রবিউল হুসাইনের কবিতা

রবিউল হুসাইনের কবিতা

ভাগ
PaidVerts

স্থপতি, কবি, শিল্প-সমালোচক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী ।

জন্মতারিখ ও স্থান: জানুয়ারি ৩১, ১৯৪৩; রতিডাঙ্গা, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।

কুষ্টিয়া শহরে স্কুল ও কলেজ জীবন শেষে তদানীন্তন সময়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক হন ১৯৬৮ সালে এবং স্থপতি হিসাবে কর্মরত হয়ে এখন পর্যন্ত সেই পেশা জীবনে ব্যস্ত । স্কুল ও কলেজ জীবনেই লেখালেখি শুরু করেন । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাড়াও ৬০ এর না গোষ্ঠী, ক্ষুধার্ত, হাংরি জেনারেশন, এইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রবণ ছোট কাগজের নিয়মিত লেখক ছিলেন । এ পর্যন্ত ৪টি কবিতা সংকলন, ১টি স্থাপত্য সংকলন, প্রবন্ধ, ২টি কিশোর উপন্যাস, ১টি উপন্যাস, ১টি অমনিবাস ও ১টি সম্পাদনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । বাংলাদেশ স্থপতি ইনসটিটিউট, জাতীয় কবিতা পরিষদ,কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক সংঘ ইত্যাদি সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা পালন । ব্যক্তিগত জীবনে বিপতœীক ও এক পুত্র সন্তান রবিনের জনক ।

পুরুস্কার: বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরুস্কার, কবিতা (২০০৯); কবিতালাপ সাহিত্য পুরুস্কার, কবিতা (২০১১)

ঐতিহ্যের নিজস্ব আহার

নিজস্ব কাঁথাতে ফুল তুলে যে-নারী শুয়েছিলো ঘরে
আজ বৃষ্টিতে ভিজে জল-নক্সার অন্তর্গত হলো বেশ
এ কোন সহবাসে আনন্দিত হবে শরীরের প্রথম সভায়
চারিদিকে আচ্ছাদনহীন নগ্ন প্রকৃতি বস্ত্রহীন মেঘভূমি

বাতাসের অস্থি নিয়ে বেহিসেবি উড়ে যায় অবলীলায়
বরং আজ কথা হলে বলে দেবে এইভাবে উড্ডয়ন পাপ
গভীর অভ্যন্তরে রহস্যের অভিজাত বাসাবড়ি দুলে ওঠে
অথচ ভূমি নয় আকাশ কাঁপে মেঘ-ব্যাকুল আশ্বিন-সন্ধ্যায়
আসন্ন দুঃখে পীড়িত হবে হ্রদয়ের এযাবৎ সমস্ত ঠিকানা
যায়ী নয় কেউ দোষী নয় তবে অনন্ত অন্তর্জ্বালায় রান্না হয়

ঐতিহ্যের নিজস্ব আহার

জলের মতো জীবন গড়ায়

জলের মধ্যে জলাঞ্জলি
নরম নদীর স্রোত
জলজ নদীর জলঠিকানায়
পূর্ণ অর্ণবপোত
জলের আকার জলের প্রকার
সঠিক পরিচয়ে
কোনটা নদী কোনটি সাগর
জানে জলের হয়ে
সাগর নদী জানতে পারে
কেমন করে তারা
আকাশ থেকে বৃষ্টিপাতে
জন্ম জল-হারা
সাগর জানে বৃষ্টিপাতে
জন্ম জল-হারা
সাগর জলে সিনান করে
বৃষ্টি জল-তুর্য
এ কারণেই জলের রাজ্য
নদী সাগর খালে
জল ভূবনটি ছেয়ে আছে
জলের পেলব জালে
সেই তুলনায় মানুষ প্রাণী
মূন্য শাদা পাতা
কেউ জানে না তার জীবনে
কে যে আসল পিতা
মাতা-পিতা ঠিকই আছে
জন্ম তার ঠিক
জলের মতো জীবন গড়ায়
জলেরও অধিক

ভালোবাসার চারটি কবিতা

এক ভালোবাসা সেই তাজমহলী ব্যবসা
আমি সেই বিরল গোত্রের মানুষ সাধু
উপক্ষো আর অপেক্ষায় যার কাটে সারাদিন
যদিও ছিল বসূ সখা প্রেমিক অমলিন
পুত্র কন্যা ভাই বোন কত কত আত্মীয় বন্ধু
সংসার সীমান্তের অগণিত মৌমাছি ও মধু

