স্বর্গে ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর আছে ভাষায়ঃ সলিমুল্লাহ খান এবং শামসেত তাবরেজীর সংলাপ

স্বর্গে ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর আছে ভাষায়ঃ সলিমুল্লাহ খান এবং শামসেত তাবরেজীর সংলাপ

ভাগ
PaidVerts

শামসেত তাবরেজী: আফজাল সাহেব ভিন্নচোখ বলে একটা প্রকাশনা করে থাকেন। ভিন্নচোখের জন্য আপনার একটা সাক্ষাৎকার করতে চাইছে। উনি কিছু গণ্যমান্য মানুষকে বাছাই করেছে, আমি কয়েকজনের নাম দেখছি, তার মধ্যে অন্যতম একজন আপনি, আপনার একটা সাক্ষাৎকার। কিন্তু শুরুটা করতে চাই আপনি যে বড় হয়ে উঠলেন সেই জায়গা থেকে।

সলিমুল্লাহ খান: ঠিক আছে, আফজাল যখন বললেন আপনার সাথে আলাপ করতে হবে তখন আমি আগ্রহী হয়েছি, কারণ কার সাথে কথা বলছি এইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য। সেই কারণে আফজালের পত্রিকায় আমি একটা লেখা দিয়েছি, লেখাটা কেউ পড়েছে কিনা..

তাবরেজী: আমি পড়েছি।

13563300_10208780011250351_23661678_nসলিমুল্লাহ: ’রাজার নতুন জামা’ – সেইখান থেকে আপনে টের পাবেন আমি এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি, ঐটাই হচ্ছে আমার সাম্প্রতিক লেখার মধ্যে সর্বশেষ লেখা। আফজালের সাহস আছে সে এইটা ছেপেছে, এই কারণে আমি তার পত্রিকায় কথা বলতে আগ্রহী হয়েছি, সোজা কথায় বলছি। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছেন আপনি, আপনার সাথে আলাপ করছি গত দুই বছর, তো এখন সমস্যা হচ্ছে একটা, আমার নরড়মৎধঢ়যু নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না, আমি মনে করি আমার জীবনে এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নাই যেটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে, কথাটা আরেকটু পরিষ্কার করে বলি, ফ্রয়েড এক জায়গায় বলেছিলেন ’গু ষরভব রং ড়ভ হড় রহঃবৎবংঃ বীপবঢ়ঃ রহ ৎবষধঃরড়হ ঃড় ঢ়ংুপযড়ধহধষুংরং’. কাজেই আমি সংক্ষেপে বলবো আমি এই যে অল্প স্বল্প বিদ্যাচর্চা করি, এইটা বাদ দিলে আমাকে রহঃবৎারবি করার কিছু নাই, আমার কোনো অর্জন নাই। সেই কারণে সফিউদ্দীন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক ১৯৭১, এখন মনে হবে কি আমি টেলিভিশন দেখে এটা বলছি, সমস্যা হচ্ছে এই জায়গায়। ১৯৭১ বড় ঘটনা, হ্যাঁ ১৯৭১ এ আমার বয়ঃসন্ধি, যেমন ১৯৭১ এ আমি প্রথম যাকে বলে মুসলমান হয়েছি আক্ষরিক অর্থে, মুসলমানি হয়েছে ১৯৭১ সালে, আমার তারিখটাও মনে আছে। ২৫শে জানুয়ারী কক্সবাজার হাসপাতালে নিয়ে গেছে আমার বাবা, আমি তখন বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি ক্লাস এইটে, তো ঐদিনই আমাকে বলেও নাই কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, ইব্রাহিম তার পুত্রকে যেমন… তারিখটা পর্যন্ত মনে আছে দেখেন আমার হ্যাঁ, ১৯৭১ সনের ২৫ শে জানুয়ারী অর্থাৎ মার্চের দু’মাস আগে। এইটা হচ্ছে আমার বয়ঃসন্ধি, এর আগের ঘটনা আছে বললাম না, (মোবাইলে কল আসলো)… আর কিছু বলার দরকার আছে স্যার? মানে আমার শৈশবের কথা যদি বলেন আমি বড় হয়েছি যেখানে সেটা হচ্ছে তীব্র মফস্বল। এইটা বাংলাদেশের সবারই কাহিনী, আমার কথা বললে আপনার কথাও হয়ে যাবে। আমি তো বাংলাদেশের নানা শহরে বেড়াইছি কিন্তু আমি বাংলাদেশের যে শহরে বড় হয়েছি এর চেয়ে বেশি অজপাড়া গাঁ বাংলাদেশে আর নাই, মহেশখালিতে, এটা একটা দ্বীপ হিসাবে পরিচিত, কিন্তু এখন যত লোক এইটার নাম জানে তখন তারা এইটা জানতো না এবং মজার বিষয় জানেন আমার বয়স প্রায় ১৩ হওয়ার আগে আমি কক্সবাজার আসি নাই, এতো দূরের অজপাড়া গাঁ, আমি ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছি ১৯৭১ এ, সুতরাং আমার সময়টা আপনি বুঝতে পারছেন। ঢাকায় এসেছি আমি ১৯৭৬ এ, সুতরাং বাংলাদেশের যেটা সবচেয়ে পৎঁপরধষ ঃরসব সেটা কিন্তু এর মধ্যে হয়ে গেছে ৭১-৭৬, তো ৭৬ এর পরেই আপনাদের সাথে পরিচয়, তারপরের কাহিনী এখন বলতে পারেন।

তাবরেজী: আমি আপনাকে যতটুকু দেখেছি, আমাদের মৌলিতে তখন আড্ডা টাড্ডা হইতো বা শাহবাগে, আপনাদের গ্রুপ ছিল, সাকি ভাইয়ের সঙ্গে…

সলিমুল্লাহ: আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাকি

তাবরেজী: হ্যাঁ, বাদল হোসেন, সাকি ভাইয়ের সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ পরিচয় ছিল, কথা-টথা বলতাম। আপনার মধ্যে এই যে আলাদা- বিশেষভাবে চিন্তা করার একটা জায়গা, এই জায়গাটা কি নিজের গ্রাম থেকেই হয়েছে না ঢাকায় আসার পর থেকে হইছে? আপনে ভাল ছাত্র এইটাতো আমরা জানতাম, এই যে আলাদা হয়ে চিন্তা করা, মানে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে চিন্তা করা, এইটা কিভাবে হইলো?

সলিমুল্লাহ: তাহলে পরের অধ্যায়টা বলতে হয়, আমি মেট্রিক বলে যেইটাকে, আমাদের সময় থেকে এস.এস.সি., ওই পরীক্ষা আমি পাস করেছি চট্রগ্রাম থেকে, শহর চট্রগ্রাম থেকে, তারপর দুই বছর চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছি, ওই দুই বছর ছিল আমার জন্য দন্ডস্বরূপ, কারণ আমি খুব ঢাকায় আসতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি চট্টগ্রাম কলেজে। এই চট্টগ্রাম কলেজ হচ্ছে দেশের একটা পুরানা কলেজ, ১৮৬৯ সনে এই কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, ঢাকা কলেজ হয়েছে ১৮৪১ এ, ঢাকা কলেজের চেয়ে ২৮ বছরের ছোট। আমাদের অঞ্চলের সবাই কিন্তু ঐ কলেজেই পড়তে চাইতো, কিন্তু আমি ঐখানে পড়তে চাইনি। আমি চাচ্ছিলাম ঢাকায় আসতে। এই দু’বছরের অপেক্ষা আমার জন্য ছিল অনন্তকালের মতো, তার মানে বোঝা যাচ্ছে আমি পেঁকে গেছি। তো ঢাকায় এসে আমার জীবনে একটা বড় ঘটনা ঘটল, আমার আর কিছুই মনে নাই, যেমন একটা কথা বলি আমি আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছি, কেন ভর্তি হয়েছি এটা বলতে পারবো না এবং আইন বিভাগের কোনো শিক্ষকের চেহারা আমার মনে নাই, দু’একজনের নাম কেবল মনে আছে। তার মানে ওগুলো আমার জীবনে কোনো কাজে আসে নাই। আমি যখন আমার পুরা জীবনকে পর্যালোচনা করি অল্প বয়সে আমি দেখি আমি সবগুলোই খারাপ কাজ করেছি জীবনে, খারাপ মানে ভুল অর্থে, সড়ৎধষষু অর্থে নয়, ৎিড়হম অর্থে। তার মধ্যে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়া এটা আমার জীবনে ভুল ছিল। তাই না? কিন্তু ঈশ্বর সমস্ত অমঙ্গলের মধ্যে একটা মঙ্গল লুকিয়ে রেখেছে, এই মঙ্গলটা হচ্ছে ঢাকায় না আসলে আমার আহমদ ছফার সাথে পরিচয়টা হতো না। আহমদ ছফা হচ্ছেন আমার জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

তাবরেজী: ’৭৬ এ তো আপনার সাথে পরিচয়?

সলিমুল্লাহ: ’৭৬ এ, এই জুলাই মাসের মাঝামাঝি। আমি এসেছি ধরেন তার একটু আগে। আমার চিন্তার উপর আহমদ ছফার প্রভাব অনেক গভীর। তখন দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলাদেশের ’৭১এর কথাটা বলছি একারণে যে, ’৭১ এর সময়ে আমি রাজনৈতিক সাহিত্য পড়া শুরু করেছি, তার আগে থেকে আমি রাজনীতি করতাম, যেমন আমি দৈনিক পত্রিকা পড়তাম ১৯৬৯ থেকে। কাজেই বুঝতে পারেন আমার রাজনৈতিক পাঁকামি যেগুলো শুরু হয়েছে.. আমি কার্ল মার্কসের বই পড়া শুরু করেছি ১৯৬৮ সাল থেকে।

তাবরেজী: এটা কিভাবে সম্ভব হলো আপনার ঐ পরিস্থিতিতে?

সলিমুল্লাহ: আচ্ছা, আমার পরিবার শিক্ষিত পরিবার, আমার বাবা একজন শিক্ষিত মানুষ, আমার ভাইরাও শিক্ষিত, কেননা পরিবারের মাধ্যমে হয়, আমার উপর একটা প্রভাব আছে। আমার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ইব্রাহিম খলিল নামে এক ভদ্রলোক, উনি প্রথম আমার মনে আছে আমাকে.. উনাকে আমি জিজ্ঞেস করছি একদিন, ইংরেজি বলার চেষ্টা করতাম তখন – ‘যিড় রং কধৎষ গধৎী?, আপনার কবিতার মতোই আর কি, আমার ভাষায় তখন ইংরেজি প্রবেশ করতো, তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি, আমি যখন যিড় রং কধৎষ গধৎী বললাম অর্থাৎ আমি ইংরেজি বলার চেষ্টা করতেছি স্যারের সঙ্গে, উনি অবাক হয়ে গেলেন, উনি পরের দিন আমাকে একটা বই এনে দিলেন, ’যে গল্পের শেষ নেই’- দেবীপ্রসাদ চট্ট্রোপাধ্যায়, আমি সিক্স বা সেভেনে উঠেছি, এতো মুখস্থ বলতে পারবো না, ’৬৮ বা ৬৯, শুধু এইটুকু মনে আছে আইয়ুব খানের উন্নয়ন দশক শুরু হইছে এবং উন্নয়ন দশকে যাওয়ার জন্য, আমাকে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য হেডমাস্টার প্রস্তুত হইতে বলছেন বক্তৃতা দিতে হবে। কিন্তু আমি কক্সবাজার যেতে
পারি নাই, সে আরেক অন্য কারণে। সে কারণ হলো আমার পায়জামা ছিল না, তাই যেতে পারি নাই, আমি এতো দরিদ্র ছিলাম। লুঙ্গি পইড়া স্কুলে যাইতাম, আমার কোনো প্যান্টও ছিল না, পায়জামাও ছিল না।

তাবরেজী: ঢাকায় আসার পর কি আপনি জাসদের সাথে যুক্ত হলেন?

সলিমুল্লাহ: না, জাসদের সাথে যুক্ত হয়েছি.. ‘৭১ এর যুদ্ধে আমার পরিবার তখনকার ভাষায় আওয়ামী লীগ করতো, আমার বাবা, বড় ভাইরা। কিন্তু আমার পরিবারের সবাই ছিল আশ্চর্যজনকভাবে চীনা ভক্ত। আপনি লক্ষ্য করেন, চীনের ভক্ত এবং আবার ভোট দেওয়ার সময় ভোট দিতেন শেখ মুজিবকে, এটা কেমন করে হয়? আমার বাবা ছিলেন আইয়ুব খান বিরোধী, ১৯৬৪ সনের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহকে ভোট দিতে ক্যাম্পেইন করতে আমি তাকে দেখেছি, তখন আমি ক্লাস টু’তে পড়ি। আপনাকে আমার পরিবারের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। আমার বাবার বন্ধুরা ছিলেন, ঐ যে ইব্রাহিম খলিল, উনি ছিলেন আবার ভাসানী ন্যাপ পক্ষের। ফলে আমাদের চড়ষরঃরপধষ পঁষঃঁৎব টা ছিল বামপন্থি। কিন্তু ‘৭০ এর নির্বাচনে আমার বাবাও আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলেন। আমাদের পরিবারের একটা বামপন্থী সংস্কৃতি থাকায় আমি অল্প বয়সে, যেমন আমাদের বাড়িতে চায়না পিকটোরিয়াল, রাশিয়ান উদয়ন এই পত্রিকাগুলো আসতো, এইগুলা আমি পড়ি, এখন পরিষ্কার মনে নাই। আমি হেড মাস্টার সাহেবের প্রভাবে বলতে পারেন কিছুটা বামপন্থী সাহিত্য পড়া শুরু করেছি।

আচ্ছা আপনে জাসদের কথা যে বললেন, দেশ যখন স্বাধীন হলো, আমি আরেকটা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বলি, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবারের কিছু সদস্য বাইরে থেকে এসেছিলেন, কলকাতা থেকে এসেছিলেন, তারা তিনটা বই আমাকে দিয়েছেন, আমার মনে আছে, মুক্তিযুদ্ধের পরে আমি পড়ি, একটা হচেছ জীবনানন্দ দাসের শ্রেষ্ঠ কবিতা, একটা বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা, আর একটা আশ্চর্যজনক বই, কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের ’আমার জীবন ও ভাষণে কম্যুনিস্ট পার্টি’। আমার স্পষ্ট মনে আছে ১৯২০ থেকে ১৯২৯। আমি ঐ তিন বইয়ের মধ্যে কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের বই পড়া শুরু করেছি, তখন আমি ক্লাস টেনে উঠে গেছি, নাইনে তো আমরা পড়ি নাই, মুক্তিয্দ্ধু হয়ে গেছে। তখন আমি বুঝতে শুরু করেছি আমারও কিছু করনীয় আছে। মানে মোজাফ্ফর আহমেদ আমি যে দ্বীপের লোক তার পরের দ্বীপের লোক, উনি সন্দীপের লোক, আমি মহেশখালীর লোক, মাঝখানে দূরত্ব প্রায় ৮০-৯০ মাইল হবে, কিন্তু আমি মনে করলাম যেনো আমার পাশের দ্বীপের লোক। তো মোজাফ্ফর আহমেদ যদি ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হইতে পারে আমি কোন কিছু হইতে পারুম না? এইটা শিশু হিসেবে আমার মনে এসেছিলো আর কি। তখন আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে আর যারা মুক্তিযুদ্ধে যায় নাই দুই ভাগ হয়ে গেছে, যেমন আমার বাপ এবং আমার বড় ভাই তিনজন ছিলেন, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে, আমিই শুধু যাই নাই, আমি বাড়িতে ছিলাম ’৭১ এ, আমার বয়স তখন ১৩ ছুঁইছুঁই। এই কাহিনী কেন বলছি তখন ১৯৭২ সনে দেখি জাসদের মধ্যে যারা বামপন্থী ঘরানার লোক তারাই এসেছে আওয়ামী লীগ থেকে। আমি তখন থেকেই কিন্তু জাসদের দিকে ঝুঁকে গেছি ’৭২ সনে, অর্থাৎ আমি কখনও মুজিববাদী ছিলাম না। ১৯৭২ সনে জুন মাসের দিকে যখন ঢাকায় তাদের দুইটা সম্মেলন হলো তখন আমার যারা বন্ধু বান্ধব তারা সবাই জাসদপন্থী হয়ে গেলো, আমিও জানি না যে আমিও জাসদপন্থী হয়ে গেছি, এইটা হচ্ছে কাহিনী ।

তাবরেজী: ওই সময়টায় যখন আপনি জাসদপন্থী, সেই সময়টায় আরও একটা রাজনীতি, চায়নাপন্থী, সিরাজ সিকদারের প্রবল প্রতাপ, সেইটা আপনার চিন্তার ভিতর কি ধাক্কা দিতো?

