সৈয়দ শামসুল হক এর কবিতা

সৈয়দ শামসুল হক এর কবিতা

ভাগ
PaidVerts

সৈয়দ শামসুল হক (জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৫) একজন বিখ্যাত বাংলাদেশী সাহিত্যিক। তিনি কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। সব্যসাচী লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

সৈয়দ শামসুল হক সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুন দম্পতির আট সন্তানের প্রথম সন্তান। পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। তিনি ডাক্তারি চর্চা করতেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত জনক জনাব হক ব্যক্তিজীবনে প্রথিতযশা লেখিকা ডাঃ আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্বামী। সৈয়দ শামসুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর রচিত প্রথম পদ তিনি লিখেছিলেন এগারো-বারো বছর বয়সে। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কবি তাঁর বাড়ীর রান্নাঘরের পাশে সজনে গাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুলাইনের একটি পদ “আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/ তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে ” রচনা করেন। এরপর ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা রচনা করেন। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘’অগত্যা’’ পত্রিকায়। সেখানে “উদয়াস্ত” নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়।

সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। এরপর ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
সৈয়দ শামসুল হকের পিতার ইচ্ছা ছিলো তাঁকে তিনি ডাক্তারী পড়াবেন। পিতার এরকম দাবি এড়াতে তিনি ১৯৫১ সালে বম্বে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশী এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে সেখান থেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘’দেয়ালের দেশ’’ প্রকাশিত হয়।

পেশা : সাংবাদিকতা ও লেখালেখি। বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রযোজক (১৯৭২-১৯৭৮)।

প্রকাশিত গ্রন্থ : প্রবন্ধ : হৃৎ কলমের টানে (১ম খন্ড ১৯৯১, ২য় খন্ড ১৯৯৫)।

ছোটগল্প : তাস (১৯৫৪); শীত বিকেল (১৯৫৯); রক্তগোলাপ (১৯৬৪); আরন্দের মৃত্যু (১৯৬৭); প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮২); সৈয়দ শামসুল হকের প্রেমের গল্প (১৯৯০); জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০); শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০)।

উপন্যাস : এক মহিলার ছবি (১৯৫৯); অনুপম দিন (১৯৬২); সীমানা ছাড়িয়ে (১৯৬৪); নীল দংশন (১৯৮১); স্মৃতিমেধ (১৯৮৬); মৃগয়ায় কালক্ষেপ (১৯৮৬); স্তব্ধতার অনুবাদ (১৯৮৭); এক যুবকের ছায়াপথ (১৯৮৭); স্বপ্ন সংক্রান্ত(১৯৮৯); বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ (১ম খন্ড ১৯৮৯, ২য় খন্ড ১৯৯০); বারো দিনের শিশু (১৯৮৯); বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল (১৯৮৯); ত্রাহি (১৯৮৯); তুমি সেই তরবারী (১৯৮৯); কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন (১৯৮৯); শ্রেষ্ঠ উপন্যাস (১৯৯০); নির্বাসিতা (১৯৯০); নিষিদ্ধ লোবান (১৯৯০); খেলা রাম খেলে যা (১৯৯১); মেঘ ও মেশিন (১৯৯১); ইহা মানুষ (১৯৯১); মহাশূন্যে পরাণ মাষ্টার; দ্বিতীয় দিনের কাহিনী; বালিকার চন্দ্রযান; আয়না বিবির পালা; কালঘর্ম; দূরত্ব; না যেয়ো না; অন্য এক আলিঙ্গন; এক মুঠো জন্মভূমি; বুকঝিম ভালোবাসা; অচেনা; আলোর জন্য; রাজার সুন্দরী।