ভালোবাসা সেই তাজমহলী ব্যবসা
স্বয়ং শাহাজান বাদশায় পায়নি যা স্বাভাবিক
যতই থাকুক তার উদ্দেশ্য সহৃদয় মানবিক
কৃতজ্ঞতাপ্রসূত অতি গভীর প্রত্যাশা দুরাশা হায়
স্থাপত্যেও পূর্ণ বিকশিত হয় না ভালোবাসা

ভালোবাসা সেই আঁধার-ঘেরা রেলের ইষ্টিশন
দাঁড়িয়ে একটি মানুষ কতটা অসহায়
সারাটি জীবন ধরে হু হু প্রতিটি ট্রেনের জন্যে যদি দেখা পায়
প্রেম নয় ভালোবাসাও নয় একটু প্রীতি ও স্নেহময় মন
চকিত জানালায় সরে যায় চলে যায় ওই দুটি ডাগর নয়ন
দুই আমরই আকাশে শুধু ধু ধু নিঃস্বতা
নিঃশব্দে কেটে যায় বেলা
কেউ কোথাও নেই ভাসমান নিঃসঙ্গ ভেলা
যদিও ছিল জীবনসাঙ্গিনী ছিল সন্তান ও প্রেমিকা
তারা যে আজ কোথায় এখন নিখোঁজ অনামিকা

আকাশ শূন্য কোথাও কিছু নেই শান্ত ও নিরাবেগ
তবুও জমেছে দিকে দিকে কত না পুঞ্জীভূত মেঘ
বিপুল আকাশে ওই কত-শত দৃশ্যত গ্রহ-নক্ষত্র
আমরই আকাশে শুধু ধু ধু নিঃস্বতা সর্বত্র

তিন যেহেতু ভালোবাসাসাপকে খুব করি ভয়
খুব বেঁচে গেছি
ভাগ্যিস কেউ আমাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি
আমিও কাউকে কোনোদিন
ভালোবাসাকে খুব পাথর-ভারি
যদি কারও জীবনের ওপরে
কোনোক্রমে একবার চেপে বসে
তাহলে তার সমূহ বিপদ
ধীরে ধীরে সে তলিয়ে যেতে থাকবে
জীবনের গভীর খাদে এবং
সেইখান থেকে আর কোনোদিন
উঠে আসতে পারবে না আবার
ভালোবাসার ভীষণ ওজন
সঘন স্ফটিক এক কঠিন পদার্থ
নীলমীলিক বৈদূর্যমণি
স্বচ্ছ অনচ্ছ পারদ স্পর্শাতীত
ধরতে গেলে হাত গলিয়ে
দিগি¦দিকে যায় যে চলে
তবুও তাকে মনের মধ্যে
পাওয়ার জন্যে

মানুষের কী যে আকুতি

ভালোবাসা মস্ত এক অজগর সাপ
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আস্ত গিলে খাওয়া তার প্রাকৃতিক স্বভাব
এই সব জেনে-শুনে স্বেচ্ছায় কষ্ঠ পেতে অবলীলায়
মানুষ কেন যে বার বার এর সহজ শিকার হতে চায়
তা অপার এক চির রহস্য
এই প্রশ্নের উত্তর জানা যায়নি আজও

সত্যি খুব বেঁচে গেছি
ভাগ্যিস কেউ আমাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি
আমিও কাউকে কোনোদিন নয়
এবং আমি চাইও না কেউ আমাকে ভালোবাসুক
যেহেতু ভালাবাসাপকে খুব করি ভয়

এই ভালো অতল সাগরে একা একা দিয়েছি ডুব
দেশ ও দশের এত দুর্দশাতেও বলতে হয় ভালো আছি খুব

চার তারপর ক্ষয়ে যেতে থাকে সেই ভালোবাসাসাবান
মানুষের জীবন যদি
হয় একটি নদী
মানুষের ভালোবাসার জুটি
জলে-ভাসে ওই ফুল দুটি
ফুটে থাকুক নিরবধি
স্মরণের কাল অবধি
কিন্তু তা তো হয় না কখনো
শুরুতেই খানিক আসর জমানো
তারপর ক্ষয়ে যেতে থাকে সেই ভালোবাসাবান
একদিন শুকিয়ে ফুরিয়ে যায় মনের বাগান