সলিমুল্লাহ: না, সেইটা আমি তখনও জানতাম না। সিরাজ সিকদার সম্পর্কে অবগত হয়েছি আমি অনেক পরে। আমাদের সাথে যাদের যোগাযোগ ছিল তাদের বলা যেতে পারে খানিকটা তোহা গ্রুপের লোক। তোহা গ্রুপের লোকদের সঙ্গে আমাদের এলাকার লোকজনের যোগাযোগ ছিল। আমি তাদের সম্পর্কে জেনেছি শুধুমাত্র লোকশ্রুতিতে, আমার কারও সাথে দেখা হয় নাই। ঢাকায় এসে সব শুনেছি। আর চট্টগ্রাম কলেজে যখন পড়তাম তখন তোহা গ্রুপের কিছু লোক যারা আমার ভাইয়ের কলিগ ছিল, আমার ভাই অধ্যাপক ছিল, চট্টগ্রামের দক্ষিণে চকোরিয়া নামক জায়গা আছে সেই কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, উনার কিছু সহকর্মী ছিল যারা হক সাহেবের কথা বা তোহা সাহেবের পাঠ করে, তারা অনেক সময় এসে আমার হোস্টেলে আমার রুমে থাইকা যেতো, আমার ভাইয়ের বন্ধু হিসাবে আসছে আমি রাতের বেলা আশ্রয় দিতাম। কিন্তু ছালার ভিতর যে বন্দুক ছিল এটা কিন্তু আমি জানতাম না। পরে আমি জানছি, ওদের দু’একজন বন্দুকধারী রাতের বেলা থেকে গেছে, এটা ১৯৭৫ সনের কথা। আমার মনে হয় এগুলা বাদ দেন।

তাবরেজী: আমরা একটু সরে যাই, সেইটা হলো এই রকম চিন্তা আমাদের দেশে রাজনৈতিক যে ডামাডোল তার মধ্য দিয়ে প্রভাবিত হওয়ার একটা বিষয় ঘটছে, সঙ্গে সঙ্গে যে রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ঘটনা আমার দিক থেকে আপনার জীবনে ঘটছে, মানে এইটা বিশেষভাবে ঘটছে, সেইটা হলো দর্শন চর্চার একটা আগ্রহ তৈরী হইছে, তখন সেই অর্থে বাংলাদেশে দর্শন চর্চার পরিবেশ তৈরী হয় নাই, ঢ়ঁৎব দর্শন পড়তে যে সমস্যা, কিন্তু আপনি ধষৎবধফু সেইটা শুরু করছেন। এই ঘটনাটা আমরা একটু জানতে চাই, এইটা একটা বড় ব্যাপার, একটা বিশাল ব্যাপার। আমাদের ংঢ়বপঁষঃধঃরাব ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু চর্চার জায়গা থেকে, আমরা বাংলাদেশে খুব কম লোক পাই যারা নানান রকম চিন্তা..সেই জায়গাটা আপনার চিন্তার

স্ফুরণটা, এই স্ফুর্তিটা কিভাবে ঘটলো ?

সলিমুল্লাহ: আগেই বলেছি আপনাকে, ১৯৭১ সনে আমরা যে চিন্তাগুলো করতাম, এগুলি সেগুলিরই এক ধরনের ফলাফল। কি চিন্তা করতাম ১৯৭১ এ? একটা বড় চিন্তা ছিল যে ভাষা, আমরা তখন গল্প যেটা শুনেছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হচ্ছে কেন, তখন জানতাম ভাষার জন্য। তারপরে ন্যায় বিচার এগুলি শুনছি পরে। যেমন চীন যে উন্নতি করতেছে, চীনের সমাজতন্ত্র কি সেটা? আমরা জানি না সমাজতন্ত্র মানে কি, কিন্তু সেটা আমাদের চিন্তাকে আকৃষ্ট করেছে। তাইলে দু’টো জিনিস আমরা চেয়েছি জাতিগতভাবে যেটাকে আমার ভাষার ক্ষেত্রে বলবো, আরেকটা হচ্ছে সামাজিক ন্যায় বিচার, যেটাকে বলেছে সমাজতন্ত্র। এই দু’টো কথা আমাদের ক্ষেত্রে আসে। এখন ব্যক্তিগতভাবে আমি যেটা বুঝেছি সমস্ত কিছুই ভাষার ভিতর দিয়ে হবে। এখন আমি ধষৎবধফু শুনেছি যখন ১৯৭১ এ কলকাতা থেকে আমার বন্ধুরা আসলো, আমি প্রথম বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাসের শ্রেষ্ঠ কবিতা পড়লাম কলকাতা থেকে প্রকাশিত, হাওড়া থেকে প্রকাশিত, ভালো ভালো প্রকাশনী। ওগুলো পড়ে বুঝলাম এদের বাংলা তো অন্য রকম। তখন যেটা নজরুল ইসলামকে পাত্তা দিতে শুরু করেনি, রবীন্দ্রনাথকে তখন আমাদের ধষৎবধফু পাচরে লেখা শুরু হয়েছে, ইচরে পাঁকা যেটাকে বলে সেইটা, পরে শুনেছি ইচরে পাঁকাদের আধুনিক বলা হয়। তো আমরা কিছুটা আধুনিক হতে শুরু করেছি তখনই এই দর্শনের প্রশ্নটা আসলো। আমি দেখলাম যে, আমি যা কিছু লিখি না কেন বাংলায় লিখতে হবে। এইটার প্রায়োগিক কথা বলি, আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলাম আমার বন্ধুরা সব রাশিয়া যাচ্ছে, আমার জন্য রাশিয়া যাওয়া খুব সহজ ছিল। আমি পরীক্ষায় পাশ করেছি, দরখাস্ত করলে রাশিয়া যাওয়া যায়, কিন্তু আমি রাশিয়া বা অন্য কোথাও যেতে দরখাস্ত করিনি। এমনকি পরে আমার বন্ধুরা আমেরিকা যাচ্ছে আমি চাই নাই, এখানে আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল আমাকে বাংলা ভাষায় লেখা শিখতে হবে। এইটাই বলছি একাত্তুরের রসায়ন। আমি বাংলা ভাষায় লিখব এই পণটা কেউ আমাকে বলে নাই, কিন্তু এইজন্য বাংলায় লিখতে গিয়ে আমি.. আমি কবিতাও লিখতাম, কিন্তু গদ্যও লিখতাম, ংরসঁষঃধহবড়ঁংষু শুরু করেছি। নজরুল ইসলামের জীবন কাহিনী আপনি জানেন, নজরুল ইসলাম সেটা বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী প্রকাশ করেছেন সওগাত পত্রিকায়, পরে তিনি একটা গান লেখেন উদ্বোধন নামে সেটাও সওগাত পত্রিকায় ছাপা হয়, তাঁর খ্যাতি পরে হয়। নজরুল প্রথম জীবনে কিন্তু গল্পকার হিসেবে এসেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তো আমারতো গান গাওয়ার প্রতিভা ছিল না, আমি ংরসঁষঃধহবড়ঁংষু গদ্য এবং পদ্য লিখতাম। আমার এই গদ্য-পদ্য লেখার প্রতিভাটি প্রকাশিত হয়েছে চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময়। চট্টগ্রামে কবিতা সমিতি নামে একটা সংগঠন ছিল, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন ওটার সভাপতি। আবু হেনা মোস্তফা কামাল মুক্তিযুদ্ধে কি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন আমি তো তার কিছুই জানতাম না, ওখানে আমার বন্ধুরা বসতো চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে, এখন যেখানে বাতিঘর নামের বইয়ের দোকানটি হয়েছে জামাল খান রোডে, ওইখানে একদিন কবিতা পাঠের আসরে আমি যাই, আমি দেখি তখন আমার হাঁটু কাঁপতেছে কবিতা পড়তাম দাঁড়াইয়া। আবু হেনা মোস্তফা কামাল সভাপতি, আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাকে পছন্দ করলো, তার মানে আমার কবিতার মধ্যে কিছু একটা হইছে বলে মনে হলো, এই হচ্ছে শুরু। কিন্তু আমি দেখলাম লোকে কবিতার চাইতে গদ্যই বেশি চায়, পত্রিকাতে কবিতার ংঁঢ়ঢ়ু অনেক বেশি কিন্তু গদ্যের ংঁঢ়ঢ়ু নাই। তো আমরা যে ছোট ছোট পত্রিকা বের করতাম, আমার একটা বন্ধু মনে আছে, তার নাম হচ্ছে জিয়া ছদকা, সে পরে আর্মিতে গেছে এবং ব্রিগেডিয়ার হয়ে বোধ হয় রিটায়ার করেছে, সে ভদ্রলোকও কবি ছিল । আমি সোজা কথায় বলি, আপনার প্রশ্নের উত্তর এক কথায় বলি, আমার দর্শনের প্রতি আগ্রহ আসছে কিন্তু কবিতা থেকে।

তাবরেজী: এইটা খুব রসঢ়ড়ৎঃধহঃ

সলিমুল্লাহ: আর কার্ল মার্কসের লেখা তো আগেই পড়েছি। কার্ল মার্কসের লেখার সাথে দর্শনের যে যোগাযোগ আমি তখন সেইটা জানতাম না। আমি বলি কার্ল মার্কস পলিটিক্স করে আর আমি কবিতা করবো। কিন্তু দুইটা যখন এক জায়গায় মিললো তখন বুঝতে পারলাম কার্ল মার্কসের রাজনৈতিক ৎড়ড়ঃ যে ভিন্ন, আমাকে কে বা কারা বললো যে এইটা দর্শনের কারণে হয়েছে। তখন একটা বইও পড়লাম ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের, আমি তো তখন বুঝি না, বইয়ের নাম হচ্ছে ’লুডভিগ ফয়েরবাগ ও চিরায়াত জার্মান দর্শনের অবদান’। তাইলে চিরায়াত জার্মান দর্শন কি বস্তু? এই বলে দর্শন.. আমি আগে আমাদের দর্শন কিছু জানতাম না। যা হোক ংঢ়বপঁষধঃরাব সরহফ যেটা সেটা আগে থেকেই তৈরী হয়েছে।

তাবরেজী: ভাষার ক্ষেত্রে যেইটা আপনি বললেন যে, ভাষাই আসলে এক সময় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে আসলে আমার সৃজনশীল কাজগুলো করবো, এইটা আমার ধারণা। কিন্তু যেইটা হলো যে, ভাষা নিয়ে আমাদের লড়াইটাও হইলো, ভাষা নিয়ে আমার অনেক কিছু করলাম, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ক্লাস ফোর-ফাইভের ছাত্র, ফলে কিছু কিছু স্মৃতি আমার মনে আছে, পরে দেখলাম, যতই দিন যাচ্ছে ভাষাকে আমরা.. যেমন আমার বিরুদ্ধে আপনার ব্যক্তিগত অভিযোগ যদি থাকে, সেইটারও আমি কারণ দেখি, ভাষা নিয়ে আমাদের যে রাষ্ট্র গঠিত হইলো, ভাষা নিয়ে যে চিন্তা, ভাষা যে আসলে শুধু একটা ব্যবহার্য বিষয় না, ভাষা যে একটা পুরা জাতির এগোনো-পিছানো সবই বুঝি, সেই ভাষাটাই আমরা এখন বর্তমানে দেখি যে উর্দু ভাষা আমাদের যতো না ক্ষতি করছে, মানে শাসকগোষ্ঠী, তার চেয়ে বেশি বাংলা শাসকগোষ্ঠী আমাদের ভাষা অথবা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতি করছে। কিন্তু আমি যখন ফোরে পড়ি মনে পরে তখনও সংস্কৃত ভাষা আমাদের স্কুলে পড়াইতো। কিন্তু আমি যখন ক্লাস এইটে উঠলাম তখন থেকে সংস্কৃত ভাষা আমি পাইলাম না। তো আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে

মনে হইছে, আমি কোনো ভাষাকেই একদম এক্কাট্টা নতুন ভাষা হিসাবে দেখতে চাই না। আরেকটা আমার পারিবারিক জায়গা থেকে আমি দেখছি যে ফার্সী ভাষার খুব একটা প্রভাব আমাদের বাড়িতে এবং সমাজে। কিন্তু দেখছি যে পরবর্তী সময়ে উর্দু ভাষার সময়েও এগুলোর একটা প্রচলন ছিল, সংস্কৃত ভাষারও একটা প্রচলন ছিল, উর্দু আমার বাবা বলত, আবার আমার দাদা ফার্সীও বলত। এখন স্বাধীনতার ঠিক দুই এক বছরের মধ্যেই আমরা দেখি সংস্কৃত, ফার্সী এই ভাষাগুলোর একেবারে একাডেমিক উচ্ছেদ হয়েছে অন্তত উচ্চবিদ্যালয় কিংবা কলেজে এবং প্রতিস্থাপনের মতো বিষয় হইছে উর্দুর উপরে, কিন্তু সেইটা যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হইছে, ভাষা হিসাবে নয়, মানে চিন্তা করবার একটা বিষয় তৈরী হইছে আমার মতে, বাংলার সঙ্গে এইসব ভাষার আত্মীয়তা ঐতিহাসিক, মানে এই জায়গা থেকে আপনে..

