জীবনানন্দ নিশ্চয়ই শক্ত। শক্তের অর্থ বুঝেও তার কিছু বোঝা যাবে না: ক্লিনটন...

জীবনানন্দ নিশ্চয়ই শক্ত। শক্তের অর্থ বুঝেও তার কিছু বোঝা যাবে না: ক্লিনটন বি সিলি ।। নাসির আলী মামুন

ভাগ
PaidVerts

 

নাসির আলী মামুন: আপনি কতদিন পর ঢাকায় আসলেন এইবার?

ক্লিনটন বি সিলি : ঢাকা আমি প্রথমে এসেছিলাম ৬৩ সালে।

মামুন : সিক্সটি থ্রি?

সিলি : তখন আমি যাচ্ছিলাম। যাবার পথে ছিলাম।… ঐ সাল থেকে ৬৫। যেহেতু আমাদের সংস্থার অফিস বক্শীবাজার ঐ খানে ছিল… মাঝে মাঝেই আসতে হয়েছে আর কি। তারপর সত্তুর সালে আমি একবার এসছিলাম বরিশাল, মংলা, হালিশহর। বরিশাল হয়ে ঢাকা এসছিলাম।

মামুন : সেইটা কি পরে না আগে? যদ্দূর মনে পড়ে ১১ই নভেম্বর।

সিলি : হ্যাঁ, না তার আগে… পরে আমরা একটা ডাক পেয়েছিলাম… আমরা বলে দিলাম, আমি অন্তত বলে দিলাম, হ্যা আমি রাজী আছি। কিন্তু তারপর আমরা ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে শুনতে পেয়েছি যে উনি চাননি যে আমরা আসি এদেশে। তারপর আসি ১৯৮১-৮২ সালের দিকে এখানে ছিলাম। এই খানেও ছিলাম তোপখানা রোডের উপরে একটা আবাসিক হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেলের নাম খুব মজার ‘এশিয়া‘। তখন আমি চাটগায়ে-চট্টগ্রামে গিয়ে ছিলাম বেশ কিছুদিন একজন অধ্যাপকের বাসায়।

Clinton chiliমামুন : ইউনিভার্সিটিতে?

সিলি : হ্যাঁ ইউনিভার্সিটিতে। আর তার পরে আমি একবছর ২ দিনের জন্যে নাকি আমি এসছিলাম ৯০ সালে এবং ৯৩ সালেআমার আসার কথা ছিল, কিন্তু আমি আসতে পারিনি, তারপর ২ বছর আগে আমি এসছিলাম। আমাদের একটা সংস্থা অওইঝ মানে ‘অ্যামেরিকান ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ‘ ওদের তরফে আমি এসছিলাম দশ দিনের জন্য। আর এই এসছি শেষ বার।
মামুন : ৬৩ তে ঢাকায় আসলেন প্রথম। আপনে কি জানতেন যে বাংলাদেশ বলতে যে ইস্ট পাকিস্তান, খুব গরিব? ঝড় আর বন্যা হয়?

সিলি : আমরা মোটামুটি জানতাম, কারণ আমাদের আসার আগেই তিন মাসের জন্য প্রশিক্ষণ থাকে বলে, আমরা তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐখানে প্রশিক্ষন চলছিল।

মামুন : আপনে স্টুডেন্ট ছিলেন?

সিলি : না, ঐখানকার স্টুডেন্ট আমি ছিলাম না। আসলে…ইউনিভার্সিটি নিউ ক্যালিফোর্নিয়াতে, স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে যাকে বলে আমি চলে গেলাম পীসকোরে। আর আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার যে জায়গা শিকাগোতে।

মামুন : পীস কোর ঐটাতো চাকরীর জন্য না।

সিলি : চাকরীর জন্য ছিলনা। এটাতে এমনি, আমরা বলতাম স্বেচ্ছাসেবী একটা সংস্থা। আমরা পেতাম সামান্য কিছু। যাতে-

মামুন : কোন রকম চলে যায়।
সিলি : হ্যাঁ।
মামুন : এটা মানে মেইনলি মানবিক সাহায্য সংগঠন, সেবা করা।

সিলি : তাই,তাই।

মামুন : সেই উদ্দেশ্যেই আপনে বাংলাদেশে আসছিলেন? তখন আসার কারণটা কি? সেসময় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা এরকম কিছু ছিল?

সিলি : ওদের কোন একটি পরিকল্পনা তখন যে ছিল, নাম ছিল নাকি, ঠিক বলতে পারি না তখন… নাকি… থাকে… তখন আমি স্নাতক অব্দি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, জীববিদ্যায়। আর আমাদের … ছিল বিজ্ঞান শিখাত সাথে কাজ করত। তখন এক্সপেরিমেন্ট দেখাতাম আর তৈরি করতাম আর সামনে ওরা বক্তৃতা দিতেন, আর ঐ রকম দুই বছর না তিন বছরের জন্যে আমি এখানে কাজ করি।

মামুন : আপনে প্রথম যখন দুই বছর ছিলেন তখনই আপনে বরিশাল গেলেন?

সিলি : হ্যাঁ বরিশালে।

মামুন : জীবনানন্দ দাস সম্পর্কে জানলেন কীভাবে?

13563308_10208779994849941_276401991_n সিলি : তখন আমি একদম জানতাম না। আমি বরিশালে যেতাম কোন একটা জায়গায় হাসপাতাল রোডের ভিতরে, কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে বগুড়া রোডের উপরে ওনার বাসা, মানে বাড়ি, বাড়ি ছিল। তখন আমার কোন খেয়ালে ছিল না। তখন আমি খেয়ালও করতাম না। যদিও জানতাম আমি, কবিতা পড়তে পারতাম না।

মামুন : আপনে কী তখন লেখালেখি করতেন?

সিলি : না। আমার নিজের ভাষায় আমি কবি নই। আমি কবিতা লিখি না কিন্তু…

মামুন : লেখালেখি করতেন কি গদ্য বা অন্য কিছু?

সিলি : তেমন কিছু না। আমি ডায়রী অব্দি বোধ হয়, আমি লিখেছিলাম। তাছাড়া তার কিছুই লিখিনি। কিন্তু ফিরে গিয়ে ঐ ছাত্র হিসেবে আমি পড়তে শুরু করেছিলাম, শিকাগোতে। শিকাগো ইউনিভার্সিটি যে জায়গায় আমি আছি এখন। আমি পড়াই ঐখানে।… কোন একটা সংস্থার পক্ষ থেকে আইওয়া, ইউনিভার্সিটিতে যাকে বলে… ওয়ার্কশপ ঐখানে তিনি এসছিলেন। এই মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে চলে এলেন। আর আমাদের পড়িয়েছিলেন। উনি আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে জীবনানন্দ দাশ এমন একজন লোক যার বরিশালে জন্মাতেন এবং তিনি খুব ভাল বিষয়ে-
মামুন : এইটা কি সিক্সটি থ্রির পরে?

সিলি : হ্যাঁ, সিক্সটি ফাইভের পরে। আমি ’৬৫ এর পরে ওখানে পড়তে গিয়েছিলাম। ৬৬-৬৭ নাকি ঐরকম সময়ে। ৬৮ এর পর থেকে আমি গবেষণা করতে এসছিলাম। আসলে আমি পৌঁছে গেছি এইখানে ঊনসত্তর সালে। ঊনসত্তর সালে এইখানে না, আমিকোলকাতায় প্রথমে সত্তুর সালে ঐখানে ছিলাম আর সত্তুর সালের মধ্যে আমি চলে এলাম আরেকবার বরিশালে, তখন আমি জানতাম। তখন আমি সবকিছু বুঝতে পেরেছি।

মামুন : জীবনানন্দ দাশের লেখা পড়ছেন আপনে?

সিলি : হ্যাঁ, তখন আমি পড়েছি।

মামুন : বাংলাতে?

সিলি : হ্যাঁ, তখন আমি মন দিয়ে পড়ছিলাম, আর বরিশালেও ব্রাহ্মবাদী পত্রিকায় ঐখানে পাওয়া যেত, এখানেও ঢাকায়ও ওদের ব্রাহ্ম সমাজ আছে। এখান থেকেও পেয়েছিলাম কিছু, ঐখানেও পেয়েছি কিছু বরিশালে। তারপরে হচ্ছে কী ফিরে গিয়ে আমি লিখতে… ছিলাম এবং তার পরের বছরে আমি পড়াতে শুরু করেছিলাম মানে ১৯৭১ এ।

মামুন : জীবনানন্দ দাশ যখন আপনি পড়লেন তখন কী আপনে বাংলা সাহিত্যের আর কোন কবি সাহিত্যেকের লেখা পড়ছেন?