এই ভাবেই জীবন ও ভালোবাসা অদৃশ্যবলে
সময় ও কালের সঙ্গে যায় অস্তাচলে

ফুল কাঁদে বর্ষা কাঁদে

সমুদ্রের নোনাজল রোদের আলোতে মিশে
তার চরিত্র হারায়
তাহলে বলা যায়
তাদেরই গভীর সঙ্গমে জন্ম নেয় অবশেষে
মিহিদানা মিষ্টি জলকণা
অপরূপা মেষ-আল্পনা
আকাশের অসীম নগ্নতা ঢেকে ভেসে ভেসে
উড়ে উড়ে মেঘালয়ে মেঘ-পর্যটক
হঠাৎ বিদুৎ ঝলকে চকিতে পলকে
আলোকিত দিগদিগন্তে তখনই ঝমঝমিয়ে আসে
বৃষ্টি বৃষ্টি ঝাপসা দৃষ্টি
হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে-রাখা সৃষ্টি
কান্না হয়ে ঝরে পড়ে অঝোরে বিষণœ মনোদেশে
মানুষও বৃষ্টির মতো ঝরে যেতে চায়
অন্তিমে ঝরে যায় মরে যায় অসহায়

প্রকৃতির শ্রাবণ আঙিনায় আঁধারের নির্গঢ় আবেশে
নদী কাঁদে ফুল কাঁদে বর্ষা কাঁদে বৃষ্টির নিবিড় নীলাভ পরশে

মানুষ ছায়ার জন্ম দিলেও

মানুষের জীবন অতি এক উদ্দেশ্যহীনতায় চিরটাকাল
পথ হারিয়ে একাকী, সঙ্গে তার কেউ নেই, এমন কি
তার ছায়াও নেই, ছায়াকে সঙ্গী হিসেবে পেতে হলে
প্রথমে একটা মাথা থাকা চাই এবং সেই মাথার ওপর
জ্বলন্ত এক সূর্য, তবেই না ছায়া পাওয়া যায়
মানুষের বেলায় এরকম ঘটে থাকে বলেই তার ছায় হয়,
কিন্তু সেই ছায়া তার নিজের জন্যে কোনো কাজেই লাগে না,
প্রখর রৌদ্রের ভেতর গেলে মানুষের ছায়া হয় কিন্তু
সেই ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে পারে না,
তবে জীবনের সঙ্গে একটা অদৃশ্য ছায়া থাকে সবসময়,
মানুষের ঠিক বিপরীতে,
মানুষ ছায়ার জন্ম দিলেও মানুষের ছায়া নেই,
তাই তার জন্ম-মৃত্যু হয়,তার জীবন আছে
জীবনের ছায়া আছে জীবন নাই,
তাই তার জন্ম-মৃত্যুও নেই,
অথচ সেই জীবনকে সঙ্গে নিয়ে আজীবন
মানুষের কী করুণ আর অসহায় অকারণ জীবনধারণ।

মানুষ সত্যিসত্যি খুবই নিঃস্ব

নিঃস্ব হতে হলে অন্তত কিছু একটা
একান্ত নিজের থাক চায়
যেটুকুই থাকুক না কেন সামান্য কিংবা অনেক
সেগুলো যখন একে একে শেষ হয়ে
শূন্যের তলদেশে গিয়ে পৌঁছে
নিঃস্ব হওয়া যায় শুধু তখনই

সেই হিসেবে একজনের যদি কিছুই না থাকে
তাহলে সে কেমন করে নিঃস্ব হবে
কী তার সম্পদ যা শেষ হয়ে হয়ে
একেবারে তা শূন্য হবে
যার কিছু নেই
কীভাবে সে নিঃস্ব হবে

তাই আমার আর নিঃস্ব হওয়া হলো না
আমার যে কিছুই নিজস্ব নেই

আমার কোনকিছুই তো আমার নয়
সবকিছুই ব্রহ্ম-ের সেই অদৃশ্য
মহাশক্তির বলয়াধীনে পতিত
কালচক্রে নিয়ত ঘূর্ণিত
ব্যাখ্যাতীত রহস্যময়
অতিশয় সামান্য অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবন
তুচ্ছাতিতুচ্ছ এই আসক্তি অকারণ