সলিমুল্লাহ: আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি বাংলা ভাষায় দর্শন লেখা যায় না। আমি কার্ল মার্কসের বই পড়ছি, এগুলোর বাংলা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন এবং আকর্ষনীয় নয়। আমি একটা জিনিসের উত্তর কখনও খুঁজে পাইনি, এঙ্গেলসকে আমরা এতো বড় চিন্তাবিদ মনে করি, যেহেতু বলা হচ্ছে বড় চিন্তাবিদ, কিন্তু ভাষা পড়ে তো আমি বুঝতে পারছি না। আমি মনের থেকে, প্রাণের থেকে আনন্দ পাচ্ছি না, তখন আমি ইংরেজি পড়া শুরু করলাম। ইংরেজি দেখি বোঝা যাচ্ছে আরও ভালো। এই যে পার্থক্য, অর্থাৎ সমস্যাটা যতটা মার্কস, এঙ্গেলসের নয়, তার চেয়ে বেশি অনুবাদে। আরেকটা উদাহরণ দেই, ১৯৭৮ সনে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে একদিন মারামারি হলো, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলো। সেইটা আমার মনে আছে এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখ হবে, তো আমি আজিমপুরে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। সেইদিন সকালে নাস্তা খেয়ে ওদের বাড়িতে, যেদিন পালিয়েছি তার পরের দিন, সকাল ১০-১০:৩০ টার দিকে আমি বই পড়া শুরু এবং রাত ১০-১০:৩০ টার দিকে টলস্টয়ের ‘লেসার একশন‘ বলে বইটা পড়া শেষ করি, প্রায় ৭৫০ পৃষ্ঠার বই এই একদিনে পড়ি এক টানা। তো ইংরেজি আমি পড়তে পারি এটা বুঝতে পারলাম, দু’একটা শব্দ বুঝি না, কিন্তু সেটা স্কিপ করলে কাহিনী আমি ধরতে পারি, ঐ যে ক্যাথরিনা.. চরিত্রগুলো এখনো মনে আছে আমার। ১৯৭৮ এর কথা, তো ইংরেজি আমি পড়তে পারি, তখন আমি ইংরেজি পড়া শুরু করলাম। ইংরেজি পড়তে গিয়ে আমি দেখলাম, যেমন হেগেলের বই আমি পড়তে শুরু করেছি চযবহড়সবহড়ষড়মু ড়ভ সরহফ, গধৎশং ্ ঈধঢ়রঃধ, সত্য কথা বলতে কি এগুলো তখন আমি বুঝি না, কিন্তু বুঝি না এইটা আবার গোপন করি বন্ধুদের কাছে, বুঝি না বললে তো ইজ্জত থাকে না।

তো অনেকদিন পরে আমি মার্কিন দেশে গেলাম, এই মার্কিন দেশে গিয়ে একটা বইয়ের দোকানে চাকরি করতাম, দু’বছর পর্যন্ত আমি কোনো চাকরি করিনি, বৃত্তি ছিল, বৃত্তি যখন ফুরিয়ে গেলো আড়াই বছরে আমি চাকরি নিলাম, অর্থাৎ বৃত্তি ফুরানোর ছয় মাস আরও আমি কোনো চাকরি করি নাই, কথাটা রসঢ়ড়ৎঃধহঃ, চাকরি নিলাম আমি একটা বইয়ের দোকানে। সেইখানে একটা বই পেলাম, বইয়ের নাম হচ্ছে ‘ঝঢ়ববপয ধহফ ষধহমঁধমব না ‘ঋববষ ধহফ ঋঁহপঃরড়হ ড়ভ ষধহমঁধমব ধহফ ংঢ়ববপয রহ ঢ়ংুপযড়ধহধষুংরং’, লেখকের নাম জ্যক লাঁকা, বইতে একটা দাঁড়িওয়ালা লোকের ছবি, এইটা নাাকি ফ্রয়েডের ছবি। বইটা কিনে আমি আমার টেবিলে রাখছি, প্রায় দশ বছর বইটা আমি পড়ি নাই, এভাবেই ছিল। ১৯৯৭ সনে, তারিখটা আমার পুরা মনে আছে, ২৮ শে জুন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আমার মনে থাকে, ১৯৭১ সনের ২৫ শে জানুয়ারী, এখন ১৯৯৭ সনের ২৮ শে জুন অথবা জুলাই হইতে পারে কিন্তু ২৮ টা আমার মনে আছে, আমি একটা বই পড়লাম, বইয়ের নাম ’জ্যক লাঁকা’, লেখকের নাম অ্যানিকা ল্যালায়া, ফরাসী নেম, লেঁময়ে উচ্চারণ হবে, বেলজিয়াম লোক। এইটা পড়ে জানলাম, মূল বইটা ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা, এইটা অনুবাদ হয়েছে ইংরেজিতে, এইটা জ্যাক লাঁকার উপর লেখা পৃথিবীর যেকোন দেশে পৃথিবীর প্রথম পিএইচডি থিসিস, ১৯৭০-এ করা, এখনও পাওয়া যায়, আপনি ইন্টারনেটে নামিয়ে পড়তে পারেন। সেই বই পড়ার পর আমি আবার ফিরে গেলাম ঐ বইটা পড়তে যেটা, বইয়ের নাম হচ্ছে ‘ঋববষ ধহফ ঋঁহপঃরড়হ ড়ভ ষধহমঁধমব ধহফ ংঢ়ববপয রহ ঢ়ংুপযড়ধহধষুংরং’, এইটাকে জ্যক লাঁকার রোম বক্তৃতা বলে, পরবর্তী কালে শুনেছি জড়সব উরংপড়ঁৎংব বলে। এইটা পড়ার পর আমার মনের মধ্যে সব কিছু খুলে গেলো, কেনো যে আমি হেগেল বুঝতেছিলাম না, কেনো মার্কস বুঝতেছিলাম না, কেনো ভাষা বুঝতে ছিলাম না, সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। এজন্য আমার জীবনে ঝরহমষব ৎবমরংঃৎু রহ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু যেটাকে বলে সেটা হচ্ছে লাঁকা, আফটার আহমদ ছফা। আহমদ ছফার সাথে দেখা হলো ১৯৭৬ এ, লাঁকার সাথে দেখা হলো ১৯৯৭ এ, লাঁকার বইয়ের সাথে। এই দুইটাই কিন্তু আমার ফবভরহরহম সড়সবহঃ জীবনে। লাঁকা পড়ে কি লাভ হলো, এখন হেগেল সোজা লাগে, এখন মার্কস সোজা লাগে। কেনো সোজা লাগে? লাঁকা বললেন কি সবকিছুই তো ভাষা। তাইলে ১৯৭১-এ ভাষাকে দেখেছিলাম রাজনৈতিকভাবে, এখন ভাষাকে দেখছি আপনার ভাষা ব্যবহার করেই বলছি দার্শনিকভাবে, যে ভাষার মধ্যেই সবকিছু আছে। লাঁকার মধ্যে দুইটা প্রতিপাদ্য আছে, আমি যা বুঝেছি তা বলছি, লাঁকার বইয়ে এগুলো নাও পেতে পারেন, একটা হচ্ছে কি ভাষাই প্রথম, অর্থটা দ্বিতীয়। ভাষা মানে উনি বলছেন আমরা যেটাকে চিহ্ন বলি, ইংরেজিতে যেটাকে ংরমহ বলে, উনি বললেন ওটাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়, ওটাকে ধহধষুংরং করা যায়, তার মধ্যে একটা থাকে আওয়াজ। উনি বলছেন আওয়াজটাই আসল, এটাকে ংরমহরভরবৎ বলে। আরেকটা হচ্ছে প্রত্যেক আওয়াজ একটা অর্থ বহন করে, গোটা জিনিস যদি অর্থ না হয় , অর্থহীন জিনিস হারিয়ে যেতো, কিন্তু অর্থের আগে আসে আওয়াজ। কিন্তু অর্থ না থাকলে সমস্ত আওয়াজ অর্থহীন হতো, এই কথার কিন্তু জটিলতা আছে, ইংরেজিতে বলে চৎরসধপু ড়ভ ঃযব ংরমহরভরবৎ, আর একটা কথা আছে উনার ঃযবৎব রং হড়

সবঃধ ষধহমঁধমব, এর মানে কি? ঃযবৎব রং হড় সবঃধ ষধহমঁধমব এর মানে হচ্ছে এমন কোনো ভাষা নেই যা ভাষা নয়। মানে ভাষার অর্থের জন্য ভাষার অতীত কোনো অর্থ আপনে পাবেন না, ভাষার অর্থ ভাষার মধ্যেই নিহিত, মানে বন্তুকে ভাষাতে রূপান্তর করা যাবে না। জিনিসটা বোঝা একটু কঠিন আছে, সহজ উত্তর হচ্ছে ফরপঃরড়হধৎু গুলো থেকে শব্দের অর্থ আরেকটা শব্দ থেকে করা হয়, তার নীচে কোনো বন্তু নাই, এইটাকে বলে চৎরসধপু ড়ভ ঃযব ংরমহরভরবৎ ধহফ ঃযবৎব রং হড় সবঃধ ষধহমঁধমব. এই দু’টো কথা আমার খুব মনোঃপুত হলো, মনোঃপুত হওয়ার পর আমি লাঁকা পড়া শুরু করলাম। সেক্ষেত্রে একটা কথা অনেকদিন পরে- দশ বছর পরে ফবৎরবাবফ করলাম, স্বর্গে ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর আছে ভাষায়। এইটা আমার একটা বইয়ে, বইটা আপনে পড়েছেন, ’আমি তুমি এবং সে’ – সেই বইতে আছে। ‘সে‘ মানে তো রামই, আমি এইটাকে আমার রাম বই বলি, রাম মানে আউট বই আর কি। সেইটাতে আমি কথাটা উল্লেখ করেছি যে ঈশ্বর ছাড়া ভাষা চলে না, মানে ঈশ্বর কে? বসঢ়ঃু ংরমহরভরবৎ , অর্থাৎ এমন একটা ংরমহরভরবৎ যার কোনো ংরমহরভরবফ নাই, অর্থাৎ ঈশ্বর একটি অর্থহীন শব্দ, কিন্তু শব্দ, এই শব্দ দ্বারা আর কোনো অর্থ তৈরী হবে না। আমি ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু তে যে কয়টা জিনিস শিখছি তার সারমর্ম বলছি আপনাকে, যেমন- ঈশ্বরের নাম নিতে নেই, যে কারণে আমাদের এখনকার মেয়েরা বলে ভাসুরের নাম মুখে নিবেন না, আমার ভাসুর খড়ের গাঁদার নীচে লুকিয়ে আছি আমি বলতে পারবো না, মেয়েরা যে স্বামীর নাম নেয় না, এইটা এ জন্য যে ঈশ্বরের নাম নেয়া যায় না। ঈশ্বরের নামের অর্থই হচ্ছে যার কোনো অর্থ নাই, জিহ্বা মানে ও ধস ও, আমি হলাম আমি, তার মানে কি? আমার নাম নেয়া যাবে না। জ্যক লাঁকা বলছেন পিতার তিন নাম, এক নাম হচ্ছে আকার, আরেক নাম হচ্ছে সাকার, আরেকটার নাম হচ্ছে নিরাকার। এগুলো বাংলায় আমি বানিয়েছি। আমি বানিয়েছি বলে এগুলোর বিজ্ঞাপন দেওয়া আমার উচিত নয়। যে শব্দগুলোর রিয়ালিটি আছে তার তিন মাত্রা আছে। একটার নাম হচ্ছে রিয়াল বা নিরাকার; আরেকটার নাম হচ্ছে সিম্বলিক বা আকার; আরেকটা হচ্ছে ইমেজিনার বা সাকার। লাঁকার সঙ্গে আমার যখন পরিচিতি তখন আমার বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি (বায়োগ্রাফির কথা বলছিলেন)।

আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম ডাক্তার হতে, ফিরে এসেছি রোগী হয়ে, ইংরেজী অর্থে, রোগী মানে পেশেন্ট। আমি অসম্ভব ধৈর্য্য ধরেছি কারন দেখেন সাধারণত একটা পিএইচডি করতে ৩ বছর সময় লাগে। আমি ব্যয় করেছি ১৪ বছর। ধৈর্য্যরে একটা পরীক্ষা, আমি পিএইচডি না করে যদি চলে আসতাম, আমার মা বলছে পিএইচডি শেষ না করে তুমি আসবা না। আমার মা এদিকে মারা যাচ্ছে, মানে ক্রিটিক্যাল সিচুয়্যাশন। আমি পিএইচডি শেষ করতে চাইনি। তবে সেটা ছিল আমার ধৈর্যের পরীক্ষা। আমি যেটার জন্য গিয়েছিলাম সেটা আমি পেয়েছি। আমি যখন আসলাম, শেষ পর্যন্ত পিএইচডি শেষ করে আসলাম। কিন্তু আমি আমেরিকাতে কেন আসছি, কেন সময় নষ্ট করছি বুঝতে পারছিলাম না। লাইব্রেরীতে যাই, পড়ি; কাধে ঝুলিয়ে বাসায় বই নিয়ে আসি, আবার নিয়ে যাই। আমি কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমার কাছে আমেরিকা ছিলো শব্দ মাত্র; আমি এর কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লাঁকার সাহেবের সাথে পরিচয় হবার পর বুঝতে পারি, না, আমার এ ১২ বছর থাকা দরকার ছিল। আমি যদি এর আগে চলে যেতাম তাহলে আমার কিছুই হতনা। আমরা দুইটা মর্মোপলদ্ধি আমি বলতে পারি যেটা আশা করি এই ধর্ম প্রধান দেশে সংস্কার প্রধান দেশে হয়তো ভুল বুঝবে, একটা হচ্ছে ইউরেকার মতো, ‘পেয়েছি পেয়েছি’। যেদিন রাত্রে আমি লাঁকার বই পড়লাম ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন। আমি চিৎকার করে উঠেছি ‘ইউরেকা ইউরেকা’ বলে। আই গট ইট! আই গট ইট! অথবা এটা এইরকম বলতে পারেন, হেরা পর্বতের গুহায় পয়গম্বর সাহেবের যেরকম অনুভূতি হয়েছিলো সেরকম অনুভূতি।

