মহাদেব সাহা’র কবিতা

মহাদেব সাহা’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

মহাদেব সাহা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালের একজন অন্যতম প্রধান কবি। মহাদেব সাহা বাংলাদেশের ষাটের দ্বিতীয়ভাগে কাব্যচর্চা শুরু করে অদ্যাবধি কাব্যদেবীর নিকট সমর্পিত হয়ে কাব্য রচনা করে চলেছেন। পাঁচ দশকের অধিক সময়ব্যাপী কাব্যচর্চায় মগ্ন কবি মহাদেব সাহা জাগতিক জীবনের তথা সাংসারিক মোহ ত্যাগ করে একনিষ্ঠভাবে কবিতার সাথেই গড়ে তুলেছেন সুখ-দুঃখের ঘরবসতি। তাঁর সমকালে অনেকেই কাব্যচর্চায় নিয়োজিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের কবিতায় কিন্তু তাঁদের অনেকেই কবিতার ঘর-সংসার থেকে নির্বাসিত হয়েছেন- কেউবা স্বেচ্ছায়, কেউ অনিচ্ছায়। মহাদেব সাহা কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর সমকালে যে মহীরুহতে পরিণত হয়েছেন সেকথা এখন নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, মহাদেব সাহা পরিশ্রমী কবি; যিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন তাঁর কাব্যবিশ্ব। নিঃস্বার্থভাবে পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন কাব্যদেবীর চরণতলে জাগতিক চাওয়া-পাওয়াকে উপেক্ষা করে। কবিতার দেবী তাঁকে যতটা কাছে টেনেছেন, তিনি ততটাই বাংলাদেশের কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন, ঋণী হয়েছি আমরা।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি:
মহাদেব সাহা ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বগদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী। সহধর্মনী নীলা সাহা এবং দুই পুত্র তীর্থ সাহা ও সৌধ সাহা।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি।

কাব্যগ্রন্থ:

এই গৃহ এই সন্ন্যাস (১৯৭২)
মানব এসেছি কাছে
চাই বিষ অমরতা
কী সুন্দর অন্ধ
তোমার পায়ের শব্দ
তবু স্বপ্ন দেখি
সোনালী ডানার মেঘ
পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি
কে পেয়েছে সব সুখ, সবটুকু মধু,
শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা
দুঃসময়ের সঙ্গে হেঁটে যাই
দুঃখ কোন শেষ কথা নয়
ভালোবাসা কেন এতো আলো অন্ধকারময়
লাজুক লিরিক-২
দূর বংশীধ্বনি
অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে – অর্ধেক আধারে
কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা
সন্ধ্যার লিরিক ও অন্যান্য
মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা (কাব্য-সংকলন)
মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা (কাব্য-সংকলন)
মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র (কাব্য-সংকলন) – ১ম খন্ড, ২য় খন্ড, ৩য় খন্ড, ৪র্থ খন্ড,
মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা (কাব্য-সংকলন)
প্রেম ও ভালবাসার কবিতা (কাব্য-সংকলন)
নির্বাচিত ১০০ কবিতা (কাব্য-সংকলন)
নির্বাচিত একশ (কাব্য-সংকলন)
প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা(কাব্য-সংকলন)

প্রবন্ধ

আনন্দের মৃত্যু নেই
মহাদেব সাহার কলাম
কবিতার দেশ ও অন্যান্য ভাবনা
মহাদেব সাহার নির্বাচিত কলাম

শিশুসাহিত্য:

টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর
ছবি আঁকা পাখির পাখা
আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া
সরষে ফুলের নদী
আকাশে সোনার থালা
মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা (সংকলন)

পুরস্কার ও সম্মাননা

মহাদেব সাহা তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ২০০২ সালে খালেদদাদ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার অন্যতম।
নির্বাচিত কবিতা:

০১. বন্ধুর জন্য বিঞ্জাপন
০২. কতো নতজানু হবো, দাঁতে ছোঁব মাটি
০৩. চিঠি দিও
০৪. জুঁইফুলের চেয়ে সাদাভাতই অধিক সুন্দর
০৫. বাউল
০৬. গাভীর চোখের দিকে
০৭. তোমার জন্য ভাঙছি পাথর
০৮. মানুষ খুব ভালো নেই কেউ
০৯. অন্তহীন নৃত্যের মহড়া
১০. সেইসব ভালোবাসার দিন
১১. আমাকে চেনে না কেউ
১২. কবিতার প্রেমে
১৩. রাধা
১৪. মন ভালো নেই
১৫. বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ
১৬. কীভাবে তোদেরও বলি
১৭. তুমি চলে যাবে বলতেই

 

 

বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন

আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার
পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে
আমার ফুসফুস থেকে দূষিত বাতাস;