সিলি : হ্যাঁ আমি পড়ছিলাম 13563291_10208779994049921_1106083678_nআশে পাশের যারা লিখছিলেন, ঐ বুদ্ধদেব বসু, মলয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সমর সেন, সুধীন্দ্রনাথ, অরুন মিত্র, জীবনানন্দ দাশ অব্দি আমি পড়েছি।

মামুন : রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা…

সিলি : তাও পড়তে হয়েছিল। কিন্তু অত মন দিয়ে আমি পড়িনি, কিন্তু হ্যাঁ নিশ্চয়ই পড়তে হয়েছিল।

মামুন : পরবর্তীতে যে আপনে কাজ করলেন জীবনানন্দ দাশ নিয়ে এর পরে মাইকেল…

সিলি : মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

মামুন : শুধুমাত্র এই দুইজন কবি আপনাকে আকর্ষণ করল কেন? এর কারণ কী এই যে ওদের উপরে আপনে পড়াশোনা করছেন আর কোনটা আকৃষ্ট করে নাই? নাকি অন্য কোন কারণে।
সিলি : না। সবকিছু আমি করতে পারিনা। জীবন এত ছোট্ট যে সবকিছু আমি করতে পারিনা। সেই জন্য আমি জীবনানন্দকে নিয়েই আর আশেপাশে যারা লিখছিলেন তাদের কবিতা, লেখা আমি পড়াশোনা করেছিলাম। কিন্তু তারপর পড়াতে গেলে আমার যে দায়িত্ব ছিল আমার একজন অধ্যাপক… ওনার বিষয় ছিল বৈষ্ণ্যব, ধর্মীয় ব্যাপার।… যাকে বলে।

মামুন : এবং আপনে নিজেও কাজ করছেন।

সিলি : আমি সামান্য কিছু কাজ করেছিলাম। আর উনি বেশ কাজ করেছিলেন। আর আমরা দুজনে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, সংস্কৃতির ইতিহাস, আমরা পড়িয়েছিলাম, পড়াছিলাম তখন। আর উনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন মধ্য যুগীয় ব্যাপার। আর আমার উপর দায়িত্ব পড়ে গেল আধুনিক যুগের ব্যাপার। আর আধুনিক যুগ কবেথেকে শুরু হয় সবাই বলে যারা সাহিত্যের ইতিহাস লেখেন সবাই বলে যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের যে মেঘনাদবধ কাব্য থেকে শুরু। শুরু মানে আমি, অন্তত আমার জানা উচিত যে শুরুতে কী রকম লেখা হচ্ছিল। আমি পড়তে বসেছিলাম আর অনুবাদ করতে… একটু একটু গদ্যে ছিলাম। যাতে ছাত্র ছাত্রীদের সুবিধা হবে আর ওরা বুঝতে পারবে যে কী রকম লেখা। কিন্তু শেষ অবদি আমি ভেবেই যে গদ্যেই হলে হবে না। এজন্য আমি পদ্যে আস্তে আস্তে সাজিয়ে দিয়েছি আর এখন প্রায়, প্রায় না পুরোপুরি ২৫ বছর ধরে আমি একাজ করছি। গতবছর মানে দু হাজার চার… বেরিয়ে গেছি মানে … ইউনিভারসিটি, নিউইয়র্ক থেকে।

মামুন : আপনের প্রকাশনাতো শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে।

সিলি : না, এই… ইউনিভার্সিটেতে এবং ঐ তে ছোট্ট একটা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি ওদেরই প্রকাশনা।

মামুন : আপনি যখন এই প্রকাশনার জন্য যখন প্রোপোজ করলেন মানে বইয়ের প্রপোজ করলেন-

সিলি : না, আমি… করিনি।

মামুন : প্রথমে বলে নাই যে, কোথাকার জীবনানন্দ দাশ? এইদেশের মানুষ পইড়া কি বুঝবো?

সিলি : হ্যাঁ।

মামুন : আননোন একজন কবি আমাদের দেশের।

সিলি ঃ পান্ডুলিপি সংগ্রহ করার পর অনেক প্রকাশনা সংস্থা আমাকে না বলে দিয়েছে। আমরা বিক্রি করতে পারবনা, কেউ করবে? ভাগ্যিস শেষ অব্দি ছোট্ট একটা বিশ্ববিদ্যালয় এর এই প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে নিল। আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ ওদের কাছে।

মামুন : আপনের মাইকেলের নতুন বইটা বাইর হইলো কোন মাসে?

সিলি : গত বছর। দু হাজার চার। এখন প্রায় ১১ মাসতো হয়ে গেছে। প্রায় এক বছর। ফেব্রুয়ারী মাসে দু হাজার চারে।

মামুন : এই কবির উপরে আপনে কাজ করলেন, যাকে বলা হয় আধুনিক বাংলা কবিতার সূচনাকালের প্রধান কবি, তার আগে মাইকেল মধুসূদন। কিন্তু আধুনিক বাংলা কবিতা যখন মডার্ণ ওয়েতে ভালভাবে চালু হইতেছে … সাথে জীবনানন্দ দাশ তখন একজন খুব ব্যতিক্রমী কবি। যদিও এই আমলে পাত্তা পায়না। এই কবির উপরে কাজ করতে যায় আপনার কী মনে হইছে? টেস্টটা কী রকম। ভাষা? জীবনানন্দ দাশের কবিতা আর আপনার মেঘনাদ বধ যে বললেন একদম আলাদা কবিতা মানে এইটা যে ধারণ করলেন আপনি, কেমন মনে হইছে?

সিলি : তফাৎ কী রকম? মামুন : হ্যাঁ, কিন্তু এইটা বলতেছিনা যে কোনটা ভাল কোনটা মন্দ।

সিলি : আরেকজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছে। কোনটা শক্ত মাইকেল না জীবনানন্দ? জীবনানন্দ নিশ্চয়ই শক্ত। শক্তের, অর্থ বুঝেও… তার কিছু বোঝা যাবেনা। কিন্তু মাইকেল বোঝা যাবে। মানে সময় লাগে, পরিশ্রম লাগে, কিন্তু বোঝা যায়। আর এমনি যে গল্প আমরা বুঝতে পারি, আগে থেকে বুঝতে পারি।

মামুন : কোনটা আপনে স্বচ্ছন্দবোধ করছেন বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়া।

সিলি : সবচেয়ে আনন্দ আমি বলতে পারি না। হতে পারে জীবনানন্দকে নিয়ে। কারণ তার কবিতা তখন সবই নতুন, সবই আশ্চর্য, আর-

মামুন : তিনি যেই রাস্তাঘাট দিয়া হাঁটছেন, যেইসব জায়গায় গেছেন সেইসব বাড়িতে আপনি গেছেন, সেইসব জায়গার মধ্যে বসবাস করছেন?

সিলি : কীর্তনখোলা নদী, সব জায়গায়।

মামুন : গোসল করছেন?

সিলি : না আমি গোসল করিনি। কিন্তু ধার অব্ধি আমি গিয়েছিলাম। নামটা আমার খুব ভাল লাগে। কীর্তনখোলা। যেমন কপোতাক্ষ, কপোতাক্ষ নদ। নদী আমি বলতাম, একজন আমাকে বলে দিয়েছে যে না, নদী হবে না নদ হবে। সে কী ব্যাপার? সবকিছুই নদী। না, না, না, না, না। বাংলাদেশে নদও আছে, নদীও আছে কপোতাক্ষ নদ।

মামুন : জীবনানন্দ দাশটা আপনাকে বেশি আকর্ষণ করছে। কারণ আপনে বরিশালে থাকেন। আপনের লেখা পইড়া আমার তাই মনে হইছে। যে বরিশালে থাকার কারণে জীবনানন্দ দাশকে যেভাবে আত্মস্থ করছেন আপনে, মাইকেল তেমন আকর্ষণ করে নাই তা বলব না। আত্মস্থ করেন নাই। অতএব মাইকেলের পিছনে অতটা সময় দেন নাই।

সিলি : তাও অবশ্যই। কিন্তু তবুও মাইকেল চরিত্র বেশ আকর্ষণীয় আমি মিশতে গেলেই ওনাকে অত পছন্দ আমি করতাম না। কিন্তু তবুও দূর থেকে দেখলেই সাংঘাতিক একজন মানুষ।

মামুন : আসলেই ছিল।

সিলি : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মামুন : কিন্তু পছন্দ করতেন না কি কারণে?