তাবরেজী: আপনার পিএইডি থিসিসটা আমি যতদূর জানি, আমরা একসাথে রিক্সায় বাসায় ফিরি অনেক সময়, সেই সময় আপনাকে নানান জিনিস জিজ্ঞেস করি, ঐখান থেকে জানতে পারছি সেটা হচ্ছে খুব পরিশ্রমের বিষয়, সেটা আপনি আব্দুর রাজ্জাকের উপর একটা বক্তৃতায়ও বলেছেন এবং এই বলতে পারার সাহসটা থাকা দরকার। বিশেষ করে আপনার ঐ বলাতে আমি খুব খুশি হয়েছি এবং আরো দশজনের কাছে আলাপ করেছি। একজন লোক থিসিস করে যে বলতে পারে আমার ১৪ বছর লাগছে; ২ বছর লাগে নাই। এইটা আমার কাছে বিশেষ একটা উপহাস।

সলিমুল্লাহ: এর মধ্যে কোন ভনিতা নেই বা ভান নেই; আমি সত্য কথাই বলেছি।

তাবরেজী: আমাদের দেশে পিএইচডি করেছেন এমন অনেক আধুনিক লোকের সাথে আমাদের থাকতে হয়। অনেক সময় বেশ কষ্ট হয়ে যায়। বেশি আধুনিক বলে এই সমস্যা। আপরার থিসিসটা সম্পর্কে আমরা খুব কম লোকই জানি। আমি যতটুক শুনেছি এটার নাম ছিলোÑ মানি এজ মেটাফোর এবং এইটুকুও আমি শুনছি এই পিএইচডি থিসিসটা সাইজেও বেশ বিপুল। এটা আমাদের কাছে বিষ্ময়; এবং এর কিছুই আমরা জানি না।

সলিমুল্লাহ: আমি আজকে একটা মেইল পেয়েছি। প্রফেসর আফসার হোসেন পাঠিয়েছেন। উনি আমেরিকাতে থাকেন। আমি আগে মেইলটা পড়ি তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসছি। উনি লিখেছেনÑ গু ফবধৎ ঝধষরসঁষষধয ইযধর, ও যড়ঢ়ব ুড়ঁ ধৎব ফড়রহম ভরহব ধহফ ঃযধঃ ুড়ঁৎ ড়িৎশ ঢ়ৎড়মৎধস রহ বিষষ, ও ঃযড়ঁমযঃ ুড়ঁ সরমযঃ নব রহঃবৎবংঃবফ রহ ধ নড়ড়শ ড়ঁৎ পড়সৎধফব ঞড়সড়ংরপ যধং ৎিরঃঃবহ, রঃ রং পধষষবফ ‘ঞযব পধঢ়রঃধষরংঃ ঁহপড়হংপরড়ঁং, গধৎশং ্ খধপধ’. ওঃ রিষষ নব ড়ঁঃ ঃযরং ুবধৎ. এখনও বের হয় নাই। তো আমার বইটার বিষয়বস্তু সেই টাইপের। আমি বইটা ১৯৯৭ সালে শুরু করি, ২০০০ সালে শেষ করি। আমার বইটার নাম হচ্ছে, আপনি যেইটা বলছেন সেটা

কিছুটা ভুল, এই হয়, আমাদের মধ্যে যেটা বোঝাবোঝি হয় সেটাও ভুল বোঝাবোঝিই হবে। তা না হলে কথা বলার দরকার কি। যখন আমি প্রকাশককে পান্ডুলিপি আকারে দিয়েছিলাম তখন বইটার ঐ নাম দিয়েছিলাম। মূল বইয়ের নাম হচ্ছে ‘ঞযবড়ৎরবং ড়ভ ঈবহঃৎধষ ইধহশরহম রহ ঊহমষধহফ: ১৭৯৩-১৮৭৭’, আক্ষরিক অর্থে। সেন্ট্রাল ব্যাংকিং-এর মুল জিনিসটা হচ্ছে টাকা। প্রশ্নটা হচ্ছে একটা দেশে কত টাকা থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠে টাকা বলতে কি বোঝায়? এটার জন্য আমি দুইটা চ্যাপটার লিখেছি প্রায় ২০০ পৃষ্ঠা। এই জন্য আমার একবছর লেগেছে। থিসিসটা বড় হয়েছে এই কারনে। ঐখানে আমি লাঁকা সাহেবের সাহায্যে দেখিয়েছি মানি ইজ এ সিগনিফায়ার; মেটাফরটিক নয়। সিগনিফায়ার ইজ প্রাইমারী অর্থাৎ আপনার মুখের জবান কি করে টাকায় পরিণত হয়। কিন্তু তার পিছনে তো একটা গোল্ড মানি অর্থাৎ একটা সলিড মানির সমর্থন থাকতে হবে। বোদলেয়ারের যে বিখ্যাত কবিতাÑ ‘তুমি কী ভালবাসো’। তোমার মা, বাপ, ভাই, বোন; সে বলে ওগুলো আমার কিছু নাই, ওগুলো সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তোমার দেশ কোথায়? বলে, কোন দ্রাঘিমায় আমি জানি না। শেষে বলে টাকা! কোর কথাটা আছে। সেটা টাকাও হতে পারে, সোনাও হতে পারে। টাকা জিনিসটা কি? আগে আর্ন্তজাতিকভাবে টাকা বলতে সোনাই বোঝাত। পরে দেখা গেল কাগজের টাকাও টাকা হয়। কাগজের টাকা কিভাবে টাকা হয় এই সম্পর্কেও আমি লিখেছি। ইংল্যান্ডে কাগজের টাকাকে কিভাবে টাকা হিসেবে চালানো হলো এইটাই ছিল আমার থিসিসের প্রতিপাদ্য বিষয়। এখানে আমি লাঁকার আইডিয়াটা কাজে লাগিয়েছি। সিগনিফায়ার বলতে কি বুঝায়। মানি যে সিগনিফায়ারের মতই, মানি যে ‘ল’ অনুসারে চলে ভাষাও সে ‘ল’ অনুসারে চলে। তাহলে ভাষার ‘ল’ যদি বোঝা যায় তাহলে টাকার ‘ল’ও বোঝা যায়। এইটা আমি তখন মনে করেছি মহা আবিস্কার করেছি, আমরা শিক্ষকরাও গ্রহন করেছে। কিন্তু এখন আমি মনে করি এটা খুব বাহ্য।

তাবরেজী: না, আমার কাছে সেটা বাহ্য নয়। কারণ আমি আপনার কাছে লাঁকার ক্লাস করেছি, হেগেলের ক্লাস করেছি এবং পরবর্তীতে আপনাকেই বলেছি লাঁকা পাঠের পরেই আপনি যখন হেগেল পড়ালেন, তখন আমার কাছে মনে হয়েছেÑ হেগেল ওয়াজ
লাঁকায়ান। তখন আপনাকে আমি বলেছিলামÑ এই যে চিন্তা, একে শেষপর্যন্ত একটা ছায়াতলে আনার মধ্যেই দার্শনিকের কাজ।

সলিমুল্লাহ: যে কোন ইতিহাসে, ভারতীয় ইতিহাসে যেটা ভালো জিনিস সেটা ইউরোপে এখন হারিয়ে যাচ্ছে। সেটা হলো পরম্পরা। তারা ট্রাডিশন যেটা বলছে সেটা আর পরম্পরা এক জিনিস নয়। পরম্পরা হচ্ছে গুরুর কাছে গিয়ে… সংগীতের ক্ষেত্রে বোঝা যায় ঘরানা জিনিসটা আছে। দর্শনেরও একটা ঘরানা ছিলো। আমরা ঘরানার বাইরে কথা বলতে পারি না। আমি কোন ভাষায় কথা বলছি? আমি যে ক্লাসগুলো নিয়েছি সেটার উদ্দোশ্যটা আমি বলি, ঐ যে বলছিলাম বাংলা ভাষায় দর্শন লেখা যায় না, এটা ¯্রফে একটা ধাপ্পাবাজি। বাংলা ভাষায় শুধু দর্শন লেখা যায় না, ইতিমধ্যে বাংলা ভাষায় দর্শন লেখা হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃত ভাষার মাঝের ভাষা হচ্ছে পালি। পালি থেকেই প্রাকৃত, প্রাকৃত থেকে আরো বিভিন্ন অপভ্রংশ, অপভ্রংশ আবার পথ হারিয়েছে কিনা জানিনা। তো বাংলা একটি অপভ্রংশ ভাষা, এটা মাগধী প্রাকৃত না সৌরশত প্রাকৃত সেটা তর্ক করার দরকার নাই। বাংলা একটি আধুনিক ভাষা, যার বয়স সর্বোচ্চ এক হাজার বছর। এখন বাংলায় দর্শন লেখা যায় না… গৌতম বুদ্ধের দেশনা, যেটা উপদেশ পাঠ করেছে, কেন পড়া যাবে না, যখন ছয় পারমিতার কথা উনি বলেন; এই পারমিতা কথাটির অর্থ আমি বহুদিন বুঝিনি। আপনার হয়তো মনে আছে, আমি যখন ম্যাকিয়াভেলীর উপর ক্লাস নিচ্ছিলাম, ঐখানে একটা কথা আছে হিদগ্রুপ, যেটাকে আমরা ইংরেজীতে বলি ঠরৎঃঁব, ইংরেজী ঠরৎঃঁব আর ইতালিয়ান ঠরৎঃঁব এক নয়। সেটাকে গৌতম বুদ্ধ বলেছেন পারমিতা। ছয় পারমিতার মধ্যে প্রথম পারমিতা হলো দান (গিফট); দ্বিতীয় পারমিতা হচ্ছে শীল (ডিসিপ্লিন); তৃতীয়টা হচ্ছে বীর্য (আসলে যেটাকে বৃত্ত বলি); তারপরেরটা হচ্ছে ক্ষান্তি; এরপরের টা হলো ধ্যান; সবশেষেরটা প্রজ্ঞা। এই হচ্ছে ছয় পারমিতা। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ এইসব কথা কি করে বলেছেন। বুদ্ধ কোন ভাষায় কথা বলেছেন সেটা আমরা জানি না। কাজেই বাংলা ভাষায় দর্শন সম্ভব না এটা একটা কুসংস্কার। আমরা যে কুসংস্কারের মধ্যে বাস করি সেরকম এটিও একটি কুসংস্কার।

আমার দুঃখ হলো, আমি যখন বিলেত থেকে ফিরলাম (আমেরিকায় যাওয়ার পর আমি বিলেতেও গিয়েছিলাম)Ñ এখানে কয়েকটা সেমিনার করলাম, দু-একটা প্রবন্ধও লিখলাম। আমি বললাম এসব কথা-বার্তা লালন ফকিরের গানেই আছে; কারণ, সাকার-আকার-নিরাকার এগুলো তার গান থেকেই এক্সট্রাক্ট করেছি। সাকারেÑ সৃজন, আকারেÑ ত্রি-ভুবন, নিরাকারেÑ কি খেলা দেখাইলে! এই সমস্ত কথা যখন বলছিলাম একজন আমাকে বলছে, এগুলো যদি লালনেই থাকে তাহলে লাঁকা পড়ার দরকার কি আমাদের! কথা হচ্ছে, এমবাসাইজ বহুরকমের হয়। আপনি এর সাথে লড়াই করতে পারবেন না। মার্কস্ বলতেন, আমি বুদ্ধিমান পাঠক কল্পনা করি, এছাড়া তো আর উপায় নেই। তাই বুদ্ধিমান পাঠক কল্পনা করতে হবে। আপনি গর্দভের মতো তো নিজেকে গাধার নিচে নামাতে পারবেন না। যাই হোক, ঢাকার দর্শন চর্চার অভিজ্ঞতা আপনারা আমার থেকে ভালো জানেন যে, খুব সুখকর নয়। লাঁকা থেকে আমি দুইটা জিনিস পেলাম, একটা হল কি- দর্শন বাংলা ভাষাতেও লেখা যায়। দর্শন বলতে বলা হয় ইট ইজ এন এ্যাডভেঞ্চার ফর ট্রুথ। দর্শন কথাটার অর্থ খেয়াল করেন, দর্শন এর অর্থ কিন্তু ফিলোসফি নয়; থিওরী। দর্শন মানে দেখা, থিওরী মানেও দেখা। থিওরী মানে দেখাই আসলে, কাজেই ঈশ্বর মানে যিনি দেখেন। দেখাটা হচ্ছে আমাদের একটা ভিশন, এক্ট অব ফাংশন। এটাকেই আধুনিক ইংরেজিতে গেইজ (এঁবংং)বলে। এটাকে ফরাসী ভাষায় বলে ভঁগার্দ। এই যে আমরা কথা বলছি, এটা কেউ না কেউ শুনছে, কেউ না কেউ দেখছে। এইজন্য সবসময় আপনি তৃতীয়জনকে মনে রাখবেন। এই তৃতীয়জনের মধ্য দিয়ে আপনি ইউনিভার্সও বলতে পারেন, সমাজও বলতে পারেন। আমি যেসব বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলাম সেসব বিষয়ে আমার নগদ লাভ হয় নি। আমার ল’তে ভর্তি হওয়াটা ভুল ছিল; ইকোনমিক্সে পিএইচডি করতে গিয়েছিলাম সেটাও ভুল ছিলো। এটা আমার বিষয় ছিলো না! সঠিক ছিলো কি? সেটা আমার বাই প্রোডাক্ট; আমি লাঁকা আবিস্কার করেছি এজ এ বাই প্রোডাক্ট। আমি গিয়েছিলাম ডাক্তার হতে, ফিরেছি রোগী হয়ে; আমি ফিরেছি ধৈর্য্যশীল হয়ে। লাঁকা পড়ার পর আমার অন্তরে শান্তি এসেছে। আমার সেই অস্থিরতটা আর নাই। যেমন আগে একটা লেখা লিখলে ছাপানোর চেষ্টা করতাম। এখন সেটা আর করি না। ঐ আকুতিটি আর নাই। যেমন ধরেন ইন্টাভিউ দিতে কেউ বললে আমি এখন আগ্রহবোধ করিনা, এইটা অদ্ভুত একটা রসায়ন পরিবর্তন হয়েছে আমার মধ্যে। আগে একটা কবিতা লিখলে পকেটে নিয়া ঘুরতাম, বন্ধুদের বলতাম, শুনবা ৫ টাকা দিব (আপনি এমন করেন না অন্য কবিদের মত)। আমি বুঝতে পেরেছি, জগতে রহস্যের একটা কিনারা আমি দেখতে পেয়েছি, কিন্তু এর শেষে কি আছে আমি জানি না। একটা খুবই ইনটুইট অভিজ্ঞতা। শেষ পর্যন্ত তো সত্যটাকে দেখা হয় নি। মানুষ যে ম্যাটাফোরটা ইউজ করেছে, ইলুমিনেশন। ইলুমিনেশন কেন বলে? ইলুমিনেশন আপনি গরম অনুভব করেন। লাইট দেখেন। জ্যক লাঁকা মানে আমার কাছে পশ্চিমা চিন্তা-ধারার শানে নুযুল। পশ্চিমা থেকে আমি কি শিখেছি সেটা বলছি। আমি ব্যাখা করতে পছন্দ করি। আমি ২০ বছর যাবৎ দর্শন কোর সিরিয়াসলি পড়েছি। ৭৬ এ ঢাকায় আসার পর থেকেই ফিলোসফির বই পড়েছি। মাথাও বুঝিনা, লেজও বুঝিনা। কিন্তু জ্যক লাঁকা পড়ার পর আমি সবকিছু বুঝতে পেরেছি- এভরিথিং মেক্স সেন্স টু মি। লাঁকার সব লেখা কিন্তু পড়তে হয়নি। দুইটা লেখা পড়ার পরই বুঝে ফেলেছিÑ দেয়ার ইজ দ্যা ম্যাটার।

