আমি ছাড়া নজরুলকে এভাবে কেউ মূল্যায়ন করেনি আমি জীবন দিয়ে করেছি –...

আমি ছাড়া নজরুলকে এভাবে কেউ মূল্যায়ন করেনি আমি জীবন দিয়ে করেছি – ফিরোজা বেগম ।। নাসির আলী মামুন

ভাগ
PaidVerts

ফিরোজা বেগম: ১৯৪০-৪৫ সালে তখন আমি খুব ছোট। ৪০-৪৫ থেকে ৬০-৬২ পর্যন্ত প্রতিবন্ধকতার কষ্ট আমি ভোগ করেছি। আমি পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি খুব সাধারণভাবে সঙ্গীত চর্চা করেছি। খুব দুঃখ, অনেক বেদনা বুকের ভেতর জমা রেখে আমি গানের চর্চা করেছি একান্তভাবে। এত একান্তভাবে যে আমার সে সাধনার জগতে কেউ নাই। আমি একা। পরবর্তীতে আমি যাকে সাথী হিসেবে পেলাম, যে আমার সারা জীবন সহায়তা করেছেন, তিনি হচ্ছেন আমার গুরু। আমৃত্যু তিনি আমাকে যেভাবে গাইড

করেছেন আমি সেভাবে চলতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি আমার স্বাভাবিক কথাগুলি, গায়কী, ইচ্ছা-ভাব এবং কণ্ঠের কিছু বৈচিত্র্যে বাধা দেননি।

নাসির আলী মামুন: ডিকটেট করেন নাই।

ফিরোজা: আমার যে একটা জন্মগত নিজস্ব যে ধারাটা যেটা আমি নিজের সাধনায় তৈরি করেছিলাম সেটাকে উনি শিক্ষার মধ্য দিয়ে লালন করেছেন।

মামুন: সেজন্য হয়ত অনেকে বলেন, বিশেষ কইরা যারা নজরুল গীতি করেন, গবেষণা করেন এবং হয়ত পরোক্ষ ভাবে আপনাকে উপেক্ষাও করেন তারা, হয়ত বলেন একমাত্র কমল দাসগুপ্তের কারণেই ফিরোজা বেগম এত বড় শিল্পী হইছেন নয়ত এতবড় সিঙ্গার হতে পারতেন না। এই বিষয়টাকে কিভাবে দেখেন?

ফিরোজা: ক্ষতি কি? ভাল কথাতো। এটাতো আনন্দের কথা, আমার গর্বের কথা। এতবড় একজন সমস্ত ভারতবর্ষে তথা উপমহাদেশে এই রকম একটা গ্রেট মিউজিসিয়ান, কম্পোজার, সিঙ্গার, এতগুলি গুণ সম্পূর্ণ মিউজিক ডিরেক্টর তো আমার মনে আপনি কি জানেন দ্বিতীয় আরেকজন আছে কিনা? খবর নিয়ে দেখুন, যে তিনি কি করতে পারেন? তার স্থানটা কোথায়। আমি যত ছোট ছিলাম যে, তার ঠিক শিক্ষার যে গতিটা এবং প্রাচুর্যটা ধরে রাখার মত সে বয়সও তখন আমার ছিলনা। কালক্রমে যদি আমি তার যোগ্য উত্তরসূরি বা তার প্রতিভার সামান্য ছাপও যদি পড়ে থাকে সেটাতো-

মামুন: গর্বিত হওয়ার ব্যাপার…

ফিরোজা: হ্যাঁ, ঠিক, তুমিতো শুনছই। যে প্রশ্নটা তুমি করলে আমি গর্ব বোধ করছি সে প্রশ্নটার জন্য। কিন্তু এর সঙ্গে একটা কিছু বলা চলে যে, আমি আমার জন্মসূত্র অনেক কিছু নিয়েই জন্মেছিলাম।

মামুন: তাইলে কথাটা এমন দাঁড়ায় যে কমল দাশগুপ্ত আপনার জীবনে আসল। তার মত এতবড় প্রতিভা, তার সাথে আপনার যোগাযোগ না ঘটলেও আপনে বড় শিল্পী হইতে পারতেন?

ফিরোজা: সেটা আমি বলতে পারব না। তার কারণ এরকম একটা জিনিস আমি কল্পনাও করতে পারব না। কারণ অপ্রাপ্ত বয়সে, খুবই অল্প বয়সে কমল দাসগুপ্তের সুরারোপে, তিনি হচ্ছে চিফ মিউজিক ডিরেক্টরের পরিচালনায় আমি এত অল্প বয়স থেকে রেকর্ড করেছি যে আমার কিন্তু আর অপসন ছিলনা যে আমি আলাদাভাবে নিজেকে কিছু করব।

মামুন: খালাম্মা একটু ঐ প্রসঙ্গের সময়টা বলবেন কিভাবে তার সাথে পরিচয়, যোগাযোগটা হইলো?

ফিরোজা: কাজী নজরুল ইসলামই ওনাকে ডেকে আমার গান

শুনিয়েছিলেন।

মামুন: সেইটা কোন সন?

ফিরোজা: এটা হচ্ছে ৪২ এর প্রথম ভাগ। এই হচ্ছে কাজী সাহেবের সঙ্গে আমার যোগাযোগ।

মামুন: তখন আপনের বয়স কত?

ফিরোজা: আমি গান শুরু করেছি নয় থেকে বারো।

মামুন: আইচ্ছা কিভাবে পরিচয়টা হইল আপনে বলেন। তখন কি আপনে জানতেন যে এতবড় মিউজিসিয়ান?

ফিরোজা: সেই দিন সরাসরি হয়েছিল বললামতো। কার সঙ্গে যোগাযোগ?

মামুন: কমল দাসগুপ্তের সঙ্গে?

ফিরোজা: কাজী সাহেব যখন আমার গান শুনছিল অনেক জ্ঞানী-গুণী ছিল সেখানে। সেখানে হঠাৎ উনি ডেকে পাঠালেন যে কমল দাসগুপ্তের ঘর আলাদা ছিল। উনি তখনই চিফ মিউজিক ডিরেক্টর হয়েছেন। এইচএমভি-র এবং ডেকে পাঠালেন, ডেকে নিয়ে এলে তখনই তাকে প্রথম দেখলাম আমি। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলেন, চলে গেলেন। তারপর আমার প্রথম রেকর্ডটা হল, দ্বিতীয় রেকর্ডেই যে চিঠিটা পেলাম তাতে উল্লেখ ছিল যে, এই রেকর্ডেও ট্রেইনার, সুরকার কমল দাসগুপ্ত। তাতে আমি খুব ভীত হলাম। আমি বুঝতে পারলাম না যে আমি গান শিখিনি টিচার নাই। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নাই। আমি সরাসরি বলেছি যে আমার চারটে রেকর্ড হয়ে গেছে কিন্তু আমার কোন সঙ্গীত শিক্ষক বলে কিছু ছিল না। এমতাবস্থায় আমি কিন্তু কোনদিন চাইনি যে আমি এত অজ্ঞ অবস্থাতে কমল দাসগুপ্তের ছাত্রী হই। কিন্তু কোম্পানী আমাকে এত বেশি জড়িয়ে ফেলল। এত তাড়াতাড়ি অনেক রেকর্ড করতে শুরু করল যে গান শেখার কোন অবকাশই আমি পাচ্ছিলাম না। কিন্তু সূত্রে সংক্ষেপেই বলতে হয় যে কমল দাস গুপ্ত এবং চিত্ত রায়, যিনি কাজী নজরুল ইসলামের প্রধান সহকারী ছিলেন, অনেকে এটা উল্লেখ করে না কিন্তু আমি পঞ্চাশ বছর যাবত সাক্ষাৎকার দিচ্ছি আমি এটা বারম্বার বলি যে চিত্ত রায় বলে একজন ছিলেন যাকে নজরুল ইসলাম তার নিজের সুর করা গান নিয়ে বললেন অমুক আর্টিস্টকে তুলিয়ে দাও। এটা কর। ওটা কর। এটা আমি দেখেছি। তো চিত্ত রায়কে নিয়ে আমার দুটো গান রেকর্ড হয়েছে, তারপর থেকে কমল দাসগুপ্তের ট্রেইনিং – এ ছিলাম।

মামুন: কমল দাস গুপ্তের সুরের প্রথম গানের কলি আপনের মনে আছে?

ফিরোজা: হ্যাঁ। ‘তুমি যদি চাহ মোরে’। আধুনিক গান। একদিকে এটা ছিল আরেকটা ছিল ‘কভু পাই, কভু পাইনা‘। ‘তাই কাদে ভালবাসা‘। তারপরই উর্দু গান ছিল ‘সে পিয়ার ভারে, প্রিত ভারে গীত সুনাউ‘। অসংখ্য গান, তারপর সেই অনেক গান জনপ্রিয় হয়ে গেল।

মামুন: ফরিদপুরে তো আপনের জন্ম?

ফিরোজা: ফরিদপুরে জন্ম, খুব সাধারণভাবে জীবন শুরু।

মামুন: আপনের জন্ম তারিখ?

ফিরোজা: জন্মতারিখ বলব কেন?

মামুন: সনটা না, তারিখটা।

ফিরোজা: ৩০ এর পরে আমার জন্ম। জন্ম এইতো সামনে ২৮ শে জুলাই জন্মতারিখ।

মামুন: খালাম্মা ফরিদপুরের কথা একটু বলেন। ছোটবেলার…, কোন স্কুলে পড়লেন? কিভাবে কোলকাতা গেলেন? আমার জানামতে আপনে বোধহয় কোলকাতায় আপনার দুলাভাইয়ের বাড়িতে উঠছিলেন।

ফিরোজা: না, উনি তখনও আসেননি উনি তখন থাকতেন সেই …। উনার কাছে প্রথমে আসিনি। আমার মামারা এবং কাজিনরাই গান বাজনার ব্যাপারে প্রথমে উৎসাহিত করেছেন।

মামুন: কোলকাতায় যাওয়ার আগেইতো ফরিদপুরে চর্চাটা ছিল?