বেড়ে গেরে শহরময় শীতের প্রকোপ
তার মুখ মনে হবে সবুজ চায়ের প্যাকেট, এখানে
ওখানে দেখা দিলে সংক্রামক রোগ,
ক্ষয়কাশ উইয়ে খাওয়া কারেন্সি নোটের মতো আমার ফুসফুসটিকে
তীক্ষè দাঁতে ছিদ্র করে দিলে, সন্দেহজনকভাবে পুলিশ ঘুরলে
পিছে, ডবল ডেকার থেকে সে আমাকে
ফেলে দেবে কোমল ব্যান্ডেজ, সে আমাকে ফেলে দেবে
ট্রান্সপেরেন্ট জাদুর রুমাল, আমি যাবো পাখি হয়ে পুলিশ-স্কোয়াড
থেকে
জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে, বলবো-
আমি প্রেমিকার পলাতক গুপ্তচর;

সে এসে অন্ধকারে চতুর চোরের মতো
আমার পকেট থেকে নেবে সব স্থলপদ্মগুলি
বলবে কানের কাছে চুপি চুপি অসম্ভব বদমাশ সে,
– চল ঘুরে আসি রাতের শো থেকে
তারপর নিয়ে যাবে ক্রামাগত ভুল ঠিকানায়
তবু সেই ভীষণ বদমাশটা আমার সমস্ত ভুল ভাগ করে নেবে,
ওর সমস্ত পাপ লিখে যাবে আমার ডায়েরিতে
আমার পাপ হাতে নিয়ে ধর্মযাজকের মতো অহস্কারে ঢুকবে গির্জায়

আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে রেস্তরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের
মাঠে এমন একজন বন্ধু খুঁজে বেড়াই যাকে আমি
মৃত্যুর প্রাক্কালে উইল করে দিয়ে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি, কুৎসা
আমার লাম্পট্য, পরিবর্তে সে আমার চিরদিন যোগাবে ঘুমের ওষুধ
আমার অপরাধের ছুরি রেখে দেবে তার বুকের তলায়, আমার
পিতার কাছে
চিঠি দেবে এই বলে- ওর কথা ভাববেন না, ও বড়ো ভালো ছেলে
নিয়মিত অফিস করে দশটা পাঁচটা; অথচ সে জানবে আমার
সব বদঅভ্যাস, স্বভাবের যাবতীয় দোষ
তবু সে যাবে আমার সাথে ক্যামেরায় ফিল্ম ভর্তি করে
নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক যুবকের ছবি তুলে নিতে, অবশেষে
মফস্বল শহরগামী কোনো এক ট্রেনে চড়ে নেমে যাবে
আমার সাথে ভুল ইস্টিশনে;

এখানে ওখানে সর্বত্র আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম
যে আমাকে নিয়ে যাবে সুন্দরবনে হরিণ শিকারে, হরিণের শিং থেকে তার স্বচ্ছ
খুর থেকে খুঁটে নেবে দামী অংশগুলি যেন ও গাভরি
খুর থেকে বানাবে বোতাম, সে
আমাকে প্রতিদিন ধার দেবে লোভ, এখানে
সেখানে শহরের পরিচিত অঞ্চলগুলিতে আমি সেই সরল সাঙাতটিকে
খুঁজি, আমি শুধু সারাজীবন একটি বন্ধুর জন্য প্রত্যহ বিজ্ঞাপন দিই
কিন্তু হায়, আমার ব্লাডগ্রুপের সাথে
কারো রক্ত মেলে না কখনো।

কতো নতজানু হবো, দাঁতে ছোঁবো মাটি

কতো নতজানু হবো, কতো দাঁতে ছোঁবো মাটি
এই শিরদাঁড়া হাঁটু ভেঙে
কতোবার হবো ন্যুব্জ আধোমুখ?
আজীবন সেজদার ভঙ্গিতে কতো আর নোয়াবো শরীর?
এক রকম স্পষ্ট দাঁড়ানো দৃঢ়ভাব
কারো কারো সহজাত থাকে,
মানুষের মধো থেকে তাহাদের পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি মাথা
মানুষের চে’ও কিছু উঁচু
আমি কতো আর নতজানু হবো
দাঁতে ছোঁবো মাটি?
আমার জনক সে কি জন্ম থেকে নিয়েছেন এই ভিক্ষা,
এই শিশু পালনের ব্রত ওরে তুই জন্ম নতজানু হয়ে বেড়ে
ওঠ
সবাই যখন পায়ের পাতায় ভর করে
পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি মাথা আরো উচ্ছে তুলে দম্ভে দাঁড়াবে
আমার বালক তুই তখনো লুকাবি মুখ
নিজেরই পায়ের তলদেশে;
আমি তাই জন্ম নতজানু, নতমুখ
মাথা তুলে বুখ খাড়া করে কোনো দিন দাঁড়ানো হলো না
বুকভাঙা বাঁকানো কোমর আমি নতজানু লোক
কতো আর নতজানু হবো কতো দাঁতে ছোঁবো মাটি!
চিঠি দিও

করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার মাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়
বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,
আসবেন অচেনা রাজার লোক
তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।
এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে
তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ
এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল!
ওই তো রাজার লোক যায় ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে, কাঁধে ব্যাগ,
হাতে কাগজের একগুচ্ছ সীজন ফ্লাওয়ার
কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর ঝোপ, কারো নিবিড় বকুল
এর কিছুই আমার নয় আমি অকারণ
হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি, আমার কি কোনো কিছু নাই ?
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি
দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এল কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও বলো, ভালোবাসি!
জুঁইফুলের চেয়ে সাদাভাতই অধিক সুন্দর

যে কোনো বিষয় নিয়েই হয়তো এই কবিতাটি লেখা যেতো
পিকনিক, মর্নিং স্কুলের মিসট্রেস
কিংবা স্বর্ণচাপার কাহিনী; হয়তো পাখির প্রসঙ্গ
গত কয়েকদিন ধরে টেলিফোনে তোমার কথা না শুনতে
পেয়ে জমে থাকা মেঘ,
মন ভালো নেই তাই নিয়েও ভরে উঠতে পারতো এই
পঙক্তিগুলো
অর্কিড কিংবা উইপিং উইলোও হয়ে উঠতে পারতো
স্বচ্ছন্দে এই কবিতার বিষয়;
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একজন কবির
মনু মিয়ার হাঁড়ির খবর ভুললে চলে না,
আমি তাই চোয়াল ভাঙা হারু শেখের দিকে তাকিয়ে
আর্ন্তজাতিক শোষণের কথাই ভাবি,
পেটে খিদে এখন বুঝি কবিতার জন্য কি অপরিহার্য
জুঁইফুলের চেয়ে কবিতার বিষয় হিসেবে আমার কাছে
তাই
শাদা ভাতই অধিক জীবন্ত- আর এই ধুলোমাটির মানুষ;
এই কবিতাটি তাই হেঁটে যায় অন্ধগলির নোংরা বস্তিতে
হোটেলের নাচঘরের দিকে তার কোনো আকর্ষণ নেই,
তাকে দেখি ভূমিহীন কৃষকের কুঁড়েঘরে বসে আছে
একটি নগ্ন শিশুর ধুলোমাখা গালে অনবরত চুমো খাচ্ছে
আমার কবিতা,
এই কবিতাটি কখনো একা-একাই চলে যার অনাহারী
কুষকের সঙ্গে
জরুরী আলাপ করার জন্য,
তার সঙ্গে কী তার এমন কথা হয় জানি না
পর মুহূর্তেই দেখি সেই ক্ষুধার্ত কৃষক
শোষকের শস্যের গোলা লুট করতে জোট বেঁধে দাঁড়িয়েছে;
এই কবিতাটির যদি কোনো সাফল্য থাকে তা এখানেই।
তাই এই কবিতার অক্ষরগুলো লাল, সঙ্গত কারণেই লাল
আর কোনো রঙ তার হতেই পারে না-
অন্য কোনো বিষয়ও নয়
তাই আর কতোবার বলবো জুঁইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই
অধিক সুন্দর।

তোমার জন্য ভাঙছি পাথর

তোমার জন্য এই যে আমি সারা জনম ভাঙছি পাথর
কাটছি পাহাড়, খুঁড়ছি নদী, হচ্ছি এমন দুঃখে কাতর;
এই যে আমি তোমার জন্য সইছি এমন দুঃখদহন
রাত্রিদিন একলা আমি এই যাতনা করছি বহন।
তোমার জন্য প্রিয়তমা, এই যে আমি ডুবছি জলে
এই যে আমার তোমার জন্য জ্বলছে আগুন বুকের তলে;
তোমার জন্য খুঁড়ছি মাটি, এই যে আমি ভাঙছি দেয়াল
জলোচ্ছ্বাসে দাঁড়িয়ে তবু তোমার ক্ষেতে বাঁধছি যে আল।

তোমার জন্য এই যে আমি সারাজীবন ভাঙছি পাথর
সে কথাটি ভেবেও কেউ হয়নি একটু স্নেহকাতর
এই যে আমি তোমার জন্য মরুর বুকে ছোটাই নদী
সব দুঃখ ভুলতে পারি তুমি ফিরে তাকাও যদি;
তোমার জন্য এই যে আমি ফেলছি এতো চোখের জল,
তবু কারো হয়নি মায়া, ফোটেনি কোনো হৃৎকমল।
মানুষ খুব ভালো নেই কেউ

