নির্মলেন্দু গুণ’র কবিতা

নির্মলেন্দু গুণ’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম: জুন ২১, ১৯৪৫ (আষাঢ় ৭, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ), কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণা) বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদেরও একজন তিনি। মাত্র ৪ বছর বয়সে মা বীনাপনিকে হারান তিনি ৷ মা মারা যাবার পর তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন৷

শিক্ষাজীবন
বারহাট্টা স্কুলে ভর্তি হন শুরুতে৷ স্কুলের পুরো নাম ছিলো করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউট। দুই বিষয়ে লেটারসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পান ১৯৬২ সালে৷ মাত্র ৩ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল স্কুল থেকে৷ বাবা তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন- “কৃষ্ণ কৃপাহি কেবলম। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’৷ মেট্রিকের পর আই.এস.সি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে৷ মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন এখানে৷ নেত্রকোণায় ফিরে এসে নির্মলেন্দু গুণ আবার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকা ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছে আসার সুযোগ পান৷ নেত্রকোণার সুন্দর সাহিত্যিক পরিমন্ডলে তাঁর দিন ভালোই কাটতে থাকে৷ একসময় এসে যায় আই.এস.সি পরীক্ষা৷ ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের৷ পরবর্তীতে বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া৷ কিন্তু না, তিনি চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে৷ ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ ৷ হঠাৎ্ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়৷ দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে৷ ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া৷ আর ভর্তি হওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ফিরে আসেন গ্রামে৷ আই.এস.সি-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা৷ তখনকার দিনে অনেক টাকা৷ ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাশ করেন তিনি ( যদিও বি.এ. সার্টিফিকেটটি তিনি তোলেননি। ১৯৬৫ সালে আবার বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷

কর্মজীবন

স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন।

সাহিত্য ধারা
তিনি প্রধানত একজন আধুনিক কবি। শ্রেণীসংগ্রাম, স্বৈরাচার-বিরোধিতা, প্রেম ও নারী তার কবিতার মূল-বিষয় হিসেবে বার বার এসেছে। কবিতার পাশাপাশি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। নিজের লেখা কবিতা এবং গদ্য সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য হলো –
“অনেক সময় কবিতা লেখার চেয়ে আমি গদ্যরচনায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। বিশেষ করে আমার আত্মজৈবনিক রচনা বা ভ্রমণকথা লেখার সময় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আমি যে গদ্যটি রচনা করতে চলেছি, তা আমার কাব্য-রচনার চেয়ে কোনো অর্থেই ঊনকর্ম নয়। কাব্যকে যদি আমি আমার কন্যা বলে ভাবি, তবে গদ্যকে পুত্রবৎ। ওরা দুজন তো আমারই সন্তান। কাব্যলক্ষ্মী কন্যা যদি, গদ্যপ্রবর পুত্রবৎ।”
বহুল আবৃত্ত কবিতাসমূহের মধ্যে – হুলিয়া, অসমাপ্ত কবিতা, মানুষ (১৯৭০ প্রেমাংশুর রক্ত চাই), আফ্রিকার প্রেমের কবিতা (১৯৮৬ নিরঞ্জনের পৃথিবী) – ইত্যাদি অন্যতম।

পুরস্কার

বাংলা একাডেমী পদক (১৯৮২)
একুশে পদক (২০০১)

প্রকাশিত গ্রন্থ

কাব্যগ্রন্থ:

