তারা হোমযজ্ঞও করেছিলো। এসবের পর সংসার ধারণার জন্ম হলে তারা পছন্দের মা নারী নিয়ে পাতায় ছাওয়া ঘরে ঢুকেছিলো। এখানে আগে আধিপত্য কার ছিলো? নারী নাকি পুরুষের? এটি সত্য যে মোরগ ও মানুষের কুচেতন মন ছাড়া বাকি সব জন্তুর মাঝে নারী দীক্ষা জন্মেছিলো। নারী পাখি ও অন্যান্য জন্তুর  ভেতর আজো নারী দীক্ষা দেখা যায়। একটি পুরুষ হাঁস আজো নারী হাঁসকে কামে সম্মত করতে অনেক কসরত করে। এই ইশারাগুলো ভাষাভুক্ত। এভাবে প্রাচীন মানুষ জঙ্গলজীবনে থাকা অবস্থায় অবশ্যই  ঐশী বাণীহীন ধর্ম এবং ধর্মের দেবতাকে তুষ্ট করতে পশু ও মানুষকেও বলিদান করেছিলো। তাদের প্রতিটি স্তরের কাজে তারা হাজার বছর ব্যবহার করেছিলো এবং হাজার হাজার বছরে চিহ্ন সময় কাজ রাগ দ্যোতক ও দ্যোতনা, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে তা যৌথ আনন্দে বাজিয়ে স্বরের ধারাবাহিক সম্মেলনে তারা আনন্দ করেছিলো। এভাবে তারা আঁকা ও চিহ্ন দিয়ে একটি সংহত সমাজ গঠনও করেছিলো। এসব সুর স্বর ও চিহ্ন এলাকা ভেদে আলাদা হয়ে আলাদা আলাদা চিহ্ন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে হাজার বা লক্ষ বছরে সমাজ ধীরে ধীরে নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হাসিল করে একে অন্যকে  গ্রাস করতে করতে একদিন তারা নিজেদের রাজা বা প্রভু তৈরি করেছিলো। এভাবে বহিরাগত উন্নত অস্ত্রের হাতে পতন হতে হতে একসময় বহু সমাজকে গ্রাস করে অপেক্ষাকৃত বড় এলাকাজুড়ে তাদের একক চিহ্ন বিস্তার করে চলাচলের চিহ্ন ভাষার উন্নতি করেছিলো। এই এতো কিছু করেছিলো, এর পরে দেখা যায় সভ্যতার বিকাশধারাতে কতো শত বছর লেগে গেছে। চিহ্ন দিয়েই মানুষের ভেতর যোগাযোগের সূত্রের আগেই পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, গৌত্র, সমাজ, সংগীত, কলাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা ও অধিকতর বড় আকারে রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ভালো ও মন্দ দেবতার উদ্ভব হয়েছে। শুভ এবং অশুভ সংকেতগুলো মানুষ আত্মস্থ করে ফেলেছে। রাজত্ব ও আধিপত্য মানুষের পূর্ণভাষা তৈরির বহু আগেই এসেছে। এরপর মানুষ তাদের কাজগুলোকে বিন্যাস করেছে এবং বিন্যাসের মাঝে অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানের চিহ্নগুলো ব্যবহার করে বিশাল এলফাবেট তৈরি করেছে। তারা রীতিনীতি তৈরি করতে গিয়ে, ধর্মবিশ্বাস, দেবত্ব এবং রাজস্বার্থ রক্ষাকল্পে শাসনের ভাষাটিও তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ছবি এঁকেছে। কিছু মানুষ প্রকৃতির সুর থেকে সংগীতসুর তৈরি করে গায়ক হয়েছে। এসব তো একদিনে হয়নি। জীবনের বিস্তারকে জ্যামিতিক পর্যায়ে নিতে তো হাজার হাজার বছর কেটেছে। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশও তেমনি হারে বেড়েছে। এই ক্রমবর্দ্ধমান ধারাতে তো চাহিদা একটি শর্ত। কারা কিভাবে কী করতে চেয়েছে এগুলোকে শৃঙ্খলায় সাজাতে সাজাতে কেটে গেছে কয়েক সহস্র বছর। কিন্তু পৃথিবীতে রচিত প্রথম শাসন বিধি তৈরিতে যে শ্রেণীর হাত ছিলো তারা কিন্তু রাজার অনুকূল্যে রাজার পক্ষেই সব নীতি ও আইন তৈরি করেছে। এইভাবে শাসিত যোদ্ধা, বুদ্ধিমানুষ, ধর্মমানুষের বিকাশ ঘটে গেছে সবার অজান্তে। জীবনযাপনের রীতি ও ভাষা এক কথা নয়। রীতিতে ছোট ছোট রাজ্যের মানুষ জীবন চালালেও লিখিত চিহ্ন ভাষার দেখা পায় নি। তারা আদি চিহ্ন ভাষাটিই রপ্ত করেছিলো মাত্র। ঠিক এভাবে বুদ্ধি ও প্রতাপের কাছে ভাষা জিম্মি থেকেছে। আর ধর্মজীবীদের পাঠ শুনে পুণ্যলাভের বিশ্বাসে সনাতন মানুষ বিভাজিত হতে হতে শ্রুতিতে ফললাভের আশায় কালক্ষেপনে ফের হাজার বছর কাটিয়ে ফলশ্রুতি শব্দে ফললাভ করেছে। এসব সাংঘর্ষিক শ্রেণী বিন্যাসে লেখ্য ভাষা পেতে মানুষকে আবারো শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাজা ধর্মজ্ঞানে মান্য এবং অতঃপর প্রজা রাজার তৈরি প্রতিনিধি অর্থাৎ রাজাসম প্রতিপত্তি বিধানে ধর্মকেই আশ্রয় করে প্রজাপালনের যেসব আধিপত্যবাদী জীবনধারা ও চেতনা বিকাশের ব্যবস্থা করেছে তাতে ভাষাটি ব্যাপকতা লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লেখ্যভাষা থেকে মৌখিক ভাষা সরে গিয়ে আলাদা আলাদা এলফাবেট তৈরি করতে হয়েছে। এভাবে রাজভাষা, ধর্মভাষা এবং মৌখিক ভাষা সামাজিক বিন্যাসে আলাদা হয়ে গেছে। এই আলাদাকরণক্রিয়াও শত বছরের সৃষ্টি। তাই প্রজাপালনে প্রথমেই ভাষার বিকাশকেই শ্রেণীকরণের মাধ্যমে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগেই এসব কাজ অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। ভাষা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক চিন্তা ও তার প্রকাশ  রাজা ও ধর্মপতিদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে আলী আফজাল খানের কণ্ঠে শুনি, আমাদের সব কার্যক্রমই ভাষা। আসলে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রমকে ভাষারূপ দান করা যায়। আসলে কি তাই?