মানুষ কেউ খুব ভালো নেই, সুখে নেই, মানুষের দিকে
তাকালেই বুঝি তার কতো দুঃখ
তার বুকে কতো ভারী বোঝা, কতো ঝড়,
সে যখন তাকায় আমি দেখি তার দুচোখ বেয়ে
টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে অশ্র“
এই চোখের জল পড়তে পড়তে কতো নদী ও সমুদ্র হচ্ছে
আমরা দেখি না,
আমি কান পেতে শুনি তার বুকের ভেতর কী হাহাকার।
আমি জানি তারা সবাই কতো রকম বিপদ-আপদে আছে
কতো রকম দুঃখ, যাতনা ও দুর্যোগ পেরোতে হয় তাদের,
আরো অর্থকষ্ট, কারো পুত্রকন্যা, কারোবা সংসার ভেঙে গেছে
চাকরির লাঞ্ছনা, জীবিকার গ্লানি, কাছের মানুষের
কপটতা
এইসব আরো অনেক কিছু নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ
এইসব আরো অনেক কিছু নিয়ে মানুষ হাসছে, কথা বলছে,
আনন্দ করছে;
মানুষকে আমি তাই কখনো দোষ দেই না, তার ওপর মন
খারাপ করি না
আমি জানি তারা খুব সুখে নেই, ভালো নেই
তাদের কাঁধের ওপর একশো-একটা ঝামেলা, মাথায়
রাশি রাশি দুর্ভাবনা,
এই মানুষকে কতোবার আমি আড়ালে দুহাতে মুখ ঢেকে
রাখতে দেখেছি;
তার এই নিঃশব্দ কান্না জমতে জমতে
পৃথিবীর বুক কতো যে ভারী হয়ে উঠলো আমরা জানি না,
মানুষ যখন আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় আমি দেখি
তার চোখে কী অঝোর বর্ষণ।