সিলি : কী জানি। মানে উনি এত কী বলব, আত্ম কেন্দ্রিক নিজের ব্যাপারে, আমি জানি না। হতেও পারে যে ভাল আমার লাগত। কিন্তু নাও হতে পারে।
মামুন : কিন্তু একই কথা কী জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে প্রযোজ্য?
সিলি : হ্যাঁ, তা অবশ্য। কিন্তু জীবনানন্দ এমন নির্জনতা … আমার কাছ থেকে কিছু নাও চাইতে পারতেন, জানিনা। মানে এমনি কল্পনা করতে গেলেই-

মামুন : …

সিলি : … আমার স্ত্রী একটা নাটক দেখছিলেন,

মামুন : তার নাম কী?

সিলি : চীয়েন। উনি বেশ কাজ করেছিলেন সংস্কৃত ভাষায়, কবি, ভট্ট অনুবাদ করে ছিলেন। তিনি, যেহেতু আমি কাজ করছিলাম মাইকেলকে নিযে আর উনি বেশ কী বলব ভেবেছেন যে, এমন চরিত্রকে নিয়ে কোন একটা নাটক আমি সাজাতে পারব? আর শেষ অব্দি আমাদের একজন সাহিত্যে পরিচালক ব্লুম, ব্লুম বেশ বিখ্যাত। নাটক তো শেষ অব্দি হবে কিনা জানিনা। কিন্তু তবুও লিখতে গেলে ওনার খুব ভাল লাগে। আর ওনার যে পরিবেশ, যে পরিস্থিতি, যে জায়গায় ঐ দুইজন চরিত্রে বসাবেন তার যেকোন একটা, এমনি একটা আড্ডার আস্তর আর মাইকেল মধুসূদন এবং… দুজনের চরিত্র হিসেবে থাকবে। কি হবে না হবে জানিনা। আমি পড়িনি, যে লেখে। কিন্তু ও লিখেছে যে, এখন আমি এত এগোতে পারি নাই। অনেকদিন ধরে। এখন প্রায় চার পাঁচ বছর ধরে লিখছেন কিন্তু শেষ করতে পারবেন কিনা জানি না।

মামুন : উনিতো ইংরেজিতে লেখছেন?

সিলি : হ্যাঁ, ইংরেজীতে। পুরোপুরি ইংরেজিতে। বাংলা জানেন, সংস্কৃত জানে। কিন্তু সংস্কৃতে লিখতে গেলে কেউই পড়বেন না।

মামুন : মাইকেল অথবা জীবনানন্দ দাশের একই সময়ে আপনে জীবিত থাকলে কার সাথে আপনার বন্ধুত্ব হইতো সবচেয়ে বেশি?

সিলি : জীবনান্দ দাশের সঙ্গে কেউ বোধ হয় বন্ধুত্ব করতে পারেনি। পারতেন না।

মামুন : ওনার স্ত্রীও পারেন নাই।

সিলি : স্ত্রী অব্দি, হ্যাঁ। আর একজন মেয়ে, একজন ছেলে। ওদের
বাবার সঙ্গে সম্পর্ক যে খুব একটা ঘনিষ্ঠ তাও ছিলনা। বন্ধুত্ব করতে গেলে মাইকেলের সঙ্গে অন্তত চেষ্টায় করতে পারতাম।
মামুন : আপনের কী মনে হয় জীবনানন্দ দাশের কোন বন্ধু ছিল না কেন? কি কারণ?

সিলি : ঠিক জানিনা…

মামুন : উনি মিশতে পারতেন না, নাকি মিশতে চাইতেন না? নাকি দুইটাই? অনেক ক্রিটিক বলছেন তিনি মিশতে চাইতেনওনা আবার কেউ কেউ বলছেন মিশতে পারতেনও না।

সিলি : আমার মনে হয় যে চাইলেও না পারার তার ফলে উনি বোধ হয় সরে এসছেন। আচ্ছা আজ থেকে আমি স্বাভাবিকভাবে সবারসঙ্গে মিশব, করতে গেলে ধাক্কা খেলেই সরে আসবে। সে না আমি গেয়েছি ওরা আমাকে সহজে গ্রহণ করতে পারেনি, দূরে থাকব। এরকম হতেও পারে।

মামুন : আপনি জীবনানন্দ দাশের কোন লেখাটা পড়লেন। কোনো বই?

সিলি : কবিতা আলাদা কবিতা…

মামুন : … যেমন জীবনানন্দ দাশ আপনি অনুবাদ করতেন তখন আপনার মনে হয়নি এটা আপনার দুঃসাধ্য কাজ? অন্য কবিতার চাইতে এই কবিতা আলাদা? ট্রান্সলেশানে আনা যায়না। কেননা এমন অনেক ভাব, চিত্রকর্ম…।

সিলি : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মামুন : কখনো কি আপনের মনে হইছে যে জীবনানন্দ দাশের অনুবাদ করার সমস্যা যেমন… তার ভাষাতো অনেক ক্ষেত্রে অনেক দুঃসাধ্য এজন্য যখন অনুবাদ করলেন আপনে কি মনে করেন যে আপনে জীবনানন্দ দাশকে ধরতে পারছেন?

সিলি : আমি ধরতে পেরেছি কিনা জানিনা। কিন্তু অন্তত হ্যাঁ আমি চেষ্টা করেছি। আমি ভেবেছি চেষ্টা করলে অন্তত উদ্যোগ আমি করেছি। তা থেকে কিছু ফল আমি এসে…। আর একটা ভাল কথা আপনি তুলেছেন, আচ্ছা আমি ওনার সাথে কিছু সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে (ওরা কী এখনো নাস্তা খাচ্ছে নাকি উপরে চলে গেছে?)… (ওরা বোধহয় এখনো রেস্তোরায় আছে। নাও থাকতে পারে। কিন্তু অন্তত ওদের জানাব।)

আচ্ছা ভাল কথা, আমার দুটো বক্তৃতা। আজকাল আমি বক্তৃতা দিয়ে বেড়াই। কোলকাতায় আমি দুটো বক্তৃতা, আসবার পথে আমি লন্ডনে একটা বক্তৃতা দিয়ে এসেছি। ঐ একই বক্তৃতা আমি কোলকাতায়ও দিয়েছিলাম মাইকেলের উপরে, আর একটা বক্তৃতা হচ্ছে জীবনানন্দের উপরে। আচ্ছা ঐ শব্দের ব্যাপার যে, মানেটা এই নিয়ে আমার পুরা একটা বক্তৃতা আছে সামান্য কিছু শুধু আমি সংক্ষেপে বলব যে, মূল কথা। তাতে বনলতা সেন সবাই পড়েছে, প্রায় না, অনেকেই অনুবাদও করেছে। আর আমি শুধু প্রথম বার যখন আমি অনুবাদ করেছিলাম, এবারতো নতুন করে আমি অনুবাদ করেছি। প্রথমবার যখন আমি অনুবাদ করেছিলাম ঐ দ্বিতীয় পংক্তি যে ‘সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে, মালয় সাগরে…‘, মালয় সবাই ধরে নিয়েছে যে মালয়েশিয়া, আমিও ধরে নিয়েছি। আর জীবনানন্দর নিজের অনুবাদে উনিও লিখেছেন গধষধুধ। মানে মালয়েশিয়া অনেক পুরানো নাম। কিন্তু মালয়েশিয়া তারপর আমি একটা সংকলন আমি তৈরি করেছিলাম। আর তারপর আরেকটা কবিতা ছিল- ‘নরঙ্কুশ’। সেই নিরঙ্কুশ আপনি দেখবেন, নিরঙ্কুশে যে প্রথম পংক্তি ‘মালয় সাগর পাড়ে, শ্বেতাঙ্গিনীদের নাকি বন্দর ছিল’। আর ২য় বা ৩য় পংক্তিতেই কুয়ালালামপুর, বালি জাভা, সুমাত্রা ঐ সব কথা আছে। তখন… ৩০-৩৫ বছর আগে যখন আমি… তে ছিলাম তখন আমি ধরে নিয়েছি যে মালয় মালয়েশিয়া, সুমাত্রাও কাছাকাছি জায়গা স্বাভাবিক। তারপর ঐ স্তবকের মধ্যে শেষ পংক্তি না তার আগের পংক্তি, একটা কথাআছে- ‘বাগানের… আলো, নীল, মরুভূমি সমুদ্রের দেশে কাঁদে সারাদিন’। আচ্ছা মলয়… আলো কথাটা অনুবাদ করতে গেলে কি বা হতে পারে? অভিধানে পাওয়া যায়না। মলয়ালো এখনো পাওয়া যায়না। এখনো আমি খুঁজে পাচ্ছি না। যদি মালয় সাগর পাড়ে মালয়শিয়া হয়, তাহলে মালয়আলো ও মালয়েশিয়া হতেই হবে। ৩৫ বছর আগে আমি তাই অনুবাদ করেছিলাম। এখন আমি বিশ্বাসও করিনা। মলায়আলো মালায়ালাম, মানে কেরালার দিকে। নানান কারণে ঐ বক্তৃতার মাঝে আমি বুঝিয়ে দিই। আর আমি দেখিয়ে দিই যে সবাই আমার মতন ভুল করে অনুবাদ করেছেন। ভাবাই যায়না। আমি বলেছি শুধু বক্তৃতার মধ্যে কিন্তু প্রকাশিত ভাবে বেরোয়নি।

মামুন : সেকেন্ড প্রিন্ট হয় নাই এখনো?