চিহ্নভাষার রাষ্ট্রীয় রূপটি প্রায় অনেকগুলো ক্ষুদ্র বনসংকুল রাজ্যের ভেতর প্রায় কাছাকাছি রকমের ছিলো। মেহনতি মানুষের ভ্রমণ না থাকলেও প-িত সমাজ অনেক রাজ্যের ভাষারূপ তৈরি করতে ভ্রমণ করেছিলো। অনেক মানুষ খাদ্য এবং উন্নতজীবনের জন্যে পার্শ্ববতী রাজ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে ভাষা ও গোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ নদী ও সাগর হয়ে দ্বীপÑ দ্বীপান্তরে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা ও মানুষের সংকরায়ন করে যাচ্ছিলো। এগুলো মানুষ পেশা ও নেশার প্রয়োজনেই করেছিলো। এভাবে দূর থেকে দূরে যেতে যেতে চিহ্নগুলোর যেসব সমীল চোখে পড়ছিলো তারা একতাবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সংকরায়ন হতে হতে মানুষের মূল অংশ বিলুপ্ত হতে হতে সংকর মানবজাতি তৈরি হতে শুরু করেছিলো। তারা তাদের চিহ্নভাষাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে পরিমার্জনা করছিলো। এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে চিন্তার বিকাশ, লেখ্য চিহ্নর উন্নয়নচিন্তার উন্মেষ ঘটলে রাজারা নিজেদের স্বার্থে দামি চিন্তকদের লালনÑপালন করে একটা অভিজাত শ্রেণী তৈরির দিকে মানব সমাজকে নিয়ে যেতে থাকে। এভাবে বুদ্ধিভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্ত সমাজ রাষ্ট্রের অতি কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে সুগঠিত হতে থাকে এবং সেগুলো পশু বর্শাফলক থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে হতে লিপিরূপ লাভ করতে থাকে। এসব লিপি তামা মাটি ও প্রস্তরে খোদাই করে করে তৈরি হতে থাকে আদি সভ্যতার শীলালিপি। সেসব লিপিতেই হাজার বছর বিবর্তন হয়। যেমন সংকরায়ন বাড়ে, সমাজের সীমা বাড়ে। দেবতাদের স্থানে নতুন দেবতার আবির্ভাব হয়। বিশ্বাসগুলো দলিত মথিত হয়ে একটা রূপে দ-ায়মান হতে চেষ্টা করছে।

এই শিলা ও মৃত্তিকায় অঙ্কিত চিহ্নলিপি দিয়ে লিখিত সাহিত্যের কাল গণনা। এসব শিলা বা মৃত্তিকায় যারা বা যে সভ্যতার মানুষগুলো তাদের চিত্র, ভাষাচিহ্ন ও কাব্য লিখে গেছেন  তাদের এসব চিহ্ন কি পরের উন্নত ভাষা তৈরিতে সাহায্য করেনি? না করলে পরবর্তী লেখাপড়া জানা মানুষ কিভাবেই বা এসবের পাঠোদ্ধার করেছিলেন? কিভাবেই বা গিলগামেশের মতো অমর কথা বিশ্বের সভ্য মানুষ জানতে পেরেছিলো? এসব থেকে একটা কথা উঠে আসে যে এসব ভাষাচিহ্নের ভেতর ব্যাপক চিহ্নের বিশ্বব্যাপী সমিল পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে, ভ্রমণ এবং রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ভেতর বৈবাহিক সূত্রে সংকরায়ন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাত প্রথার ভেতরে থেকেও ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন জাতের ভেতর মিশে গিয়ে এই পেশাভিত্তিক জাতিগুলোর ভেতর একটি প্রমিত লেখ্যভাষা তৈরির আগেই ব্যাপক সংকরায়ন ঘটেছিলো। এবং এ থেকে আমাদের নৃগোষ্ঠীর ভেতর সংকরায়ন হয়েছিলো। তবে মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই এ পৃথিবী থেকে প্রচুর জাতি ও তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে এবং আন্তঃ উপমহাদেশীয় মানুষের নৃগোষ্ঠী সীমার ভেতরই সংকরায়নের সুযোগ পেয়েছিলো। অর্থাৎ মহাদেশের ভেতর যেভাবে ভ্রমণ হয়েছিলো, সেভাবে আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ তিন হাজার বছরের আগে তেমন ঘটে নি। ফলে  মহাদেশীয় ভাষা তৈরিতে লিপিচিহ্নের বিকাশ ও পারস্পরিকতা মহাদেশের ভেতরেই বা দু এক হাজার মাইলের ভেতরেই ঘটেছিলো। ভারতবর্ষের লিপিচিহ্নের ভেতর যেসব পরিবর্তন ও সমিল পাওয়া যায় তা অন্য মহাদেশীয় ভাষার সাথে পাওয়া যায় না। এছাড়া আবহাওয়াও একটা বড় ব্যাপার, চরমভাবাপন্ন দেশগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকের জীবনযাত্রার ফারাকের দারুণ লিপি তৈরির কালখ-ে তেমন ভ্রমণ হয়নি বা ঘটে নি। ফলে লিপি তৈরির ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় স্বকীয়তা থেকে গেছে। তবুও বলা যায় পরবর্তী সাম্রাজবিস্তারের যুগে এসব হাজার বছরের গথিক চিন্তায়ও কিছু প্রভাব পড়ে পরাগায়নের মতো বিশ্বায়ন ঘটেছিলো।

এই সাম্রাজ্যবাদ আরব থেকে পারস্য তুর্কি হয়ে ভারত পর্যন্ত যেমন ঠেকেছিলো তেমনি ফ্রান্স পর্তুগাল হল্যান্ড আরমেনিয়া রোমান সাম্রাজ্য, ইংরাজ প্রভৃতি দেশ আফ্রিকা আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকা, কানাডা ব্রাজিল ও ক্যারিবিয়ান ইত্যাদি দেশে সাম্রাজ্য এবং বসতি বাড়িয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্প ও সংগীতকে বিশ্বায়নের ভেতরে নিলে ভাষাচিহ্ন নিকটবর্তী হবার আরেকটি সুগোগ তৈরি হয়ে যায়। দুহাজার বছরের অগ্রগতির পর পাঁচশ’ বছর আগে ভাষাচিহ্নগুলো সারা পৃথিবী জুড়ে খুব কাছাকাছি আসার সুযোগে এলফাবেটের উন্নতির ধাপগুলো পার হতে থাকে। বাংলা ভাষাও ততো দিনে সংস্কৃত থেকে লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে আরম্ভ করে। আরবি বা ইংরেজি এলফাবেটগুলো বহু আগেই একটা স্থায়ী রূপ পেলেও সংস্কৃতির দাপটে বাংলাভাষার এলফাবেট খুব একটা এগুতে পারেনি। আজো আমাদের ভাষাচিহ্নের ভেতরে ভাঙ্গাগড়ার খেলা চলছে। ল বলতে এল বা লাম ইয়া বোঝালেও এন এর ক্ষেত্রে গিয়ে দেখা  যায় আমরা দুটো এন বা দুটো বে বা বি হরফ ব্যবহার করছি। আমাদের ব দুটো ন দুটো রি দুটো এবং অধুনা বিলুপ্ত লি এলফাবেটে পড়েছি। অন্য ভাষায় চন্দ্রবিন্দু না থাকলেও আমাদের আছে। এভাবে আমাদের বর্ণপ্রথার কারণে লিপিচিহ্নে বর্ণের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯টি। যেখানে ইংরেজিতে ২৬টিতেই গোটা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কাজ চালাচ্ছে। আমরা সমাজে জাতপাত মেনে রাজা ও প্রজার ভাষার বিচ্যুতি ঘটাতে গিয়ে সংস্কৃত থেকে জন্মিত শব্দ নিয়ে খোঁড়া বাংলায় বিশ্বজয়ে নেমে গেছি। কলিম খান তাঁর পরমাভাষার সংকেত গ্রন্থে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীতে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার ভেতর থেকে ৪৫০০ ভাষা ঝরে যাবে। কারণ ঐ ৪৫০০ ভাষায় সাতশ’ কোটি লোকের ভেতর এক কোটির চেয়ে কম লোক কথা বলে যাঁরা আগামী ৫০ বছরের ভেতর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে এটা কি ভাবা অনুচিত যে আমাদের গত দু’চার শতাব্দী আগে কতো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে? অথবা আরো দু চার শতাব্দী পরে আমাদের পৃথিবীর লেখ্য ভাষাচিহ্নগুলো কী অবস্থায় দাঁড়াবে?