ফিরোজা: ফরিদপুরে আমরা ভাইবোনরা মিলে থাকতাম। আমার আব্বা-মার মনটা খুব উদার ছিল। কালাচারাল এ্যাক্টিভিটিজটা তাদের ভিতরে অত্যন্ত প্রবল, পারিবারিকভাবে সবসময় ছিল। এসব প্রভাব আমার মধ্যে খুব বেশি করে পড়ল। আমি দেখলাম যে আমার আব্বা গান পছন্দ করেন, মা সুন্দর গান করতে পারেন, এত পর্দানশীল!

মামুন: উনি কি ধরনের গান করতেন?

ফিরোজা: আমার মা খুবই, তখনকার দিনে যাদের রেকর্ড বেরত তাদের কঠিন সমস্ত গান, যেগুলো এখনো সবাই আয়ত্তও করতে পারেনা আমার মা সেই গান করত। আমার মার কণ্ঠে খুব ভাল লাগত ‘মলয় আসিয়া বলে গেছে কানে, প্রিয়তম তুমি পেলে না’। যদি ভুল না বলি বোধ হয় এটা আঙুর বালার গাওয়া, তারপরে গাইতেন ‘প্রিয়তম তুমি এলে না, এলে না’।

মামুন: আপনে নিজেও এইসব রেকর্ড শুনতেন বাসায়। তার মানে আপনেদের বাসায় কলের গান ছিল?

ফিরোজা: কলের গান ছিল। কলের গানটা কোন এক সময় বোধহয় ভাল ছিল। পরে আমি ছোটবেলায় যখন দেখলাম তখন ডিফেকটিভ, ওটাকে ভাড়ার ঘরে ফেলে রাখা হয়েছিল। তো সেখান থেকেই আমি কালো মোটা মোটা গানগুলিÑ তখন বুঝি যে সেসব গানের রেকর্ডে কার গান ছিল সতী দেবী, শাহানা দেবী, বিন্দু বালা, আশ্চর্যময়ী দাসী।

মামুন: তখন গান গাওয়া মুসলমান পরিবারে প্রতিবন্ধকতা ছিল…।

ফিরোজা: গান করে থাকি সেটাতো অন্যায় হতে পারেনা! তো সেইদিন থেকে আমি অন্তত ক্ষমা চাইতে পারি। কারণ এটা আমি পেশা করেছি। এটা আলটিমেটলি পেশা করতে বাধ্য হয়েছি। আমি কিন্তু গান শিখিনি নাম করার জন্য, যে আমার কবে সুখ্যাতি কে করবে, আমি কবে জনপ্রিয় হব তার জন্য গান শিখিনি। আমার বাবা-মা কোনদিন আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব রেডিও স্টেশনে, যত সোর্স আছে সেখানে ঘুরে আমাকে পুস করেননি। এটা অন্যের থেকে ব্যতিক্রম। যতগুলি আর্টিস্ট দেখবে সমস্ত পরম্পরা। হয় কারো মেয়ে, না হয় কারো ছেলে এবং বাপ-মা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে। বাপ-মা চায় আমার মেয়ে নাম করুক, আমার মেয়ে এই করুক, তারপরে পেশা, তারপরে পয়সা। তারপরে বাড়ি গাড়ি সব। কিন্তু কোনদিন তোমরা, ভুল করেও কেউ যেন না ভাবো যে আমি তাদের দলে। আমি একেবারে ব্যতিক্রম। আমি গান শিখেছি আমার প্রাণের তাগিদে, আমি গান গেয়েছি স্বতস্ফূর্তভাবে। সেখানে কোন শিক্ষকের প্রয়োজন হয়নি। আমার কানে যা এসেছে আমি তাই বলেছি। সেই শোনাবার ক্ষমতাটা আমাকে আল্লাহ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ সে ক্ষমতা যাকে প্রদান করেন সেটা যদি আমি চর্চা করে থাকি এবং সেটা কতটা ভাল উদ্দেশ্যে করেছি সেটাতো আমি জানি। সেই জন্য কখনো গ্লানি বোধ করিনা। কষ্ট হয়েছে অনেক।

মামুন: কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না?

ফিরোজা: প্রতিবন্ধকতাটা এল যখন আমি বড় হয়ে গেলাম, স্বাভাবিকভাবেই আমি এ্যাডাল্ট হচ্ছি। পারিবারিক দুশ্চিন্তা বেড়েছে সবার। আমার এ্যাটিচুড, এটা ঠিকই জানি না এ প্রসঙ্গে এ কথা আসে কিনা, আমার চলাফেরা, জীবনযাত্রা, ব্যবহার, সময় কাটান, আমি কি করছি ইত্যাদি এত ইমপোরটেন্ট ছিল। যদি কেউ আমাকে তখন অবজারভ করে থাকে, বুঝতে চেষ্টা করে থাকে, অনুসরণ করে সে বলতে বাধ্য এ কোন ঐ বয়সের মেয়ের জন্য ঐটা স্বাভাবিক না।

মামুন: শুধুমাত্র সঙ্গীতের জন্য?

ফিরোজা: শুধু সঙ্গীত না। ধর যতদিন মানুষ স্কুলে পড়ে তখন এমন কোন বিষয় নাই যাতে আমি অংশগ্রহণ করি নাই এবং প্রথম স্থান অধিকার করি নাই।

মামুন: সাঁতারও কাটতেন স্কুলে?

ফিরোজা: সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি তিনবার। সব অস্বাভাবিক মনে হয়না?

মামুন: যারা গান গায় তারা কখনো এক্সারসাইজ কিংবা খেলাধূলা করে না সাধারণত।

ফিরোজা: আমি ব্যাডমিন্টন রেগুলার খেলতাম। এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে কতগুলি খেলাধুলা যেগুলি আমার ভাইয়েরা করত, আমরা করতাম। আমার আব্বা-মাও এতে অংশগ্রহণ করতেন। সুতরাং বাড়ির ভেতরে ছিল তিনটা ভাগÑ বহির্ভাগ, অন্দরমহল আর পুকুর ও বাগান।

মামুন: এখনও আছে বাড়িটা?

ফিরোজা: এখনও আছে। এখন একটু চাপা মনে হয়। আমার আব্বার চেম্বারের পাশে এত গোলাপ! আব্বার এত শৌখিনতা ছিল গোলাপের যে কোলকাতা থেকে আনাতেন। আমিও সেখানে যাই মাঝে মাঝে। এমন গোলাপের বাগান। সেখানে অন্য কোন গাছের স্থান নেই। লোকে বলত খান বাহাদুর সাহেবের গোলাপ বাড়ি। একেকটা মানুষের সৌন্দর্য ডেভেলপ করে তার মা-বাপের অ্যাক্টিভিটিজ থেকে। এটা বড় হয়ে ইনভলবড হলাম। বললাম আমার এইটুকু জায়গায় কেউ আসতে পারবেনা। আজ আলাদা আমার বাগান করব। আমার বাগানে সবচেয়ে প্রাধান্য পেত রজনীগন্ধা। সেগুলো যখন শীষ তুলে একেবারে ফুটত, আমার হাইটে আসত তখন আমি কাছে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা মুখে মুখ লাগিয়ে থাকতাম। মা বলতেন, বাড়িতে কি আর কোন ফুল নেই? এটার সাথে তোমার এতই বন্ধুত্ব? আমি বলতাম মা এর কেন ডাল নেই? অনেক প্রশ্ন করতাম। আমার প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? কেউতো দিতে পারছেনা। পরে পড়াশোনা করে, অবজারভ করে জেনে জেনে শেষ পর্যন্ত আমার কপালে, “ওরে শুভ্র বসনা রজনীগন্ধা বনের বিধবা মেয়ে” সেইখানে এসে আমি একেবারে একাকার হয়ে গেলাম। তখন আমি বলি তাই বাঁধন মানুষ একটা স্টেটে হয়, তারপর তার গুণাবলী কিভাবে ফোটে। ঠিক উপর দিয়ে এরকমই হয়। পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হয়েছে ছোটবেলায় রাজকীয় ব্যাপারও বলতে পারব না, মিথ্যাও বানিয়ে বলতে পারবনা। আমি বলবনা যে আমি তখনও অসাধারণ গান করি। আমি যা শুনি আমি তাই করি। কেউ তখন জানেনা যে আমার এই সুর কোথায় গিয়ে থামবে, বা আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তারপরে সামনে কি অন্ধকার না আলো।

মামুন: আপনে নিজেও জানতেন না?

ফিরোজা: অসম্ভব কি করে জানব? পথ নেইতো। যেখানেই যেতে চাই পথ রুদ্ধ। স্কুলের চ্যাপ্টার শেষ হয়ে গেল, আমার অনেক এ্যাক্টিভিটিজ কমে গেল।
মামুন: ফরিদপুরে কোন স্কুলে আপনি পড়তেন?

ফিরোজা: আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়।

মামুন: আপনারা ক’ ভাইবোন ছিলেন?

ফিরোজা: আমরা সাত ভাইবোন।

মামুন: কয় ভাই? কয় বোন?

ফিরোজা: চার ভাই, চার বোন। আসলে জীবিত সাতজন।

মামুন: এক ভাই মারা গেছে?

ফিরোজা: একেবারে প্রথম যিনি তিনি মারা গেছেন।

মামুন: আপনে প্রথম যে কোলকাতায় গেলেন ফরিদপুর থেইকা-

ফিরোজা: কোলকাতায়তো দূরের কোন ব্যাপার ছিলনা।

মামুন: প্রথম কোলকাতা গেলেন কোন বছরে? কার সাথে, কিভাবে?

ফিরোজা: এইটাতো বলা মুশকিল। আব্বার সাথে প্রায় প্রায় বেড়াতে যেতাম। বোনের বিয়ে, মায়ের অসুখ নিয়ে যেতাম। কোলকাতাকে কখনো মনে হয়নি যে এটা আলাদা জায়গা।

মামুন: গানের জন্য প্রথম কবে গেছেন?