সিলি : না। এ নিয়ে আর হবেনা বোধ হয়। কিন্তু যে একটা সংকলন যে আমি বার করব হতেও পারে যে তাতে থাকবে আর কি। অন্তত অনেকে জানবে এই কারণে বক্তৃতা অনেক শুনেছে। আচ্ছা মালয় কথাটা তাও অভিধানে পাওয়া যায়না প্রায়। একটা অভিধানে পাওয়া যায় এই প্রেমেন্দ মোহন দাসের যে বাংলা থেকে বাংলা। কিন্তু তাতে মালয় সে অর্থে বিশেষণ, মলয় থেকে। মলয়তো আমরা জানি কৈরালার যে পাহাড়গুলো যে জায়গায় চন্দন গাছ হয়। আচ্ছা মালয়- যেমন ব্রহ্ম থেকে ব্রাম্ম সমাজ। মলয় থেকে মালয় হয় তবে মালয় সাগর বলে যে সাগর কাছাকাছি আছে। আচ্ছা অন্য কোন যুক্তিত আমি দেখিয়ে দেই বক্তৃতায়। কিন্তু বিশেষভাবে এই হচ্ছে আমার বক্তব্য। আর তাতে ঐ নিয়ে নতুন করে আমরা যদি দেখি বনলতা সেন তাহলে স্বাভাবিকভাবে আমরা বলতে পারি যে, সিংহল সমুদ্র থেকে নীশিথের অন্ধকারে মালয় সাগরে- তার মানে যে তামিলনাড়- ঐসব জায়গায় ঐ… থেকে কন্যাকুমারী, ঐ কেরালার ঐ কূলে যাচ্ছিল, যে কবি বা যে বক্তা।

মামুন : আপনের কথা শুইনা আমারও মনে হইতেছে, আমি আপনের সাথে একমত।

সিলি : তাই নাকি? আগে থেকেই?

মামুন : না, আগে ছিলাম না, আপনে বলছেন জীবনানন্দ দাশের লাইনগুলা…

সিলি : আমি বলতে চাচ্ছি যে এই কবিতাগুলো ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক। মানে খুব বেশি যেতে হবেনা। একদম ভারতবর্ষের কেন্দ্রিক। দক্ষিণ যে জায়গায় কন্যাকুমারী। এই দিক দুটো সমুদ্র আছে আর একদম সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে, ভারত বর্ষের ব্যাপারে।

মামুন : আমি আপনের সঙ্গে একমত। আমি এই যে, সামান্য পড়িটড়ি, জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে পড়ার চেষ্টা করি। যার কারণে আমি ক্লিনটন সিলিকে চিনি। না হলে আপনেকে আমি চিনতাম না। আপনেকে আমি কেন চিঠি দিব ৯২ সালে।

সিলি : ঠিকমত যে অনুবাদ করেছি… তারপরও সমালোচনা আসছে এবং খুব ভাল বলত গৌতম…। উনি বলেছিলেন যে প্রথম, পৃষ্ঠায়… অনুবাদ করতে গেলে উর্মিলা বিলাসী… আমি অনুবাদে গিয়েছি ‘ঞযব লড়ু ড়ভ টৎসরষধ’। তিনি বললেন, না তা টিক নয়। বিলাসী হল লড়ু না বলে বহলড়ু… হবে। যে লোক, কি বলব বাংলায় যেমন কৃষ্ণ রাধার সঙ্গে প্রেমতো আছেই কিন্তু উপভোগ করে।

মামুন : মানে লীলা করে আর কি…

সিলি : লীলা করে, হ্যাঁ। আর জয় অফ উর্মিলা লিখতে গেলে ঠিক মত অর্থ হয়ে ওঠেনা। আমি বললাম ঠিক আছে আমি মেনে নিই। ভুলটা করেছি, প্রথম পৃষ্ঠায়ও ভুল করেছি প্রকান্ড একটা ভুল তা নয়। আর বোধ হয় পরে আমি ভুলটা সংশোধন করতে পারিনি। মানে অনুবাদ, করতে গেলে ওরকম ভুলতো থাকবেই।

মামুন : কিন্তু, জীবনানন্দ দাশকে নিয়া কতগুলা নতুন ভাষা যেগুলা বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবির কবিতায় আমরা পাইনা। কিন্তু এইটা কেন মনে হয় যে জীবনানন্দ দাশের চিত্রকল্পগুলি এমন কেনো? যেইটা রবীন্দ্রনাথের নাই,… আবার জসীমউদ্দিন কমপ্লিটলি আনে না। আবার আধুনিক বাংলা কবি যাতে চার পাঁচজনের নাম বললাম ওদের মত না। জীবনানন্দ দাশ যে কমপ্লিটলি আলাদা বাইর হইয়া আসছেন, এইটা নিয়া আপনের কি মনে হয় যে আলাদা… বাংলাদেশের এই কবি অন্যরকম কেন?

সিলি : দৃষ্টিভঙ্গি কেন যে এইরকম হয়ে যায় সেটা ঠিকমত আমরা বুঝতে পারিনা আর কি।

মামুন : ইংরেজি সাহিত্যে এরকম কবি আছে? জীবনানন্দ দাশের মতো এই স্টাইলের কবি আছে কি না?

সিলি : না, নেই। কিন্তু, কেন যে গাছ দেখলে আমরাতো গাছ দেখবই কিন্তু উনি গাছ দেখলে উনি বলে ঠিক গাছই দেখবে না অন্য কোন কিছুই দেখবেন। কিন্তু কি যে দেখেছেন আর কী ভাবে বর্ণনা করবেন তা আমরা…। ওনার মস্তিষ্কের মধ্যে যদি না দেখতে পায় তবে আমরা বুঝতে পারিনা।

মামুন : মানে এক্সপ্লেইন কইরা বলা সম্ভব না।

সিলি : আমার মনে হয় তাই।

মামুন : আরো একটা জিনিস। এটা খুবই হালকা প্রশ্ন যে, জীবনানন্দ দাশ তার কালে, তার সময়ে এত বিখ্যাত ছিলেন কেন? যেটা মাইকেল ছিলনা। মাইকেলতো নিজে ভুল করছে। তার স্বদেশে আপনি দেখবেন পুরনো পত্র পত্রিকায় মাইকেল কিন্তু উপস্থিত ছিলেন না। এইটা কি কারণে মনে হয়?

সিলি : দুটো কারণ হতে পারে। একটা হচ্ছে যে নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করে। আরেক দ্বিতীয়ত আরেকটা হতে পারে যে যেরকম প্রথমে যখন অতি আধুনিক, এমন একটা জিনিস এসে পড়ে আমাদের চোখের সামনে যে বুঝতে পারিনা আমরা, উপভোগও করতে পারিনা।মামুন : উই কেনোট রিকোগনাইজ ইট।

সিলি : হ্যাঁ রেকগনাইজ করতে পারিনা আর সেজন্য আমরা, একটু ঠিক আছে, ঠিক আছে, থাক… এই নিয়ে আমরা কাজ করব, হেনতেন হৈচৈ করব এই জিনিস একটু পেইনফুল একটু আলাদা। পরে, যখন আমরা বুঝতে পারি যে আহা, যেমন এই সঙ্গীতের ব্যাপারে যে… কী বলা অতি আধুনিক যারা এদিকে কেউই পাত্তা দিচ্ছেনা এবং আস্তে আস্তে আমরা আত্মস্থ যাকে বলে আত্মস্থ… করে ফেলেছি। তার পর থেকে হ্যাঁ! হ্যাঁ! উফ! আমরা যদি বুঝতে পারতাম তখন আমরা বেশ প্রশংসা, আমরা দিতাম। বেচারা তখন মারা গেছে আমরা-

মামুন : আসলে জিনিসটা কী এইভাবে ধরতে পারি যে সব ভাষায় সব সাহিত্যে কোন কোন কবি থাকেন যারা সময়ের আগে চলেন-

সিলি : হ্যাঁ ভাল কথা আপনি বলে দিয়েছেন, হ্যাঁ ঠিক। খুব সুন্দরভাবে আপনি সাজিয়ে বলেছেন।

মামুন : তারা ঐ সময়টাকে বুঝত না। আচ্ছা, জসীম উদ্দীন সম্পর্কে আপনে কী বলেন? আমি একটু শুনি আপনের কাছে।

সিলি : আমি পড়েছি। আমাদের… আমি দেখতে, চাচ্ছিলাম। আমি দেখতে পাইনি। অন্য কোন কাজে আমি আটকে গেছি। আমার আগে মধুসূদন মঞ্চেই… আমার খুব ইচ্ছে ছিল দেখতে। কিন্তু দেখতে পারিনি। মানে আমি, যেতে পারিনি। অন্য কোন কাজে আটকে গেলাম।

মামুন : জসীম উদ্দীনের সাথে এমনি সরাসরি যোগাযোগ কোন সময় ঘটে নাই?