কবিতা : একদা এক রাজ্যে (১৯৬১); বিরতিহীন উৎসব (১৯৬৯); বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৭০); প্রতিধ্বনিগণ (১৯৭৩); অপর পুরুষ (১৯৭৮); পরাণের গহীন ভিতর (১৯৮০); নিজস্ব বিষয় (১৯৮২); রজ্জুপথে চলেছি (১৯৮৮); বেজান শহরের জন্য কোরাস (১৯৮৯); এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি (১৯৮৯); অগ্নি ও জলের কবিতা (১৯৮৯); কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে (১৯৯০); আমি জন্মগ্রহণ করিনি (১৯৯০); তোরাপের ভাই (১৯৯০); শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯০); রাজনৈতিক কবিতা (১৯৯১); নাভিমূলে ভস্মাধার; ধ্বংসস্তুপে কবি ও নগর (২০০৯)
কবিতা সংগ্রহ: প্রেমের কবিতা, কবিতা সংগ্রহ, কবিতা সমগ্র ১,২,৩।
কাব্যনাট্য : পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬); গণনায়ক (১৯৭৬); নুরুলদীনের সারা জীবন (১৯৮২); এখানে এখন (১৯৮৮); কাব্যনাট্য সমগ্র (১৯৯১); ঈর্ষা।
কথা কাব্য : অন্তর্গত।
অনুবাদ : ম্যাকবেথ; টেম্পেস্ট; শ্রাবণ রাজা (১৯৬৯)। শিশুসাহিত্য : সীমান্তের সিংহাসন (১৯৮৮); আনু বড় হয়; হড়সনের বন্দুক।
অন্যান্য : শ্রেষ্ঠ গল্প; শ্রেষ্ঠ উপন্যাস; শ্রেষ্ঠ কবিতা; মুখ (১৯৯১)।

পুরস্কার : বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬); আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৯); অলক্ত স্বর্ণপদক (১৯৮২); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩); কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৮৩); লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক (১৯৮৩); একুশে পদক (১৯৮৪); জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক (১৯৮৫); পদাবলী কবিতা পুরস্কার (১৯৮৭); নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০); টেনাশিনাস পদক (১৯৯০); জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীতিকার।

আমার পরিচয়

আমি জন্মেছি বাংলায়
আমি বাংলায় কথা বলি।
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?

আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে
আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে।
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে
আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে
এসেছি বাঙালি জোড় বাংলার মন্দির বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।

আমি তো এসেছি সার্বভৌম বারোভূঁইয়ার থেকে
আমি তো এসেছি ‘কমলার দীঘি’ ‘মহুয়ার পালা’ থেকে।
আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরীয়ত থেকে
আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে।

এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে
এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।
এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে
এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।

আমি যে এসেছি জয় বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে
আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে।
এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে
শুধাও আমাকে ‘এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে ?

তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির ইতিহাস শোনো নাই-
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজো একসাথে থাকবোই
সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবোই।

পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের-
কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস;
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ;
একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস;
আপোষ করিনি কখনোই আমি- এই হ’লো ইতিহাস।

এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি ।

নিঃসঙ্গ কবি, নির্জন রেস্তোরাঁ

মাথার ভেতরে লেখা। অদূরে রেস্তোরাঁ।
আষাঢ় সেজেছে খুব মেঘে মেঘে-মনে সে করাবে
বিরহ বিপন্ন দিন-রাস্তাঘাট আদ্যোপান্ত খোঁড়া।
মাটির পাহাড়গুলো কতদিনে কে জানে সরাবে!

এরই মধ্যে পথ করে নিতে হবে আজ।
অপেক্ষায় কবিতা ও কফি।
হঠাৎ বৃষ্টির শুরু, ধমকাল বাজ।
পিছলে পা পড়ে গেল কবি।

সমস্ত শরীরে কাদা। এভাবে কি যাওয়া যেতে পারে?
বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থেকে কেটে যায় কাল।
তবুও কি প্রেম কিছু ছাড়ে?
বিরহেও রয়েছে বহাল!