প্রেমাংশুর রক্ত চাই (১৯৭০)
না প্রেমিক না বিপ্লবী (১৯৭২)
কবিতা, অমিমাংসিত রমণী (১৯৭৩)
দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী (১৯৭৪)
চৈত্রের ভালোবাসা (১৯৭৫)
ও বন্ধু আমার (১৯৭৫)
আনন্দ কুসুম (১৯৭৬)
বাংলার মাটি বাংলার জল (১৯৭৮)
তার আগে চাই সমাজতন্ত্র (১৯৭৯)
চাষাভুষার কাব্য (১৯৮১)
অচল পদাবলী (১৯৮২)
পৃথিবীজোড়া গান (১৯৮২)
দূর হ দুঃশাসন (১৯৮৩)
নির্বাচিতা (১৯৮৩)
শান্তির ডিক্রি (১৯৮৪)
ইসক্রা (১৯৮৪)
প্রথম দিনের সূর্য (১৯৮৪)
আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও (১৯৮৪)
নেই কেন সেই পাখি (১৯৮৫)
নিরঞ্জনের পৃথিবী (১৯৮৬)
চিরকালের বাঁশি (১৯৮৬)
দুঃখ করো না, বাঁচো (১৯৮৭)
১৯৮৭ (১৯৮৮)
যখন আমি বুকের পাঁজর খুলে দাঁড়াই (১৯৮৯)
ধাবমান হরিণের দ্যুতি (১৯৯২)
কাব্যসমগ্র, ১ম খন্ড (১৯৯২, সংকলন)
কাব্যসমগ্র, ২য় খন্ড (১৯৯৩, সংকলন)
অনন্ত বরফবীথি (১৯৯৩)
আনন্দউদ্যান (১৯৯৫ )
পঞ্চাশ সহস্র বর্ষ (১৯৯৫ )
প্রিয় নারী হারানো কবিতা (১৯৯৬)
শিয়রে বাংলাদেশ
ইয়াহিয়াকাল (১৯৯৮ )
আমি সময়কে জন্মাতে দেখেছি (২০০০)
বাৎস্যায়ন (২০০০)

গল্পগ্রন্থ:

আপন দলের মানুষ

ছড়ার বই:

১৯৮৭ সোনার কুঠার

আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ
আমার ছেলেবেলা
আমার কণ্ঠস্বর
আত্মকথা ১৯৭১(২০০৮)

অনুবাদ
১৯৮৩ রক্ত আর ফুলগুলি

নির্মলেন্দু গুণ:

১। স¦াধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো
২। হুলিয়া
৩। উপেক্ষা
৪। মানুষ
৫। যাত্রাভঙ্গ
৬। আফ্রিকার চিঠি
৭। একজন কবির সাক্ষাৎকার
৮। অগ্নিসঙ্গম
৯। তোমার চোখ এতো লাল কেন
১০। লিপিষ্টিক
১১। ওটা কিছু নয়
১২। হিমাংশুর স্ত্রীকে
১৩। গৌতম
১৪। পুরুষের প্রতি
১৫। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি

স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ৷

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷
সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷
না পার্ক না ফুলের বাগান, – এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷

হুলিয়া

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ্দুর-;
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে৷

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল;- আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি৷
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না৷

বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনলো না৷
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি৷
সেই একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি৷

আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ,
শো-ঁশো ঁকরছে হাওয়া৷
অনেক বদলে গেছে বাড়িটা,
টিনের চাল থেকে শুরু করে পুকুরের জল,
ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনখানে৷

পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লকলকে জিভ দেখালো৷
স্বত:স্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চতুর্দিকে ঘাস, জঙ্গল,
গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে অনায়াসে; যেন সবখানেই
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি৷
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়,
আমাকে দেখেই পালালো একজন, একজন গন্ধ শুঁকে নিয়ে
আমাকে চিনতে চেষ্টা করলো- যেন পুলিশ-সমেত চেকার
তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল৷
হাঁটতে- হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া অশোক,
একসময়ে কী ভীষন ছায়া দিতো এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারতো এর ছায়ায়৷
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়ে ছিলুম৷
সেই বাসন্তী, আহা, সেই বাসন্তী এখন বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার- সন্তানের জননী হয়েছে৷

পুকুরের জলে শব্দ উঠলো মাছের, আবার জিভ দেখালো সাপ,
শান্ত-স্থির-বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে – -৷
আমি বাড়ির পেছন থেকে দরোজায় টোকা দিয়ে
ডাকলুম,— “মা’৷
বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে দরোজায় কোন কন্ঠস্বর ছিল না,
মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেলো৷
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম৷

মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন; আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা- খরচের পাশে কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙ্গা- কাচের অভাব পূরণ করছে
ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি৷

মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহকুমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি৷
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে৷
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বৃষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য৷
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস৷
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
— আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
— আইয়ুব খান এখন কোথায়?
— শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?
— আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?