সিলি : না।

মামুন : আপনে যে সময় ঢাকা আসেন উনি জীবিত ছিলেন।
সিলি : হ্যাঁ, কিন্তু ওনার কী একজন… আচ্ছা কোন সালে মারা গেলেন?

মামুন : সেভেনটি সিক্সে মারা গেলেন। ১৪ই মার্চ ।

সিলি : … ওনার সাথে নাকি কোন একটা-

মামুন : অনুষ্ঠানে দেখা হইছিলো।

সিলি : অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল কিনা, একবার অন্তত পরিচয় করার জন্য আলোচনা বা তেমন কিছু হয়নি। একবার যদ্দূর মনে আছে একবার নাকি একজন আমাকে নিয়ে ওনার কাছে আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন স্পষ্ট… ঝাপসা ঝাপসা-

মামুন : ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ? মন্ত্রী?

সিলি : তা হবেনা। আহ্- থাকগে। স্মৃতিশক্তি এখন-মামুন : আচ্ছা আপনে বলেন, এখন যে রবীন্দ্রনাথ আপনাকে আকর্ষণ করল না কেন আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এতবড় একজন পাওয়ারফুল কবি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়া কাজ করলেন না কেন, ওই আগ্রহটা সৃষ্টি হইলো না কেন?

সিলি : আগ্রহতো নিশ্চয়ই ছিল। কারণ আমি পড়েছি। কিন্তু অনুবাদ করতে গেলে আমি ভেবেছি, অনেকে করেছে। ভাল করেই করেছে-

মামুন : বিভিন্ন দেশে।

সিলি : বিভিন্ন দেশী বিভিন্ন লোক আমি কি বা উপাদান হতে পারে? আমি তেমন কিছু করতে পারিনা। পরে যারা করছেন। করে যান। আমি অন্য কোন উপাদান…

মামুন : মাইকেল, জীবনানন্দ দাশ… আপনের বইটা কেমন চলছে? জীবনানন্দ দাশ আপনে বললেন যে রিপ্রিন্ট করা সম্ভব হয় নাই।

সিলি : রিপ্রিন্ট মানে কী, দ্বিতীয় সংস্করণ তো বোধহয় গেছে রবীন্দ্রর ভারতী থেকে। তবুও বিক্রি হচ্ছেনা। আর শুধু চাহিদা-

মামুন : মানে যার দরকার ঐটা শুধু সে নিবে। এর বাইরে আসলে পাঠক খুব মুষ্টিমেয় ।

সিলি : তা হতে পারে। কিন্তু ওরা দাম রেখেছে ৩০০ টাকা। অন্তত কেনা যায়। যদি কোন না কোন কারণে আমি জানি না কেন, বিভিন্নভাবে বিক্রিটা খুব ভাল করে করেনা।

মামুন : মানে বিপণনটা খুব বেশি সুবিধার না।

সিলি : বিপণন কথাটা আমি খুঁজছিলাম, আমি বিতরণ কথা ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু ওরা বলল বিপণন ওদের খুব একটা ভাল করেনি। থাকগে, হবে বোধ হয় কারণ একজন জীবনীকার আমার মতন, প্রভাতকুমার দাস ওনার বই আপনি দেখেছেন জীবনানন্দে উপরে। উনি ওখানে চাকরী করেন। চাকরী বলব না কাজ করেন আর ওনার সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। হতে পারে যে উনি কিছু ব্যবস্থা করতে পারবেন। যাতে ওই বিপণন…

মামুন : হ্যাঁ, বিপণনটা আরেকটু সুইফটি ভাল…। কিন্তু শিকাগো ইউনিভার্সিটি তে কি অবস্থা। ঐ বই ওরা কত হাজার ছাপল বা…

সিলি : না, শিকাগো ইউনিভার্সিটি ছাপায়নি। আচ্ছা অদ্ভুত ব্যাপার কি বলব?… কাছে আমি অনেক কিছু শুনেছি। প্রকাশকদের কাছে শুনেছি যে প্রকাশকদের কাছে, উনি খুব রেগে যেতেন নানান প্রকাশকদের উপরে-

মামুন : জীবনানন্দ দাশ?

সিলি : না, জীবনানন্দ দাশ না, বুদ্ধদেব বসু। যেমন…। থাকগে… কি এখনও আছে?
মামুন : আছে।

সিলি : আচ্ছা। তাইলে না লিখলেও চলবে। নানা ঠিক আছে, ঠিক আছে। লিখতে গেলে লিখতে পারবেন- কোন একজন প্রকাশকের উপরে উনি রেগে যেতেন। আমার যে দলিল আমি স্বাক্ষর দিয়েছি তাতে লেখা আছে যে, ৮০০ কপির পর থেকে আমি রয়্যালটি পাব।

মামুন : মানে ৮০০ কপি পর্যন্ত…

সিলি : ওদেরই ব্যাপার। ইদানিং মানে ছ’মাস আগে আমি ওদের কাছে লিখেছিলাম যে, আচ্ছা কতখানি বিক্রি হয়ে গেছে আর কতখানি রয়েছে। আমাকে লিখেছে যে ‘আমরা মাত্র ছয়শত কপি ছাপিয়েছি।‘ আর এর মধ্যে একটা গোডাউন থেকে অন্য গোডাউন সরাতে গেলেই ৩০০ কপি নষ্ট হয়ে গেছে। তার মানে ৩০০ কপি মাত্র আছে। আমি যে দলিল আমি সই দিয়েছিলাম তাতে লিখেছিল ৮০০ কপি।

মামুন : তাই…

সিলি : হ্যাঁ, ওরা একদম আমাদের গুল মেরেছে যে কীরকম ছাপা হয়েছে।
মামুন : সাইন… এগ্রিমেন্ট…

সিলি ঃ না, কিন্তু দলিলের মধ্যে তো লেখা আছে।

মামুন : ওইটা গুল মাইরা দিছে।

সিলি : গুল মেরে দিয়েছে ঠিকই তাই।

মামুন : মিথ্যা কথা তো।

সিলি : থাকগে। এরকম হয় সব জায়গায়।

মামুন : আর জীবনানন্দ দাশ যেইটা ছাপা হইল আমেরিকায়, ওইটা কত কপি ছাপা হইছে?

সিলি : জীবনানন্দ দাশের ব্যাপারে আমি বলছি ৮০০ খানা। কিন্তু ৬০০ ওরা বলেছে এবার ছাপিয়ে দিয়েছে, আর মাত্র ৩০০ কপি…
মামুন : এইটাতো কোলকাতারটা।

সিলি : না, না। এই হচ্ছে আমাদের দেশে। কোলকাতার ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। ক’ কপি ওরা ছাপিয়ে দিয়েছে আমি কিছুই জানিনা। ওরা… আমাদেরই।

মামুন : আপনের ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা আপনের বই সম্পর্কে আলোচনা করে?

সিলি : করে সামান্য কিছু। আমি পড়াই না এগুলো, আমার নিজের বই…

মামুন : কি বলা হয়? এই যে বিদঘুটে ভাষায় চিত্রকল্প এইগুলাসম্পর্কে আলোচনা করে? তাদের কি সিরিয়াস মনে হয় এইগুলা?

সিলি : … তো আমরা সবাই ধরে নেই কিন্তু তবুও যেভাবে আমি অনুবাদ করে দিয়েছি ওরা নাও স্বীকার করতে পারে। কিন্তু অন্তত: ওরা বলে দিতে পারে যে এমন একটা একজন অনুবাদক আমি, কীভাবে আমি… করেছি। ওরাও অনুবাদ করে…

মামুন : কিন্তু…

সিলি : কাসের মধ্যে আমরা তাই করি মাঝে মাঝে। এমনি, আমার যে, অনুবাদ আর মূল কবিতা আমরা মেলাই। ওরাও অনুবাদ করেছি। দেখি যে-

মামুন : ইদানিং কি নিয়া লেখালেখি করতেছেন?