যদিও পিছল পথ, জামা কাদা লেপা।
হেঁটে চলো, হেঁটে চলো, দাঁড়িয়ে থেকো না।
সময় যতই হোক বিরুদ্ধ বা খেপা-
কবিতাকে ঠেকিয়ে রেখো না।

কবিতা কি থেমে থাকবার!
দুর্গতির একশেষ, খাতা তবু শক্ত হাতে ধরা।
হাতছানি দেয় কফি, আলো রেস্তোরাঁর,
দুধের বদলে স্মৃতি, কালো কফি, শব্দের শর্করা


বৃষ্টিভেজা গন্ধ ছড়ায় ফুলদানিতে ফুল।
ঘটিয়ে দেয় ইন্দ্রজাল রাতের রেস্তোরাঁয়।
একলা বুকে আছড়ে পড়ে ও কার খোলা চুল।
আষাঢ় এলে পদ্মা পাগল-পেলেই ভূমি খায় ।

আগুন ওঠে দপদপিয়ে, লাফাতে চায় খাড়া
ভোলা তো খুব সহজ নয় চিরে ফেলার ধাঁচ।
অতীতও নয় গেছেন কবি নক্ষত্রের পাড়া,
সেদিন কবি জেনেছিলেন স্বর্গীয় তার আঁচ।

ফুলের সাথে চুলের গন্ধ এখন একাকার।
এখন শুধু গন্ধটুকুই-এবং অন্ধকার ।


কফির গরম গন্ধ। পেয়ালায় আঁকা দুটি ফুল
দীর্ঘ দুটি বৃন্তে তারা পরস্পর জড়িয়ে রয়েছে।
কত দীর্ঘদিন কবি রেস্তোরাঁয় এসেছে ও
একাকী সহেছে
বিরহ বিচ্ছেদ তার। আষাঢ়ের বৃষ্টিপাত হয়েছে তুমুল।

কবিতার খাতাটি পাশেই।
রেস্তোরাঁয় একা কবি চুমুকে চুমুকে
পান করে চলে কফি।
পৃথিবী বিপুল আর লেখার বিষয় তার
হতে পারে সবই।
কিন্তু আজ সেই মুখ-একটি সে মুখ ছাড়া
আর কিছু নেই।

ভোরের প্রথম আলো প্রতি ভোরে পড়ে সেই মুখে।
ফুরোয় না ভালোবাসা-কফি শেষ হয়ে যায়
চুমুকে চুমুকে


সে নেই, তবুও কবি আসে রেস্তোরাঁয়।
ধীরে কালো কফি ঢালে শাদা পেয়ালায়।
এই সে চেয়ার আর এই সে টেবিল।
জানালার পর্দা ওড়ে এখনো তো নীল।
শূন্যতার রং শাদা, মৃত্যু ঘন কালো।
যা ছিল জীবনব্যাপী-মুহূর্তে মিলাল।

এখনো টেবিলে ফুল-ছাইদান পড়ে।
কেবল সে নেই আর। স্মৃতি হয়ে ওড়ে
ছাইদানে ছাই আজ করুণ বাতাসে।
রেস্তোরাঁয় সেদিনের ফুলগন্ধ ভাসে।
স্মৃতির নদীতে নেভা আলোর বিকন।
কালির কলমে লেখা জলের লিখন

মৃত্যুর শরীর ভেঙে

বিদ্যুতেরও সাধ্য নেই রুদ্ধ করে রক্তের প্রবাহ
যেভাবে রাতের ঘরে এলে তুমি দাঁড়ালে যখন
শরীরের বস্ত্র ছেড়ে, চুলে ঝড়, যখন উধাও
লজ্জার সকল শীল, মরে যাই আমি যে তখন!
বিপুল সমুদ্র দেখে ছোট এক জাহাজের মাঝি-
ধ্রুবতারা লক্ষ্যহারা, কম্পাসের কাঁটাও বিকল-
তখন যে হয় তার হাহাকার, কীভাবে যে বাঁচি-
চারদিকে নাচে তার রাক্ষুসীর জল ছলচ্ছল।
সেই মতো তোমার সমুখে আমি একান্ত বাসরে
নতজানু ক্রমে হই সাক্ষাত মৃত্যুর দেখা পেয়ে-
সমুদ্র তখন নয় ভেসে থাকি রতির চাদরে,
হর্ষের বদ্বীপমুখে প্রাণপণে চলি দাঁড় বেয়ে-
তোমার সম্মত দেহে -সারারাত-সারারাত আমি
মৃত্যুর শরীর ভেঙে রতিপথ ধরে স্বর্গগামী ।