আমি কিছুই বলবো না৷
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখবো৷
উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে
কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলবো:
” আমি এসবের কিছুই জানি না,
আমি এসবের কিছুই বুঝি না৷’

উপেক্ষা

অনন্ত বিরহ চাই, ভালোবেসে কার্পণ্য শিখিনি৷
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উৎস গ্রাস করা প্রেম; যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও৷

আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারি বিরহে?
মানুষ

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ।
আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না ।
কী করে তাও বেঁচে থাকছি, ছবি আঁকছি,
সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে
সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে । অবাক লাগে ।
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো,
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো,
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো,
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো ।
আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন ?
মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে,
নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে,
নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে
ভালোবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে ।
মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো ,
বাবা থাকতো, বোন থাকতো,
ভালোবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো ।
আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা
আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত
বেঁচে থাকাটা আর হতো না ।
মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই,
অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি ।
যাত্রা-ভঙ্গ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷
হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷
তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷
তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরনী নায়ে৷
নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷
তুই কেমন করে যাবি?

আফ্রিকার চিঠি

আজ জিম্বাবুই থেকে বাংলার প্রত্যন্ত পল্লীতে
পরিব্যাপ্ত হলো নববর্ষ। তোমার শুভেচ্ছা নিয়ে
উড়ে এলো দূরের বাতাস; রাতের শুভেচ্ছা নিয়ে
দিনের পিয়ন যেন উঁকি দিলো পুবের আকাশে।

খামের ভিতরে পুরে তুমি পাঠিয়েছো আফ্রিকার
হাওয়া নীলাকাশে ডানা মেলে তাতেই উড়াল দিলো
আমার হৃদয়। আমি স্বপ্নাবিষ্ট পৃথিবীর পাখি,
ভারতসাগর পাড়ি দিয়ে মেঘ ফুঁড়ে উড়ে যাচ্ছি
জোহান্সবার্গের শ্রমিক বস্তিতে, ডাকার বন্দরে…।

আমার গৃহটি যেন হো চি মিন শহরের সেই
সুসজ্জিত কনফারেন্স হল, যেখানে বর্ণনানুক্রমে
সাজানো আসনে বসে আমরা শুনছি বর্ণবাদী
আফ্রিকার নির্বাসিত গল্পকার গুমা’র ভাষণ।

‘Hallo Africa, have you finished your poem?”

‘Oh, no, no,… not yet,… not yet.’

‘We shall overcome one day.”— বিধবস্ত কাম্পুচিয়ার

বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে আমরা গাইছি নবজীবনের গান।
হ্যানয়ের কবিতা মেলায় আমরা আবৃত্তি করছি কবিতা।

ফেলে-আসা অন্তরঙ্গ স্মৃতির আকাশ খুঁড়ে খুঁড়ে
আমার বিপন্ন করতল ক্রমশ রুপান্তরিত হলো
এক অলৌকিক গোলাপ বাগানে।
তোমার চিঠিটি যেন সদ্যফোটা স্মৃতির গোলাপ,
টকটকে লাল, তাজা, ঘ্রাণময়।
সেই গোলাপের গভীরে তাকিয়ে আমি দেখলাম:
আলজিরিয়ার কবি আহমেদ হামদী
এঙ্গোলার এন্টোনিও কারদ্যসোঁ
কঙ্গোর লিওপোল্ড
ঘানার ওকাই
ইথিওপিয়ার আসেফা গেব্রি মরিয়ম
তিউনিসিয়ার মোস্তফা ফেরসি
মোজাম্বিকের রাউল দ্যা সিল্ভা
জাম্বিয়ার মোসেস কুয়ালী
শিয়রে লীয়নের কলসো জসেন
মরোক্কোর মোহাম্মদ বাররাদা…..
যেন ভাঙা আয়নার কাচে মুক্তিকামী আফ্রিকার
একগুচ্ছ ছড়ানো-ছিটানো মুখ।