নদীর মতো প্রবাহমান এই বিশ্বে কোন কিছুই স্থির নয়। এবং এটা আমরা দাবি করতেও পারি না যে, আজকের ভাষাচিহ্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

এখন বলা হয়ে থাকে ভাষাবিজ্ঞান বা ভাষাদর্শন বিষয়ক কথা। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির আদিতে মানুষে মানুষে কিসের মাধ্যমে যোগাযোগ চলতো। একটি হ্যাঁ বা একটা নাÑবাচক শব্দ যখন আঁকা যায় নি তখন কিসের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করতো। এখানে আমি আধুনিক কালের দুটি বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি। এক হচ্ছে মুখ ও বধিরদের ভেতর আন্তঃ বা বহিঃ যোগাযোগের ভাষা অথবা ট্র্যাফিক চিহ্নের ভাষা। মাঠের কৃষক কর্মরত অবস্থায় তার কেন্দ্রের দিকেও কিছু চিহ্ন ব্যবহার করে। কাছে ডাকার হাত নাড়া। নাÑসূচকের হাত নাড়া বা হ্যাঁ সূচকের হাত নাড়া। বিপদ সংকেতে, বৃষ্টি সংকেত, বজ্র সংকেত কৃষক আজো মাঠের ভেতরে কর্মরত অবস্থায় দেয়। বিমান থেমে থাকা অবস্থায় যাত্রী উঠানোর সংকেত বা না উঠানোর অবস্থা সম্পর্কেও বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচু বা নিচু করে দেয়ার রেওরাজ গোটা পৃথিবীতে আছে। গোটা বিমানবন্দরে রানওয়ে বা টারমার্কে হলুদ লাইন ও সাদা লাইনের ছড়াছড়ি আছে। প্রত্যেকটি বিমান দাঁড়ানোর পয়েন্ট ও থামতে বলার জন্যে দু’হাতে দুটি পাখার মতো বস্তু হাতে একজন ট্র্যাফিকম্যান দুলিয়ে ডানÑবাম করে নেড়ে বিমানকে থামার সংকেত দিয়ে যায়। এ ছাড়াও বাতাসের গতিমাপক একটি হাতির শুঁড়ের মতো ফাঁপা কাপড় থাকে। বিমান সেটা দেখে বাতাসের বিপরীত দিকে সাধারণত বিমান অবতরণ করায়। এ ছাড়া বিমান বন্দরের মাথার উপর হলুদ আলো রাতে বিচ্ছুরিত হয়। গোটা বিমানবন্দর থেকে তীব্রমাত্রার হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। কারণ আকাশ থেকে হলুদ রংটিই সব চেয়ে শনাক্তযোগ্য। এসব ছাড়াও নগরে ট্রাফিক বাতির কথা সবাই জানেন। এটিও কথা বলে। লাল জ্বেলে থামতে বলে. হালকা হলুদ জ্বেলে স্ট্যার্টের আয়োজন বলতে পারে। এবং সবুজ জ্বেলে চলার সংকেত দিতে পারে। এ ছাড়াও স্পিড ব্রেকার, ভাঙা রাস্তা বা ব্রীজ, বাঁক চিহ্ন, মানুষ চলার জন্যে জেব্রা ক্রসিং চিহ্ন, রেল চলার ক্ষেত্রেও এমন অনেক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। সমুদ্রে লাইটহাউসের আলো বা বরফের অবস্থান এলাকায় অনেক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। নদীতে ফেরি চলাচলেও চ্যানেলে চিহ্ন দেখেই সারেং ফেরি চালান। মোট কথা এই আধুনিক পৃথিবীর আকাশপথ, রাজপথ, নদী ও সমুদ্রপথগুলো এসব সংকেত মেনেই চলে। এ ছাড়াও আন্তঃগাড়ি চলাচলের সময় পরস্পরকে সংকেত দিয়ে নিজেদের গতি ও গন্তব্য জানিয়ে দেয়। এই পথ চলাচলের চিহ্ন ভাষা বিশ্বময় একই। একই মানসম্পন্ন। তো দেখা যাচ্ছে, এই অত্যাধুনিক যান চলাচলে লেখ্য বা মুখের ভাষা কাজ করে না। কাজ করে চিহ্ন ভাষা। এখন মূক ও বধিররা লেখ্য ভাষা লিখতে পারে। কিন্তু মৌখিক কমুনিকেশনগুলো তারা কিভাবে করে? এখানেও বিশ্বব্যাপী একটি সর্বজনীন মূক ও বধিরের ভাষা তৈরি হয়েছে। যারা মূক ও বধির স্কুলে পড়ে তারা সেখানেই এটা শেখে। কিন্তু যারা লেখাপড়া করে না তারা কিভাবেই বা আরেকজন লেখাপড়া জানা মূক ও বধিরের সাথে কমুনিকেশন করে। এটাও অঙ্গভঙ্গি বা তাদের জিভ চটকানো, স্বর ও সুরের মাঝ দিয়ে দিনরাত যোগাযোগ রেখে চলেছে। এবং আজকাল সারা পৃথিবীর জাতীয় কিছু সংবাদে ইনবক্সে মূক ও বধিরদের জন্যে খবরটি সর্বজনীন গৃহীত সংকেতে দেখিয়ে দেয়া হয়।