সিলি : এখন আমি বসে আছি। আমি মাইকেল করতে গিয়ে, আর কিছুই ধরিনি। কিন্তু ভাবছি মাইকেল আরো কিছু করব।

মামুন : বাংলাভাষার আর কারোর উপর কাজ করার পরিকল্পনা আছে আপনার?

সিলি : আপাতত আমি ঠিক করিনি, কিন্তু নিশ্চয়ই আমি কারো না কারো লেখা তো…

মামুন : কত বছর যাবত বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে জড়িত আছেন?

সিলি : একাত্তরে আমি যোগ দিয়েছি। তারপর থেকে আছি। তার আগে আমি ছাত্র ছিলাম ওখানে।

মামুন : আমি এট্টুক জানি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কি আপনে ঢাকায় এসছিলেন বা বাংলাদেশে?

সিলি : না, না, না। আসলে ঐ সময় যে ’৭০ বা ’৭০ এর শেষ দিকে যে আমাদের আসবার কথা ছিল সাহায্য দেবার জন্যে, ঐ জলোচ্ছ্বাসের (জলোচ্ছ্বাসের) ব্যাপারে। কিন্তু আমি আসতে পারিনি। মানে ওরা আসতে দেয়নি আমাদের।

মামুন : পারমিশন দেয় নাই?

সিলি : হ্যাঁ, ইয়াহিয়া খান।

মামুন : কিন্তু ’৭১ এর যে যুদ্ধ হইল… ঐ সময় খোঁজখবর জানতেন আপনে?

সিলি : খোঁজখবর প্রায়ই আমি, দিনের পর দিন, আমরা রাখছিলাম। আমাদের কী বলে ঐ যে সংসদ, জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই সব আমরা বেশ জোর করে বলে দিচ্ছিল যে, ঐ ইলেকশনের যে কীভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে… তো ঠিক নয়-

মামুন : মানে আপনের সমর্থন ছিল না ঐসময়, যে কিলিং… সিলি : না, না। আমরা বিরুদ্ধে একদম। তার থেকে আমরা বেশ কিছু করছিলাম। অনেকে। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম।

মামুন : আপনে তখন শিক্ষক শিকাগো ইউনিভার্সিটির?

সিলি : তখন সবে আমি শুরু করেছি। আসলেই মানে যুদ্ধের শুরুতেই তখনও জয়েন করিনি। তখন আমি মার্চ মাসে জয়েন্ট করিনি। সেপ্টেম্বর মাসে জয়েন করেছি।

মামুন : আপনে কোন বিভাগে ছিলেন তখন?

সিলি : তখন পড়াতে গেলে, নিজের বিভাগে যাকে বলে সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড সিভিলইজেশন। মানে ভাষা ও সভ্যতা।

মামুন : এখনও?

সিলি : এখনও আছি ঐখানে।

মামুন : একই জাযগায়। এখনতো আপনি ফুল প্রফেসর?

সিলি : থাকগে।

মামুন : আমি আজকে বলব কারণ, ওরা কালকেও নাম ছাপাবে।

সিলি : ঠিক আছে।

মামুন : আর দুই তিনটা প্রশ্ন করলে আমার হইয়া যাবে।

সিলি : আচ্ছা।

মামুন : আপনে যখন এখানে আসলেন, আসার আগে বেঙ্গলি স্টাডি… আপনাকে ই-মেইলে কী দেওয়া হইছিল?

সিলি : কীভাবে থাকবার ব্যব¯’া, এইসব?

মামুন : না, আপনাকে নাকি ই-মেইলে হুমকি দেওয়া হইছিল?

সিলি : না, আরেকজনকে বোধ হয়। না আমাকে জানায়নি। আপনে কার কাছ থেকে শুনছেন?

মামুন : ঐ যে একজন স্টুডেন্ট আমাকে বলল। বললাম ঠিক আছে আমি জিজ্ঞেস করব তো।

সিলি : না। কিন্তু দু’জন আসেনি। ওদের বোধ হয় হুমকি এসে গেছে। ঐ যে… আর…। কাছে বোধ হয় হুমকি এসেছে।

মামুন : এর আগেওতো… কনফারেন্সে আপনে আসছেন?

সিলি : হ্যাঁ।

মামুন : এইবার কেমন লাগতেছে আপনের? সিলি : ভাল। অন্য কিছু হচ্ছে। যেহেতু আমরা আছি এইখানে, যেমন কালকে যে সাংবাদিকদের যে কথাবার্তা আমাদের দেশে থাকলে হত না। আর আমাদের লোক নেই। কিন্তু আজকে যে বেশ কিছু হচ্ছে আমাদের মতন সম্মেলন। কালকের একটু অন্যরকম।

মামুন : ইংরেজিতে বক্তৃতা।

সিলি : বক্তৃতা এবং মি: চৌধুরী।

মামুন : জাফরউল্লাহ চৌধুরী বক্তৃতা…

সিলি : হ্যাঁ। ওটাও আমাদের দেশে থাকলে ওরকম হতনা। মানে কনফারেন্স সম্মেলনের মধ্যে। কিন্তু ভাল… এখানে এসে আমি আমার মতন… পেরেছি।

মামুন : উপভোগ করছেন?

সিলি : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মামুন : বাংলা ভাষার কারণে কী আপনে এইখানে আসছেন? এদের সাথে আপনের সম্পর্ক নাকি এই ভাষার প্রতি?

সিলি : একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছে যে কেন আমি প্রেমে পড়েছি ভাষার? আমি বলেছি যে, প্রেমে পড়ার কোন কারণই নেই। কোন যুক্তিই নেই। কিন্তু এমন ঐতিহ্য… প্রেমে পড়লে এমনি যে, হয়ে গেছে। হয়ে গেছে, কি কারণে যে হয়ে গেছে আগে বলতে পারিনা। আমি বলতে পারিনা।

মামুন : ব্যাকরণ নাই।
সিলি : হ্যাঁ কোন ব্যাকরণ নেই। হ্যাঁ, ঠিক তাই। বিশেষ বিশ্লেষণও করা যাবেনা এই কারণে, ঐ কারণে…

মামুন : আমেরিকায় যারা বাঙ্গালী আছেন তাদের সাথে কেমন যোগাযোগ রাখেন?

সিলি : যোগাযোগ হয়।

মামুন : ওরা যোগাযোগ করে আপনের সাথে?

সিলি : হ্যাঁ, মাঝে মাঝে। দূর্গাপূজোর সময় অথবা একটা জয়ন্তী। রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী ঐখানে বক্তৃতা আমি দিয়েছিলাম। আর এমনি ঈদের সময় খুব একটা করিনা। মাঝে মাঝে জয়ন্তীর ব্যাপার থাকেই মাঝে মাঝে।

মামুন : এই যে ক্যাটাসট্রপি…

সিলি : শোচনীয় ব্যাপার। উফ!

মামুন : আমি আপনার মতামত জানতে চাই। কারণ সুনামিতে আমরা এফেক্টেড, সরাসরি না। আমাদের প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলঙ্কা, আরো দূরে ইন্দোনেশিয়া। এরাতো আমাদেরই স্বজন এবং লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে। এখনতো এক লাখ সত্তর হাজার বলতেছে।… রয়টার এরা বলতেছে। বিদেশীরা কালকে বলল যে আরও বেশি হবে। কিন্তু আমেরিকায় একটা সংগঠন কালকে বলল তারা নাকি ৩ ঘন্টা আগে জানতে পারছে যে সুনামি হইতে যাইতেছে। ওদের মেশিন আছে, সেই প্রতিষ্ঠানটার নাম যাই হোক, আবহাওয়া… তো উনি বলল যে বিচার হওয়া উচিত। বক্তৃতায় উনি বলল। আপনের কি মনে হয় ঐ দেশের নাগরিক আপনে, এইযে ওরা ফোরকাস্টকরল না। এতগুলি লোক মারা গেল, এইটা করাটা ঠিক হইছে নাকি?