ফিরোজা: গানের জন্য আমি যাইনি। গিয়েছিলাম একটা সামার ভ্যাকেশনে, অনেক আত্মীয় ছিল।

মামুন: আপনাকে কিভাবে শনাক্ত করল মিউজিক কোম্পানী?

ফিরোজা: আমি যে ঐরকম গান করতে পারতাম। সবাই মিলিত হয়ে কথায় কথায় উঠত। তখন আমার মামাত, খালাত, চাচাত ভাই প্রত্যেকে পরিবর্তীতে এত নাম করেছিলেন, সবাই চিনত। মামাত ভাই কোলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। তারা অনেক কিছুর সাথে যুক্ত ছিল। ওরা বলত, ও যে এরকম করে গান করে ওকে একটু নিয়ে গেলে হয় কোথাও। এভাবেই। আমাকে কিন্তু বলা হয় নাই যে আমি কাজী সাহেবকে গান শোনাতে যাচ্ছি। আমার যে বয়স তখন কাজী নজরুল ইসলামের বিরাট প্রতিভার খবরাখবর আমার কাছে থাকার কথা না। আমি থাকি ফরিদপুরে আমি কি করে জানব সঙ্গীতে যে তার অসাধারণ অবদানই যে কি ব্যাপ্তি লাভ করেছে এটা উপলব্ধি করার মত বয়স আমার হয়নি! এখন মেয়েরা কত মিডিয়ায় কথা শোনে। আমাদের তো সে স্কোপ ছিল না। সরাসরি অনুষ্ঠানে সেদিন যে সাক্ষাৎকার দিয়েছি তা কিন্তু

অসমাপ্ত। অন্তত দুটো তিনটে সাক্ষাৎকার হলে হয়ত পুরো কমপ্লিট হতে পারে আমার লাইফ। শুধু বাল্যকালের কথাটাই ওখানে বলতে সময় পেয়েছি। একটু একটু করেই ছোটবেলার কথা বলছিলাম তার ভিতর থেকেই ঐ যে ব্যাপারটা জঘন্য রূপ নিল!

মামুন: এই প্রসঙ্গে আমরা আসতেছি। কিন্তু আমি আপনাকে বলি কমল দাসগুপ্তের হয়তো একটা পর্ব থাকবে আমাদের লেখার মধ্যে।

ফিরোজা: কন্ট্রাভার্সিয়াল ব্যাপার নিয়েই খালি কথা বলছ। কেন তোমরা কমল দাসগুপ্তকে নিয়ে আলাদা করে করনা কেন?

মামুন: তাঁর মৃত্যুর ২৫ বছর হইয়া গেছে কিন্তু তাঁর সম্পর্কে…

ফিরোজা: ২৭ বছর। ২০শে জুলাই তার ম”ত্যুবার্ষিকী। জন্ম কিন্তু তার আর আমার একই দিনে।

মামুন: তাঁর সম্পর্কে প্রচুর লেখা দরকার, আর জানানো দরকার।

ফিরোজা: তার ছবি দিয়ে তার লেখা এবং ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের কি অপিনিয়ন সেটা দিয়ে তার মৃত্যুবার্ষিকীটা যদি মতিউর রহমান করেন আমি খুব খুশী হব। আমি খুব ব্যথিত হই যে দেশে কানাই লাল শিলের জন্মদিন পালন হয়Ñ তুমিতো রেকর্ড করছ?

দেখ, এই কথা অনেকবার বললাম। অনেক লোক ছিলেন, কিন্তু কাউকেই চেহারায় চিনি না। কিন্তু আমাকে যিনি কাছে ডেকে বসালেন, আমি বসলাম কিন্তু বার বার তার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। যতলোক ঘরের ভিতর আছেন এই লোকটি আলাদা।

মামুন: কি পোশাক ছিল কাজীদার পরনে?

ফিরোজা: লোকটা আলাদা কি জন্য? তার চুলটা কান পর্যন্ত, কোকড়া কোকড়া চুল। অনেক কবিই পৃথিবীতে একটু অসাধারণ ছিল। রঙ্গিন এবং অন্যরকম পোশাক তারা পরেন, কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর চুলের জন্য কত টিটকারিই না দিয়েছে। আমি এটা বুঝলাম না যে উনার ঝাকড়া চুল নিয়ে পড়েছি, কিন্তু লোকে এইরকম কেন? কাজী নজরুল ইসলামের খুব ভাল চুল ছিল। তাঁর পারসোনাল ব্যাপার। যা ছিল তা ছিল। উনার ইচ্ছা। যাই হোক, পাশে বসে বার বার মুখ তুলে তুলে দেখছিলাম মাথায় একটা টুপি একটু গেরুয়া রং এর পোশাক, উনি বসা ছিলেন। সুতরাং আমার যতটুকু মনে হয় উনি পায়জামা পাঞ্জাবী পরা ঘরভর্তি লোকের মধ্যে একেবারেই আলাদা। খুব হাসি হাসি মুখ। বড় বড় চোখ, চোখে একটা গোল ফ্রেমের চশমা। আর সুন্দর। পোশাক পরিচ্ছদে সবকিছুতে তিনি আলাদা ছিলেন। এটা ফোরটি ওয়ানে।

থারটি নাইন ফোরটিতে মিলিত ভাবেই দুই তিনবার দেখা হয়েছে আমার সঙ্গে। তিনি আমাকে বেশ আদর করে বললেন যে, তুমি কোত্থেকে এসছ, কোন কাসে পড়। বললেন ‘তুমি কি গান করতে পার? ‘চুপ করে ছিলাম। আমার মা বললেন যে পারে। ‘তুমি যে গান কর বাড়িতে কেউ কিছু বলে না?’ বললাম ‘না’। তারপরে বললেন যে, ‘আমাদের খুব ইচ্ছে করছে যে আমরা তোমার একটা গান শুনি’। তখন স্বাভাবিকভাবে একটু অস্বস্তি বোধ করছিলাম। মানসিক প্রিপারেসন ছিল না এত লোকের মধ্যে গান করব। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এলে গাইতে বললে গেয়ে দিতাম। ওটা যে এইচএমভির রিহার্সেল রুম ওটাতো জানলাম কত পরে। সত্যি কথা বলতে গেলে ছোট শহরের মেয়েতো, রিহার্সেল রুম বুঝলাম মোটামুটি এখানে আর্টিস্টরা আসে, গান গায়। আমাকে ব্যাখ্যা করে বলাও হল অনেক পরে। কাজী সাহেব জানে যে আমি গান জানি এবং করব, উনি শুনবেন। চুপ করে রইলাম কতক্ষণ। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি আমরা শুনব’। আমি মাথাটা কাৎ করে সম্মতি জানালাম। মামাও ইশারা করলেন। গান গাও। গাইলাম, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কি গান শোনাব ভাববার সময় পাইনি। যেটা মনে এল সেটাই শুরু করলাম। গানটা উনি শুনলেন, শুনে চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথা ঠিক ছিল কিনা। শুনে উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কি? কি রকম শুনলে?’ আমিতো ভারি অবাক হয়ে গেলাম। আমি তো ভাবলাম রেকর্ড বাজল। তার একটা কারণ রেকর্ডে যেখানে যতটুকু রিপিট আমি ততটুকু রিপিট করেছি আর যেখানে থেমে যাওয়া সেখানে থেমে গিয়েছি। এইভাবে গানটা শোনালাম।

মামুন: আপনের সাথে কি কোন ইন্সট্রুমেন্ট ছিল?

ফিরোজা: কিচ্ছুনা। উনি বললেন কি, ‘আমি তো ভারি আশ্চর্য হয়ে গেলাম এত কঠিন গান তুমি কি করে তুললে?’ তখন তাকে পুরো ব্যাখ্যা দিতে হল, যে আমি কিভাবে গান তুলেছি। শুনলেন। খুব ইন্টারেস্টিং মনে হল তাদের কাছে। ‘এরকম কত গান তুমি তুলেছ?’ আমি আর কোন উত্তর দিলাম না সে কথার। তারপর আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, ‘বাড়িতে কেউ কিছু বলেনা?‘ বললাম ‘না’। ‘তুমি আর কি কি কর?’ সব বললাম। কিন্তু এত কথার উত্তর কেন দেব? অস্বস্তি বোধ করছি। উনি আবার অন্যদের সাথে কথা বলছেন। তারা সকলেই নামী দামী মানুষ বসা। বললেন কি যে, ‘মেয়েটির তো অদ্ভুত ক্ষমতা, আচ্ছা আমাদের না আরেকটি গান শোনার খুব ইচ্ছা। তুমি কি হারমোনিয়াম বাজাতে পার?’ আমি বললাম ‘পারি’। তখন উনি হারমোনিয়ামটা নিজের হাতে টেনে আমাকে দিলেন। এরপর কাকে যেন বললেন, ‘একটু কমলকে ডেকে নিয়ে এসতো।’

এই যে কমলকে ডাকতে বললেন যখন তখন আমি পট করে তার মুখের দিকে তাকিয়েছি। কারণ আমি একটা রেকর্ডে সম্প্রতি এই নামটা দেখেছি। আমিতো তখন ঐ সময় কে সুরকার, কে ট্রেইনার অতকিছু জানি না। শুধু নামটা রেকর্ডে দেখেছি। যাই হোক মনে হল কিছুক্ষণ পরে কেউ এসে পড়ল। তখন আমি তাকিয়ে দেখলাম খুব সুদর্শন স্বাস্থ্যবান একজন লোক চুপ করে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে, তখন নজরুল ইসলাম বললেন যে ‘কমল, দেখ কি অদ্ভূতভাবে গান তোলে। আমরা তো একটা গান শুনেছি, এখন আরেকটা গান শুনব তোমরা শুনে দেখ।’ আমি কতক্ষণ ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপরে তখনও আমি কাপলিং হারমোনিয়াম দেখিনি যে একটা রিড টিপলে আরেকটা লাফিয়ে ওঠে বা নড়ে। দুবার তিনবার ট্রাই করে দেখলাম যে এত হবেনা। বললাম না, আমি বাজাবনা, এটাতো নষ্ট, খারাপ, তখন যে উনি একটা হাসি দিলেন, উনি বুঝতে পেরেছেন যে এই জিনিসে আমি অভ্যস্ত না, বললেন- ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার বাজাতে হবে না, রেখে দাও।’ এমনিই খালি গলায় গাইতে বললেন। গান করলাম ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা, শুধু চোখে দেখা দিতে এসো না’। পুরোটা শেষ করিনি একটু বাকি ছিল। আমি থেমে গেলাম। আমার খুব অস্বস্তি লাগল, এই হচ্ছে শুরু। তারপরে তিনি অনেক কিছু বললেন, যেকথা বার বার বলি, বলতেও লজ্জা করে। উনি বললেন যে, আমি এত খুশী হলাম যে এইচএমভির রিহার্সেল রুমে আমি একটা বাঙ্গালী মেয়ে দেখলাম… ‘তো তুমি আবার আমার কাছে যখন ইচ্ছা আসবে।’ আমার আত্মীয় স্বজনকেও বললেন, ‘আরেকদিন নিয়ে আসবেন? মেয়েটির গান শুনে সবাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি। যত তাড়াতাড়ি হোক ওর জন্য কিছু করতে পারি কিনা দেখি?’ আমাকে বললেন, ‘আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারি কিনা তাতো জানি না, তবে তোমরা রইলে, ওকে দেখবে, ও কিন্তু অনেক নাম করবে। ওর যে নিষ্ঠা ওর যে ক্ষমতা জন্মগত, এ কিন্তু বৃথা যাবে না।’ তারপরে অনেকবার দেখা হয়েছে গানের ব্যাপারে কথা হয়েছে। ১৯৪২-এর প্রথমমার্ধেও দেখা হয়েছে।

মামুন: তখন কি দেইখা মনে হইছে তাঁর মনে অস্থিরতা চলতেছে?

ফিরোজা: পরে আমি কমল বাবুর কাছে শুনেছি যে ৪২-এ তার যে পরিবর্তনটাÑ কমল বাবু এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে বেশ কিছুদিন থেকে অবজারভ করেছিলেন। ওনার অসুস্থ হওয়ার সময়টা উনি অবজারভ করছিলেন। উনি আমাকে দুঃখ করে বলেছেন যে, কাজী সাহেব কেমন করে আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়ে গেলেন, ‘আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের ঘর থেকে গিয়ে কিছুক্ষণ বসতাম, বলতাম কাজীদা শরীরটা ভাল নেই নাকি?’ কাজীদা খুব গম্ভীর হয়ে বলতেন যে, ‘নারে শরীলতো ভাল নেইই মনও ভাল নেই আমার।’ তারপর কমল বাবু একদিন দেখেছেন যে, কাজীদা অঝর ধারায় একটা ঘরে একা কাঁদছেন। তখন কমল বাবু কাজীদাকে ঘর থেকে এনে বললেন ‘কাজীদা আমার ঘরে চলেন, একটু কাজ আছে। আপনার সঙ্গে একটু বসতে হবে।’ উনি বললেন ‘আজকে নারে? অন্য আরেক সময় বসব।’ তারপর কমল বাবু বললেন, ‘আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে চলেন আমরা কোথাও গিয়ে একটু খাই দুজন মিলে?’ এইভাবে ওনাকে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করতেন। কমল বাবু এত ব্যস্ত তখন! তিনি বলতেন ‘এত ব্যস্ততার মধ্যেও কাজীদার জন্য খারাপ লাগত। কাজীদার কি যেন একটা হতে যাচ্ছে কারণ তিনি সুস্থ নেই।’

দু’একদিনের ভিতরেই ফট করে ঢুকে কাজীদা বলছিলেন, ‘কালকে কি কাজ আছে বলছিলে।’ তিনি বললেন যে, ‘কাজীদা বসুন, আপনার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।’ কাজীদা বললেন যে, ‘আর কথা কি? কই তোমার খাতাটা কই?’ আপন মনে বসে বসে খুব সময় নিয়ে একটা গান লিখলেন। লিখে বললেন, ‘এই নাও।’ গানটা পড়া হল। কমল বাবুর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বললেন, ‘কাজীদা এইরকম গান কেন লিখলেন? আমার বড় কষ্ট হচ্ছে।’ ‘খেলা শেষ হল, শেষ হয় নাই খেলা’ এই গানটা লিখলেন এবং এর মধ্যে কতগুলো লাইন ছিল যেগুলো নিজেকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলেন। নিজের একটা অবস্থাকে ব্যক্ত করেছিলেন। পরে কমল বাবু সেটা রিরাইট করে, গান আকারে সুর করে সেটা আমিই রেকর্ড করেছি। আমার আগে কেউ করেছিল কিনাÑ হয়ত করেছিল।

মামুন: কোন সময় রেকর্ড করলেন?

ফিরোজা: ’৬৫-৬৬ এ বোধ হয়। অনেক পরে। আমি ভেবেছিলাম আর কেউ হয়ত করবে। যখন দেখলাম আর কেউ এটা করছে না কমল বাবু বললেন, ‘যেসব গান, আমি সুর করে রেখেছি সেসব রেকর্ডিং এখনো হয়নি, তোমার এত এল.পি বেরোচ্ছে তুমি এইগুলি করে ফেল।’ তখন আমি করলাম, ‘খেলা শেষ হল।’

মামুন: কাজী নজরুল ইসলামকে তো অনেকবার আপনে দেখছেন, যখন উনি অসুস্থ হইলেন ঐ সময় দেখতে গেছেন?

ফিরোজা: ভায়োলেন্স যতদিন ছিল ততদিন আমি দেখতে যেতে চেয়েছি। কিন্তু চিত্ত রায় আমাকে বলছেন যেও না। তুমি এখন যেও না ওটা এত ভায়োলেন্স যে তুমি সহ্য করতে পারবে না। পরে যেও। পরবর্তীতে যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন ততদিন তার জন্মদিনে কোলকাতায় ঢাকায় সর্বত্র অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও নজরুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত ছিলাম, তাদের সুখ দুঃখে, শান্তি অশান্তি সবকিছুর সাথে জড়িত ছিলাম।

মামুন: কাজীদার সাথে আপনার পুরনো আগেকার কোনো ছবি পাওয়া যায়? খুব বিখ্যাত একটা ছবি আছে, আপনি গান গাইছেন পাশে উনি বসা। সম্ভবত ’৭৩ এ তোলা বাংলাদেশে।

ফিরোজা: অনেক তোলা হয়েছিল কিন্তু কথা হচ্ছে এত তো জানি নাই তাকে নিয়ে এতকিছু কেউ… আমাকে দেয়ওনি। আর আমার তখন নিজের জীবনে এত ব্যস্ততা এত সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যে জীবন কাটিয়েছি যে কে ছবি তুলল, গান কে শোনাচ্ছে, কে না শোনাচ্ছে খেয়াল রাখিনি। দু’ এক জন আর্টিস্ট আছে যখন জন্মদিন পালন হতে লাগল নিজে যায় সঙ্গে করে ফটোগ্রাফার নিয়ে যায়, ছবি পেলে সংগ্রহ করে। কিন্তু আন্তরিকভাবে তো বাড়িতে যাওয়া, অসুস্থ প্রমীলা নজরুল-এর জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া, তাকে ঘন্টার পরে ঘন্টা কথা বলা, অনেক কথা শোনা…।

পারিবারিক অনেক না জানা কথা, শোনা। নজরুল ইসলামকে ঘন্টার পরে ঘন্টা আমি অবজারভ করা…। তাকে আমি যে কত গান শুনিয়েছি। প্রমীলা নজরুলের মৃত্যু পর্যন্ত। তিনি মারা যাওয়ার পরেও তার পরিবারের সকলের সঙ্গে আমার এমন হৃদ্যতা ছিল। নজরুলের গানের সঙ্গে তার ছেলেরা ও পরিবার যুক্ত হতে লাগল। কারণ তখন আমি, অল ইন্ডিয়া রেডিওতে আমার রেকর্ডও হচ্ছে।

মামুন: আপনেতো সুস্থ অবস্থায় কাজীদাকে গান শোনাতেন, প্রশংসা করলেন উনি কয়েকবার। আপনে বললেন প্রমীলার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে গান শোনাতেন উনি কি তখন রেসপন্স করতেন বা বুঝতে পারতেন?

ফিরোজা: হুম্। আমি গেলেই প্রমীলা বলতেন ‘ফিরোজা কাজী সাহেব আজ বেশি উতলা।’ ওনার একটা ভাব ছিল উনি অস্থিরতা প্রকাশ করতেন। ফিট হয়ে যাওয়ার মত হতেন। সে সময় প্রমীলা নজরুল বলতেন ‘ফিরোজা তুমি একটু গান কর ওকে একটু শান্ত করি।’ এরকম ঘটনা বহুদিন হয়েছে সে বাড়িতে, সত্যি উনি আস্তে আস্তে ধীরস্থির হলেন। খাট থেকে নেমে বসলেন, আমার পাশে। এসব ছবি যদি তুলে রাখতাম, ছবি তুলে রাখা না ভিডিও করে রাখলে অবিশ্বাস্য, আমি গেলেই মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন বলতে চাইতেন, অসম্ভব পাগলামি করতেন। আমি গান করছি, উনি খুঁজে খুঁজে কোত্থেকে কাগজ এনে হারমোনিয়ামের উপর রাখছেন, অবিশ্বাস্য ব্যাপার!ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। ‘আপনারা বলছেন তার ব্রেন কোন কাজ করেনা কিন্তু আমি গান করার সময় উনি আমার সামনে কাগজ বা খাতা বা বই তুলে দেন কেন?’ তার মানে তার প্রিভিয়াস অভ্যাসটা ছিল। যতবার আমি সরিয়ে রাখি উনি আবার দেন। মাঝে মাঝে পাতাও ওল্টাতেন। তাছাড়া হারমোয়িাম দেখলে উনি যে কি উৎসাহী আমি বলতাম, ‘আপনারা যে কি বলেন উনি কিছু বোঝেন না।’ তারপরে তো একদিন চিৎকার করে কথাটা বলে উঠলেন একটা, সকলে অবাক হয়ে গেল। কি একটা অসুবিধার জন্য গান করছিনা, উনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘গান’!

মামুন: ডাক্তারের কাছে যখন এইসব কথা বলতেন তখন তারা কি বলত?

ফিরোজা: বলতেন আমাদের ডাক্তারি পরিভাষায় সেটাতো ধরা পড়ছেনা। বললাম উনি আমাকে কমল বাবুকে চেনেন কি করে? কমল বাবুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন আর কি যেন বলতে চাইতেন। কমলবাবু কাছে বসে গায়ে হাত বুলিয়ে কত সন্দেশ খাইয়ে দিয়েছেন। ঢাকাতে আসার পরও বহুদিন নিয়ে যেতাম। উনি সন্দেশ খেতে খুব পছন্দ করতেন। কি সুন্দর খেতেন। যতদিন প্রমীলা নজরুল বেঁচে ছিলেন খাবার রেডি করলে উনি খাটের থেকে নেমে ওখানে গিয়ে বসতেন এবং সুন্দর পুরোপুরি খাবারটা খেতেন। আমরা যে মিষ্টি নিয়ে যেতাম, অন্য কিছুতো ডাক্তারের অর্ডার ছিল না। সন্দেশটা নিতাম। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে খাওয়াচ্ছি একটা দুটো, তিনটে ঠিক সন্দেশ খেয়ে যাচ্ছেন। কোন অসুবিধা তার নেই। মুখের কাছে গ্লাস ধরলে খাচ্ছেন এগুলো অবাক লাগত যে, অনেকদিন জন্মদিনে গলার ফুলের মালা আমাকে দিয়ে দিলেন। মনে আছে ‘মুসাফির মুছরে আখি জল…’ এই গানটি শুনে যেরকম অস্থির হতে দেখেছি ওনাকে, শুরু করলে থামতে পারিনা। এ যে কি মুশকিল, হারমোনিয়াম বন্ধ করতে পারবনা। চলছেই গান। প্রমীলা নজরুল রিকোয়েস্ট করতেন ‘ফিরোজা তুমি থেমো না’।

মামুন: আপনার বিয়াটা কোথায় হইলো, কত সালে?

ফিরোজা: সব বলা আছে।

মামুন: এখন আপনার জনপ্রিয়তা কেমন লাগে?

ফিরোজা: কেমন লাগে? এখন যদি বলি আমার কাছে উপেক্ষিত সাবজেক্ট তবে মনে হবে আমি এবনরমাল সবচেয়ে অভিভূত হয়েছি মানুষের আগ্রহ ও ভালবাসায়, শ্রদ্ধায়। গানগুলো স্মরণে রেখে যখন গাইবার অনুরোধ করে তখন, এগুলোতে আমি উৎসাহিত হয়েছি। অনেক প্রশ্নও করেছি। আমার এই ভয়াবহ জনপ্রিয়তা ঠিক সেই সময়ে যখন বাংলা গানের স্বর্ণযুগ শেষ হয় নাই। তখন আধুনিক সব ভাল ভাল শিল্পী জীবিত। একদিকে আধুনিক আরেক দিকে রবীন্দ্র সংগীত, দুটোর প্রবল আকর্ষণ যখন মানুষের মধ্যে তখন ঠিক মাঝখানে থেকে নজরুল সঙ্গীত নিয়ে গেছি, এসব খবর তোমাদের রাখতে হবে। কোম্পানী এত রেকর্ড কেন করেছিল সেখান থেকে জানবে। কত বিক্রি হলে তারা ইন্টারেস্ট নিয়ে এসব করেছে? কারণ তাদের ব্যবসা, তারা এখানে কাজী নজরুল ইসলামের জন্য কোন বিশেষ চিন্তা করে এটা করেনি। তার জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তা করলে তার গান বন্ধ হয়ে যেত না।

মামুন: আপনি এত বছর পরও মানুষের ভালবাসা পাইতেছেন, অনেক আগের গানগুলা যখন তারা শুনতে চায় তখন কেমন লাগে?

ফিরোজা: এইরকম কেমন লাগেটা-তো বহুদিন থেকে। পঞ্চাশ বছর উত্তীর্ণ হয়ে গেছি, ৬০ বছর চলছে। কেমন লাগায় ভাল লাগা। প্রশংসা তারপর…

মামুন: প্রশ্ন ছিল ফিরোজা বেগম হইলেন কি কইরা?

ফিরোজা: ফিরোজা বেগম হলাম যারা আমাকে আবিষ্কার করেছেন। আমাকে আবিষ্কারের জন্য যারা পরিশ্রমী যারা নিষ্ঠা দেখিয়েছে। আমার গান শুনেছেন রেকর্ড ও স্টেজ শো দেখে দেখে তাদের যে ধারণা হয়েছে তারা বিভিন্নভাবে যে পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন, সেই লেখার ভাষা, প্রশংসাগুলি কোনদিন আমাকে অহংকারী করেনি। সমস্ত প্রশংসাগুলি আমাকে উৎসাহিত করেছে। আমার অজানা একটা সাবজেক্ট, নজরুলের গান। এটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি যার ভবিষ্যত জানতাম না, কোথায় নীয়ে আমার শেষ হবে জানতাম না, জীবনের স্বপ্ন সফল হবে কিনা তাও জানিনা। আমার স্বপ্ন আমি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত শিল্পি হব। শ্রেষ্ঠ ঐ সেন্সে যে সবাইকে ছাড়িয়ে টাড়িয়ে যাব তা না, আমি যেন পরিপূর্ণভাবে একজন ভাল গায়িকা হতে পারি সেটা। সে স্বপ্ন কিন্তু এখনো অচল হয়নি। আমার অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল। আমার ধারণা ছিল সঙ্গীত শাস্ত্র বিষয়ক সমস্ত কিছু আমার জ্ঞানে সেগুলো থাকবে। কিন্তু এত প্রতিবন্ধকতা, এত বাধায় গান করেছি আমি যে অন্য কোন শিল্পীকে আমার মত মনে পড়েনা যে জীবনে এত সংঘাত সহ্য করে গান নিয়ে থাকতে পারে। আমার লাইফের শ্রেষ্ঠ সময়টা এত অশান্তি, বিপর্যয়ের মধ্যে কাটিয়েছি যে অন্য যেকোন মানুষের তার একটা কারণই যথেষ্ট গান ছেড়ে দেবার জন্য।

মামুন: বিপর্যয়ের দুই একটা ঘটনা বলবেন?

ফিরোজা: পারিবারিক বিপর্যয়, ব্যক্তিগত জীবনের বিপর্যয় এসব বলেতো লাভ নেই। মামুন: কমল দাস গুপ্তের সম্বন্ধে বলেন?

ফিরোজা: আমি বলব কেন? না, না যে অজ্ঞ লোকগুলি বসে আছে তারা বলুক না। তারা তো সব জ্ঞানী।

মামুন: উনিতো ভারতবর্ষের এত বড় সুরকার-

ফিরোজা: ভারতে গিয়েই ইন্টারভিউ নেন না।

মামুন: উনি কেন এইদেশে, ঢাকাতে আইলেন?

ফিরোজা: ভারতে সঙ্গীত জগতের লোকদের জিজ্ঞেস করুন বেঁচে তো আর কেউ নেই। তার হাতে তৈরি ছাত্র-ছাত্রীও ওনারা প্রায় শেষ, দু-একজন আছেন। কমলদাস ঢাকায় আসায় তারা এখানে উপেক্ষিত হলেন আর যাদের তৈরি করলেন তারাও মন থেকে প্রায় মুছে ফেলতে চাইল। শুধু কাননদেবী তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন কমল দাসগুপ্ত যে শিক্ষক, সুরকার ও মানুষ হিসেবে সবার চাইতে উপরে ছিলেন সেটা বোঝা যেত যখন তার কাছে গেলাম। কানন দেবীকেও তো তৈরি করলেন।

যার যা করণীয় সে তা করেছে। যার যার ধর্ম সে পালন করেছে। ধর্ম এই সেন্সে যা করণীয় ছিল তারা কিন্তু করেনি তা জানা দরকার নেই। আমি করলেই তো হল, এখানে জনগণ সবচাইতে বেশি ঋণী বাংলা গানের জন্য তিনি কমল দাসগুপ্ত। অহরহ তোমরা গান বাজাচ্ছ, বেআইনী ভাবে তার গান ব্যবহার করছ তার নামটাও উল্লেখ করনা। জন্মদিন মৃত্যুদিন পালন করনা। তিনি তো এদেশেরই ছেলে। যশোরে তার বাড়ি। এখনো বাড়ি রয়েছে ওখানে কালিয়া গ্রামে। তিনি আর উদয়শংকর কাছাকাছি এলাকার। তোমরা মাইকেল মধুসূদন, স্যার জগদীশ তাদের কথা স্মরণ করতে এখানকার বুদ্ধিজীবী বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই কর্তব্য কি পালন করেছে? করে নাই।

মামুন: কেন করে নাই? এই না করার পিছনে কি আছে?