আমি সেই মুখগুলো একত্রিত করে গাঁথলাম
নব-আফ্রিকার একখানি ধ্যানমৌন মালা।
আমি দেখলাম পিকাসোর শান্তি কপোতের মতো
কালোঘোমটার অন্তরালে তোমার মানবরূপ;
সারল্যের উজ্জ্বল ঐশ্বর্যে প্রস্ফুটিত চঞ্চল যৌবন।
আমি প্রেমে পড়লাম কালো আফ্রিকার।
প্রিয় মিলনের স্বপ্নাচ্ছন্ন ঘোরে আমি শুনতে পেলাম
মুক্তির উদাত্ত কণ্ঠ, দরোজায় তর্জনীর টোকা;
ঘৃনার অতীত রাত্রি পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা প্রেম।

সামনে পথের বাঁকে অজস্র কন্টক আছে জানি,
তাই, তোমার উদ্দেশে আজ আমিও পাঠাই বাণী:
‘দস্যুপায়ের কাঁটামারা জুতোর তলায় দলিত আফ্রিকা,
শতাব্দীর শোষিত আফ্রিকা, লাঞ্ছিত আফ্রিকা, কমরেড
এসো, অভিন্নযাতনাবিদ্ধ এশিয়ার হাতে হাত ধরে
সভ্যের বর্বর লোভ আমরা থামিয়ে দিই চিরতরে।’
একজন কবির সাক্ষাৎকার

: আচ্ছা, এককথায় কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন?
– মানুষ।

: আপনার কবিতায় রাজনীতির ব্যবহার খুব বেশি, মনে হয়
শিল্পের ব্যাপারটাকে আপনি খুব একটা, – এর কারণ কী ?
– মানুষ।

: স্বর্গ, নরক; এসব বিষয়ে আপনার চিন্তা ভাবনা জানতে
ইচ্ছে করে। একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলবেন কি ?
– খুব সহজ করে বললে বলতে হবে, মানুষ।

: মানুষের মৃত্যু হলে পরে, কিছু ভেবেছেন কি ?
– হ্যাঁ, ভেবেছি, তারপরও মানুষ।

: সব প্রশ্নের উত্তরই যদি মানুষ, তাহলে এবার বলুন,
মানুষ বলতে আপনি কী বোঝেন?
– সমাজবদ্ধ শ্রমজীবী মানুষ।

: তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো শেষ-পর্যন্ত ?
– দাঁড়ালো না, চলতে থাকলো।

: মানলাম চলতে থাকলো, কিন্তু কে মানুষকে দিলো তার এই
অন্তহীন চলার গতি ? সে কি কোনো পরম শক্তি নয় ?
– হ্যাঁ, মানুষ এক পরম শক্তিই তো। ঠিকই বলেছেন।

: তার মানে, আপনি বলতে চান, এই সুন্দর পৃথিবী, এই
মহাশূন্যমুগ্ধ সৌরলোক, এই মৃত্তিকা, এই আকাশ, বাতাস-
এগুলো সৃষ্টি করেছে মানুষ ?
– হ্যাঁ, মানুষ।

: বলুন, কীভাবে ?
– সন্তান যেভাবে সৃষ্টি করে তার মাতাকে, পিতাকে।
অগ্নিসঙ্গম

আমি কীভাবে অগ্নির সঙ্গে সঙ্গম করেছিলাম, সেই গল্পটা বলি।

একদিন ঝড়ের রাতে ঈশ্বর এসে উপস্থিত হলেন আমার ঘরে।
আমি সারাদিনের পরিশ্রম শেষে, তক্তপোষে আরাম করে শুয়ে,
নিজের মনে, নিজের সঙ্গেই খেলা করছিলাম। আমার গাত্র
এবং মন উভয়ই ছিল নিরাবরণ। তিনি আমার ঘরে প্রবেশ করলেন
একটি চমৎকার দৃষ্টিনন্দন আলোকবর্তিকার রূপ ধরে, এবং
গায়েবিভাষায় বললেন: ‘আমি আপনাকে শিশ্নমুক্ত করতে এসেছি,
দয়া করে আপনি দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।’

আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, তাই যেভাবে শুয়েছিলাম,
সেরকম শুয়ে থেকেই বললাম: ‘খুব ভালো কথা, কিন্তু
আমি কি জানতে পারি, কী আমার অপরাধ?’