মানুষের কোনোকিছুই নয় নিজস্ব
মানুষ সতিসতি খুবই নিঃস্ব

ইচ্ছে স্বপ্ন

আমার একটি ইচ্ছে ছিল-
প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে
ডুব দিয়ে জলের গভীর তম তলদেশে
চলে যাওয়া
এবং সেখানে থেকে আর কোনোদিন
ফিরে না আসা

আমার একটি স্বপ্ন ছিল-
মেঘের ভেতর থেকে বাতাস আর
জলবিন্দুকে আলাদা করে
ওদের স্বাধীনসত্ত্বায় নিয়ে যাওয়া
এবং এমন একটা ব্যবস্থা করা
যাতে কনোদিন ওরা আবার
এক হয়ে মিশে যেতে না পারে

আমার একটি আকাঙ্খা ছিল-
এই যে সূর্যটা অনাদিকাল থেকে
জ্বলে পুড়ে মরছে
তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিভিয়ে দেওয়া
এবং ওকে নিশ্চিত করা
যাতে আর কোনোদিন তাকে আবার

ওই জ্বলন্ত ব্রহ্মকু-ে নিপতিত
না হতে হয় কোনোক্রমেই

আমার একটা আশা ছিল-
আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটাকে
একটু বিশ্রাম দেওয়া
আর কতো ঘুরবে মহাশূন্যে
ওকে হাত ধরে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলা
আর নয় অনেক হয়েছে আর কত কাল
এবং আস্তে-ধীরে আদরে-স্নেহে
পাশের ব্রহ্মগ্রামে নিয়ে গিয়ে
তাকে চিরদিনের জন্য পুনর্বাসিত করা
আর সেই সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করা
জীবনে যে কোনো ব্যাপারে
আমি এরপরেও কোনোদিন
ইচ্ছে স্বপ্ন আকাঙ্খা আর আশা না করি

আমগ্ন কাটাকুটি খেলা

করণীয় কিছু নেই
জানা গ্যাছে ইচ্ছেগুলো প্রবল হলে
নদীরও বাঁধ ভাঙে
মাটির নিঃশ্বাস কর্তব্য-সুখ শেকড়-সংসার

চৌদিকে বিস্তৃত বিভাস অহরহ
অন্তরীক্ষের অপর পাড় কোলাহলময়
ধুলোর মধ্যে জলরেখা কিংবা
জলের ভেতর চোখের মরুভূমি
বহুদিন দ্যাখা নেই অমেয় রূপ
পারি দিয়ে উড়ে যায় পাখির প্রতাপ

সারাৎসার বিবেচ্য জেনে প্রায়শ আনত নিমগ্ন
আধেয় বর্তুলাকার আঁধার চতুষ্কোণী
ত্রিভুজ স্বাপ্নাকীর্ণ আয়তরেখা দিগন্তাবধি
বধ্যভূমি ইতিহাস-প্রেক্ষিত
সময়ের অন্তর্জ্বালায় তাপদগ্ধ মৌলিকতা
ধরা পড়ে অবশেষে বোধের বিকেলে

ছাদের ওপর অভয়ারণ্য
নিচের খাঁচায় কাকাতুয়া গৃহবধূ ধর্মগ্রন্থ
অন্যায়-প্রীতি প্রচল চিন্তাচেতনা

বাঘ নয় বাঘের চামড়া
মানুষ নয় মানুষের সকল সাহস
বৃক্ষ নয় বৃক্ষের বাকল ক্বাথ রস

ভিত্তির ভেতর-কাঠামো শূন্য বিলাস
জলের মন্দির মূলধারায় মেঘের শরীর
করতলে শাদা পাতা সমুদ্রের ঢেউ
সারাবেলা ভেসে থাকা
অনন্ত ভেসে যাওয়া
ডোবে ওঠে ওঠে ডোবে অবিরত

আমগ্ন কাটাকুটি খেলা

ভবিষ্যতের ডিম

অনন্ত এই কাল-পাখি
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে যায় দিকহীন প্রান্তরে
শূন্যতার সঙ্গে মাঝে মাঝে বোধহীন সহবাসে
প্রকৃতির প্রচ্ছন্ন আয়না
মুহ্যমান হতে থাকে

এই কাল সৃষ্টির গর্ভধারণের কাল
কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই
ক্ষণ নেই মানবমন নেই সারাংশ
এই প্রসবের কালে
সবকিছুই নিঃশব্দের আলিঙ্গনে
কুমারী যোনির মতো শান্ত এই গ্রামের
মেঘভরা পুকুর তোলপাড় করে