একুশের কবিতা

সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল-

তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর জ্বালাকর দিগন্তে
আষাঢ়ের পুঞ্জীভূত কালো মেঘ আসবেই ঠিক।
সাগরের লোনাজলে স্নিগ্ধ মাটীর দ্বীপ
শ্যামলী স্বপ্নের গান বুকে পুষে
নবীন সূর্য্যেরে তার দৃঢ় অঙ্গীকার জানাবেই।
সংখ্যাহীন প্রতিবাদ ঢেউয়েরা আসুক, তুমি স্থির থেকো।
প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝাবাত অবহেলা করি
সঞ্চয় করে যাও মুঠো মুঠো গৈরিক মাটী:
সবুজ গন্ধবাহী সোনালী সূর্যের দিশা
অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কোরে দেবে তোমার চলার পথ।

সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি
শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়
বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল-
পৃথিবীর জিজীবিষু আত্মার আছে। ঘনীভূত জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে
উজ্জ্বল শিখা সেই অমর সংবাদে ঢেউ তুলে দিয়ে গেল।।

এখন মধ্যরাত

এখন মধ্যরাত।
তখন দুপুরে রাজপথে ছিলো মানুষের পদপাত।
মিছিলে মিছিলে টলমল ছিলো সারাদিন রাজধানী।
এখন কেবল জননকূল ছল বুড়িগঙ্গার পানি
কান্ত নীরব
নিদ্রিত সব।
ওই একজন জানালায় রাখে তার বিনিদ্র হাত

ছিলো একদিন তার
উজ্জ্বল দিন, ছিলো যৌবন ছিলো বহু চাইবার।
সারা রাত চষে ফিরেছে শহর খুঁজেছে সে ভালোবাসা।
পেতেছে সে হাত জীবনের কাছে ছিলো তারও প্রত্যাশা পাওয়া না পাওয়ার
প্রশ্নে হাওয়ার
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে এখন সারারাত হাহাকার।

পথে ওড়ে ধুলো, ছাই ওড়ে শুধু পথে যে আগুন ছিলো
একদা সে জ্বেলে ছিলো।
হৃদয়ে এখন সৌধের ভাঙা টুকরো আছাড় খায়।
আলো নিভে যায়, নিভে যায় আলো একে একে জানালায়।
থেমে যায় গান
তারপরও প্রাণ
বাঁশিটির মতো বেজে চলে যেন সবই আছে সবই ছিলো।

গেরিলা

অবিরাম
দক্ষিণ ভিয়েতনাম
কম্বোডিয়া
বাংলাদেশ
অ্যাংগোলায়
মোজাম্বিকেতুমি
নিসর্গের ভেতর দিয়ে
সতর্ক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত যখন গ্রামগুলো
জনশূন্য চাতাল চিড় খাওয়া আর উপাসনার চত্বরগুলো ঝরাপাতায়
অনবরত ঢেকে যায় নিঃশ্বাসের শব্দের ভেতরে
তোমাদের চলাচল
যেনতুমিআমাদেরই দ্বিতীয়
শরীর কোনো এক রবীন্দ্রনাথের
গান সমস্ত কিছুর কেন্দ্রেই আছো
এবং ধ্বনিত করছ দুঃখের পাহাড়
আফ্রিকার এশিয়ার
নিসর্গে তুমি নতুন বৃক্ষ
নতুন বর্ষা নতুন ফুল
দিগন্তে নতুন মাস্তুল
পিতৃপুরুষের নাপামের
দাউ দাউ হেঁটে যাও
মধ্যে তুমি একাকী
উদ্যত উজ্জল এক চিতা
‘জনশূন্য জনপদে।

পরানের গহীন ভিতর : ১

জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আববর বাদশার মোহর,
মানুষ বেকুব চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বঝিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি- একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়া থাকা পথেঞর ধূলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাকিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর ॥