 প্রকৃতি দিয়েই কথা আরম্ভ হয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির আগে জল ছিলো। ঝড় বৃষ্টি আকাশের রং ও মেঘ ছিলো। জীব ও জীবনের বিবর্তনকে বিশ্বাস করলে মানুষ সৃষ্টির আগে বানরের সৃষ্টি। আজো পাখি বানর এবং হরিণ বা বাঘ, এভাবে প্রাণী জগৎ সংকেত বোঝে ও সংকেত পাঠাতে পারে। এগুলো প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনের স্বার্থে জীবের কোষে বাঁচার সংকেত দেয়। পিঁপড়া প্রজাতি আগাম বিপদ সংকেত বুঝে স্থান পরিবর্তন করে। হরিণ জানে কোন এলাকায় এ মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ নেই। বানর তো তাদের ভেতর মুখ ও বধিরের ভাষার মতো দেহ ভঙ্গিমা বা শব্দে তাদের গালগল্প চালিয়ে যায়। আমরা মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করি। আকাশের রং বদলানো দেখে আগাম বুঝতে পারি ঝড় আসছে বা জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সূর্যের পূর্ণগ্রাসে পাখিরা ভোরের চিহ্ন ভেবে ডেকে ওঠে। এগুলোও প্রকৃতির ভাষা। এ ছাড়া আমরা ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব বুঝতে পারি। কৃষি সংকেতের কথা তো আজো চালু আছে। একটি নতুন শিশু জন্মের পর প্রথমে না কাঁদলে অভিভাবক ও চিকিৎসক ততক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেন। পৃথিবীর প্রথম প্রশ্বাসে কাঁদাটাই নিয়ম। তারপর শিশু যদি একটা সময় পরপর কাঁদে তো মা বোঝেন, বাচ্চার ক্ষিদে পেয়েছে। ঘন ঘন কাঁদলে অসুস্থতা বা মাকে কাছে পাবার আকুতির কথাটা ভাবা ভয়। এভাবে কথা না বলা পর্যন্ত মা ও শিশু বা পারিপার্শ্বিকতা ও শিশুর মাঝে যোগাযোগ তৈরি হয়। এগুলোই আদি ভাষার অংশ। তবে নারী নারী হয়ে পুরুষের সঙ্গলাভ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিলো, গুহায়। আমাকে দার্শনিক ও কবি মঈন চৌধুরী বলেছেন, এ একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষ সৃষ্টি ক্ষমতায় এই উপমহাদেশ বা রোমÑগ্রিসে, দেবতার চেয়ে দেবীদের বড় মূল্যায়ন করে থাকে। এই উপমহাদেশে মা, দুর্গা, কালী, লক্ষèী, সরস্বতী ইত্যাদি মহাদেবীর প্রতাপ অনন্যা। একইভাবে গ্রিসে দেবী ম্যাডোনা, আফ্রোদিতিসহ শত দেবীর পদচারণা। এই আদি জীবনে ভাষা চিহ্ন তৈরি হয় নি। তাই প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা আদি মানুষ আগে প্রকৃতির ভাষা রপ্ত করে দেহের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তা প্রকাশ করেছে। এভাবে বলা যায়, চিহ্ন ভাষার আগেও মানুষের প্রকৃতি থেকে শেখা ভাষা ছিলো। মেঘ উঠলে তারা দলের ভেতর হাত ও মুখভঙ্গিমার সাহায্যে নিজেদের ভেতর খাবার থেকে কাম পর্যন্ত, জাগরণ থেকে ঘুম চিহ্ন পর্যন্ত নিজেদের ভেতর কমুনিকেশন তৈরি করেছে। পরে তৈরি হয়েছে কৌমসমাজ, আঁকা