সেইসব ভালোবাসার দিন

কিছুই কি ফিরে পাবো না আর, সেই সূর্যোদয়,
সেই ভোরবেলা,
কেঁদে ওঠে মন, বড়ো ব্যাকুল হয়ে ওঠে হৃদয়, তোমার জন্য
সর্ষেফুলের মধুর গন্ধ
টিনের ঢোল-বাজানো হাটখোলা, সেই গমগম শব্দ, সেই
হাটে ঢোল দেওয়া
আর সেসব কিছুই কি ফিরে পাবো না, মাটির মেঝেতে কলাপাতা,
ফেনাভাতের থালা, মোম জ্বালিয়ে অন্ধকারে ঝরাপাতার শব্দ শোনা
হয়তো কিছুই ফিরে পাবো না আর, ফিরে পাবো না আর, ওই যে
ট্রেন চলে যায়…
সেই যে নদীর ঘাটে নৌকা ভাসাবার দৃশ্য, পাতাঝরা হেমন্তের দিন
এইসব আকাশ বাতাস নদীজল, খোলা হাওয়া কোথায় রেখে এলাম,
এখন কেবল শীতের বাতাসে সেই স্মৃতি ভেসে আসে, সেই
কাঁচা কৈশোর, বাল্যকাল
বুকপকেটে কতো যে আমপাতা জামপাতা, কতো যে সুপুরি নারকেল কলাগাছ
বুকের ভেতর,
মনে পড়ে সেই শ্যামল জ্যোৎস্নায় পুকুরঘাটে
কতো দুপুররাত গড়িয়ে যায়;
সেই যে নদীর দিকে তাকিয়ে আমি দুচোখ কতো জলে ভাসিয়েছি
সেই আমআঁটির ভেঁপু সেই নিম জারুলের বন
সব কিছুর ভেতর দিয়ে কার মুখ বারবার মনে পড়ে যায়
আর কিছুই মনে পড়ে না এখন
কেবল হারিয়ে যেতে থাকে, হারিয়ে যেতে থাকে, হারিয়ে যেতে থাকে
যেমন করে একদিন ফুলজোড় নদীতে পাড় ভেঙেছে
বর্ষাকালে।
সেই আমবাগান, ধানক্ষেত, গোলাঘর
সারারাত গোরুর গাড়ির শব্দ, লণ্ঠনবাধা সাইকেল,
রাত জেগে পালা করে সেই যে গ্রাম পাহারা দেওয়া
লিচুগাছে টিনের শব্দ
সেই সন্ধ্যার অন্ধকার, সেই ভোরের আলো, সেই
মধ্যরাতের বাতাস,
বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে, মনের ভেতর সব কেমন হিম
হয়ে যায়;
সেই স্মৃতি স্বপ্ন বেদনা, সেই পুরনো ভাঙাবাড়ি,
মনের ভেতর কেমন উথাল পাতাল করে ওঠে
ছিপ নৌকা
সেই নদীর বুকে নৌকাবাইচ, রথের মেলা
এসব সুখ দুঃখ কিছুই ফিরে পাবো না আর, সেই সন্ধেবেলা
গান শুনতে যাওয়া,
কতো কিছুই যে পেছনে ফেলে এলাম, সেই হালট, মামাবাড়ি,
কলের গান
আজ বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে, মনের ভেতর হিম বাতাস
বয়ে যায়;
নদীর পাড় ভাঙে, হাট ভাঙার শব্দ হয়, গোরুর গাড়িতে
নতুন বউ বাড়ি ফেরে
ডুলি পালকি বাদামের নাও, নিঝুম রাতে বাঁশি শুনতে শুনতে
ঘুম আসে,
কতোক্ষণ এই বিষাদ ও স্বপ্নের মধ্যে কেটে যায় কে জানে;
কিন্তু এসব কিছুই আর ফিরে পাওয়ার নয়, স্কুলের লাইনটানা খাতা,
মাটির স্লেট, কাঠপেনসিল
সেই টিনের বাক্স, নদীর ঘাটে মুখ ধোয়া, পিতলের জামবাটি,
এসব এখন ভাঙামেলার করুণ দৃশ্যের মতো হাহাকারময়
এর মধ্যে দিয়ে চলে গেছে ইলেকট্রিকের তার, শান-বাঁধানো
রাস্তা,
ট্রাকের শব্দ, নদীর ওপর ব্রিজ
এই পথ দিয়ে চলতে চলতে এসব কথা এখন মনে পড়ে।
আমার মায়ের লালপেড়ে শাড়ি, সিঁদুরের কৌটো,
উঠানে তুলসীগাছ,
এসব আবার কুড়িয়ে পেতে ইচ্ছে করে, যদি কুড়িয়ে
পাওয়া যেতো…
কখনো কখনো হারানো রুমাল পাওয়া যায়, হারানো ছাতা
পাওয়া যায়, হ্যান্ডব্যাগ পাওয়া যায়
এই দিনগুলি ফিরে পাওয়া যায় না কেন, এই
শীত গ্রীষ্ম বর্ষা লঞ্চ খেয়াঘাট?
লটারিতে টাকা পাওয়ার মতো এই দিনগুলি যদি পাওয়া যেতো
বুকের ভেতর এখন শীতকাল কেবলই পাতা ঝরে, কেবলই
পাতা ঝরে
আর কিছুই শোনা যায় না;
সেই কলকাতা থেকে ফিরে এসে পুরসুন্দরী ধর্মশালার
গল্প
সার্কাসের তাঁবু, পাটালি গুড়, চিড়ের মোয়া,
কেমন টিভি সিরিয়ালের মতো মনে হয়, কাপড়ে বাঁধানো
বাবার জমাখরচের খাতা,
লোহার সিন্দুক, কাঠের বাক্স
সেই পুরনো চিঠিগুলি কেউ আমাকে আর
ফিরিয়ে দেবে না
পি এম বাগচীর পঞ্জিকা, ডাকে-আসা খবরের কাগজ,
মাসিক বসুমতি,
দেবদারু বন, অর্জুন গাছ, সন্ধে হলে শেয়ালের ডাক
ঝিঁঝিঁপোকা
বরশি ফেলে মাছ ধরা, সেই মেঘলা দুপুর, সেই ঝড়বৃষ্টি,
সেই বর্ষার জল,
মন কেমন ভারী হয়ে ওঠে, দুচোখ ভিজে যায়;
কেউ আমাকে আর এই স্বপ্নগুলি ফিরিয়ে দেবে না, এই
লাইনটানা শাদা খাতা, কাঠপেনসিল, সেই কাঁসার থালা
কেউ ফিরিয়ে দেবে না, কেউ ফিরিয়ে দেবে না, কেউ
ফিরিয়ে দেবে না।
এখন নদীর ওপর ব্রিজ, শান-বাঁধানো পাকা রাস্তা,
ইলেকট্রিকের লম্বা তার
আমার সেই বাঁশি হারিয়ে গেছে, নায়ের বাদাম হারিয়ে গেছে,
মাটির কলস হারিয়ে গেছে…
সেই বুলবুলি পাখি, সেই ঘুঘুর ডাক, সেই ভাঁটফুল,
সেই বাঁশবাগান,
শেফালি এখন কোথায় আছে কে জানে, তার ঠিকানা জানি না।
সব ঠিকানা হারিয়ে গেছে আজ, সব চিঠি হারিয়ে গেছে,
তুমি একবার সেই পুরনো চিঠি, কাঠের বাক্স, শান্ত দিঘির মতো
স্নিগ্ধ দিনগুলি ফিরিয়ে দিতে পারো ?
আমি সব দেবো তোমাকে এই টেলিফোন, এই কলকব্জা,
এইসব সুইচ, ক্যালকুলেটর
তুমি সেই শান্ত দিঘি, মজা পুকুর, সেই বেতবন
সেই ধারাপাত, সেই বৃষ্টি ধারা ফিরিয়ে দাও আমাকে,
তুমি আমাকে হাটে সুর করে পড়া কবিতাগুলি দাও,
আমি তোমাকে মুদ্রণশিল্প দিয়ে দেবো;
তুমি আমাকে সেই পুরনো পঞ্জিকাগুলি দাও, সেই খনার বচন,
সেই হাতে লেখা কলাপাতা
আমি তোমাকে সব মুদ্রণ শিল্প দিয়ে দেবো।
তুমি শ্যাম্পু-সাবান নিয়ে নাও, আমাকে ফিরিয়ে দাও ডালবাটা,
খাঁটি দুধের গন্ধ, তালপাখা
বুকের ভেতর সেই কাঁঠালপাতা, বিলের জল, সেই সরপুঁটি,
সেই বেলেমাছ
কতোদিন ভরা জ্যেৎস্নার মধ্যে শিশিরে শরীর ভিজে গেছে আমার
আমার মন বড়ো উড়–উড়– করে, সেই কাঠের
পুল, পাটশাক
এই তো সেদিন সারা দুপুর নদীর জলে ডুবসাঁতার,
মাছধরা,
সেই সব মায়াভরা মুখ, সবুজ মাঠ, পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধ
বুক ভরে ওঠে সেই স্মৃতি স্বপ্ন বেদনায়, হেমন্তের ঝরাপাতার মতো
কোথায় হারিয়ে গেলো সেইসব জ্যোৎস্নারাত, ভালোবাসা;
সেইসব সুখ, সেইসব দুঃখ, সেইসব ভালোবাসার দিন
কেউ আর ফিরিয়ে দেবে না আমাকে
শীতের লেপের ওম, টিনের চালে ওস পড়ার কান্না,
আমার সেই ভালোবাসার দিনগুলির ওপর কারা এমন
কালি মাখিয়ে দিলো জানি না।
শুধু মনে হয় বুকের মধ্যে আমার এই চোখের জলের মধ্যে
সেই সব সুর্যাস্ত ও ভোরবেলা,
সেইসব বর্ষার হেমন্তের স্বপ্ন, সেইসব সন্ধ্যাতারা মিশে আছে
সেই হলুদ পাখির শিস, সেই বাঁশি, খঞ্জনি, একতারা,
এসব কিছুই আর কেউ ফিরিয়ে দেবে না আমাকে
এখন ব্যস্ত রাস্তায় সবাই ছুটে যা, এখন ট্রাফিক পুলিশের
হুইসিল
তবু আমার বুকের ভেতর এইসব শব্দ, গন্ধ,
ভালোবাসা,
একদিন হয়তো সেই মুখ দেখতো পারো, সেই
বকুল ফুলের মতো ভালোবাসার মুখ।