তাবরেজী: আমাদের এখানে যে বুদ্ধিজীবি শ্রেণী তারা লাঁকাকে ডাক্তার সাহেব হিসেবেই চিহ্নিত করেন। কিন্তু আমরা ফাইনালি দেখতে পাই লাঁকা হচ্ছে চিন্তার একটা সিস্টেম।
০২৮

সলিমুল্লাহ: আপনার সাথে আজকের আলোচনাটা শেষ করব। যদি আলাপ করতে চান, আরেক দিন শুধু লাঁকা সম্পর্কে আলাপ করা যাবে। লাঁকা সাহেব সম্পর্কে শুধু আমি এটুকুই বলি, তিনি তো ডাক্তার’ই। সেই হিসেবে আপনি আমাকে আইনজীবি বলতে পারেন। আমি তো ট্রেনিং পাওয়া আইনজীবি। কিন্তু আমি আইন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। কিন্তু আমি বেআইনি কাজ করি সেটা বলছি না। লাঁকা সাহেব সম্পর্কে আমার উচ্ছ্বাস এখন কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু ১২ বছর আগে আমার অনেক উচ্ছ্বাস ছিল। তারপরও আমি এইটা মনে করি, লাঁকা সাহেবের চেয়ে সিরিয়াস কোন পশ্চিমা চিন্তাবিদের সাথে আমার দেখা হয়নি। লাঁকা সাহেব প্রথমে ডাক্তার হিসেবে ট্রেনিং নিয়েছিল। তার জন্ম ১৯০১ সালে; তিনি ১৯৩২ সালে একটি পিএইচডি থিসিস লেখেন এবং সেটিও লেখেন একজন সাইকোসিস রোগীর উপরে। একজন ভদ্রমহিলা যিনি জেলাস হয়ে তার কলিগকে ছুরি মেরেছিলেন। লাঁকা তার কোড নাম দিয়েছিলেন এম.এ.। এম.এ.-এর উপর থিসিস পেপারটা এখন বের হয়েছে। আপনি পড়ে দেখতে পারেন, ১৯৭৫ সালে বেরিয়েছে এটা। এটা বের হয়েছিলো যখন তার বয়স ৬৬। লাঁকা সাহেবের প্রধান কাজ হলো তার বই। আমি কেন বলছি, আমি ধৈর্য্য অর্জন করেছি। যে লোকটা তার প্রথম বই ছাপানোর জন্য ৬৫-৬৬ বছর অপেক্ষা করে সেই লোকটাকে আপনি হেনতেন লোক বলতে পারবেন না।

মনে আছে? মোগর্ট যুদ্ধের একটা ঘটনা কান্ট সম্পর্কে? হুমায়ন কবির লিখেছিলেন। মোগর্ট যুদ্ধের সময় একজন মেজর জেনারেল গোয়েন্দা পাঠিয়েছে তার বিপরীত পক্ষের মেজর জেনারেল রাতের বেলা কি করে তা জানার জন্য। জেনারেল স্মার্কস তার নাম। গোয়েন্দা এসে বললোÑ সে কান্টের ক্রিটিক অফ পিওরিজম পড়তেছে। পরে, এই জেনারেল বলছেÑ চল আমরা যুদ্ধ উইদড্র করি। যে লোক যুদ্ধের আগের রাতে মাথা ঠান্ডা রেখে ক্রিটিক অফ পিওরিজম পড়ছে তার সাথে আমরা নিশ্চিত হেরে যাব। তারা যুদ্ধ উইদড্র করে। এই গল্পটা হুমায়ন কবির লিখেছে। আমিও সেটা বলি, যে লোক ৬৫-৬৬ বছর অপেক্ষা করতে পারে প্রথম বইয়ের পরীক্ষার জন্য সেই লোকের সামনে কথা বলার সময় আপনাকে মাথা নত করে কথা বলতে হবে।

তাবরেজী: এখন আমি খুব ছোট্টমত লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি দেখি লাঁকা আমাদের বিভ্রান্তি ঘুচাইতে পারত। আমাদের একটা পুরনো আধুনিকতার চিন্তা আছে। সেই চিন্তাটাকে আরো এক্সটেন্ড করে নতুন নাম দিয়ে আমাদের আরো বিভ্রান্ত হওয়ার একটা জায়গা তৈরী করেছে যেটাকে আমরা গ্লোবাল পুঁজির জায়গা থেকে দেখতে পারি। যবে থেকে আমি ঢাকা শহরে ফিরি, আমি আজিজ মার্কেটের দোকান থেকে একাকী গিয়ে একটা পুরাতন বইÑ “আমি, তুমি, সে” কিনে আনি। যেহেতু বেশী লোকের সাথে মেশা হয় না। তাই আমি কিনে নিয়ে আসলাম এবং সেই রাতেই আমার সিদ্ধান্ত হলোÑ আই হ্যাভ টু গো ব্যাক দ্যা পোয়েট্রি। পোয়েট্রি বলতে আমার মনে হলো, কবিতা একটা সুনির্দিষ্ট ছন্দ, একটা স্টাকচার, এগুলো ধ্বনি। লাঁকা পড়ার পর সরাসরি যোগ না থাকার পরেও পোয়েট্রিক সাউন্ড সিস্টেম যেটা সেই জায়গাতে আমি ফিরলাম এবং এই ঈমানটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। সেইখান থেকে আমার মনে হয়েছে, মুল প্রশ্নটা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার এমন একটা জায়গায় আছে যা, আমাদেরকে আরো দূরে নিয়ে যায়। এই যে আমরা দর্শন চর্চা করি না, এই যে পোয়েট্টি থেকে আমাদের নিজেদের উৎখাত করেছি, আমি দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে একজন তরুণ কবিকে (হিজল যোবায়ের) পেয়েছি যার কবিতা পড়লে একটা তাল লাগে। যেই তালে আমরা যখন চিটাগাং যেতাম বা সিরাজগঞ্জ যেতাম তখন ঘুম পেত। এই কারণে আমি এই তরুণ কবির সাথে মিশছি; দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর আমি কোন কবির সাথে মিশতে পারিনি। পোয়েট্রিকে যদি দর্শনের কাছাকাছি থেকে দেখি; যে কারণে পোয়েট্রি হয় না, সে কারণে দর্শন হয় না; এটা আমার কথা। কিন্তু সেটার জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা; আমি মনে করি বাংলাদেশের কৃষি এখন দেয়ালের ওপারে চলে গেছে, কৃষকের ছেলে-মেয়েরা যদি লেখাপড়া-করতে পারতো তাহলে বাংলা আধুনিক সাহিত্য সেইটা পাঠ করার লোক পাইত। কিন্তু সেটা কোন না কোনভাবে হয়নি। এখন শিক্ষার ভেতরেই আমাদের এটা প্রচার, দর্শন চিন্তার প্রসার; এট লিস্ট আপনি যখন রিপাবলিক পড়িয়েছেন তখন আমার এটাই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের ইন্টারমিডিয়েট লেবেল থেকেই রিপাবলিক পড়ানো উচিত। এইটার কি করা যায়?

সলিমুল্লাহ: আপনিতো অনেকগুলো কথা একসঙ্গে বললেন। কবিতা সম্পর্কে আগে বলি, আমাদের কবিতার যে একটা রাফ ছাট রয়েছে, আমি রাফ ছাটটার কথা বলি। যে কারনে সমস্যাটা হচ্ছে, যে কবিতাগুলো আধুনিক কবিতা বলতাম, অধিকাংশ আধুনিক কবি গদ্য কবিতা লেখে এদেশে এবং তাদের ছন্দ সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। তারা এমনকি বাংলা কবিতার যে পুরনো ছন্দ অক্ষরবৃত্ত এবং নানারকমের মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এটাও তারা জানে না। কবি হিসেবে নজরুল ইসলামের সিদ্ধির একটা গোপন কথা লোকে খেয়াল করেনি; বেশিরভাগ লোকই খেয়াল করে নি; সেটা হলোÑ নজরুল ইসলামের মাত্রাবৃত্ত ছন্দের উপর অসাধারণ দক্ষতা। আমি নজরুল ইসলামকে নকল করে দু-একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি। আমি অক্ষরবৃত্তেও কবিতা লিখেছি কিন্তু মাত্রাবৃত্তে যখন লিখেছি তখন কবিতার দুর্বলতা তাতে ঢাকা পড়ে। এজন্য ছন্দের মাত্রার ভিতর দিয়ে অনেক খারাপ কথাও বলতে পারেন। নজরুলের সব কবিতাতেই দেখবেন মাত্রাবৃত্তের প্রাধান্য আছে। নজরুল ইসলাম নতুন অনেক জিনিস তৈরী করেছেন। নজরুল ইলামের একটা বিখ্যাত গান আছেÑ “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে”।

এইটাকে আমি একটা কবিতাতে রুপান্তরিত করেছি। এই কবিতায় আমি নজরুল থেকে কি চুরি করেছি আপনি ধরতে পারবেন না।

তাবরেজী: আমিও চুরি করেছি আপনার ঐ কবিতা থেকে।
০২৯

সলিমুল্লাহ: ব্যাপার হচ্ছে একজন কবির সংক্রমণতা থাকতে হবে। আমাদের দেশে এই সংক্রামক ব্যাধিটি এখন আর নেই। ইংরেজীতে একে বলে ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি। আমি নজরুল ইসলাম থেকে একটা লাইন নিয়েছি। “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে”।

তোরা দেখে যা, আমি না মায়ের কোলে
বলুন পাঠক এবং পাঠিকা
কি নকল করলো কবি নজরুল থিকা
আমি না এর মধ্যে থামি; আমিনার মধ্যে থামি না
আমি অর্থ শুধু আমি না
কে এই নায়ক যদি অন্তর্যামিনা
না বলেই হ্যা বলি কোলে থেকে নামি না
তোরা দেখে যা, আমি না মায়ের কোলে।

আমার লাঁকা আবিস্কারের পরে এইটা লেখা। আমার মধ্যে লাঁকানিয়ান কর্ম এইটা দিয়ে শুরু। এইটাকে আমি নজরুলের ছন্দে (মাত্রাবৃত্তে) লিখেছি। নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘কৈফিয়ত’ও মাত্রাবৃত্তে লিখা, ৬+৬+৬+৪ পর্বে ভাগ হবে। যেমন দেখেন “বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবী”। এরকম নজরুলে কবিতার ভেতর দেখবেন…., এই কবিতারই কয়েকটি লাইন, আমি সবিনয়ে বলছি ফররুখ আহমেদ সাহেব চুরি করেছেন তার লাশ কবিতায়। একই বক্তব্য কিন্তু ওনি ঐটা লিখেছেন নকল করে। ফলে এইটা যত সফল হয়েছে ঐটা তার একফোটাও হয় নাই। তার একটা প্রমাণ বলি, নজরুল ইসলামের কবিতা কতবার প্রিন্ট হয়? এটাতো ভারত সরকারের জন্য বা বাংলাদেশ সরকারের জন্য হয় না। ফররুখ আহমেদের সাত সাগরের মাঝি যেটাতে ঐ লাশ কবিতা ছাপা হয়েছে ১৯৪৩ সালে সেইটা ১৯৬৮ সাল নাগাদ ঢাকায় কপি খুজে পাওয়া যায়নি। একটা বুঝাচ্ছে বাংলা কবিতার মাত্রাবৃত্তের যে সংক্রামক ক্ষমতা অক্ষেরবৃত্তের সেইটা নাই এবং আমাদের এখানে পরবর্তীকালে কবিতার সাথে বিচ্ছেদ কোথায় হলো আর কি।

পরবর্তীকালে দেখি সবাই জীবনানন্দ দাশের ভক্ত। আই অ্যাম সরি টু সে দ্যাটÑ জীবনানন্দ দাশ ইজ মাচ মাচ ইনফিরিওর পোয়েট কমপেয়ার টু নজরুল ইসলাম। আক্ষরিক অর্থে তিনি নজরুল ইসলামের শিষ্য ছিলেন সে অর্থে বলছি না। তিনি ছিলেন বিশেষ প্রবণতার কবি। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে লোকে এমনভাবে সাহিত্যকে মুক্তিযুদ্ধের চতুর্দিকে গড়ে তুলেছিলাম যে, জীবনানন্দ দাশ আকাশচুম্বী কবি; নজরুল ইসলাম কিছুই না।

তাবরেজী: নজরুল ইসলাম যখন আমরা ছোট থাকতে আম্মার কোলে বইসা পড়ি তখন তার কবিতা পড়ার জন্য কোন অর্থ জানতে চাইতাম না। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে একমাত্র নজরুল ইসলামের কবিতা পড়ার জন্য কোন অর্থ বুঝতে হয় না; তার ধ্বনিই ভিতরে এমনভাবে খেলে যায় যে, ঐটা নিয়েই বাড়ি ফিরে যাওয়া যায়। সলিমুল্লাহ: আপনাকে আমি দুইটা কথা বলি। মধুসুদন যখন প্রথম লিখতে আসে তখন প্রচন্ড বিরোধিতার মুখে পরেছিলেন। ভক্ত থেকে সাবধান। মনে রাখবেন আপনার বইয়ের যারা ভুমিকা লিখছেন তাদের থেকে সাবধান। হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় মধুসুদনের বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলো। লক্ষ্য করেন তিনি মধুসূদনকে মহাকবি হিসেবে প্রেজেন্ট করেছেন। তিনি মেঘনাদবধের আগেই অমিত্রাক্ষর লিখেছিলেন। কিন্তিু তিনি বিরোধীতার মূখে পরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ১৬-১৭ (কেউ বলে ১৬, কেউ বলে ১৭) সেই বয়ছে তিনি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেনÑ মধুসূদনের কবিতা টিকিবে না, বৃত্ত সংখ্যা টিকিবে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রথম চপেটাঘাত হচ্ছে এইটা যে, বাংলার শ্রেষ্ট কবিকে তিনি বুঝতে পারেন নি। তাহলে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে গেলেন কিভাবে? তিনি আরেকটা নৌকায় উঠলেন; সেটা হচ্ছে বিহারী লাল চক্রবর্তীর নৌকায়। বিহারী লাল চক্রবর্তীর নৌকায় উঠে রবীন্দ্রনাথ নিজে পার হয়ে গেলেন কিন্তু আমাদেরকে ডুবিয়ে গেলেন।

মধুসূদনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের বিক্ষোভটা প্রকাশ করিÑ রবীন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালে এডওয়ার্ড টমসনকে বলছেনÑ মধুসূদন বাংলা জানতেন না, প্রমাণ কি? কারণ তার কবিতায় কোন উত্তরাধিকার নেই! এডওয়ার্ড টমসন হচ্ছে ইপি টমসনের বাবা; তিনি পাদ্রী ছিলেন, বাংলা শিখেছিলেন কিছু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুও তিনি। “রবীন্দ্রনাথ টেগর ওয়াজ এ ড্রামাটিস্ট” বইয়ের ১৯৪৮ সালের এডিশন থেকে আমি বলছি (অক্সফোর্ড ইউভার্সিটি প্রেস ছেপে ছিল) যে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা জানতেন না মধুসুদুন বলছেন। প্রমাণ কি? ‘দেখনা তার কোন উত্তরাধিকারি নাই। কঠিন দুই একটা ডিকশনারী নিতেন। ডিকশনারী থেকে শব্দ বসাইয়া দিতেন’। রবীন্দ্রানাথের এইটা হচ্ছে আনচেরিটেবল রিমার্কস। আনচেরিটেবল শব্দের বাংলা হবে এটা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বিদ্বেষপ্রসূত মন্তব্য।

নজরুল ইসলামের অনুসারী বলে আপনি যাদের নাম উচ্চারণ করতে পারেনÑ তালিম হোসেন বলেন, বন্দে আলী মিয়া বলেন এরা সবাই স্ব স্ব ভালো কবি। জসিম উদ্দীন নজরুলকে অনুকরন করেন নাই। জসিম উদ্দিন নিজ আইডেন্টটিতে দাড়িয়ে আছেন। কিন্তু যারা অনুসরন করেছেন বেনজির আহমেদ পর্যন্ত, দেলোয়ার হোসেন, খান মোহাম্মদ মইনুদ্দীন এদের সবারই প্রতীভা সীমিত।

এখন নজরুল ইসলামকে মনে করেন মোহাম্মদ মাহফুজুল্লা বা শাহবুদ্দিন যদি তুলে ধরেন সেই নজরুল ইসলামের কি কোন মর্যাদা থাকে? ব্যাপার হইছে তাই। নজরুল ইসলাম একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেটা মধুসূদন হয়েছেন যে, তাদের কোন ফলোয়ার নেই। এরপর কবি হিসেবে যারা সফল হয়েছেনÑ সুধীন্দ ০৩০

নাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু। জীবনানন্দ দাশকে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা অবহেলা করেছেন। আপনাদেরকে আমরা যেরকম অবহেলা করি। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন, তাকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গ-নিঃসঙ্গ লিখতে হয়; অমীয় চক্রবর্তী তার সেক্রেটারী থাকেন, সুধীন্দনাথ দত্তের সাথে একটা খামচা-খামচি সম্পর্ক ছিলো। হিজল যোবায়েরের কবিতা আমি পড়িনি। হিজল যোবায়ের পর্যন্ত যদি আসেন দেখেন সবাই আধুনিক কবিতার ভক্ত। আমরা কেউ আর রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুকরণ করি না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে এখন আমরা বিয়ের কার্ডও ছাপি না। রবীন্দ্রনাথের অপমৃত্যু হলো? আচর্য্য ক্ষুদ্র তেলাপোকা টিকিয়া আছে, অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে। রবীন্দ্রনাথ লোপ পাইয়াছে, নজরুল টিকে আছে। এটা অদ্ভুত ব্যাপার। এখন আপনি দেখছেন কিনা আমি নজরুল ইসলামের কবিতা নকল করছি। আমি কবি হিসেবে গণ্য নই। আপনার কবিতা পড়ে আমি তো অবাক হয়ে গেছি, সবই নজরুল ইসলামের নকল (অশ্রু মোবারকেও)। আমি দেখাব আপনাকে।

তাবরেজী: হ্যা…

সলিমুল্লাহ: মানে আপনি আবার মাত্রাবৃত্তে ফিরে আসছেন। আপনার কবিতায় ৮০ ভাগ মাত্রাবৃত্ত এবং সেইগুলি ভালো কবিতা। আপনাকে পরে সেটা বলব। তার মানে নজরুল ইসলাম আবার ফিরে আসছে। কোথায় ফিরে আসছে? এই বাংলা ছন্দের ভেতর ফিরে আসছে এবং ম্যাসেজের দিক থেকেও নজরুল ইসলাম খুব পরিস্কার করে বলছে পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি, যুগের যুগ কেটে যায়। এইটা তো সাংঘাতিক কথা। তাই না? ভক্তরা বলে নবযুগ কবি। কিন্তু রসিকতা করেন নাই। নজরুলের যে ব্যঙ্গ করার ক্ষমতা আছে, ব্যাজশ্রুতি করার ক্ষমতা আছে এইটা লোকে বুঝে উঠতে পারে নাই এবং নজরুল কাউকে ঈর্ষা করতেন না। আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজীবনীর ১ম খন্ডে উনি বলেছেনÑ নজরুল ইসলাম হল একমাত্র ব্যক্তি যিনি কখনো কাউকে ঈর্ষা করতেন না।

তাবরেজী: এইটা আমি শিবরাম চক্রবর্তীতেও পড়ছি।

সলিমুল্লাহ: হ্যা এখানেও আছে। যাই হোক, আমার বক্তব্য হচ্ছে, বাংলা কবিদের মধ্যে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল তিনজনই মার্কা মারা কবি। নজরুল ইসলাম যখন আবির্ভূত হন তখন কেউ তাকে ক্ষুমদ রঞ্জন মল্লিকের সাথে তুলনা করছেন, কেউ যতীন্দ্রমোহন সেন গুপ্তের সাথে তুলনা করছেন, কেউ মোহিতলাল মজুমদারের সাথে তুলনা করছেন। এমনকি অসীমকুমার বন্দোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতা নিয়ে এক বক্তৃতায় (১৯৮৩-১৯৮৫) বলেছেনÑ নজরুল ইসলাম, যতীন্দ্রমোহন সেন-গুপ্তের মতো কবি ছিলো। এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যানী সেন মেমোরিয়াল লেকচার। কাজেই আমি বলছি অবিমৃশ্যকারীতা একটা আছে ভবিষ্যত দেখতে না পারা। কিন্তু যারা অতীত দেখতে পায় না তাদেরকে কি বলবেন?

তাবরেজী: নজরুল ইসলামকে নিয়ে আপনার একটা বই বের হবার কথা, হব হব করছে। এইটা আমি আফজালের মাধ্যমে আপনাকে বলতে চাই আপনি যদি একটু সহযোগিতা করেন; এটা অনেকদিন পর বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্যে একটা ঘটনা। আপনার সাথে গত দুই বছরে আমার সপ্তাহে ৩-৪ দিন এটাচমেন্টের কারণে বলছি এবং সেইটা নিয়ে একটু বলে আমরা আজকের আলোচনা শেষ করব।

সলিমুল্লাহ: নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত আমার বইটার নাম আমি রেখিছিÑ “কাজীর বিচার”। আপনি যেহেতু কবি আপনার জন্য বলতে হবে না; আমি কিন্তু কবি না; তাই নিজের জন্যই বলিÑ কাজীর বিচার বলতে বাংলায় আমরা দুইটা জিনিস বুঝি। এক হচ্ছে কাজী সাহেব বিচার করছে। অর্থে আমরা এইটা বুঝি। কিন্তু আমরা যদি বলিÑ বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে সেই জনতা; এইটা সলিল চৌধুরীর লেখা। এই গানটার মধ্যেও একটা মর্ম আছে। অর্থাৎ কাজীর বিচারও আমাদেরকে মাঝে মাঝে করতে হয়। আমি এখানে বলেছি, নজরুল ইসলামের জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত লোকে তাকে কিভাবে বিচার করেছে। আমার ঐ বইয়ে প্রতিপাদ্য হচ্ছে সেইটা। সেই বইয়ের নাম দিয়েছি আমি ‘নজরুল ইলামের নাম’। প্রথমে দিয়েছিলাম নজরুল ইসলামের তিন নাম। এখনও ঠিক করি নাই শেষ পর্যন্ত কি নাম দিব। একজন লেখক একটি লেখাকে কতবার বদলায় সেটি আপনি জানেন। শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়ায় আমি জানি না। ইংরেজীতে এই প্রবন্ধটা আমি লিখেছিলাম ১৯৯৯ সালে। নজরুল শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মার্কিন দেশে একটা নজরুল সমিতি আছে, তারা তাদের, আমি তখন অল্পবয়স্ক এবং অপরিচিত, কি কারনে যেন আমাকে বলছে কি নোট স্পিচ লিখতে।

আমি তখন পিএইচডি লেখায় ব্যস্ত ছিলাম বলে একটু সময় নিয়ে এই প্রবন্ধটি লিখেছিলাম। ইংরেজিতে এর নাম ছিলো ‘নজরুল ইসলাম এজ এ সিগনিফায়ার’। তখন আমি থিসিস লেখেছিলাম ‘মানি ইজ এ সিগনি ফায়ার’। তো সেইটা আমি আর অনুবাদ করিনি। কিন্তু মেমোরিতে ঐটা রয়ে গেছে। সাবটাইটেল ছিলোÑ নজরুল ইসলাম এন্ড দ্যা পলিটিকস অফ বেঙ্গল বিফোর নাইনটিন ফোর্টি সেভেন। আপনি বাংলাদেশের সবার একটা অদ্ভুত রোগ লক্ষ্য করেছেন? সবাই ৭১ নিয়ে কথা বলে, ৭১ এর গুরুত্ব অভিয়াস। কিন্তু ৪৭ নিয়ে কথা বলাটা আর যাই হোক, ফ্যাশনেবল না। আপনি বললে লোকে সহ্য করে নেয় তবে আগ্রহ পোষণ করে না।

তাবরেজী: এটা একটা সমস্যা!

সলিমুল্লাহ: হ্যাঁ। এটা একটা সমস্যার মধ্যেই পড়ে। যাই হোক, নজরুল ইসলাম যেহেতু সাতচল্লিশের আগেই বোবা হয়ে গেছেন, ০৩১

চৈতন্য হারিয়েছেন সেহেতু নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আর উপায় নেই। জিয়াউর রহমান সাহেব নজরুল ইসলাম সাহেবের গলায় মেডেল দিয়ে মুসলমান বানিয়েছেন। নজরুল ইসলাম কখনো সাম্প্রদায়িক মুসলমান ছিলেন না, নজরুল ইসলাম কখনো পাকিস্তানও চাননি; তবে বাংলার মুসলমানদের যে অধপতিত দশা তাতে নজরুল ইসলাম ব্যথিত ছিলেন এবং তাদের জাগাতে চেয়েছিলেন। মুসলমানরা যে বাংলায় কথা বলতে পারে সেটা নজরুল ইসলামের কারণেই গ্রহণযোগ্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আগে বলা হতো, তুমি মুসলমান, তুমি বাংলায় বলো! এইরকম ধারণা ছিলো। একজন লোক একই সাথে মুসলমান এবং বাংলায় কথা বলতে পারে এটা নজরুল ইসলামের চেয়ে এতো সুন্দর করে কেউ বলতে পারেনি। নজরুল ইসলামের কাছে আমাদের ঋণের কোন শেষ নাই। আমি নজরুল ইসলামকে আবিস্কার করেছি দুইভাবে। এক হলো, আহমেদ ছফার মাধ্যমে; দুই হলো, আব্দুল কাদিরের মাধ্যমে। আমার বইটাকে আমি দুইজনকে উৎসর্গ করব ভেবেছি। আব্দুল কাদির ও আহমেদ ছফাকে। আব্দুল কাদির নজরুলকে দেখেছিলেন। নজরুল ইসলাম আব্দুল কাদিরের প্রথম কবিতার বই ‘দিলরুবা’, সেটা আপনারা পড়েছেন কিনা জানিনা, এর রিভিউ লিখেছিলেন। নজরুল ইসলাম কত সুন্দর করে বলেছিলেনÑ আব্দুল কাদির হচ্ছে সেই ধরণের লোক, যাদের গান গাওয়ার সময় ভালো নাও লাগতে পারে, কিন্তু অনেক সময় যখন কেটে যায় তখন গানটি বাজতে থাকে কানের ভেতর। আব্দুল কাদিরকে আমি এখন আরো বেশী ভক্তি করতে শুরু করেছি। আব্দুল কাদির একজন খাঁটি লোক ছিলেন। যেসব লোকগুলোকে আমি পছন্দ করতেছি তার জন্য প্রিয়ম পালের কিছু অবদান আছে। একজন হচ্ছেন ড. এনামুল হক, বিশেষ করে ড. এনামুল হককে আবিস্কারের ক্ষেত্রে প্রিয়মের অবদান আছে। আব্দুল কাদির, ড. এনামুল হক, জসিম উদ্দীন এই জেনারেশনটা আসলে যেটা চর্চা করেছিলেন সেটাই দর্শন। আমরা তাকে দর্শন বলে চিহ্নিত করি। প্রিয়মকে আমি দুই কারণে সম্মান করি। সে দর্শন বিভাগে পড়াশোনা ছেড়ে দেবার দুঃসাহস রাখে। প্রিয়মের বন্ধু হচ্ছে আমার ভাইয়ের ছেলে-লেলিন। সে ঢাকা ভার্সিটির ৪ বছরের পড়াশোনাকে লাথি মেরে দিল্লীতে ইতিহাস পড়তে গিয়েছে। এই মোরাল সাহস কিন্তু আজকালকের ছেলেমেয়েদের নেই। লেলিন বহুদিন আমাদের সাতে আলোচনা করেন নাই, লেলিন আর আমি কিন্তু একই পরিবারের লোক, এক খানার লোক; সে কিন্তু কোনদিনই বলেনি, চাচা, আমি এই পড়লেখাটা বাদ দিচ্ছি। সো হি টুক হিজ ডিসিশন অন হিজ ওন, আমার সমর্থন সে চায় নাই, আমি বলি এটাই দর্শন। দর্শন মূলত অ্যাকশনের মধ্যে। প্রিয়ম পালের সেই সাহটা আছে। তবে বাদ দেওয়ার দর্শনটা আছে কিন্তু গ্রহণ করার দর্শনটা নেই।

যাই হোক আব্দুল কাদির ও আহমেদ ছফা এই দুইজনের প্রভাবে আমি নজরুল ইসলামকে পুনঃআবিস্কার করেছি; এটা বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই।
তাবরেজী: এই বইটা তাহলে বড় ঘটনা!