চিহ্ন ও চাষবাস সংসার। ভাষার প্রথম ধাপ যে দেহ বা হাতÑপা বা যখন যেভাবে তৈরি হওয়া চিহ্ন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষা কতো প্রকার ও কী কী। এর উত্তর বহুধা, বহতা ও বিভক্ত। একটা পরিসংখ্যানে বাংলা একাডেমি প্রতি পাঁচ মাইল পর পর ভাষার হেরফেরে কথা বলেছে। আচ্ছা এখন এই দ্রুত যোগাযোগের সময় এই দূরত্ব বাড়িয়ে দশ বা বারো মাইল করা যায়। কিন্তু যদি এখানে একটা মাঝারি নদী ও চর থাকে তবে? তবে ভাষা চরমভাবে বদলে যেতে পারে। এটা হচ্ছে মুখের ভাষা। মানুষের কথ্য ভাষা। এটা বদলে যায় ঠিকই। এবং এটা মানুষের জীবনযাত্রা বা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষার সাথে এলাকা ভেদে খাদ্যের অভ্যেসে বদল ঘটে। এসব বদলে যাওয়া নিয়েই আমাদের এই বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে মুখে মুখে ঘুরছে। কেউ কিছু তো বলছে না। বরং এসব নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে নিয়ত। কেউ কিছু তো বলছে না। এটি এতোটাই স্বাভাবিক যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখের ভাষা পাল্টাতে পারে এবং পাল্টাতে থাকে। আজকাল গ্রামের লোক এতোটাই প্রবাসী যে, আমার গ্রামের যুবকেরা একদিন যারা বিদেশ গিয়ে লেবারের কাজ করেছে, তাদের প্রথম প্রজন্ম ফেরত এসেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম দলেবলে প্রবাসী হয়েছে। এদিকে কালচার বলতে যে এগ্রিকাচারাল ইনফস্ট্রাকচার শতবছর বজায় ছিলো সেটা গত বিশ বছরে বিদায় নিয়েছে এবং চাষবাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ হয়েছে হাইফ্রিকোয়েন্সিতে। সোজা মোবাইল এবং অন্যান্য সংযোগে নিত্য বিনি পয়সায় কথা চলছে। ট্রাক্টর ডিপকল সার ও হাইব্রিড বলে একাকার জীবনে নগরে গ্রাম আর গ্রামে নগরের নাক, ভাব ও ভাষাও ঢুকে গেছে। এই একাকার অবস্থায় আর্থ সামাজিক এবং অর্থ রাজনৈকিতার ভেতর আর্থ ধার্মিকতার উগ্র মিশ্রণ মিলে ভাষায় ঢেলে দিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। গ্রামের লোক এখন শহরে বা গ্রামের হাটে বিকেলে চেম্বার করা ডাক্তারের সাথে লেখ্যভাষায় কথা বলছে, বলতে পারছে। এই গা লাগালাগি অবস্থায় বাঙ্গলা ভাষা মানে লেখ্যভাষাকেও প্রভাবিত করে ফেলেছে। কম্পিউটার আজকাল সর্বগামী হয়েছে। প্রবাসীর স্বামীর যুবতী বৌ কম্পিউটার থেকে মোবাইলে ছোট ছোট কাটপিস নীল ফিল্মের দৃশ্য ধারণ করে গভীর রাতে একা বা মুদ্রণ অযোগ্য সম্পর্কের সাথে শেয়ার করে দেখছে। এসবও সমাজে এমন একটি কালচার তৈরি করে দিয়েছে যে গর্ভপাতের জন্যে গ্রাম্য নার্স, এজেন্ট ও ডাক্তার হোমিওপ্যাথিÑএলোপ্যাথি দোকান নিয়ে বসে গেছে। এদের মাধ্যমে শহরে বর্ধিত ক্লিনিকগুলো সামাজিক ড্রেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরে আর স্থায়ী এবং ঘোষিত বেশ্যালয় তৈরি হচ্ছে না। এইসব ঘেরাটোপে টোটকা ভাষার একটা রূপ দেখুন। আমি মোবাইল করলাম  আমার গ্রামে। জিজ্ঞেস করলাম, গাঁয়ের খবর কি রে। কেউ কি মরেছে? ওপার থেকে উত্তর এলো, জানুর আর রুস্তমের উইকেট পড়েছে। দু’জনের ভিসা লেগে আছে। যে কোন সময় ভাই ফ্লাইট হয়ে যাবে। এ কথায় আমি কি বুঝতে পারি?