ঈশ্বর বললেন: ‘হ্যাঁ, পারেন। আপনি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রটিকে সৃষ্টির চেয়ে
অনাসৃষ্টির কাজেই বেশি ব্যবহার করেছেন। আপনি সামাজিক
নিয়ম-কানুন এবং স্থান-কাল-পাত্রের ভেদ মান্য করেননি।’

তাঁর কথা শুনে আমার খুবই রাগ হলো। এ কি ঈশ্বরের যোগ্য কথা?
নিয়ম-কানুন,স্থান-কাল-পাত্রভেদ, মানে ? তিনিও যদি মানুষের
মতোই কথা বলবেন,তা হলে আর ঈশ্বর কেন ? একটু রাগতস্বরেই
আমি বললাম: ‘আপনি কি জানেন না, আমি অভেদপন্থী?’

ঈশ্বর বললেন: ‘জানি। আমি ভুল করে আপনাকে অসময়ে
পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলাম। আপনি আদিমকালের মানুষ;
এ-যুগ আপনার নয়। আমি আপনার প্রতি সম্মানবশত আপনাকে
উঠিয়ে নিতে নিজে এসেছি এজন্যে যে, আপনি আমার প্রিয়-কবি,
অন্যথায় আমি আমার যমদূতকেও পাঠাতে পারতাম।’

আমি বললাম: ‘বেশ, ভালো কথা। কিন্তু ভুলটা যেহেতু আমার নয়,
আপনার, তাই আমার একটা শেষ-শর্ত আপনাকে পূরণ করতে হবে,
তারপর আমি আপনার কথা রাখবো।’

‘বলুন কী শর্ত!’-ঈশ্বর জানতে চাইলেন।
আমি আমার লালিত একটি গোপন স্বপ্নকে মনের অতল থেকে
মুক্তি দিয়ে, কামনাজড়িত কণ্ঠে বললাম:
‘শুধু একটি বারের জন্য আমি আপনার সঙ্গে মিলিত হতে চাই।’

মনে হলো, আমার প্রস্তাব শুনে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে
আলোকবর্তিকাটি ঘুর্ণিহাওয়ায় দুলে উঠলো।
স্থির হলে পর, গায়েবিভাষায় ঈশ্বর বললেন, আমি অন্তর্যামী,
আমি আপনার এ-আকাক্সক্ষার কথা অনেক পূর্ব থেকেই জানি,
কিন্তু তা কখনই পুরণ হবার নয়। আমি নারী, পুরুষ বা কোনো
সঙ্গমযোগ্য প্রাণী নই, -আমি হচ্ছি অগ্নি, সর্বপাপঘœ অগ্নি আমি,
আমি নিশ্ছিদ্র। আপনি আমার সঙ্গে মিলিত হবেন কী ভাবে?’

আমি বললাম: ‘সে ভাবনা আমার, আমি আমার প্রবেশপথ
তৈরি করে নেব। আমি শুধু আপনার সম্মতিটুকু চাই।’

ঈশ্বর বললেন : ‘সাবধান, আপনি আমার দিকে অগ্রসর হবেন না।
আর এক পা-ও এগুবেন না, ভস্ম হয়ে যাবেন।’

প্রজ্বলন্ত আলোকবর্তিকার মধ্যে নিজেকে নিক্ষেপ করে আমি বললাম:
‘ইতিপূর্বে বহুবার, বহুভাবে আমি ভস্ম হয়েছি, ভস্মের ভয় দেখিয়ে
আপনি আমার সঙ্গে ছলনা করছেন কেন ?- আমি চাই আপনিও
আমার আনন্দের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুন।’

নায়াগ্রা প্রপাতের অফুরন্ত জলধারার মতো আমার স্খলিত বীর্ষধারায়
যখন শীতল হলো আলোকবর্তিকার সেই অগ্নিজ্বলা দেহ,
তখন গায়েবিভাষা রূপান্তরিত হলো মধুক্ষরা মানবীভাষায়।
ঈশ্বর বললেন, ‘আমাকে অমান্য করার অপরাধে,
দেখবেন, একদিন আপনার খুব শাস্তি হবে।’

আমি অপসৃয়মাণ আলোকবর্তিকার দিকে তাকিয়ে বললাম:
‘কুচযুগ শোভিত, হে অগ্নিময়ী দেবী, তবে তাই হোক।’
তোমার চোখ এতো লাল কেন?