সলিমুল্লাহ: বড়-ছোট জানি না; তবে বাঙালীদের সাথে আপোষ করার জন্য আপনার মতো আমারও বুদ্ধি আছে। আমি হচ্ছি কাজির বিচার দিয়ে… লোকে এটাকে মাসুদ রানার বই মনে করতে পারে, সেই জন্য আমি একটা সাব টাইটেল দিয়েছি, নাম দিয়েছি “নজরুল ইসলাম বোধিনী”। বোধিনী কথাটা কোথা থেকে নিয়েছি বলি, যেহেতু আমার আগের বইয়ের নাম ছিলোÑ ‘আহমেদ ছফার সঞ্জিবনী’। এটা জাতীয় সাহিত্যের দুই নম্বর বই হবে। ঐটা তো ছিলো এক নম্বর বই। আমার মতে, বোধিনী শব্দের ইংরেজী অর্থ হলো ক্রিটিক। আমাদের দেশের লোকজন ক্রিটিক শব্দের অর্থ সমালোচনা মনে করে। সমালোচনা মানে তো সমান আলোচনা নয়, সম্যক আলোচনা। এমনকি আলোচনা শব্দটা কত সুন্দর বাংলা শব্দ, খেয়াল করেছেন! আমরা বলি আপনি পুরা চোখে দেখবেন, চোখ ভরাইয়া দেখবেন। চোখকে যতখানি বিস্তৃত করে দেখা যায়।

আমি কার্ল মাকর্সের আত্মজীবনীর প্রথম অনুবাদ যখন পড়ি, সেটা পূর্ব জার্মানির এক ভদ্র মহিলার করা ছিলো। আমি পশ্চিম বাংলার অনুবাদ পড়িনা। সেখানে লিখেছেÑ হেগেলের আইন দর্শনের সমালোচনী- ‘এ ক্রিটিক অফ হেগেল ফিলোসফি’। তখন ক্রিটিকের অনুবাদ সমালোচনা আমার মনের মধ্যে আসেনি। তখন থেকেই আমার মধ্যে এসেছে এটা হবে বোধী। কিভাবে আমরা ট্রেডিশান থেকে শব্দ পাই! আমাদের ভাষায় আসলে সবই আছে কিন্তু আমরা চিনতে পারছি না, সেটা কি ? আমরা যে নোট বই পড়তামÑ ‘সবুজ সাথী বোধিনী’; আর আমাদের পাঠ্যবইয়ের নাম ছিলো ‘সবুজ সাথী’। আমার চিন্তা ছিলো এই বোধিনী শব্দটিকে উদ্ধার করতে হবে। তো আমি নাম দিয়েছিÑ ‘নজরুল ইসলাম বোধিনী’।

আমাদের সাহিত্যে মানে বাংলাদেশের সাহিত্যে নজরুল ইসলাম হচ্ছেন পশ্চিম বঙ্গের লোক; এটা ভুললে চলবে না। বর্ধমানের একটা দরিদ্র মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। আমাদের বিখ্যাত লেখক, সত্যজিৎ রায় যার বই ফিল্ম বানাইছে-বিভূতভূষণও ছিলেন দরিদ্র ব্রাহ্মন পরিবারের সন্তান। তিনি যে চরিত্রটা আঁকছেন, কুঁড়েঘর; সেটা সেই দরিদ্র ব্রাহ্মনের। নজরুলের বাবা ছিলেন দরিদ্র মাওলানা। কাজী ফকির আহমেদ, দেখেন নজরুলের জীবনিতে বাবার কথা কিছু পাওয়া যায় না। নজরুল খুবই অভিজাত কিন্তু দরিদ্র পরিবারে জন্মেছেন। ঐ বিভুতিভূষনের মতোই। আমি ঐ বইটা অনেকবার পড়েছি ইংরেজী অনুবাদে। পথের পাঁচালী, অসাধারণ একটি বই। এরকম বই বাংলায় খুব কম লেখা হয়েছে। এই রকম আমাদের এখানে আরেকজন লেখক জন্মেছে তিনি হলেন আহমেদ ছফা, যাকে কেউ খেয়াল করেনি! সে অনেকটাই আননোন ছিলো। হিজল, আপনি নিশ্চয়ই তার “কবি ও স¤্রাট” কবিতাটি পড়েছেন। যদি না পড়ে থাকেন তাহলে আপনার জীবন পনের আনা মিছে। আমি বলি, আহমেদ ছফা আমাদের কবিদের মধ্যেও শ্রেষ্ট। কিন্তু এটা বললে এখন আমাকে সবাই পাগল বলবে, তার ‘কবি ও সম্রাট’, অন্য লেখা বাদ দেন। আমি পাকা লেখা যা লিখেছি ০৩২

তারচেয়ে বিশগুণ কাচা লেখা লিখেছি। আমরা যারা দুর্ভাগ্যবান তারা কাচা লেখাগুলা প্রকাশ করেছি আর আপনারা যারা ভাগ্যবান তারা কাচা লেখাগুলো প্রকাশ করেননি। পার্থক্য একটাই। যাই হোক আমি বলছি নজরুল ইসলাম বর্ধমানের লোক, আহমেদ ছফা চট্টগ্রামের লোক। চট্টগ্রাম হচ্ছে প্রাচীন আরাকান রাষ্ট্রটা বাংলা সাহিত্যের কাছাকাছি এলাকা। আহমেদ ছফার মধ্যদিয়ে কিন্তু আলাওল পুনর্জন্ম লাভ করেছে। মজা কি জানেন, এটা কেউ জানে না। দিস ইজ এ ফান। আহমেদ ছফার দীর্ঘ ইন্টারভিউ করেও, দীর্ঘদিন বসেও, সাজ্জাদ শরীফ সেটা বুঝতে পারেননি। আহমেদ ছফা সাজ্জাদ শরীফকে বই উৎসর্গ করেছিলেন! এটা কি কেউ জানেন- খানিক দ্বিধার সহিত, খানিক বিশ্বাসের সহিত। ব্রাত্য রাইসু আপনাদের সমবয়সী। ভালো কবি। কিন্তু সেও আহমেদ ছফার সাথে এতো মিশেছে, এতো ইন্টারভিউ নিয়েছে; তবুও তারা তাদের মাপে আহমেদ ছফাকে ছোট করেছেন (আমি তাদের নাম বলছি এই কারণে তারা একটি বই লিখেছেনÑ ‘আহমেদ ছফা বললেন’)। আহমেদ ছফার মুল কথাগুলো না লিখে ফালতু কথাগুলো লিখেছেন। স্বাভাবিকভাবে আমরা সবাই ফালতু মানুষই। তার পরে না আমরা মহৎ মানুষ। তারা আহমেদ ছফার বাহ্যিক ব্যাপারগুলো লিখেছে, কিন্তু মনের কথাগুলো লিখতে পারেনি। ঐ যে আহমেদ ছফা সব সময় বলতেন, এই মিয়া, ১০ সেরের মধ্যে ৫ সের রাখা যায়, ৫ সেরে মধ্যে ১০ সের রাখা যায় না। রাইসু একটা ৫ সের লোক, আহমেদ ছফার সেই ১০ সের সে রাখতে পারেনি। এইজন্য তাকে তারা তুচ্ছ মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছে। তারা আহমেদ ছফার স্পর্শে বুঝে উঠতে পারে নি যে, তারা মহা দার্শনিকের স্পর্শ পেয়েছে। এইটা যদি তারা বুঝতে না পারে…, এইটা তো শুধু তাদের কথা নয়, আমাদের সারা দেশই সেটা বুঝতে পারেনি। আমি কোন দিন ভুলব না, আহমেদ ছফা যেদিন মারা গেলেন, আপনার হয়তো মনে নেই, সেদিন প্রথম আলো পত্রিকা শেষের পৃষ্ঠার আগের পৃষ্ঠায় একটা ছোট্ট কলামে তার মৃত্যু সংবাদ ছাপা হয়েছিলো। ইতিহাসের এই কলংক কখনই অপনয়ন করা যাবে না। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই আহমেদ ছফা মারা গেলেন। ২৯ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকাটা দেখুন। এই যে একটা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান… আপনার কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে কী লাভ! যেখানে জাতির শ্রেষ্ট সন্তান আহমেদ ছফাকেই চিনতে পারলেন না।

আমার শেষ কথা হচ্ছে এই, এখন বাংলা সাহিত্যে যুগান্তর আসছে- যেটা আপনারা পোষ্ট মর্ডানিজম বলছেন, কেউ আর নজরুল ইসলামের মত কবিতা লিখছে এটা আমি বলতে চাচ্ছি না কিন্তু নজরুল ইসলাম এখন প্রতিশোধ নিয়ে ফেরত আসছেন এই হিজল যোবায়েরের মধ্যে, আপনার মধ্যে এবং আরো তরুণদের মধ্যে। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের নাম নিতে হয়। গোমেজ অত্যন্ত ভালো বাংলা লেখে। কিন্তু গোমেজেরও একটা গোমেজ আছে! সে সিগনেফায়ারের উপর যে দখল অর্জন করেছে কিন্তু সে সিগনেফাইডকে খুঁজে পায়নি। অর্থাৎ সে অর্থহীন শব্দ লিখতেছে। তার পশ্চাৎ সে পাচ্ছে না। সে শব্দের প্রেমে শব্দ লিখতেছে।

রোমেল আমাকে প্রশ্ন করলো, আমাকে যারা প্রভাবিত করেছে বা আমি যাদের কাছে ঋনি তাদের মধ্যে এক নাম্বার হচ্ছে আহমেদ ছফা, দুই নাম্বার লাঁকা, তো রোমেল আমাকে উকিলের প্রশ্ন করল ০৩৩

আহমেদ ছফা কি আপনাকে চিনতে পেরেছিলো? আমি তো অবাক হয়েছি! কারণ ছায়া তো পূর্বগামী। তবুও আমি আহমেদ ছফার গল্প বললাম। আমাকে তো তার চিনবার প্রয়োজন নেই (আমি তার চেয়ে বয়সে ছোট নয়, প্রজ্ঞায় ছোট, বিদ্যায় ছোট)।

২০০১ সালের জানুয়ারী মাসে আহমেদ ছফা আমাকে ফোন করে বললেনÑ সলিমুল্লাহ, আমি তোমাকে একটা বই উৎসর্গ করতে চাই (ফেব্রুয়ারী মাসের দুই-এক দিন আগে)। বইয়ের নাম-‘উপলক্ষ্যের লেখা’। মনে মনে ভাবছি, বিদেশ থেকে আসলাম। চাকরী-বাকরী নেই। আপনার বইয়ের উৎসর্গ পাতায় আমার নাম ছাপা হলে আমি তো বর্তে গেলাম! আমি বললাম, ছফা ভাই আপনি আমাকে বই উৎসর্গ করবেন সেটা কি জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি! এক সপ্তাহ পর আবার ফোন পেলামÑ বললেন, সলিমুল্লাহ আমি দুঃখিত, তোমাকে বইটা উৎসর্গ করতে পারছি না। আমার একটা পুরনো বন্ধু ছিলো, নাম আনিস সাবেত। ও কানাডায় মারা গেছে, খুব মেধাবী লোক ছিলো। ওকে কোন বই উৎসর্গ করা হয়নি। বইটা বেরিয়ে গেছে, পরে উনি আমাকে একটা কপি দিয়েছে। বইটি বের করেছিলো শ্রী প্রকাশ, আজিজ মার্কেট। প্রকাশক ছিলেন শিব নারায়ন দাশ। উনি আবার বললেন, সলিমুল্লাহ ভুল হয়ে গেছে, আনিস সাবেতকে আগে একটা বই উৎসর্গ করেছিলাম। এই বইটি তোমাকে উৎসর্গ করতে পারতাম। আমাকে আর বই উৎসর্গ করা হলো না। উনি পাঁচ মাসের মধ্যেই মারা গেলেন।

যে প্রশ্নটা আপনি করেছিলেন, আমাদের দেশের ইতিহাসকে আমাদের দেশেরে দর্শনকে আহমেদ ছফা যেভাবে বুঝেতে পেরেছিলেন সেভাবে আর কেউ বুঝতে পারেনি। অন্তত আমার চেনা কেউ বুঝতে পারেনি। আহমেদ ছফা কিভাবে বুঝেছিলেন, সেটা একটা কথা দিয়ে বোঝাইÑ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য আমাদের বুদ্ধিজীবিরা বোঝেননি। তারা মুক্তিযুদ্ধের ভেতর পতিত হয়েছিলো। আহমেদ ছফার সেই বিখ্যাত বাক্য যা আমরা সবসময় উদ্ধৃতি দিয়ে বলি, “বুদ্ধিজীবিরা যা বলেছিলেন তা শুনলে দেশ স্বাধীন হতো না; আর এখন যা বলছেন সেটা শুনলে সমাজ কাঠামোর আমুল পরিবর্তন সম্ভব নয়”। আহমেদ ছফা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে পেরেছিলেন। অনেক বুদ্ধিজীবি মনে করতেন, জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আহমেদ ছফা বলেছিলেন, ভারত যে বহুজাতি, এটা তার স্বীকৃতি। ভারত যে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত সেটা নজরুল ইসলামও মানেননি, আহমেদ ছফাও মানেননি। এখনও বাংলাদেশ যে সংগ্রামে আছেন (দিল্লী-ঢাকা) এটার মর্মকথা আহমেদ ছফার চেয়ে ভালো বাংলাদেশের কোন বুদ্ধিজীবি বোঝেননি। আমাদের বাংলাদেশে যারা অল্প বিদ্যার রাজনীতি করেন (মানে অল্প পানির পুটি মাছের মতো) তাদের কথা না শুনে আহমেদ ছফার কথা যত তাড়াতাড়ি শুনতাম ততই মঙ্গল হতো।

তাবরেজী: আপনার “আমি তুমি সে” থেকে একটা লাইন দিয়ে শেষ করি, বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি সেটা এক ধরণের অসুস্থতাই আমি মনে করি। কোন না কোনভাবে আমরা একটা দুঃখীভাব ফুটিয়ে তুলি। মানে ভাবটা এমন যেনÑ ‘এ জীবন নিয়ে আমি কী করিব!’ দেখা যায়, বাড়িতে খাবারটা ভালো হয় নি, আমরা আমাদের বউ বা বাচ্চাকে বলছিÑ ‘এ জীবন নিয়ে আমি কী করিব!’ এই অবস্থা থেকে আমরা একটু আশার বাণী চাই। এই জন্য নজরুল ইসলামকে এতদিন পরেও আমি ক্যারি করার চেষ্টা করছি। এই যে জীবন আমরা নিতেছি, আমরা কি ভাল কিছু দেখবো না?