সিলি : বলছি। আমাদের দেশের একদম যে জায়গায় আমরা আছি, গ্রীষ্মকালীন একটা জায়গা- শিকাগোতে আমরা থাকিনা… আমরা থাকি। ওইখানে একটা ঝড় এসছে। আচ্ছা ঝড় আসার আগে আমরা বুঝতে পেরেছি যে ঝড় আসছে। আমাদের যে জায়গায় আমরা বসবাস করি ওই অব্ধি আসেনি। কিন্তু আমাদের খুব ভাল বন্ধুদের বাড়ি একদম ভেঙ্গে ফেলেছে। শেষ হয়ে গেছে। আর ঠিক আগেই খবর বের পাওয়া গেছে। কিন্তু খবর পেলেও কী বা করা যায়? বাড়িতো রয়েছেই। বাড়ি কি এখান থেকে ওখান সরাতে হলে, মানুষ তো… কিন্তু একটা যেমন ঘন্টা বা কোন একটা জিনিস যাতে লোক শুনতে পারে যে আসছে, কিন্তু ঝড় যখন আসছে তখন শোনা যাবে কিনা এই হচ্ছে একটা কথা মানে থাকলেও ওরকম একটা যেমন আযানের যে ডাক আমরা শুনতে পাই। কিন্তু খুব একটা ঝড় এসে গেল, আমরা শুনতে পাচ্ছিনা।

মামুন : ফোরকাস্ট করল কিন্তু আমরা… কিন্তু ওরাতো এইটা গোপন রাখছে বলে নাই।

সিলি : কিন্তু ইচ্ছা করে গোপন রেখেছে, নাকি বুঝতে পারেনি কাকে বা কী ভাবে বা কোন সূত্রে যে জানান, যাবে। আমি জানিনা। আমি ঐ খবর খুব একটা শুনিনি। কিন্তু তবুও- যেমন এমন অনেকে বলছে যে- এখন থেকে আমরা কোন একটা ব্যবস্থা করি যাতে ভবিষ্যতে ওরকম হলে…

মামুন : … মারা গেছে।

সিলি : হ্যাঁ, তাও আছে। কিন্তু তবুও খবরটা, মানে কিভাবে ছাপানো যায়, কিভাবে আমি, যদিও আমি জানি আপনার কাছে আমি কিভাবে খবর পৌঁছে দিতে পারি… ওরা করবে কিছু না কিছু। আর খুব সত্যি করা যাবে কিনা।

মামুন : মানে একটা ব্যবস্থা অন্তত থাকা দরকার যে পৃথিবীর যেখানেই হোক আধুনিক যে সিস্টেম আছে, এমন কোন… ভূমিকম্পন, সুনামি এটলিস্ট খবর পৌঁছান যে অমুক দেশে হইতে পারে। তাইলে কিছু লোক অন্তত প্রাণে রক্ষা পাইতে পারে।

সিলি : না,… অন্য কিছু।

মামুন : আমার একটা প্রশ্ন এইটা উত্তর দিলে দিতে পারেন, নাও দিতে পারেন। আমেরিকার যে আধিপত্যবাদ…

সিলি : আধি…?

মামুন : আধিপত্যবাদ মানে এই যে এ্যাগ্রেসিভ, বিভিন্ন দেশে গিয়া আপনারা যুদ্ধ করেন।

সিলি : কী কথাটা?

মামুন : … কথা বলতেছি যে, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ-
সিলি : বাংলায় আধি-?

মামুন : আধিপত্য মানে জোর কইরা, জবরদস্তি কইরা, আপনে একজন সচেতন মানুষ, একজন লেখক এবং ভারতবর্ষে বহু আসছেন। আমি পারসোনালি আপনের দেশ এই পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার, দেশ দখল করতেছে তেলের জন্য হোক, যাই হোক, এইটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

সিলি : আমি খারাপ চোখে দেখি। আমি একে সমর্থন করিনা।

মামুন : ওয়ার্ল্ড পিস-এর কথা বলে আমেরিকা-
সিলি : আমরা দেখিছি যে নির্বাচনের ব্যাপারে একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। নির্বাচনে জেতার জন্যও অনেক সময় যুদ্ধ করতে হয়।

মামুন : আমারও কিন্তু তাই ধারণা ছিল।

সিলি : বুশ কিভাবে জিতে গেছে আমরা কল্পনাও করতে পারিনা, যুদ্ধের কারণে? … বাদ দিলেও যে কারণেই হোক জিতে গেছে।

মামুন : ইলেকশন কি ফেয়ার হইছে?

সিলি : ইলেকশন ফেয়ার হয়েছে কিনা আমাদের সন্দেহ আছে। কারণ দুহাজারে যে, এখন কি হয়েছে আমাদের মনের মধ্যে যে ঠিক নাও হতে পারে। অনেকেই ওনাকে আমার মতে একটু সন্দেহ করে। শেষের দিকে এইরকম মানে শর্টকাটের যে পদ্ধতি…

মামুন : মানে যুদ্ধ মনোভাব আমেরিকার সেটা ডেফিনেটলি আপনি নিন্দা করেন।

সিলি : হ্যাঁ। কেন যে আমরা করেছি। আমরা করেছি একটা কারণে, তেল।

মামুন : তেল নেওয়ার জন্য, বিজনেস করার জন্য। সাহিত্য। এটা সম্ভবত আমার লাস্ট কয়েশ্চেন, পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষা আর পূর্ব বাংলার বাংলাদেশী বাংলা ভাষা, এই দুই ভাষার মধ্যে আপনে কোন পার্থক্য দেখেন?

সিলি : আচ্ছা একটা পাথর্ক্য আমি বলতে পারি। সাধারণত আপনার কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগে আর বুঝতে পারি। কিন্তু তফাৎ এই সাধারণত বাংলা যাকে বলে, আপনারা এত দ্রুতভাবে কথা বলেন, এত তাড়াতাড়ি কথা বলেন, বুঝতে সামান্য একটু অসুবিধা হয়েছে। আর ঘটিরা, পশ্চিম বাংলার মানুষরা এত আস্তে আস্তে কথা বলে আমার খুব সুন্দর লাগে।

মামুন : বুঝতে সুবিধা…

সিলি : হ্যাঁ, বুঝতে। বোঝাটা। যা ওরা বলছে ঐ নিয়ে আমি মন্তব্যকরছিনা। কিন্তু বুঝতে গেলে আস্তে আস্তে কথা বললে আমার পক্ষে সুবিধে, সাধারণত এইখানে আরো তাড়াতাড়ি কথা বলে।

মামুন : অনেকে বলে যে, পশ্চিম বাংলার যে বাংলাভাষা এইটাতো অনেকটা হিন্দি ডোমিনেটেড, অন্যদিকে আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, আমাদের ভাষা বাংলা, আমাদের জাতীয় সংগীত বাংলা, সবকিছু বাংলা, বাংলাদেশ বাঙ্গালীর। কিন্তু পশ্চিম বাংলার ওরা বলতে পারেনা ভারত বাঙ্গালীর। এই যে একটা পার্থক্য এর মধ্যে হয়ে গেছে। আরেকটা জিনিস বলি ওদের সাহিত্য আর আমাদের সাহিত্যÑ আপনের কি মনে হয় যে একটু উত্তরনের দিকে বাংলাদেশের সাহিত্য, না ওরা আমাদের চেয়ে অনেক আধুনিক? আমি এখনকার কথা বলছি ধরেন গত ২০-৩০ বছর। জীবনানন্দ দাশের পর আমি জানি না শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কি রকম পড়ছেন বা জানেন কিনা।

সিলি : পড়ি। তুলনা করতে গেলে তেমন শামসুর রহমানের সঙ্গে আল-মাহমুদের তুলনা করতে গেলে আমি কি-বা বলতে পারি? আর তারপর তুলনা করতে গেলে কিংবা বলা যায়?… বৈচিত্র্য যাকে বলে আছে। বৈশিষ্ট্য যে এখানকার বৈশিষ্ট্য আমি অন্তত…

মামুন : মানে আপনার চোখে ধরা পড়েনি। একই রকম মনে হয়।

সিলি : একই রকম বিষয়, নিশ্চয়ই তো আলাদা থাকবেই। কিন্তু পড়তে গেলে মোটামুটি আমি বঙ্গদেশ যাকে বলে-

মামুন : ওরাতো ভাষা আন্দোলন করে নাই।

সিলি : হ্যাঁ ওরা লজ্জিত।

মামুন : মুক্তিযুদ্ধ, তারপর ৪৭ সাল, ’৪৭ সালে আমরাও ফাইট করছি।

সিলি : তবুও একটু, কী বলে যে ইয়ে হয়ে, যায়। ওরা বলে যে, আমরা কিছুই দিইনি… কিন্তু ওরা দিয়েছে মানে আপনারা। ওদের কোন একটা লজ্জার ব্যাপারতো রয়েই গেছে।

মামুন : এটা বলে নাকি?

সিলি : হ্যাঁ, বলে, প্রায়ই বলে।

মামুন : কবি আল মাহমুদ, শামসুর রহমান পড়ছেন কিনা, এইটা জিজ্ঞেস করছি।

সিলি : হ্যাঁ, পড়েছি। আর খুব বিস্তৃতভাবে পড়িনি। কিন্তু তবুও আমি পড়েছি।

মামুন : দুই কবির কি মনে হয় আপনার? মাইকেল যেমন…, প্রায় একইরকম। দুইটার দুই রকম টেস্ট।

সিলি : এত সূক্ষ্মভাবে আমি বিচার করতে পারিনা।

মামুন : মানে ঐভাবে এখন আর পড়তেছেন না,

সিলি : হ্যাঁ।

মামুন : আবার ঢাকায় আসবেন কবে?