একদিন জন্ম নেবে
কালদর্শী এই কাল এই শূন্য জাজিম
অতঃপর অতীত কাছে এসে আবার পশ্চিমে
ফিরে যাবে বর্তমানের দুপুরবেলায় আর
সঙ্গে থাকবে অতিকায় ভবিষ্যতের ডিম

প্রত্যুৎপন্নমতি এই দুরাচারী বোধ

ইটের ভাটা দেখে মনে হয় নগরায়ণ পৃথিবীর ভবিতব্য
শস্যের ভেতর জীবন অফুরন্ত অন্তহীন রহস্য
ডাইনোসরের ডিম এই ইটের ভাটা
একদিন এই ডিম ফেটে নগরের নতুন নতুন বড়িঘর হবে
তীব্র বেগে যে শকট চলিতেছে কংক্রিটের প্রশস্ত পথে
তাহাদের দেখিয়া চার বেহারার পালকির কথা মনে হয়
উড়োজাহাজ দেখে সবুজ ফড়িং কিংবা বোয়াল মাছ
আকাশের পাখিগুলো উড়ে গেলে মাটির ঢিল
এই ইহজীবন থেকে ছুড়ে দিলাম স্বর্গের বাড়ির দিকে
কাচের জানালায় লেগে ঝন্ ঝনৃ ভেঙে পড়ে
মফস্বলের পিতা রোদে দুপুরে ঈশ্বর হয়ে
ডেকে ওঠেন কে রে হারামজাদা
প্রত্যুৎপন্নমতি এই দুরাচারী বোধ সহায়ক হোক
সম্পন্ন-সার্থকতায় জানা যায় তা হবার নয়
অন্তত জলের চাষাবাদে নৌকোর স্বাস্থ্য পূর্ণ হয়
স্থলভাগে অগ্নি-উৎসব হলে জলভাগে উজ্জ্বলতায়
প্রতিবিম্বে প্রতিস্থাপনায় অর্ধ জীবন পায়
প্রায়শ গুপ্ত থাকে মানবিক-শিং মানুষের মর্যাদার মধ্যে
মাঝে-মধ্যে প্রকাশিত প্রস্ফুটিত পুষ্প-সুগন্ধ চারিধারে
কিছুই গোপনীয় নয় প্রতিভা আগুন আর পচনশীলতা
উপসংহার শূন্য কিংবা এক আপাত জটিল এই
জটিলাঙ্কের কী সরল উত্তর – যুদ্ধ ও জীবনের
মনোস্তরে পলিমাটি জমে জমে এই মনোভূমি
একদা যেখানে ছিল তেথিসের সমুদ্রভুবন দূরায়ত
পেছনের পর্দা থেকে জলছাপ উঠে গেলে অন্ধকার পড়ে থাকে
বিবর্ণ অস্তি-মজ্জায় ইতিহাস লুক্কায়িত জীবাশ্ম প্রাণ পায়
আমাদের মগজের ভেতর কম্পিত প্রহর
ডোবে-ভাসে অস্থির নীলমীলিক জ্বলে-নেভে
সারি সারি মানুষেরা মোমবাতি হয়ে অগ্নি-প্রযতেœ
মস্তকে অগ্নি-শিরস্ত্রাণে দাউ-দাউ জ্বলে ওঠে ধীরে ধীরে

কাছিমের খোলস

চিরাচরিত প্রথা ছিলো ভঙ্গুর সমাজে
ছিলো ভাঙনের রীতি-নীতি কর্মপদ্ধতি
ভাতের ভেতর নক্ষত্রকণা
গাছের শেকড়ে সমুদ্রের নূপুর
আমি যখন একা হই তখনই আমাকে পাই
অন্যসময় আমি আমার কেউ নই
সেজন্য মানুষ একা একা একাকী হাঁটে
এই যে বেলা বয়ে যাওয়া -এ এক বিশুদ্ধ তীর্থ

একমুঠো বাতাস উগরে দ্যায় ঢেঁকুর
সময় গর্বিত নয় অপিচ কঠোর পাথর
আঘারেত আঘাতে মৃগনাভি দৌড় দিলো
দূরদৃষ্টির মধ্যে কেঁদে মরে আর্তি
যারা ধুলোর মধ্যে জলকণা খুঁজে পায়
জলের ভেতরে নিঃশ্বাস নিশুতির গন্ধ
তারাই নিদ্রা-ব্যবসায়ী জাহাজ ভরে দূরদেশে যাবে সঙ্গে
প্রয়োজনীয় স্মৃতি গ্রাম গোরু কিংবা গুড়ের সন্দেশ