আমি বলছি না ভালোবাসতেই
হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর
থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই
হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক।
আমি হাত পাখা নিয়ে
কাউকে আমার
পাশে বসে থাকতে বলছি না।
আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-
সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস
করুকঃ
আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন
লাগবে কিনা,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও
একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ
লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল
আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই
হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভেতর থেকে আমার
ঘরের দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু
খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ
অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুকঃ “তোমার চোখ
এতো লাল কেন? ”

লিপিষ্টিক

ট্যাকা কি গাছের গুডা?
নাকি গাঙের জলে ভাইস্যা আইছে?
এই খানকী মাগীর ঝি,
একটা টাকা কামাই করতে গিয়ে
আমার গুয়া দিয়া দম আয়ে আর যায়।
আর তুই পাঁচ ট্যাকা দিয়ে
ঠোঁট পালিশ কিনছ্স কারে ভুলাইতে?
ক্যা, আমি কি তরে চুমা খাই না?
এই তালুকদারের বেডি, বাপের জন্মে
পাঁচ ট্যাকার নুট দেখছস?
যা আহন রিকশা লইয়া বাইরা,
আমি আর রিকশা বাইতে পারুমনা। হ।

বইটা ভীষণ ঘাবড়ে যায়! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে
সে এগোয় রিকশার দিকে: ‘যামু?
তয় আমারে রিকশা চালানি হিখাইয়া দেও।

রিকশাঅলা বউয়ের দিকে আচমকা তাকায়,
তার চোখ আটকে যায় বউয়ের পালিশকরা ঠোঁটে।
বুকের মধ্যে হঠাৎ করে ঝলক দিয়ে ওঠে রক্ত।
একটু আগেই যাকে তালাক দেবে ভেবেছিল:
‘আ্য়,তরে রিকশা চালানি হিখাই’-এই বলে
সে তার বউটাকে চুলের মুঠো ধরে
হ্যাঁচড়াতে- হ্যাঁচড়াতে টেনে নিয়ে যায়।
আপন গুহার দিকে। সারাদুপুর ধরে বউকে সে
রিকশা চালানো শেখায়।
বউ বলে: ‘কী অহন রাগ পড়িছে?’

রিকশাঅলা বউয়ের দিকে তাকায়,
চেনা বউটাকেও ভীষণ অচেনা মনে হয়।
ভাবে, আহা, পাঁচ ট্যাকার লিপিস্টিকেই অতো!
বড়লোকদের মতো যদি সে তার বউটার পেছনে
আরও কিছু ট্যাকা ইনভেস্ট করতে পারতো,
তা হলে! রমনা পার্কের হাওয়া খাওয়াবে বলে
সে তখন বউটাকে প্যাসিঞ্জার বানিয়ে নিয়ে
ছুটে যায় রমনা পার্কের দিকে।

ওটা কিছু নয়

এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব? পাচ্ছোনা ?
একটু দাঁড়াও, আমি তৈরি হয়ে নিই।
এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব? পাচ্ছো না ?
তোমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার। ওটা নয়, ওটা চুল।
এই হলো আমার আঙুল, এইবার স্পর্শ করো, – না, না, না,
– ওটা নয়, ওটা কণ্ঠনালী, গরলবিশ্বাসী এক শিল্পীর
মাটির ভাস্কর্য, ওটা অগ্নি নয়, অই আমি, – আমার যৌবন।

সুখের সামান্য নিচে কেটে ফেলা যন্ত্রণার কবন্ধ- প্রেমিক,
ওখানে কী খোঁজ তুমি? ওটা কিছু নয়, ওটা দুঃখ;
রমণীর ভালোবাসা না-পাওয়ার চিহ্ন বুকে নিয়ে ওটা নদী,
নীল হয়ে জমে আছে ঘাসে,- এর ঠিক ডানপাশে, অইখানে
হাত দাও, হ্যাঁ, ওটা বুক, অইখানে হাত রাখো, ওটাই হৃদয়।

অইখানে থাকে প্রেম, থাকে স্মৃতি, থাকে সুখ, প্রেমের সিম্ফনি;
অই বুকে প্রেম ছিল, স্মৃতি ছিল, সব ছিল, তুমিই থাকোনি।