সিলি : তা বলা যায়না। ভবিষ্যতে কি হবে না হবে একদম বলা যায়না।

মামুন : আপনার পরিবার সম্পর্কে বলেন। ফ্যামিলি মেম্বার-

সিলি : আমার স্ত্রী আছেন।… ছেলে পোলে নেই।

মামুন : কোন বছরে বিয়ে করছেন আপনি? সরি পারসোনাল প্রশ্ন।

সিলি : না, ঠিক আছে। বলতে পারেন যে ’৭১ এ।

মামুন : উনি কি বাংলাদেশে এসছেন?

সিলি : ঠিক তা নয় কিন্তু, বলতে পারেন আমরা একসঙ্গে। বসবাস করেছি।

মামুন : উনি বাংলাদেশে এসছেন?

সিলি : না, উনি আসেননি। আর ভারতবর্ষেও আসেননি। আর নিউ ইয়র্ক অব্ধিও আসতে পারেন না। ওনার যে, শিকাগো তো বিরাট বড় শহর। কিন্তু তবুও ওনার… এত বড় জায়গায় এত লোকের সামনে গেলে। মানে একটু অস্বস্তিবোধ করেন। কেন যে, বোধ করেন জানিনা। আজ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত যাননি।

মামুন : হৈচে বড়-

সিলি : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি যাই, যেতে পারি যাব নাটক এত বড়, খুব দেখতে ইচ্ছা আছে কিন্তু তবুও যেতে পারিনা।

মামুন : আচ্ছা আমার কথা শেষ হয়ে গেছে এবার অটোগ্রাফটা দেন। এইটা আমার আম্মা… আপনি একটা ছবি এঁকে দিন।

সিলি : না, না, পারিনা।

মামুন : লেখকরা তো আঁকে। আমার… কী যারা লেখে তাদের দিয়ে, ছবি আকাই। যা ইচ্ছা আইকা একটা সিগনেচার করে দেন। যা হয় এঁকে দেন।

সিলি : …
করছিনা। কিন্তু বুঝতে গেলে আস্তে আস্তে কথা বললে আমার পক্ষে সুবিধে, সাধারণত এইখানে আরো তাড়াতাড়ি কথা বলে।

মামুন : অনেকে বলে যে, পশ্চিম বাংলার যে বাংলাভাষা এইটাতো অনেকটা হিন্দি ডোমিনেটেড, অন্যদিকে আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, আমাদের ভাষা বাংলা, আমাদের জাতীয় সংগীত বাংলা, সবকিছু বাংলা, বাংলাদেশ বাঙ্গালীর। কিন্তু পশ্চিম বাংলার ওরা বলতে পারেনা ভারত বাঙ্গালীর। এই যে একটা পার্থক্য এর মধ্যে হয়ে গেছে। আরেকটা জিনিস বলি ওদের সাহিত্য আর আমাদের সাহিত্যÑ আপনের কি মনে হয় যে একটু উত্তরনের দিকে বাংলাদেশের সাহিত্য, না ওরা আমাদের চেয়ে অনেক আধুনিক? আমি এখনকার কথা বলছি ধরেন গত ২০-৩০ বছর। জীবনানন্দ দাশের পর আমি জানি না শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কি রকম পড়ছেন বা জানেন কিনা।

সিলি : পড়ি। তুলনা করতে গেলে তেমন শামসুর রহমানের সঙ্গে আল-মাহমুদের তুলনা করতে গেলে আমি কি-বা বলতে পারি? আর তারপর তুলনা করতে গেলে কিংবা বলা যায়?… বৈচিত্র্য যাকে বলে আছে। বৈশিষ্ট্য যে এখানকার বৈশিষ্ট্য আমি অন্তত…

মামুন : মানে আপনার চোখে ধরা পড়েনি। একই রকম মনে হয়।

সিলি : একই রকম বিষয়, নিশ্চয়ই তো আলাদা থাকবেই। কিন্তু পড়তে গেলে মোটামুটি আমি বঙ্গদেশ যাকে বলে-

মামুন : ওরাতো ভাষা আন্দোলন করে নাই।

সিলি : হ্যাঁ ওরা লজ্জিত।

মামুন : মুক্তিযুদ্ধ, তারপর ৪৭ সাল, ’৪৭ সালে আমরাও ফাইট করছি।

সিলি : তবুও একটু, কী বলে যে ইয়ে হয়ে, যায়। ওরা বলে যে, আমরা কিছুই দিইনি… কিন্তু ওরা দিয়েছে মানে আপনারা। ওদের কোন একটা লজ্জার ব্যাপারতো রয়েই গেছে।

মামুন : এটা বলে নাকি?

সিলি : হ্যাঁ, বলে, প্রায়ই বলে।

মামুন : কবি আল মাহমুদ, শামসুর রহমান পড়ছেন কিনা, এইটা জিজ্ঞেস করছি।

সিলি : হ্যাঁ, পড়েছি। আর খুব বিস্তৃতভাবে পড়িনি। কিন্তু তবুও আমি পড়েছি।

মামুন : দুই কবির কি মনে হয় আপনার? মাইকেল যেমন…, প্রায় একইরকম। দুইটার দুই রকম টেস্ট।

সিলি : এত সূক্ষ্মভাবে আমি বিচার করতে পারিনা।

মামুন : মানে ঐভাবে এখন আর পড়তেছেন না,

সিলি : হ্যাঁ।

মামুন : আবার ঢাকায় আসবেন কবে?

সিলি : তা বলা যায়না। ভবিষ্যতে কি হবে না হবে একদম বলা যায়না।

মামুন : আপনার পরিবার সম্পর্কে বলেন। ফ্যামিলি মেম্বার-

সিলি : আমার স্ত্রী আছেন।… ছেলে পোলে নেই।

মামুন : কোন বছরে বিয়ে করছেন আপনি? সরি পারসোনাল প্রশ্ন।

সিলি : না, ঠিক আছে। বলতে পারেন যে ’৭১ এ।

মামুন : উনি কি বাংলাদেশে এসছেন?

সিলি : ঠিক তা নয় কিন্তু, বলতে পারেন আমরা একসঙ্গে। বসবাস করেছি।

মামুন : উনি বাংলাদেশে এসছেন?

সিলি : না, উনি আসেননি। আর ভারতবর্ষেও আসেননি। আর নিউ ইয়র্ক অব্ধিও আসতে পারেন না। ওনার যে, শিকাগো তো বিরাট বড় শহর। কিন্তু তবুও ওনার… এত বড় জায়গায় এত লোকের সামনে গেলে। মানে একটু অস্বস্তিবোধ করেন। কেন যে, বোধ করেন জানিনা। আজ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত যাননি।

মামুন : হৈচে বড়-

সিলি : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি যাই, যেতে পারি যাব নাটক এত বড়, খুব দেখতে ইচ্ছা আছে কিন্তু তবুও যেতে পারিনা।

মামুন : আচ্ছা আমার কথা শেষ হয়ে গেছে এবার অটোগ্রাফটা দেন। এইটা আমার আম্মা… আপনি একটা ছবি এঁকে দিন।

সিলি : না, না, পারিনা।

মামুন : লেখকরা তো আঁকে। আমার… কী যারা লেখে তাদের দিয়ে, ছবি আকাই। যা ইচ্ছা আইকা একটা সিগনেচার করে দেন। যা হয় এঁকে দেন।

সিলি : …

জন্ম: জুন ২১, ১৯৪১, আমেরিকা।

আমেরিকান একাডেমিশিয়ান, অনুবাদক এবং বাংলা ভাষা সাহিত্য বিশেষজ্ঞ সিলি রামপ্রসাদ সেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনুবাদ করেন।

১৯৭৬ সালে বাঙ্গালী কবি জীবনানন্দ দাসের উপরে তার থিসিস সন্দর্ভ রচনা করেন। যার শিরোনাম Doe in Heat: A Critical Biography of the Bengali Poet Jibanananda Das (১৮৯৯-১৯৫৪). তিনি কিছু বাংলা সফ্টওয়্যারও তৈরী করেছেন। ইধৎরংধষ ধহফ ইবুড়হফ তার ২০০৮ সালে ভারত থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ বই।

তিনি ২০০৮ সালে University of Chicago-i Department of South Asian Languages and Civilizations থেকে অবসর গ্রহন করেন।

PaidVerts