ফিরোজা: হ্যাঁ ওরা তো কোন সংখ্যার কথা বলেনি। এখানে বিবৃতি প্রথম দিয়েছেন ওরা রফিকুল ইসলাম। তোমরাই বল না তিনি কি বলেছেন? বলো। তার কোন কথাটায় আমি অবজেকসন দিয়েছি? সংখ্যা টংখ্যা না, আমাকে সরাসরি প্রোগ্রামে আলী যাকের সাহেব শেষের দিকে জিজ্ঞেস করলেন যে, ‘আমরা তো জানি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক গানে কমল দাসগুপ্ত সুর করেছেন তাই না, বললাম, ‘জ্বী’। অনেক গানের সুর করেছেন, এই কথা বলার সময় দু’তিনবার কাট হয়েছে। যাই হোক, রফিকুল ইসলাম হচ্ছে নজরুল ইসলামের চাইতেও…! এরকম একটা কি বলেছি জানিনা। আমি আসলে কী বলতে চেয়েছি? নজরুল ইসলামের গানে অন্য যারা সুর করেছেন সুরকাররা, তাদের ভিতরে সর্বাধিক গানের সুরকার এই কথাটা বড় করে আন্ডার-লাইন করে রাখ, আমিই বলতে পারি এই কথা যারা এখানে নিজেদের বিশেষ কিছু মনে করেন তাদের চাইতেও অনেক বেশি কিছু যে, আমি জানি, সেটা তাদের মাথায় রাখা উচিত ছিল। অন্য জায়গায় সুর বহু লোকে করেছেন, তার মধ্যে সর্বাধিক করেছেন কমল দাসগুপ্ত এবং আমরা তার কাছে ঋণী যে এত ভাল ভাল গান উপহার দিয়েছেন।

মামুন: সেইখানে সংখ্যা ছিল?

ফিরোজা: সংখ্যার কোন প্রশ্নই ওঠেনা সেখানে। সংখ্যার নির্ধারণ এত দিনেও নজরুল ইন্সস্টিটিউট করেনি কেন? নজরুল ইন্সস্টিটিউট কেন একবারও উত্তর দিতে পারবেনা কে কটা গানের সুর করেছে, কোন কোন লোক করেছে? তা তোমরা কিছুতেই পেপারে দিতে পারলে না এই পরিসংখ্যান হয়নি। কেন? এটা তোমাদের প্রশ্ন, আমিতো প্রশ্ন করব আলাদা।

মামুন: আপনের সম্বন্ধে বলা হইছে যে আপনে নজরুলকে অবমূল্যায়ন করছেন।

ফিরোজা: নজরুলের অবমূল্যায়ন বলার মত স্পর্ধা ওনার থাকা উচিত না। কারণ উনি চেনার বহু আগে থেকে আমি নজরুল ইসলামকে শুধু মূল্যায়ন করার জন্য আমার জীবনের অর্ধেকের বেশি আমি অতিবাহিত করেছি। ওনার স্পর্ধাজনিত এই কথার আগেও প্রতিবাদ করেছি, এখনও করছি। এটা শুধু অজ্ঞতা নয়, স্পর্ধা যে আমি এবং সমগ্র দেশবাসী কিভাবে সহ্য করল কি করে? জ্ঞান-গুণী লোকের প্রতি সন্দেহ জেগেছে, যে এখনই আমি জীবিতবস্থায় এসব কথা বলা হয়, আমার মৃত্যুর পরে পুরো ইতিহাস বিকৃত করা হবে। আমি ছাড়া নজরুলকে এভাবে মূল্যায়ন কেউ করেনি, আমি জীবন দিয়ে করেছি। আমি যদি ফিল্মে গান করতাম, কোটি কোটি টাকা থাকত আমার। আমি না খেয়ে থাকতে রাজী আছি তবুও আমাকে দিয়ে কেউ ফিল্মে গান করাতে পারেনি কেন? কেন ভাল গান ছাড়া অশ্লীল কথায় গলা দেইনি কেন?

তোমরা রিপোর্টার হিসাবে অযোগ্য বলেই কোন দিন তুলে ধরতে পারনি। এটা তোমার ছাপাতে হবে যে তিনি বলেছেন ‘ফিরোজা বেগম বলবেন কি যে তার স্বামী কতগুলো সুর করেছে?’ এটার জন্য তোমরা কি করে দাড়াও? কমল দাসগুপ্ত কি ফিরোজা বেগমের পরিচয়ে পরিচিত? ওনার স্পর্ধা যে কমল দাসগুপ্তকে ছোট করে কথা বলে! উনি কি জীবনে কমল দাসগুপ্তের ঐ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন? সারা ভারতবর্ষে তার যে অবদান, অসংখ্য শিল্পী তৈরিতে, শিক্ষক হিসেবে যে অবদান, তার উপরে উনি কথা বলেন। উনার এত বড় স্পর্ধা কবে থেকে হল? এবং এই নজরুল… বিষয়ে আমার বাড়িতে বসে আমার একটা চেয়ারও নাই বসানোর। মাদুরের উপরে বা শতরঞ্জির উপরে বসে উনি দিনের পর দিন আমার গানের খাতা নিয়ে নির্দেশনা যখন প্রথম হাতে খড়ি নিলেন, সেই কাজ উনি করেছেন। সেই হাতে খড়ি উনি আমার আর কমল বাবুর কাছ থেকে নিয়েছেন। তারপরে উনি এতবড় বেঈমানি করলেন আমার সঙ্গে!

নজরুল ইন্সস্টিটিউটের যিনি নির্বাহী পরিচালক তারও বোঝা উচিত ছিল ঐ স্টেটমেন্ট দেওয়া উচিত হয় নাই। তিনিও অজ্ঞ। তিনি তার ইন্সস্টিটিউট থেকে কয়েকজন আর্টিস্টদের নিয়ে তিনি যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন সেটা যে ঠিক হয়নি। তার পর আসাদুল হক আরেকটা দিয়েছেন। তারটাও ঠিক হয়নি। আমার কাছে বহু প্রমাণ, বহু বইপত্র আছে। তবে ইনশাআল্লাহ্ আমি খুশী হলাম যে এতদিন পরে কমল দাসগুপ্তর অবদান নজরুল সঙ্গীতে কি সেটা বই স্কুলে আশা করি সঠিক পরিসংখ্যানটা এখন বের করতে পারবেন। এটা নজরুল ইন্সস্টিটিউটে যেন ছাপার অক্ষরে থাকে।

মামুন: আপনি ব্যক্তিগত জীবনে অবসর কিভাবে কাটান?

ফিরোজা: আমি অবসর সময়ে ভাল গান শুনি। ভাল গানের চর্চা করি, এখনো নিয়মিত সাধনা করি এবং হবি কিন্তু আলাদা। অবসরে শুধু পড়াশোনা ও গান শুনে কাটাই।

মামুন: কী ধরনের গান?

ফিরোজা: কী ধরণের? এখনও বহু গান তুলতে হয়, নজরুল সঙ্গীতও তুলতে হয়, যা এখন পাচ্ছি। বা আগে পাইনি; ইচ্ছে ছিল নজরুল ইনস্টিটিউটে অনেক কাজ করার সুযোগ হবে। কিন্তু সেগুলিতে প্রতি বন্ধকতা এরাই সৃষ্টি করেছেন। সেখানে আমার অভিজ্ঞতাটা কখনোই কাজে লাগাতে চাননি। সব সময় কন্ট্রোভাশিয়াল একটা ঘটনা সেখানে ঘটছে। তার কার তারা এমন কোন একটা দায়িত্ব দিয়ে আমাকে কাজ করাননি। নজরুল ইনস্টিটিউট বলতে পারেনা কেন কারা কে কে গান করেছেন। ওরা কয়জন যেন আঠারজন বলেছেন। আসাদুল হক বলেছেন ৪০ জন সুর করেছে, ওরাও বলেছে ৪০ জন করেছে। কিন্তু নাম দিতে পারেনি ৪০ জনের।

৪০ জনের মধ্যে হয়ত ইনক্লুডিং কমল দাসগুপ্ত। তার যে সংখ্যা দিয়েছেন তার চাইতে অনেক বেশি গান তিনি সুর করেছেন। কেন তারা ভুলটা করল? মিন্সিট্রিও এটা লক্ষ্য করছে না। আমি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, এটা বলেছি। আজেবাজে কথা কেন সহ্য করব। শ্রদ্ধেয় লোকদের শ্রদ্ধা করে কথা বলতে হয়। তিনি কমল দাসগুপ্তের অপমান করে কথা বলেছেন। সেটা জানার দায় ভার তোমাদের। তিনি কেন ফিরোজা বেগমের স্বামী বলেছেন… সারা দেশবাসীর কাছে এটা বলে রাখলাম, এত স্পর্ধা কি করে হয়। এটা সহ্য করনা। সঙ্গীত শিল্পীরা কিসের ভয় পায়? কাকে ভয় পায়?

মামুন: অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনে কাদের গান শোনেন?

ফিরোজা: ক্যাসিকাল গান শুনি, যে বিষয়ে যারা ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছেন আমি তাদেরটা শুনি। কমপেয়ার করি। যন্ত্র নয় মানুষ হিসেবে কে কি ধরনের বৈচিত্র্য আনতে পেরেছেন। শুধুতো স্বরলিপির সামনে বসে থাকলেই তো গান হবে না। এটা নিয়ে তো সারা দেশ অস্থির হয়ে আছে। দেব ফেলে তোমার সামনে স্বরলিপি, একটা গান উদ্ধার করে গেয়ে শোনাওতো দেখি? তা হবে না। এর সঙ্গে অন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন। আমি নজরুল ইনস্টিটিউটে একটা প্রোপোজাল দিয়েছিলাম আজ থেকে দশ বছর আগে। বলেছিলাম এটা যেন সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র না হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাই হয়েছে। পরে শুনেছি যে আমার আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে সমস্ত স্কুলে যারা নজরুল গীতি শিখবে তারা এখান থেকে স্বরলিপি পুরোপুরি আয়ত্ত করে তারা শিক্ষক হবে।