হিমাংশুর স্ত্রীকে

আমাকে বিশ্বাস নেই হিমাংশু, কোনো কিছুতেই কোনো কিছু না পাওয়ার ক্লিন্ন
অবসাদ আমার শরীরময় পাপ, স্বপ্ন যদি আমার অনুভবে জনতার বিপ্লবের
কথা বলে, দুঃস্বপ্ন আমার রক্তে কণায়-কণায় অন্য এক প্লাবনের গান গেয়ে
যায়। মুখের গোলাপ যদি সুর্যালোকে স্বর্ণের মতো ফোটে, বুকের গোলাপ
তখন গায়ে কাদা মেখে যন্ত্রণায় নীল হয়ে কাঁদে। আমি যখনি ঘুমোতে যাই,
তখনি শয্যাময় লুকানো দুঃস্বপ্ন এসে আমাকে জড়ায়। আমি জনতার শক্রুকে
গুলিবিদ্ধ করে পুলিশের তাড়া খেয়ে রাত্রির অন্ধকারে যখনি পালাতে যাই,
তখনি তোমার স্ত্রীকে পাই প্রতিদিন, আমার মঙ্গলময় পথের সিদ্ধান্তে সে
এসে আগলে দাঁড়ায় সমুখের সকল গন্তব্য, সজ্ঞানে ডিঙোতে গেলেই আমার
অজ্ঞান দেহ বাঁধা পড়ে তার আলিঙ্গনে, আমি সব কিছু ভুলে যাই, আমাকে
বিশ্বাস নেই হিমাংশু, আমি কোনো কিছুতেই কোনো কিছু না-পাওয়ার
অভিমানে একজন জলজ্যান্ত পাপ, খাপহীন তলোয়ার নিয়ে আমরা দু’জন
তাই গতকাল সারারাত ধরে যে-যুদ্ধের শরীর দেখেছি, সেখানে স্পষ্টত জীবন
থেকে যৌবন, স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্ন, সিদ্ধান্ত থেকে গন্তব্য, গন্তব্য থেকে আলো;
খন্ডিত বাঙলার মতো যেন চিরকাল মীমাংসিত সত্যে আলাদা।

গৌতম

মানুষ তো দূরের কথা, পাঁতি কাকগুলো পর্যন্ত আমাকে ভয় করে না, তারা
ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে রুটি কেড়ে নেয়। আমি হাবার মতন তাকিয়ে
তাকিয়ে দেখি, কালো-চঞ্চুতে সাদা-রুটি ছেঁড়ার উৎসব। অথচ আমার দৈহিক
উচ্চতা যেরকম,তাতে হাত বাড়ালেই আমিকাকের বাসা থেকে কোকিলের
ডিম পেড়ে আনতে পারি, কিন্তু আমি তা কখনও করি না। মানুষের সঙ্গে যে
পারে না, কাকের সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হাওয়া তার উচিত নয়,-
আমি এরকম করে ভাবি।
রাতে, যখন ঘুমিয়ে থাকি আমার গায়ের উপর দিয়ে ইঁদুর হেঁটে
বেড়ায়, আমি টের পাই। আমার গৃহকোণে বিড়ালিনীর সঙ্গে সঙ্গম করে
সংঘর্ষপ্রিয় হুলো-বিড়াল। চিকা চাটে পায়ের আঙুল। প্রথম দিকে বিরক্ত
হতাম, ভয়ে লাথি ছুঁড়তাম। একবার চিকা বা ইঁদুরের কামড় খেয়ে আমাকে
এটিএস নিতে হয়েছিল। তাতে কোনোই দুঃখ নেই, কেননা বিঘিœত নিদ্রায়
আমি তোমাকেই অনুভব করি শয্যায়।

গভীর রাতে তোমার কাছ থেকে ফেরার সময় তোমাদের পাড়ার
কুকুরগুলো ঘেউ-ঘেউ করে আমাকে তাড়া করে, তারা ধমকাতে-ধমকাতে
আমাকে একেবারে পলাশীর মোড় পর্যস্ত এগিয়ে দিয়ে যায়। আমি বুঝি
অপমান, কিন্তু কী আর করবো, আমাকে যে মাঝে মাঝে তোমার কাছে আসতেই হয়। ইচ্ছে করলে আমি ঐ নেড়ী কুত্তাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোরতম
ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা নিই না। মানুষের বিরুদ্ধে যে
ব্যবস্থা নিতে পারে না,কুকুরের বিরুদ্ধে তার কথা বলা উচিত নয়-;
আমি এরকম করে ভাবি।

তোমার জন্য আমাকে আর কত ক্ষমাশীল হতে হবে ?