এখনো তীব্র দহন থেকে জন্ম নেয় সুখের পোকা
দু’আঙুলে ভর করে কেউ কেউ কী সুন্দর হাঁটে
কেউ কেউ নখ কাটতে রক্ত ঝরায়
দৌড় দিলে দাঁড়িয়ে থাকি এখন
ঘাড় ঘোরালে দু’দিকে নয় চারদিকে ঘোরে মু-ু

তাকালে করোটি থেকে চোখ দুটো দৃশ্যের কাছে চলে যায়
কারো হাত ধরলে কাঁধ থেকে খুলে পড়ে স্পর্শের হস্তদুটি
পায়ের মধ্যে দূর্বাঘাস শিশির রাতের নদী
শরীরের রক্তলতা দিয়ে একটি মানুষ চাদর জড়িয়ে
ভূগর্ভের জ্বলন্ত মহিমা মেখে নিয়ে উজানে হাঁটে

সুউচ্চ দালান দ্রুতগামী যানবাহন উড়োজাহাজ
ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প-সাহিত্য এইসব রচনা
মানুষের হয়তো-বা নাকি সব ব্রহ্মান্ডের ঝরাপাতা
বোধ ও বুদ্ধির নিষ্ফল কথকতা
তার চেয়ে দুই লক্ষ তিরিশ হাজার পিঁপড়েবাসী
এই অবুঝ বৃক্ষকে দেখি
শত শত সবুজ হাত করজোড়ে আলোকে মুগ্ধতা জানায়
এর মধ্যে নগরের বাতি স্রোতোময় জ্বলে নিরবধি

রাস্তার ওপর একটি মানুষ থুতু ফেললে
উড়ে যায় প্রজাপতি
কালে কালে কালকেতু কাছিমের খোলসে ঢোকে
কাক ডেকে ওঠে কবুতরের ভেতরে তারপর
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় এক-কালো আকাশ কাঁপিয়ে

সরলতার জটিল ফলাফল

প্রতিবিম্বে পিতৃত্বের বর্ণচ্ছটা, জলের মধ্যে মৎস্যহীন
এই সন্ন্যসী, ঈশ্বরই অপেক্ষারত, পাহাড়ের গায়ে
মেঘের ঘাম গন্ধ-বাতাস উড়ে উড়ে মাটির শস্যে
সবই সম্ভব, টেলিফোনে শোনা যায় কাকের ডাক

সুদুর নিউইয়র্ক থেকে, কল্লোল কতোদিন শোনেনি
এমন সময় যায় খুব ধীরে, আগুয়ান মানুষের নির্জনতা
কতিপয় পোশাকের মধ্যে দেহের খবর খুব স্পষ্ট
বাগানে আলোর মহিমা, মানুষের জটিল ইঁদারায়

চারকোনা জলের চাদর, ভেতরে নন্দনতত্ত্বের হা-হুতাশ,
সারাদিন বিমর্ষতায়, কাছে দুধভরা বাটি, কালিহীন
মলমের মধ্যে ভবিষ্যতের সাহিত্য আর কবির লেখনী,
নদীর দুঃখে দুঃখী এই মাটির রহস্য, শোনা গ্যাছে

মাঝ-রাতে জল-ডম্বরু বেজে ওঠে নিরীহ প্রকৃতির গ্রামে,
বিধ্বস্ত সড়কের মধ্যে পদচ্ছাপ পরিচিতি পায়, তবে
দুর্ঘটনা সামান্যই, কারো কারো মনে জাগে চুপিসারে
প্রহরের কঙ্কালাকীর্ণ অবয়ব, বিষময় ভঙ্গামন পরাজয়

মানে না, মনের মধ্যে ময়ূরের সবুজতা, বিড়ালের গোঁফ,
টানা অপরাহ্নের একাকী বারান্দা, রোদের ভেতর একা
একটি শুকনো পাতা, কিছু ধূলোর বিন্দু-বিসর্গ, দল-ছাড়া
দুটি পিঁপড়ে, রোদের গন্ধে ডুবে পাখির পক্ষপাতিত্ব