আমার কথাগুলি, প্রোপোজালগুলি ভেঙ্গে নিয়ে ইচ্ছেমত… তারা কি জানে যে সঙ্গীত কি করে ভাল হবে? একজন সাহিত্যিক তো বলতে পারেন না সঙ্গীত চর্চার সুবিধা অসুবিধাগুলো কোথায়? তিনি বলতে পারবেন কী? আমি নিজেইতো কত বিষয়ে অজ্ঞ। তবুতো ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা তাদের উচিত ছিলনা কাজে লাগান? সরকারের উচিত ছিল না যে, রাখুন আপনাদের কথা, বলতে দেন উনি কি বলতে চান? স্বরলিপিতো গায়কী দেবে না। নোট দেবে। নোট গুলো কিসের থেকে কি হবে। লোকে কি বুঝবে? প্রিলিমিনারি স্টেজের কোন শিক্ষার্থী স্বরলিপি দেখে পুরো অভিজ্ঞতাটা কি আয়ত্ব করতে পারে? দরকার হয় গাইডেন্স। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে আমাদের এমনই দুভার্গ্য যে নজরুল ইসলামের কৃত স্বরলিপি যারা ওনার গান গাইবার মত অতটা উপযুক্ত ছিলনা তারাও যে গানও করেছে অনেক গান নষ্ট হয়েছে। আর যারা খুবই ভাল গান করেছেন তাদেরটা তোলার মত একজন গাইডেন্স লাগে। এখানেও প্রবলেম যে ওনার স্বরলিপির সঙ্গে রেকর্ডের মিল পাচ্ছে না। এই সংমিশ্রণটা কে ঘটাবে? এর জন্যই যে অভিজ্ঞ লোক দরকার এখন তারা কেউই জীবিত নাই। আজীবন তদবির করে এখনো বিশ্বভারতীতে চেষ্টা তাদের মতানৈক্য এখনো কতরকম মতবিরোধ, এখনো কত কিছু ভাবে যে কী করা উচিত? চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা পারছিনা। সবাই বলছে রেকর্ডে যা আছে এটাই অথেনটিক, তাহলে নজরুল ইসলাম যে স্বরলিপি করেছেন সেগুলো তাহলে ভুল! রেকর্ডই যদি অথেনটিক এবং শুদ্ধ হয় একেক আর্টিস্ট একেক রকম করে গেয়েছেন। নাম বললে বিভ্রান্তি হবে। একই গান তিনজন গেয়েছেন তিন রকম, কোনটা অথেনটিক? স্ট্রংগলি একজন, দুজনকে মানতে হবে যে এর কথাই ঠিক, আর সব স্টপ কর।

মামুন: তাইলে বর্তমানে নজরুল গীতি চর্চা বিভ্রান্তির মধ্য দিয়া আগাইতেছে?

ফিরোজা: চর্চা অনেক বেড়েছে, আরো বাড়াতে হবে। এবং মাধ্যমগুলির আরো সচেষ্ট হতে হবে যে কত সুন্দর করে নজরুলের গান প্রেজেন্ট করা যায়। যারা অলরেডি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেছে কারেকশন করতে হবে। যদি কারেকশন করতে পারে তো ভাল। আমারও তো কত গান কারেকশান করতে হচ্ছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি সংশোধনটা যত তাড়াতাড়ি করতে পারব, নতুন শিক্ষার্থী তা বুঝতে পারবেনা যে কোনটা গ্রহণ করব কোনটা গ্রহণ করব না। আমার অধ্যায় বাদ দাও। আমার সব গান অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে গেছে। সেগুলো যারা ফলো করছে তাদের মধ্যে কোন দোষ থাকার কথা নয়। কারণ আমি কাজী নজরুল ইসলামের জীবদ্দশায় তার গুলিতে যারা প্রাণ সৃষ্টি করেছে তারাই তো আমাকে দিয়ে গাইয়েছে তারা নিজেদের কিছু জিনিসও চেঞ্জ করেছে। তারা আমার মধ্যে কি দেখতে পেয়েছেন, আমাকে দিয়েই আরো সুন্দর করে গাইতে বলেছেন।

মামুন: ভারত উপমহাদেশে অনেক নামী-দামী শিল্পী নজরুল গীতি গাইছে। যখন ফিরোজা বেগম নজরুল গীতি গায় তখন শ্রোতার হৃদয়ে এত… স্পর্শ করে কেন?

ফিরোজা: এটা কি বলব আল্লাহ্র মেহেরবাণী।

মামুন: অনেকে আপনার গান শুনে কাঁদে এটা জানেন?

ফিরোজা: তোমরাই বলতে পার ভাল। আলী যাকের সাহেব প্রসঙ্গক্রমে বললেন যে আমি চেষ্টা করেও আপনার প্রোগ্রামে একটা টিকিট জোগাড় করতে পারিনি। ৩৮০ টা একক অনুষ্ঠান যা প”থিবীর কোন সিঙ্গেল আর্টিস্ট করতে পারেনি এবং সাকসেসফুল। এখনো আমি গাইতে পারি। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ্র অশেষ মেহেরবাণী।

মামুন: আপনি কার গান শোনেন এখনো বলেননি।

ফিরোজা: আমি বড় গোলাম আলী সাহেবের গান শুনি। জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ হারমোনিয়াম, ভায়োলি বাজালেন, প্রোগ্রামটা হল কলা মন্দিরে। কিংবা রবীন্দ্রসদনে, ঠিক মনে নেই। তোমরা কি এটা কখনো প্রকাশ করেছ? তবলায় ছিল মালহার। জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের ছেলে। যেন জ্ঞান, প্রকাশ ঘোষদের অজয় চক্রবর্তীকে তিনি তৈরি করেছেন। তারা সঙ্গত করেছেন। আমার জীবনে আর কি চাই? তারা যে গান শুনে যে কি প্রশংসা করেছেন।
মামুন: আমরা কাজী নজরুলকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করি যখন আপনি গান করেন। এটা আপনি উপলব্ধি করেন কিনা?

ফিরোজা: এটাতো উপলব্ধি করার ব্যাপার নয়, দায়িত্বটা গ্রহণ করেছি।

মামুন: আপনে যখন নজরুল গীতি চর্চা শুরু করলেন তখনতো এতটা নজরুল চর্চা ছিল না। নজরুল অনেকটা অবহেলিত ছিলেন।
ফিরোজা : যখন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নজরুলের কীর্তন, শ্যামা সঙ্গীত, গীতিকাব্য কিংবা আধুনিক যে গানই হত বলা হত চিত্ত রায় গান করছেন বা ধীরেন্দ্র মিত্র রানা প্রধান গান করছেন, রচনা করেছেন গানটা কাজী নজরুল ইসলাম। তারপরে ধীরে ধীরে নজরুল গীতি বলে প্রচারিত হল, তার পরে আমার চাপ সৃষ্টিতে নজরুল সঙ্গীত বলা সবাই শুরু করেছে। নজরুল ইসলাম নজরুল ইসলামই। তিনি যা করেছেন তার পরিচয় তার গানে, তার লেখনীতে। প্রত্যেকের একটা মুদ্রা দোষ রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনা। যে যার জায়গায় থাকবে। আমি বললাম নজরুলের কথা গান সব মিলিয়ে নজরুল সঙ্গীত বললেই শোভা পায়, এর গাম্ভীর্যটা এতে বাড়ে। এত অনুরোধ করলাম কিন্তু বিটিভি অনুরোধটা রক্ষা করেছে এবং কোন কোম্পানী যখন আমার রেকর্ড বের করে তখন নজরুল সঙ্গীত বলে। আর্টিস্টরা হয়তো এগুলো খেয়াল করে না। এইটার উপরে কোন একটা আর্টিকেল লিখতে পারলেন না? লিখতে পারলেন না কেন এটা হয়না? এটা নিয়ে কখনো মনে খটকা লাগেনি।

শুধু কমল দাসগুপ্ত কি করল। তার কাছে বাংলাদেশ আজীবন ঋণী। তিনি ভারতবর্ষের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে চিহ্নিত। এটা ফিরোজা বেগমের কথা বলে নয়, শহীদুল ইসলাম মারা গেছেন। তিনি দেশ স্বাধীনের পর ছুটে গিয়েছিলেন শচীন দেব বর্মণের কাছে কিছু বলার জন্য। আমন্ত্রণ করার জন্য। যেহেতু তিনি নজরুল ইসলামের কিছু অনবদ্য গান করেছে সেজন্য তিনি স্বীকৃত। তাই ৭২ কি ৭৩ এ তিনি ছুটে গিয়েছিলেন যেন শচীন দেব বর্মন এদেশে আসেন। এটা শহীদুল ইসলাম নিজে আমাকে বলেছেন ডিজি ছিল শিল্পকলার, তারপরে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের ডিরেক্টর ছিলেন, বললেন প্লিজ আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি শিল্পকলা থেকে আপনি একবার আসেন। তিনি বললেন যে, ‘কি বললে তুমি? আমাকে নিয়ে? আমি ঢাকায় যাব নজরুল ইসলামের গানের মূল্যায়ন করতে? আমাকে দিয়ে মূল্যায়ন করবে? আমিতো শুনলাম যে কমল দাসগুপ্ত ঢাকায় নাকি এখন থাকেন, তোমার যদি সময় থাকে পরের প্লেনে ফিরে যাও গিয়ে তার কাছে যাও। তাকে নিয়ে কি করবে দেখ, নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত আমার কোন অবদান নেই।’ সেই যে ফিরিয়ে দিলেন তিনি এলেনও না। বললেন যে, ‘তোমরা আলেয়ার পিছনে ছুটছো।’

মামুন : বই পড়েন?

ফিরোজা: বই পড়া, সমস্ত কিছু পড়া। আগেতো কবিতা পড়তাম, এখন কম পড়ি গদ্য কবিতায় আমি এত মুগ্ধ, আগে খুব আবৃত্তি করতাম। জীবনান্দ দাশের সাথে কোন তুলনাই হয়না। শত শত বার পড়লেও আমার সেই জিনিস পড়তে ভাল লাগে যেখানে ভাবার খোরাক আছে। এক সময় ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, বঙ্কিমচন্দ্র। পরে যাযাবর, শংকর তাদের লেখা, সুনীল পর্যন্ত।

মামুন: বাংলাদেশের?