একথা আমার কাছে খুব কমুনিকেটিভ। আমি বুঝলাম, রুস্তম আর জানু মারা গেছে। দুজনের অবস্থা বড় খারাপ। যেকোন দিন মারা যাবে। এই হলো এখনকার এলাকা ভেদে জীবনযাপন ও চালু ভাষার নগদ বিবরণ। এখন আমরা ফেসবুকে কিছু ভাষা চর্চার নমুনা দেখতে পারি। এখানে অনেক পোস্ট মডার্ন চিহ্নের ব্যবহার চর্চিত হয়। খারাপ কিছু নয়। এগুলো কমুনিকেটিভ। অনেকেই স্থানীয় কিছু ভাষায় ‘ব্যাপক’ চর্চা করেন। যেমন বলে, ওরে আমায় মাইরায়ালা। সবাই বোঝে ‘জটিল হইছে’ ‘চরম লাগতাসে’ আপ্নে কিল্লাই আইছেন?” ব্লগগুলোতে বা একটি নতুন গ্রুপ বাংলা ভাষার লিখ্যরূপকে সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমশঃ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এরা অনেক বড় বড় গ্রন্থ লিখেছেন। নিজেদের এসব লেখার ওপর বৈপ্লবিক সাক্ষাৎ নিচ্ছেন। একজন সাক্ষাৎকার সাহিত্যবাজ এই ভাষাতেই সাক্ষাৎকার পর্ব নিতে ও দিতে দিতে সাহিত্যের ভাষাকে বানানরীতি ও ব্যাকরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেশ জমিয়ে তুলেছেন। আমি এর পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। ফর্ম ফরমেট বিভিন্ন ডিসকোর্সে ভাঙে। সাহিত্য আন্দোলনে ভাবের প্রকাশ বদলে যায়। জীবন চর্চায় বডি ও মন ল্যাঙ্গুয়েজ বদল হয়। তারা কিন্তু প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যান নি। তবে কি প্রমিত ব্যাকরণের বাইরে যারা যাচ্ছেন, তাদের লেখাকেও আমাদের সাহিত্যের মূলধারার সাথে গেঁথে নেবো? পশ্চিম বাংলা কথ্যভাবে প্রায় হিন্দি ও ইংরেজিতে এখন বিপন্ন। এ নিয়ে সেখানে অনেকে প্রতিবাদী। তবে আজো প্রমিত বাংলায় সাহিত্য রচনায় তারা মগ্ন এবং এর বাইরে পশ্চিম বাংলার লেখককুল এখনো যান নি। তবে আমরা যারা ৫২Ñতে বাংলাভাষার স্মরণে শহীদ মিনার করেছি এবং আমাদের একটি সর্বজনীন একুশ আছে, আমরাই কি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ভেঙে ভাষার বিপ্লব করবো সবার আগে?

 সমাধান পাওয়া জরুরি।

 

PaidVerts