এই চরাচরে কতোদিন মানুষের নিজস্বতায় উঁকি দ্যায়,
কাছে আসে বিস্তৃত সামিয়ানায়, চারিদিকে আপ্লুত
উদ্দেশ্যহীনতা, একরমই ঝুলন্ত কারুকাজ, নক্সা, বেলুন,
ক্রমাগত পিছুটান সম্মুখে ডাকে, সুদূরতা বিশ্বস্ত হলে

সাহসের সুপ্ততা বেড়ে যায় ব্রহ্মান্ড অবিধি, কেউ নেই
এই গভীরতর ভীড়ে, হৃদয়ের পক্ষে মানুষের আহাজারি
কোন্ দিগ¦লয় থেকে ভেসে আসে, কি তার স্বপ্নপুষ্প,
কি তার বৃত্তের বিন্দু, কি তার পূর্ণ পরিধি, কি তার

পূর্ণিমার অধিকার কিংবা সত্য অন্ধকার, উজ্জ্বল,
কিছুতেই জানা যায় না সরলতার জটিল ফলাফল

সবই জানা অথচ জানা যায় না

গন্ধের ভেতর পরিচয় ব্যাপৃত
মূন্যতা-সন্ধানী প্রহর খুঁজে মরে
প্রকৃত রহস্য কোথায়
কোথায় গন্ধভূমি কোথায় উৎস

বাতাস মোহময় নীরব নির্ঝর
ঝরে পড়ে ব্যক্তিত্ব প্রকৃতিত্ব
অস্বাভাবিক অনাদৃত তথ্য-তত্ত্ব
কোথাও নেই এই গন্ধের গোপনে

অদৃশ্য তবুও অস্তিত্ব চারিদিকে
গন্ধ তীব্র দুর্গন্ধ অথবা নম্র নীরব
কোথায় নিবাস পরিচয় অবস্থান
এখানেই অথচ অনির্দিষ্ট বোধ

সবই জানা অথচ জানা যায় না
গন্ধের রহস্য আছে কী নেই
স্বপ্ন হীনাতায় দুঃস্বপ্নের ছায়া
চির অবগুন্ঠনে ঢাকা সৌরভ

স্মৃতিবোধ স্বপ্নের মধ্যে বিভূতি
জানিয়ে দ্যায় বিপুল ঘ্রাণেন্দ্রিয়
এই বাতাস বহতা কাল বিন্দুর কণা
চারিদিকে বকপাখি ওড়ে ভাসে

অন্ধগন্ধে মাখা সুবাসিত মৌতাত
বিমর্ষ আনন্দে ভাসমান অতিবাস্তবী
গন্ধ ভাস্কর্য সঙ্গীত বোধানুভব
অব্যক্ত নীরব অথচ উচ্চারিত

অস্তিত্ব-অদৃশ্য ডানাহীন প্রজাপতি
বাতাস-সখি এই আড়ালেরর নেপথ্যে

গোপন কিছু ছিলো

গোপন কিছু ছিলো, বাক্সভর্তি পাখির পালক নিদেনপক্ষে
গোখরোর বিষ, হালখাতা লাল কাপড়ের ফিতে বাঁধা পরোক্ষে
গোধুলি মেখে কে গ্যালো শূন্য পরপারে মহার্ঘ এই নিজ প্রতিপক্ষে
গোরুগুলো হেঁটে গেলে পায়ের ছন্দে নূপুর বাজে, এ কেমন সে বিপক্ষে
গোলামের মতো ধেয়ে যায় যেনো বা তিনিই বখতিয়ার বংশের সপক্ষে,
গোলাকার এই যে পৃথিবীর জীবন, অমানিশায় কেটে গ্যালো সাক্ষ্যে,
গোলাপের চারার সঙ্গে বাতাস আনন্দ পায়, অতিদূর স্থির লক্ষ্যে
গোপন গবাক্ষ সরে যায়, সহসা জানালার শিক ধরে অলক্ষ্যে
গোবর্ধন দাঁড়িয়ে থাকে যতোক্ষণ না সূর্য ডুবে যায় আকাশ-বক্ষে,
গোবেচারা বসে যায় পথিমধ্যে, রোদ্দুর হেসে ওঠে তাই জানি রক্ষে
গোচর হলেই জেনে যাবে মিথ্যার চেয়ে সত্যের পক্ষপাতিত্ব, প্রতি অক্ষে
গোকুল কেবা যায় বংশী বাজিয়ে সুর তুলে, প্রকৃতির ভুল তাই রক্ষে

PaidVerts