সলিমুল্লাহ: আগে একটা সংশোধন প্রস্তাব আনি। এখন এই কথা ছিল বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের, বঙ্কিম এ জীবন নিয়ে যাহা ভাবিয়াছিলেন তাহা করতে পারেন নি। তিনি অন্য কিছু করেছেন। আমরাও যা ভাবিব, তা করিব না। বঙ্কিম বাংলাদেশকে একটা বাঙালী রাষ্ট্র না করে একটা হিন্দু রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে আমরা বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভেতর দিয়ে গেছি। লোকে অনেক সময় মনে করে ঘটনাই চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু এটা সব সময় সত্য নয়। চিন্তাও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বঙ্কিমের চিন্তা মানে বঙ্কিম যে শ্রেণীর বা কাস্টের প্রতিনিধি তাদের চিন্তা। আমাদের ইতিহাস এই প্রসেসের মধ্যে দিয়ে গেছে, এদের মধ্যে ওরিয়েন্টিজম আছে, ইংরেজী শাসন আছে, সবগুলো সংক্ষেপে বলছি।

এখন আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে আমরা কোথায় যাব? আমি এ জন্য আজকের আলোচনাটা শুরু করেছিলাম ১৯৭১ সাল থেকে। ১৯৭১ এর ঘটনা শুধু নাটকীয় ঘটনা মাত্র নয়, একটা দার্শনিক ঘটনাও বটে! এখানে আপনাকে একটা দাঁড়ানোর জায়গা দিয়েছে নজরুল ইসলাম। ৭১ সালে আমরা কোথায় পরাজিত হয়েছি জানেন? যুদ্ধাপরাধীরা শাস্তি পায়নি, সেটা নয়। ৭১ সালে কত লোক মারা গিয়েছে সেটা নিয়ে মানুষজন তর্ক করে…। এই যে ভাষা না বোঝার ত্রুটি এইটা। যেমন আপনি চেকের মধ্যে লেখেন দশ হাজার টাকা। ইংরেজিতে লেখেনÑ টেন থাওসেন্ড টাকা। থাওসেন্ডস লেখেন না কেন? কিন্তু যখন লেখেন মিলিয়নস অফ পিপল ডাইড, তখন লিখছেন কেন? মিলিয়ন শব্দটি দুইভাবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ্য বা নাউন হিসেবে যখন ব্যবহৃত হয় তখন বহুবচন হবে না। সংখ্যার কোন বহুবচন নাই। এইজন্য আপনি লেখেনÑ টেন থাওসেন্ড টাকা, নট টেন থাওসেন্ডস টাকা, টু লাখ টাকা, নট টু লাখ্স টাকা। আমরা যখন বলি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩ মিলিয়ন লোক মারা গিয়েছে, ৩০ লাখ লোক মারা গিয়েছে, প্রায় লোকই ধরে নিয়েছে এটা সংখ্যা হিসেবে বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা তো জানি, অগুণিত লোক মারা গিয়েছে। এটা গণা যাবে না, এটা সংখ্যা না। এটা ম্যাটাফোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা সিগনিফায়ার, এটাকে বলে এমটি সিগনিফায়ার। কত লোক মারা গেছে? আপনি বলবেন অগুণতি লোক মারা গেছেনে। মানুষ কিন্তু অগুণতি কথাটা বুঝতে পারেনা। এইটা এবাষ্ট্রাক কথা, মূর্তি কি? ৩ লাখ। অনেক লোক আছেনা, গ্রামের লোক, কূড়ি পর্যন্ত গুণে আর গুণতে পারে না। আমাদের ভাষার মর্মটা যদি আমরা বুঝতাম! এই যে ডেভিট বার্গম্যান বলে সাংবাদিক নিয়ে যে মামলা হলো, সেটার মর্মে কিন্তু এই জিনিসটা আছে। কতলোক মারা গেছে? যখন ০৩৪

পাকিস্তান সরকার সরকারী রিপোর্ট হল বলছে ২৬ হাজার লোক মারা গেছে। পাকিস্তানে নিয়োজিত একজন গবেষক মিস শর্মিলা বোস বলছেন ৩০ হাজার। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে… যদি জরিপও করতাম! আহমেদ ছফাও লিখেছে, আমিও লিখেছি, আমাদের একটা জরিপ করা দরকার ছিলো। তার মানে জরিপ হয়নি বলে কি আমরা বলবো আমাদের এতো লোক মারা যায়নি। আমরা বলবো আমাদের অগুণিত লোক মারা গেছে। অগুনিতকে যদি আপনি একটা মুর্তি দিয়ে বলেন তখন সেটাকে ৩ লাখও বলা যাবে, দশ লাখও বলা যাবে। বাঙালী মুসলমানরা যখন বলে, লাখে লাখে সৈন্য মরে, চলে কাতারে কাতার। তখন মুনির চৌধুরীও হাসাহাসি করেছে, আহমেদ ছফাও হাসাহাসি করেছে। মানে বাঙালী মুসলমানদের অপরিপক্কতার প্রমাণ আছে। আরে আশ্চর্য! এখানে অপরিপক্কতার কি হলো! এখানে তো মেটাফোর ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক লোক। চল্লিশ হাজার যে অনেকের প্রতীক মানে ইনফিনিট এটা বুঝতে পারলেই আর ঝামেলা হতো না। এজন্য বলছি এজ নাম্বার, এজ নাউন। নাম্বারের প্লুরাল হয় না, নাউনের হয়। আমরা এখানে এটা ব্যবহার করেছি নট এজ নাম্বার বাট এজ নাউন। নাউন মানি মেটাফোর। এই জন্য আমরা বলি এটা এত এত…। তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনও লিখিত হয়নি। আমি মাত্র পড়া শুরু করেছি। এটা অসাধারণ এক মহাকাব্য। কিন্তু আশ্চর্য আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ এতো কম প্রতিফলন কেন! এইখানেই আহমেদ ছফার গুরুত্ব।

আহমেদ ছফা জীবনে মাত্র আটটি উপন্যাস লিখেছেন, সবগুলো মিলিয়ে এক ভলিউম হবে, কিন্তু এর কোনটিই মুক্তিযুদ্ধের বাইরের নয়। আহমেদ ছফা মুক্তিযদ্ধের গুরুত্ব আগেই বুঝেছিলেন। আমাদের একটা বড় প্রভলেম হচ্ছে সাব-ভার্সন, নিম্ন বর্ণ বা অন্য বর্ণ হতে লোকজন মুসলমান হয়েছে বাংলায়, তাদের বেদনাটা কি, আপনারা সিরাজগঞ্জের মানুষ যেটাকে বেদ্না বলেন, সেইটার সমস্যা কি- সেইটা আহমেদ ছফা সূর্য তুমি সাথী বই-এ লিখছেন। আহমেদ ছফার বয়স তখন কত? ৬৮ সনে লিখছেন, তাইনা? তার পরে তার যে লেখা, মুক্তিযুদ্ধের উপর অন্যান্য উপন্যাসগুলো, ওঙ্কার থেকে শুরু করেন আপনে। উনি অপেক্ষা করছেন, উনি কিন্তু আইসাই লেখেননি। ‘পাথেয়’ বলে একটা গল্প লিখেছিলেন, অসাধারণ একটি গল্প; তারপর ওঙ্কার লিখেছেন। মরনবিলাশ বলেন, পুষ্প-বৃত্ত-বিহঙ্গই বলেন অথবা গাভী বৃত্তান্ত বলেন; এরকম একজন সাহিত্যে লেখক এদেশে জন্মেছে, অথচ এদেশের লোক কিছুই জানেন না, একেবারে নীরব। এর চেয়ে বিষ্ময়কর, এর চেয়ে স্যূররিয়েল, এরচেয়ে ম্যাজিকরিয়েল ঘটনা আর হতেই পারে না। অথচ আশ্চর্য! এ জন্য আমি বলি কি আমাদের এখানে আমাদের যুগের নায়ক হচ্ছে আহমেদ ছফা। এবং এইটাই হচ্ছে দর্শন। আপনার সাথে আমার আলোচনা শুরু হয়েছিল দর্শন কি জিনিস। দর্শন মানে ঐ আমিনুল ইসলামের ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যাবে না, গোবিন্দ্র চন্দ্র দেবের ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যাবে না। দর্শন পাওয়া যাবে আহমেদ ছফার উপন্যাসের পাতায়। জার্মানীরা একটা শব্দ বলত সাইট ক্রাইস্ট; সাইট মানে টাইম, ক্রাইস্ট মানে স্পিরিট, স্পিরিট অফ দ্যা এইজ। একটু রোমান্টিক কথাটা; গ্যাটের মিক্সার পাবেন কিছুটা এবং ইট ইজ নট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট দ্যাট আহমেদ ছফা ওয়াজ এ গ্রেট অ্যাডমেয়ারার অব গ্যাটে; হু ইনভেন্ট দ্যা ট্রাম ভেলচ লেটেরেচু। গ্যাটে আবিস্কার করেছিলেন বিশ্বসাহিত্য কথাটা এবং সেটাও ১৯ শতকের গোড়ার দিকে। আহমেদ ছফা এর মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন। আহমেদ ছফা যাকে বলা যায় অ্যান্টেনা।

বাঙালিদের মধ্যে একমাত্র গ্রীক ছিলেন আহমেদ ছফা। রবীন্দ্রনাথেরও কিছু গুন ছিলো, রবীন্দ্রনাথকেও ছোট করা যাবে না। আহমেদ ছফা ওয়াজ এ গ্রেট অ্যাডমেয়ারার অব রবীন্দ্রনাথ। এটা ভুল করলে ভুল হবে। এটা মনে রাখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক ধরনের বলা যায় স্কুজো ফিনিয়ার, আই সে ইট ইন সাইকো এনালাইসিস ট্রাম। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ড. জেকিল এবং মি. হাইডের মত, দুইটা ভাগ করা। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটা নোবেল সাইট ছিল। সেইটা নিয়ে তার গ্রীক…., রবীন্দ্রনাথের দুই খন্ড-এ প্রবন্ধ আছে, পড়ে দেখতে পারেন, যেগুলো তার বাবার যে ব্রাহ্ম ধর্মের ব্যাখ্যা তারই অনুকরণ। এইটা হচ্ছে আমাদের দেশের দর্শন। রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন আমাদের দেশের সবচেয়ে ভাল দার্শনিক। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ভালো দার্শনিক আর নেই। অরবিন্দকেও অনেকেই বলে থাকেন কিন্তু অরবিন্দ নস্যি রবীন্দ্রনাথের তুলনায়। আমি অরবিন্দের লেখা পড়েই বলছি আপনাকে, উনিও অনেক লেখাপড়া জানতেন, কিন্তু লেখাপড়া জানাটাই আসল কথা নয়। রবীন্দ্রনাথকে দেখছেন ভবগত গীতা নিয়ে বেশী লেখা নাই- এগুলো সব সিমটোমেটিক, রবীন্দ্রনাথ কি লেখেন নাই…। সাইলেন্স সামটাইম স্পিচ। রবীন্দ্রনাথ তার বাবার গদ্য অনুকরণ করতেন। তার বাবার গদ্যকেও আমি খুবই ভালো গদ্য মনে করি। কিন্তু তার বাবার গদ্য লিখিত হয়েছে ১৮৯৮ সালে। বঙ্কিমের সর্বজয়া তখন লেখা হয়ে গেছে। তার বাবা আগেও ভালো গদ্য লিখতেন। তার চিঠি পড়লে বোঝা যায়। কিন্তু আমরা যখন বলি অক্ষয় কুমার দত্ত ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যরীতি। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী ও ব্রাহ্ম ধর্মের ব্যাখ্যা তার প্রধান গদ্য। এগুলো তার পরিপক্ক বয়সে লেখা। ১৮৬০ এর পরে। তখন মধুসুদনের আবির্ভাব হয়েছে; বঙ্কিমের গদ্যগুলো লেখা শুরু হয়েছে এবং তার আত্মজীবনী যখন লেখা শুরু হয় বঙ্কিম চন্দ্র অলরেডি মারা গেছেন। তো আমরা বঙ্কিমকে দিয়ে শেষ করি।

তারিখ: ১২/০৬/২০১৫
আলোক চিত্র: অনিকেত রেজা। ০৩৫

সলিমুল্লাহ খান ১৯৫৮ সালে ১৮ই আগস্ট কক্সবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। চিটাগাং ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর চিটাগাং কলেজে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করেন। ১৯৭৬ সালে প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী আহমেদ ছফা-র সাথে পরিচয় হন। যিনি তাকে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৮৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায়ে অনুষদ শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য মার্কিন দেশে যান। দেশে ফেরার পর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-এ অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

দেশের বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকগুলোতে নিয়মিত প্রবন্ধ লিখছেন তিনি। তার প্রধান লেখার বিষয় ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্য এবং মনো বিশ্লেষণ। উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ, বাংলা সাহিত্য, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়েও তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ, রোহিঙ্গা সমস্যা, লালন শাহ, রামপ্রসাদ চন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, রোকেয়া শাখায়াত হোসেন, আহমেদ ছফা, আবুল হাসান, চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং তার সমসাময়িক বেশ কয়েকজন কীর্তিমান বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেছন। এছাড়া চার্লস বদলেয়ার, ওয়াল্টার বেনজামিন, মিশেল ফুকো, ফ্রেঞ্চ ফেনন, ক্লদ লেভিষ্ট্রস, এডওয়ার্ড সাইদ, তালাল আসাদ প্রমুখ দার্শনিকের দর্শন বিষয়ে পান্ডিতপূর্ণ ধারা বিবরিনি করেছেন।

তার উল্লেখযোগ্য বাংলা অনুবাদকর্ম প্লেটো জেম র‌্যানেল, জ্যাক লাঁকা, চালর্স বদলেয়ার, ফ্রেঞ্চ ফেনন এবং ডরতি সলিই। সলিমুল্লাহ খান ‘সেন্টার ফর এশিয়ান আর্টস এন্ড কালচার’ (কাক) এবং আহমেদ ছফা রাষ্ট্র সভার সাথে নিবিরভাবে কাজ করছেন। তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্তসেন এর বাংলা গদ্য এবং অর্থনীতির কিছু চিরায়ত আলোচনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সলিমুল্লখানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: “জঁষব ড়ভ ঞড়ৎঃঁৎব, জরঃবং ড়ভ ঞবৎৎড়ৎ ধহফ ঃযব গরৎৎড়ৎ ড়ভ ঋধংপরংস: অ ঋঁৎঃযবৎ ঞৎরনঁঃব ঃড় ঋৎধহঃু ঋধহড়হ” রহ গফ. ঝযধৎরভঁষ ওংষধস (বফ.), ঐঁসধহ জরমযঃং ধহফ এড়াবৎহধহপব; ইধহমষধফবংয (ঐড়হম কড়হম: অখজঈ): ৩১-৫০ (২০১৩), আল্লার বাদশাহী (অনুবাদ কবিতা গ্রন্থ, পুনর্মুদ্রন- ২০১২), স্বাধীনতা ব্যবসা (প্রবন্ধ- ২০১১), আহমেদ ছফা সঞ্জীবনী (প্রবন্ধ-২০১০), প্লেটোর নির্বাচিত কর্ম, ভলিয়ম-১ (পুনর্মুদ্রন-২০১০), আদম বোমা (প্রবন্ধ-২০০৯) ইত্যাদি।

PaidVerts