পরানের গহীন ভিতর : ৩

সে কোন বাটিতে কও দিয়াছিলা এমন চুমুক
নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীল অবশ,
অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি এখনো সারুক।
আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস?
সে পাতা পানের পাতা মানুষের হিয়ার আকার?
নাকি সে আমের পাতা বড় কচি ঠোঁটের মতন?
অথবা বটের পাতা অবিকল মুখের গড়ন?
তুঁতের পাতা কি তয়,বিষনিম, নাকি ধুতুরার?
কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায়
আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহীন ভিতরে,
কত না গাছের পাতা কতবার দিয়ছি জিহ্ায়,
এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে।
তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভুবনে আমার,
আমারে দিয়াছ ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার?


আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান ক্যাত রোয়?-
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশীর লহরে ডোবা, পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের’ পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরে বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায় ?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায় ?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার ?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর ॥


নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ,
অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়।
আমারে অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়,
আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাছে পাছে ফেউ।
পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে
যত চোর যুবতীরা, গেরামের শ্যাষ সীমানায়
বটের বৈরাগী চুল, মেঘে চিল হারায় বারায়,
বুখের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে।
এখন কোথায় যাই, এই খানে বড় সুনসান,
মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কি জানি না-
জগত এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা।
মনে হয়, আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার ॥


একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া করো তুমি ঘর?
আঙিনার পাড়ে ফুল গাছ দিলে কি সোন্দর হয়,
দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর।
পাথারে বৃক্ষের তলে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে চায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান,
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে।
তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমিকি পাগল,
তোলো লাল শাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ,
সাধের ব্যঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায় আঞ্চল,
বিকাল বেলায় করো কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ।
ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি,
তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি ॥

১১
কী আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?
ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে ?
উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর
আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে ?
যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না,
যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম,
যখন ফুরায় যাবে জীবনের নীল শাড়ি বোনা,
তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম ?
আমার তো দ্যাশনাই,নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক,
আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর।
তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা,
আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা ?

স্বাধীনতা দিবস : ২০০৭

ধরা পড়ছে, ধরা পড়ছে আয়নাতে চেহারা।
ধরা পড়ছে এক্সরে প্লেটে স্বপ্নখাদক কারা।
ধরা পড়ছে, ধরা পড়ছে  হাতকড়াতে হাত।
চলছে মাকু, চলছে জোরে ইতিহাসের তাঁত!

অনেক ছিলো নষ্ঠামি আর অনেকগুলো দিন
তার ভেতরে ঘুরছে কালে কলের গানে পিন!
গানের অনেক রকম আছে  একাত্তরের গান!
স্বাধীনতার দিবস আসে, কে দেবে শ্লোগান?

মুখ খোলা তো বারণ, তাই কথা কোয়ো না কেউ।
শ্লোগান দেবে গাছের পাতা, নদীর জলে ঢেউ।
মানুষ আবার পলিমাটির দখল নেবে ফিরে।
মশাল জ্বেলে জাগছে ওরা আঁধার রাক্তিরে।

আর কতটা দীর্ঘ হবে অমাবস্যার রাত!
শক্ত হাতে চালাও জোরে ইতিহাসের তাঁত।
লাল সূর্যের ছবি ফোটাও বয়ন করা বস্ত্রে
স্বাধীনতার মন্ত্রে এবং একাত্তরের অস্ত্রে ॥