ফিরোজা: হুমায়ূন আহমেদ পড়ি। তার টা পড়ি এইজন্য যে সবকিছু পড়েই বোঝা যায় কোনটা আমার ভাল লাগছে। আমার হবি হচ্ছে বাগান করা। আমি ভীষণ একা, সারা জীবনেই কিন্তু একাকিত্বের, এখানে কারো প্রবেশ নেই। আমার নিজস্ব একটা জগৎ আছে। … আমার ড্রেসিং টেবিলে যে কয়টা শিশি আছে-

মামুন: আপনাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি খুব হালকা রঙ এর শাড়ি আর সুন্দর একটা মালা থাকে।

ফিরোজা: আসলে আমি একেবারে সাদা শাড়ি পড়তে পছন্দ করি। গয়নাগাটি পরা, অলঙ্কারে নিজেকে সাজিয়ে ব্যাপারটা পছন্দ করিনা। আংটি আমার ভীষণ শৌখিনতা। আমি কখনো ফ্যাশন ফলোয়ার নই, আমি স্টাইল মেকার। আজকের থেকে নয় যখন ১২-১৩ বছর বয়স তখন থেকেই। আমি ভীষণ স্ট্রাইকিং স্টাইলমেকার। আমি স্টোন পছন্দ করি। আমার যদি সাঙ্গতি থাকত তবে স্টোনই পড়তাম সবসময়। পৃথিবীর তো অনেক জায়গায় গিয়েছি তখন স্টোন কালেকসন করেছি। ¯েপ্রর চাইতে রিয়েল পারফিউম বেশি ইউজ করি। গলায় একটা মালা পরি সুন্দর করে।

মামুন: অনেকেই মনে করেন ফিরোজা বেগম খুব অহংকারী মানুষের সাথে বেশি মেশেন না। দর্শক শ্রোতারা কাছে আসতে পারেন না।

ফিরোজা: কে বলেছে? একশ-দেড়শ অটোগ্রাফ দিয়েছি। অনেক যন্ত্রণা আঘাত, ব্যথা, কষ্ট সব আমার গানে মিশ্রিত থাকে। আমি লোকের কাছে যেসব বলে বেড়ানোর লোক না, তাই লোকে অহংকারী ভাবল কি না ভাবল, আমার কিছু এসে যায়না। ওরা আমার জীবন নিয়ে এতটুকু জানে। তাদের কাছে কেন ব্যক্ত করব? আমার জীবনে কোন হালকা ব্যাপার নেই। এখন গায়িকারা অধিকাংশ লাশ্যময়ী। আমিতো লাস্যময়ী নই। গানের সঙ্গে নাচ, কিংবা লিপসিং এগুলো তো ছিল না। তোমার যুগের সাথে আর কত জানিয়ে নেব? আমার গন্ডিটা এখন আমার ভাইবোন আর সন্তান নিয়ে। আমার তিনটি সন্তান। অরা আমার কত প্রিয়, আমার তিনটি পুত্র সন্তান। ২৭ বছর স্বামী মারা গেছেন, তারপর একাকীত্ব আর দায়ভার এখনো ছেলেদের স্কুলে পড়া শেষ হয়নি। এখনতো বয়স হয়েছে যেকোন সময় একটা কিছু হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার সান্ত¡না যে আমার তিনটি সন্তানই ছোটবেলা থেকেই কতকিছু তারা করেছে এবং আমার সঙ্গীত সংক্রান্ত সবকিছুতে সংসারের দায়ভার তাদের উপরে দিয়ে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি। ঘরের ভিতরে এবং ঘরের বাইরের ঘটনায় তারা যেভাবে সহযোগিতা করেছে। সহিষ্ণুতা দেখিয়েছে। কষ্ট স্বীকার করেছে বলতে গেলে আমার তিনটি সন্তানের কাছে আমি দায়বদ্ধ আছি। তারা যেকোন পরিস্থিতিতে তারা ছোটবেলা থেকেই সুশৃংখল ছিল। এরা যদি আমাকে বিরক্ত করত তবে হয়ত আগাতে পারতাম না। আমি যদি তাদের জন্য আরো সুবন্দোবস্ত করতে পারতাম তাহলে তারা অনেক বেশি বিকশিত হতে পারত। যেটা তারা নিজে নিজে কষ্ট করে অর্জন করেছে। যে ব্যবস্থা তাদের জন্য করা উচিত ছিল তা কোনভাবেই করতে পারি নাই। একটা সময় বুঝে বুঝে তাদের সবাইকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি। দিন নেই রাত নেই কষ্ট করে উপার্জন করে তাদের পড়ার খরচ দিয়েছি। সবটুকু সুষ্ঠুভাবে পারিনি। সেই আক্ষেপ আছে। আমি কাউকে সাহায্য করতে বলিনি। সবটুকু কষ্ট আমি একা মেনে নিয়েছি, ছেলেরাও মেনে নিয়েছে। আমি ওদেরকে কোন টিচার দিতে পারিনি। একজন স্কুল শিক্ষক কিছু সাহায্য করেছিলেন।
মামুন: আপনি কোন ধরনের শাড়ি পরেন?

ফিরোজা: আমি শিফন শাড়ি পছন্দ করতাম। ফ্রেঞ্চ শিফন ছাড়া আমি পরতাম না ইয়াং এইজে। সাদা, নেভি ব্লু, গ্রে, লাইট ফিরোজা পরতাম। আমার স্বামী কোনদিন আমার সাজার ব্যাপারে কোন ইন্টারফেয়ার করতেন না। অন্যান্য সবাই চাইতেন আমি খুব সেজে থাকি। মুখের মেকাপে আমার সব সময়ই অস্বস্তি। এখন বয়স হয়েছে এখন একটু টাচ আপ করা দরকার। কিন্তু আমি যা আমি তাই, আমি সুন্দরী না, কিন্তু কিসে সুন্দর দেখায় তা আমি জানি। কিন্তু আমি এভয়েড করি।

মামুন: একটা ছবি অন্তত পুরনো, দেন। কোমল দাস গুপ্তের সাথে। একসাথে একটা ছবি দেন।

ফিরোজা: কি জীবন, কি দুর্যোগ, কখনো মনে হয়নি যে ওরকম প্লেজার মুডে ছবি তুলে রাখি। এইচএমভি বোধ হয় রং ফেল কভার করেছিল, ঐটা আছে।

মামুন: আমি নিজের হাতে তুলি?

ফিরোজা: ফ্রুট খাই, মিল্ক প্রোডাক্টস খাই, মিষ্টি বা ঝাল কোন খাবারে আসক্ত নই।

ফিরোজা: আমার দুই ছেলে, ছোট ছেলের এক ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে বিয়ে করেনি।

মামুন: আপনের ফরিদপুরের ঐ এলাকার নাম কি?

ফিরোজা: এলাকার রাস্তা আমার আব্বার নামে নাম, খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল রোড।

মামুন: এই বয়সে কত ঘন্টা বিশ্রাম নেন?

ফিরোজা: দুপুরবেলা শুয়ে বই, পেপার পড়ি, পেপারে কিবা পড়ার আছে! আমি দোয়া করি পরবর্তী প্রজন্ম যেন সুন্দর একটা পরিবেশে প্রতিভা বিকাশের সুযোগটা পায়।

০৭-০৭-২০০১ ইং

ফিরোজা বেগমের জন্ম ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান জেলা) রাতইল ঘোনাপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল এবং মায়ের নাম বেগম কওকাবুন্নেসা। শৈশবেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ জন্মে। ১৯৫৪ সাল থেকে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে সুরকার, গায়ক ও গীতিকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৬৭ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। কমল দাশগুপ্ত ২০ জুলাই, ১৯৭৪ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। এ দম্পতির তিন সন্তান তাহসিন, হামীন ও শাফীন রয়েছে। হামিন ও শাফিন উভয়ই রকব্যান্ড দল মাইলসের সদস্য।

১৯৪০-এর দশকে তিনি সঙ্গীত ভুবনে পদার্পণ করেন। ফিরোজা বেগম ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গানে কন্ঠ দেন। ১৯৪২ সালে ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে ৭৮ আরপিএম ডিস্কে ইসলামী গান নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয়। কিছুদিন পর কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে উর্দু গানের রেকর্ড হয়। এ রেকডের গান ছিল- ‘ম্যায় প্রেম ভরে, প্রীত ভরে শুনাউ’ আর ‘প্রীত শিখানে আয়া’। দশ বছর বয়সে ফিরোজা বেগম কাজী নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন এবং তার কাছ থেকে তালিম গ্রহন করেন। নজরুলের গান নিয়ে প্রকাশিত তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৪৯ সালে। কাজী নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগম নজরুল সঙ্গীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনি ৩৮০টির বেশি একক সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। নজরুল সঙ্গীত ছাড়াও তিনি আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাতসহ বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতে কন্ঠ দিয়েছেন। জীবদ্দশায় তাঁর ১২টি এলপি, ৪টি ইপি, ৬টি সিডি ও ২০টিরও বেশি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৭২ সালে কলকাতায় বঙ্গ-সংস্কৃতি-সম্মেলন-মঞ্চে কমল দাশগুপ্তের ছাত্রী ও সহধর্মিণী হিসেবে তিনি ছিলেন মূখ্যশিল্পী। উভয়ের দ্বৈতসঙ্গীত সকল শ্রোতা-দর্শককে ব্যাপকভাবে বিমোহিত করেছিল।

পুরস্কার ও সম্মাননা: স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী স্বর্ণপদক, সেরা নজরুল সঙ্গীতশিল্পী পুরস্কার (একাধিকবার), নজরুল আকাদেমি পদক, চুরুলিয়া স্বর্ণপদক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট। এ ছাড়াও জাপানের অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিবিএস থেকে গোল্ড ডিস্ক, ২০১১ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেন। ১২ এপ্রিল ২০১২ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে “বঙ্গ সম্মান” পুরস্কার গ্রহণ করেন। সম্প্রতি ভারত সরকার তাঁকে “ভারত রতœ” (মরনোত্তর) সম্মানে ভূষিত করেছেন।

কিডনি জটিলতায় ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪, মঙ্গলবার রাত ৮টা ২৮ মিনিটে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

PaidVerts