আমাকে চেনে না কেউ

এখন আমাকে কেউ তেমন চেনে না আর, এ শহরে
কেমন বেগানা হাঁটি আমি,
পথভুল করে পরীবাগ চেড়ে চলে যাই রমনার দিকে
কোনো চেনা গাছ, চেনা জলের ফোয়ারা
হয়তো কখনো কাছে ডাকে;

কখনো পার্কের নিঃসঙ্গ শীতল বেঞ্চ হাতছানি দেয়
ডাক দেয় কখনোবা বৃষ্টিভেজা অবসন্ন কাক
পথের ধারের নেড়িকুত্তাগুলো মাঝে মাঝে চোখ
তুলে দেখে,
এর বেশি বড়ো কেউ আজকাল আমার করে না খোঁজ,
কোন রম্য পানশালা তেমন ডাকে না,
কোন জলসাঘর, নাচের আসর, মনোজ্ঞ সঙ্গীতসন্ধ্যা
করে না আমাকে মনে-
কারো বিগলিত গাঢ় টেলিফোন তেমন ওঠে না বেজে
বন্ধুর ব্যাকুল কণ্ঠস্বর তেমন শুনি না আর
শুধু এই নির্জন টানেলে একা হেঁটে যাই।

অনেকেই দেখেও দেখে না, একবারও বাড়ায় না হাত
আমি হাঁটি নিঃসঙ্গ রাস্তায়, মনে হয়
আমি এক অচেনা মানুষ, কিছুই চিনি না,
চিনি না এখানে পথঘাট, জানি না রাস্তার নাম,
এই দালান, হর্ম্যরাজি নিতান্ত অচেনা
রাস্তার সাইনবোর্ডগুলো যেন কোনো অজানা
ভাষায় লেখা
আমি ঠিক পড়তে পারি না;

এই হাইরাইজ, গাড়ির বহর, মোহন
রেস্তরাঁ
মোটেও আমার দিকে ফেরায় না চোখ,
শুধু মাঝে মাঝে কোনো পুকুরঘাটের সিঁড়ি,
লেকের শ্যাওলাপড়া জল
দু একটি শুকনো ঝরাপাতা এখনো আমাকে মনে রাখে।

দয়া করে দুএকটি প্রিয় ফুল, তৃণলতা, বনের উদ্ভিদ
বিলায় সুবাস
পথের বান্ধব বৃক্ষ এখনো আমার দিকে প্রসারিত করে
তার বুক,
এ শহরে আর কেউ আমাকে চেনে না।
কবিতার প্রেমে