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

আমি এই পৃথিবীতে আকাশ দেখি নি আর এতো অবনত,
ঘুমন্ত শিশুর মুখে যেন চুমো খাবে পিতা নামিয়েছে মুখ;
প্রান্তর এতোটা বড় যেন মাতৃ¬-শরীরের ঘ্রাণলাগা শাড়ি;
আদি কবি পয়ারের মতো অন্ত্যমিল নদী এতো শান্তস্বর;
এতোই সজল মাটি কৃষকের পিঠ যেন ঘামে ভিজে আছে;
যদিও বৃষ্টির কাল নয় তবু গাছ এতো ধোয়ানো সবুজ;
দেখি নি এমন করে পাখিদের কাছে ব্যর্থ ব্যাধের ধনুক-
মানুষের কাঁধটিকে বৃক্ষ জেনে বসে তারা এতো স্বাভাবিক।
এ কেমন? – এমনও কি ভিটে হয় কারো এই পৃথিবীতে যাঁয়
বাড়ির গভীরে আছে সকলের বাড়িঘর এতোখানি নিয়ে? –
এভাবে ওলান থেকে অবিরল দুধ ঝরে পড়ে যায়, এই
শব্দ কোনো গ্রামে আমি কোনো বিবরণে আর কখনো পাইনি;
কোথাও দেখি নি আর একটি পল্লীতে এতো অপেক্ষায় আছে
রাখালের মতো তার গ্রীবা তুলে মানুষের স্বপ্নের সময়।
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এলো এই পল্লীটিতে।

সকল পথের পথ পল্লীটির দিকে অবিরাম ঘুরে গেছে-
গিয়েছিল – একদা গখন এই পল্লীটির কালো মাটি থেকে
একটি নতুন শিশু উঠে এসেছিল, আর এই পল্লীটিরই
পাশ দিয়ে মাটির দুধের মতো বহে যাওয়া নদীটিতে নেয়
ক্রমে বড় হয়েছিল, আর চেতনার কামারশালায় বসে
মানুষের হাতুড়ি নেহাই লোহা প্রযুক্তির পাঠ নিয়েছিল,
সকল পল্লীকে তার আপনার পল্লী করেছিল। স্ েতিাঁরই
টগবগে দীর্ঘদেহ ছিল, মানুষ দেখেছে – দেখেছিল তাঁকে –
বাংলার বদ্বীপব্যাপী কংকালের মিছিলের পুরোভাগে, তাঁকে

দেখেছিল চৈত্রের অগ্নিতে তারা, আষাঢ়ে বর্ষণের কালে,
মাঘের শীতার্ত রাতে এবং ফাল্গুন ফুল যখন করেছে,
যখন শুকিয়ে গেছে পদ্মা, আর গখন সে বিশাল হয়েছে,
যখন ষাঁড়ের ক্ষুর দেবে গেছে, আর মাটি রক্তে ভিজে গেছে,
যখন সময়, আর ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরী শুরু হয়ে গেছে।
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এলো এই পল্লীটিতে।
টেনে নেবে পথ; যদিও অনেকে আজ পথটিকে ভুলে গেছে,
যদিও এই তো দেখি, কণ্টিকারী ফেলে ফেলে পথটিকে কেউ
পথিকের জন্যে বড় দুর্গম করেছে, এবং যদিও জানি
কেউ কেউ আমাদের পথের সম্বল সব খাদ্যপাত্রগুলো
মলভাণ্ডরূপে আজ ব্যবহার করে; বিষ্ঠায় পতিত হবে
অচিরে তারাই; আমি করতল তেখে খুঁটে খাবো; সঙ্গ দেবে
আমাদেরই পথের কবিতা; আমাদের গোষ্ঠির পিতাকে যারা
একদিন হত্যা করে তাঁর জন্ম-পল্লীটিতে মাটিচাপা দেয় –
কতটুকু জানে তারা, কত ব্যর্থ? – জেগে ছিল তাঁর দু’টি হাত,
মাটির গভীর থেকে আজো সেই হাত, স্মৃতির ভেতর থেকে
পরনকথার মতো উচ্চারণমালা, নদীর গভীর থেকে
নৌকোর গলুই; পথিকের পদতল কাঁটায় রক্তাক্ত যদি,
সেই রক্তে শোধ হোক তাঁর কাছে ঋণ; মানব-প্রসিদ্ধ কৃষি
খুব ধীরে কাজ করছে; পাখিরা নির্ভয়; আর আমিও পৌঁছেছি;
আমারই ভেতর-শস্য টেনে নিয়ে এলো আজ আমারই বাড়িতে ॥