বোষ্টমী

এতো সাজানো গোছানো কেন, চলে যাবে না তো?
এই নাও রুদ্রাক্ষের মালা, আপাতত এটি পরে নাও,
এতো রাতে চন্দনের আশ্চর্য তিলক কোথা পাবে ?
এসো আমি চুড়ো করে চুল বেঁধে দিই।
‘এরকম রাধাচূড়া কতদিন মানুষে ফুটেনি, সুন্দর তো,
কে বেঁধেছে ওটা?’ পথে যদি প্রশ্ন করে কেউ, সাবধান
তখন বলবে তুমি: ‘কেন, আমি নিজেই বেঁধেছি।’

এতো পেছনে তাকানো কেন? ফিরে যেতে চাও?
এই নাও কম-ুলূ, জপমালা, পথের অগুরু;
আজ রাত নির্বাসন শুরু। আমাদের গৃহ-পলাতক
পদচিহ্ন দেখে অভিজ্ঞ পথিক যদি প্রশ্ন করে পথে:
‘কে ডেকেছে তোকে?’ সাবধান, তখন বলবে তুমি:
‘কেন, আমি নিজেই এসেছি।’

এতো অস্থিরচিত্ততা ভালো নয়, ছুঁতে চাও নাকি ?
এই ধরো, স্পর্শ করো আমার আঙ্গুল।

অযৌন যুগলে বাঁধো আমাদের পৃথক অঙ্গুরী।
যৌবনের সুধামৃতে প্ররোচিত করি, যদি কেউ
প্রশ্ন করে পথে: ‘এই বুঝি, তোমার বোষ্টমী?’
সাবধান, তখন বলবে তুমি: ‘এ আমার স্বামী।’
কাশফুলের কাব্য

ভেবেছিলাম প্রথম যেমিন
ফুটবে তুমি দেখব,
তোমার পুষ্প বনের গাঁথা
মনের মতো লেখব।

তখন কালো কাজল মেঘ তো
ব্যস্ত ছিল ছুটতে,
ভেবেছিলাম আরো ক’দিন
যাবে তোমার ফুটতে।

সবে তো এই বর্ষা গেল
শরৎ এলো মাত্র,
এরই মধ্যে শুভ্র কাশে
ভরলো তোমার গাত্র।

ক্ষেত্রের আলে, নদীর কূলে
পুকুরের ঐ পাড়টায়,
হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে
বাঁশবনের ঐ ধারটায়!

আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে
মাটির দিকে নুয়ে,
দেখি ভোরের বাতাসে কাশ
দুলছে মাটি ছুঁয়ে।

কিন্তু কখন ফুটেছে তা
কেউ পারে না বলতে,
সবাই শুধু থমকে দাঁড়ায়
গাঁয়ের পথে চলতে।
পুচ্ছ তোলা পাখির মতো
কাশবনে এক কন্যে,
তুলছে কাশের ময়ুর চূড়া
কালো খোঁপার জন্যে।

যেন শরত রানী কাশের
বোরখাখানি খুলে,
কাশবনের ঐ আড়াল থেকে
নাচছে দুলে দুলে।

প্রথম কবে ফুটেছে কাশ
সেই শুধু তা জানে,
তাই তো সে তা সবার আগে
খোঁপায় বেঁধে আনে।

ইচ্ছে করে ডেকে বলি:
‘ওগো কাশের মেয়ে,
আজকে আমার চোখ জুড়ালো
তোমার দেখা পেয়ে।’

‘তোমার হাতে বন্দী আমার
ভালোবাসার কাশ,
তাই তো আমি এই শরতে
তোমার ক্রীতদাস।”

ভালোবাসার কাব্য শুনে
কাশ ঝরেছে যেই,
দেখি আমার শরত-রানী
কাশবনে আর নেই।

PaidVerts