এই কবিতার পায়ে সঁপেছি আমার যতো
দিবসরজনী, মাসবর্ষ, এই মনুষ্য জীবন;
আমার সমস্ত সুখ, আনন্দ-বিষাদ-স্বপ্ন
সবই সমর্পণ করেছি যে আমি এই
কবিতার কাছে; এই কবিতার জন্য আমি
আমর মনুষ্যজন্ম উৎসর্গ করেছি;

শুধু এই কবিতার জন্য আমি ভালোবেসে
হয়েছি পাগল, লণ্ডভণ্ড করেছি জীবন,
মেখেছি দুহাতে কালি, ডুবেছি অতলে
এই কবিতার জন্য নিঃশব্দে করেছি বিষপান;
পৃথিবীর সমস্ত যাতনা আমি কেবল সয়েছি
এই কবিতার উন্মাদনা দেখো বুকে নিয়ে।

এই অর্ধ কোটি বর্ষ আমি তাই কাটালাম
তার ধ্যানে, মৌনব্রতে একাকী এমন
কতো গ্রীষ্মবর্ষা, বসন্তপূর্ণিমা গেলো, গেলো
শারদযামিনী; আমি এক নিঃসঙ্গ কয়েদী যেন
বহুকাল বসে আমি শব্দহীন নির্জন টানেলে
আর কোনোদিকে কখোনোই ফেরাইনি চোখ;
এই কবিতার প্রেমে মজে এভাবে দিলাম
পাড়ি কতো না কণ্টকবন, দুর্গম পাহাড়,
দুহাতে নিলাম তুলে পৃতিবীর যাবতীয়
বিষ; শুধু এই কবিতাকে ভালোবেসে
হলাম এমন দিওয়ানা-প্রেমিক, হলাম
এমন আপাদমস্তক এক ব্যর্থ মানুষ।

রাধা

আমি তোমাকে বলতে চাই রাধা, তোমাকে
ডাকতে চাই রাধা রাধা বলে
দাঁড়ে বসা টিয়ার মতন;
তোমার তো আছে একটি সুন্দর নাম
খুব মিষ্টি ছোট্ট একটি ডাকনামও আছে
তবুও তোমাকে দিতে চাই আমার হৃদয়
থেকে আরেকটি নাম,
আমার হৃদয় থেকে তুলে দিতে চাই
টকটকে একটি গোলাপ।
সুরঞ্জনা, বনলতা, এলসা কি বিয়াত্রিচে
এ রকম কোনো নাম তোমাকে দিতেই পারি
কিংবা তোমাকে ডাকতে পারি
যে কোনো ফুলের নামে
অভিধান ঘেঁটে দিতে পারি অপূর্ব সুন্দর
কোনো নাম
বৃক্ষ বা নদীর কাছ থেকে তোমার একটি নাম
সংগ্রহ করতে পারি আমি
আকাশের বুক থেকে তুলে নিতে পারি
তোমার একটি নাম
নিতে পারি রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে
মনোমুগ্ধকর কোনো কাব্যনাট্য থেকে;
কিন্তু এরূপ সহস্র শব্দ ভুলে
খুব মৃদুস্বরে নিরিবিলি
তোমাকে ডাকতে চাই রাধা।

মন ভালো নেই

বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই,
মন ভালো নেই,
ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা
সারাদিন ডাকি সাড়া নেই
একবার ফিরেও চায় না কেউ
পথ ভুল করে চলে যায়, এদিকে আসে না
আমি কি সহস্র বর্ষ এভাবে
তাকিয়ে থাকবো শূন্যতার দিকে?
এই শূন্য ঘরে, এই নির্বাসনে
কতোকাল, আর কতোকাল!
আজ দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি,
উদ্যানে উটেছে ক্যাকটাস-
কেউ নেই, কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই,
শুধু শূন্যতার এই দীর্ঘশ্বাস, এই দীর্ঘ পদধ্বনি।
টেলিফোন ঘোরাতে ঘোরাতে আমি ক্লান্ত
ডাকতে ডাকতে একশেষ;
কেউ ডাক শোনে না, কেউ ফিরে তাকায় না
এই হিমঘরে ভাঙা চেয়ারে একা বসে আছি।

একী শাস্তি তুমি আমাকে দিচ্ছো ঈশ্বর,
এভাবে দগ্ধ হওয়ার নাম কি বেঁচে থাকা!
তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, আমি বেঁচে থাকতে চাই
আমি ভালোবাসতে চাই পাগলের মতো
ভালোবাসতে চাই-
এই কি আমার অপরাধ!
আজ বিষাদ ছুঁয়েছে বুক, বিষাদ ছুঁয়েছে বুক
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই;
তোমার আসার কতা ছিলো, তোমার যাওয়ার
কথা ছিলো-
আসা-যাওয়ার পথের ধারে
ফুল ফোটানোর কথা ছিলো
সেসব কিছুই হলো না, কিছুই হলো না;
আমার ভেতরে শুধু এককোটি বছর ধরে অশ্র“পাত
শুধু হাহাকার
শুধু শূন্যতা, শূন্যতা।
তোমার শূন্য পথের দিকে তাকাতে তাকাতে
দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো,
সব নদীপথ বন্ধ হলো, তোমার সময় হলো না-
আজ সারাদিন বিষাদপর্ব, সারাদিন তুষারপাত…
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই।

বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ

আমি হয়তো কোনো দিন কারো বুকে
জাগাতে পারিনি ভালোবাস,
ঢালতে পারিনি কোনো বন্ধুত্বের
শিকড়ে একটু জল-
ফোটাতে পারিনি কারো একটিও আবেগের ফুল
আমি তাই অন্যের বন্ধুকে চিরদিন বন্ধু বলেছি;
আমার হয়তো কোনো প্রেমিকা ছিলো না,
বন্ধু ছিলো না,
ঘরবাড়ি, বংশপরিচয় কিচ্ছু ছিলো না,
আমি ভাসমান শ্যাওলা ছিলাম;
শুধু স্বপ্ন ছিলাম;
কারো প্রেমিকাকে গোপনে বুকের মধ্যে
এভাবে প্রেমিকা ভেবে,
কারো সুখকে এভাবে বুকের মধ্যে
নিজের অনন্ত সুখ ভেবে,
আমি আজো বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ।

তোমাদের সকলের উষ্ণ ভালোবাসা, তোমাদের
সকলের প্রেম
আমি সারি সারি চারাগাছের মতন আমার বুকে
রোপন করেছি,

একাকী সেই প্রেমের শিকড়ে আমি
ঢেলেছি অজস্র জলধারা।
সকলের বুকের মধ্যেই একেকজন নারী আছে,
প্রেম আছে,
নিসর্গ-সৌন্দর্য আছে,
অশ্র“বিন্দু আছে
আমি সেই অশ্র“, প্রেম, নারী ও স্বপ্নের জন্যে
দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি,
সকলের বুকের মধ্যে যেসব শহরতলী আছে,
সমুদ্রবন্দর আছে
সাঁকো ও সুড়ঙ্গ আছে, ঘরবাড়ি
আছে
একেকটি প্রেমিকা আছে প্রিয় বন্ধু আছে,
ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে
সকলের বুকের মধ্যে স্বপ্নের সমুদ্রপোত আছে,
অপার্থিব ডালপালা আছে
আমি সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা, সেই স্বপ্ন
সেই রূপকথার
জীবন্ত মানুষ হয়ে আছি;
আমি সেই স্বপ্নকলা হয়ে আছি, তোমাদের
প্রেম হয়ে আছি,
তোমাদের স্বপ্নের মধ্যে ভালোবাসা হয়ে আছি
আমি হয়ে আছি সেই রূপকথার স্বপ্ন মানুষ।

কীভাবে তোদের বলি

আজ আর কীভাবে তোদের কাতর মুখের দিকে
চেয়ে বলি
কোথাও তোদের জন্য একখণ্ড
জমি যদি নাও থাকে,
তবুও আছে তোদের পিতার এই বুক,
যে কোনো সবুজ জমির চেয়ে স্নেহচ্ছায়াময়,
অধিক সবুজ;
যে কোন নদীর চে’ও জলময়
তোদের এ পিতার হৃদয়
আজ কী করে তোদের বলি, তোদের পিতার
এই দুটি চোখ
পৃথিবীর সব আশ্রয়ের চে’ও
নিরাপদ অনন্ত আশ্রয়,
এই তোদের অক্ষম পিতার দুইখানি হাত
তোদের আগলে রাখার জন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে
বেশি কার্যকর, শক্তিশালী-
আজ আর কীভাবে তোদের বলি
এই পিতৃহৃদয়
প্রেইরী অঞ্চলের চেয়েও তৃণাচ্ছাদিত
ছায়াময়;
বড়ো ভয় হয় অক্ষম পিতার
এই নিষ্ফল আশ্বাস শুনে যদি
তোমরা না পাও ফিরে মনোবল
কিংবা সাহস
আজ তাই বারবার ভাবি
কীভাবে তোদের কাতর মুখের দিকে চেয়ে বলি
এইসব কথা!

তুমি চলে যাবে বলতেই

তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে
পাড় ভাঙার শব্দ শুনি-
উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম হাওয়া বয়,
শার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে;
দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াই আমি
দুই চোখে কিছুই দেখি না-
এর নাম তোমার বিদায়, আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি,
খোদাহাফেজ।
তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন
মাথা নেড়ে না, না বলো
সঙ্গে সঙ্গে মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে;
তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো
তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড়
হয়ে যায়,
তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল শূন্যতা শূন্যতা
ছাড়া আর কিছুই দেখি না
আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়।
অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া,
কতোদূর যাওয়া-
হয়তো নীলক্ষেত থেকে বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট
তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে
সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি
পাতা ঝরার শব্দ শুনি-
আর কিছুই শুনি না।

PaidVerts