১৭ই মার্চ ১৯৯৪ টুঙ্গিপাড়া

খঞ্জনি

আকাশে উদাসী মেঘ, মর্ত্যে তুমি বাজাও খঞ্জননি;
ধুলোর বাউল তুমি, তাকে তুমি ব্যাপ্ত করে আছো।
নিমের আড়াল আর কামরাঙা ছায়া-
সেখানে দাঁড়াও এসে;
ছেলে, বুড়ো, আধবুড়ো, আইবুড়ো মেয়ে-
সকলেই সন্তানের অধিকারে ভালোবাসা বোনে,
তুমি বাজাও খঞ্জনি।

কী স্বাদ ছড়াও তুমি গ্রাম থেকে গ্রামে!
স্বর্গ কি ভরাতে পারে বাংলার বিকল হৃদয়?

তোমার গৈরিক ছায়া মিশে যায় এ রোদ্দুরে, তুমি
লোক থেকে লোকে।

চেতনায় গৃঢ় মূলেল জল দও, বীজ;
শস্য করো চিরকাল, হাসি দাও কান্নার সময়ে,
উপদ্রুত হৃদয়ের বাঁধ ভাঙ্গো ভক্তির প্লাবনে;
চিরকাল বাজাও খঞ্জনি ॥

উৎসের দিকে

নিষ্ঠুর তমসা তার আদিম জননী
বিশাল স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে সে দু’হাত বাড়িয়ে।
দেবতার মৃত্যু হোক। পরিপূর্ণ শস্য পতনের
সবুজ গোধুলিকালে অতিক্রান্ত পাখিদের মতো

মৃত্যু হোক যত দেবতার।
ডাকো তাকে, তমসা জননী ॥

তুমি

যখন তুমি আধেক মুখ তোলা
ছড়ায় যেন চন্দ্রালোকের তাপ,
কিন্তু যখন আঁধার কেরা মুখ
মুহুর্মুহ গিরি, অগ্নিগিরি,
ছড়ায় লাভা, ধুম্রজালে মরি।
আমার তুমি শত্রু হলে সখী?

ঘুমেও কিছু স্বস্তি মেলেনাকো,
মিলনে নয়, বিরহে নয়, আর
স্মৃতিও নয় মরণও নয় যেন,
কিছুই যেন যথেষ্ট নয় আর-
হৃদয় জুড়ে কিসের হাহাকার ?
এমন করে বাঁধলে তুমি সখী ?

আমায় তুমি কঠিন জাগরণে
রেখেছ, যেন তীব্র তলোয়ার
বেরিয়ে পড়ে থমকে আছে খাড়া
কেবল এক রক্ত ঈষদুষ্ণ
ছিনিয়ে নিতে পারবে বুঝি ধার।
এমন তুমি শত্রু আমার সখী ?

না হয় তুমি শত্রু হলে সখী ?
তোমার মুখ বিষুবে খাড়া সূর্য
পোড়ায় ঘর, শস্য, শুকোয় জল
পড়েছি আমি কঠিন ভাগ্যলেখা
তৃষ্ণা তুমি তৃষ্ণা নিবারণী ॥

এপিটাফ

আমি কে তা নাইবা জানলে।
আমাকে মনে রাখবার দরকার কি আছে?
আমাকে মনে রাখবার?
বরং মনে রেখো নকল দাঁতের পাটি,
সন্ধ্যার চলচ্চিত্র আর জন্মহর জেলি।
আমি এসেছি, দেখেছি, কিন্তু জয় করতে পারিনি।
যে কোনো কাকতাড়–য়ার আন্দোলনে,
পথিক, বাংলায় যদি জন্ম তোমার,
আমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবে ॥

একেই বুঝি মানুষ বলে

নষ্ট জলে গা ধুয়েছো এখন উপায় কি ?
আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি।
কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রীত,
মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি।

নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা?
তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা?
সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ;
তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ

এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি-
একেই বুঝি মানুষ বলে, ‘ভালোবেসেছি’ ॥

PaidVerts