বেলাল চৌধুরী’র কবিতা

বেলাল চৌধুরী’র কবিতা

ভাগ
PaidVerts

বেলাল চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত একজন আধুনিক বাঙ্গালী কবি যাকে ষাট দশকের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। তিনি সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সম্পাদক হিসাবেও খ্যাতিমান।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন:
তাঁর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১২ই নভেম্বর বাংলাদেশের ফেনী উপজেলার অন্তর্গত শর্শদি গ্রামে। তাঁর পিতা রফিকউদ্দিন আহমাদ চৌধুরী ও মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরানী। তিনিঁ দীর্ঘকাল ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস কর্তৃক প্রকাশিত ভারত বিচিত্রা পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, একসময় ’কৃত্তিবাস’ এরও সম্পাদক ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:
নিষাদ প্রদেশে, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ, স্বপ্নবন্দী, সেলাই করা ছায়া, কবিতার কমলবনে, বত্রিশ নম্বর ।
প্রবন্ধগ্রন্থ: কাগজে কলমে ।
শিশু সাহিত্য: সবুজ ভাষার ছড়া, বত্রিশ দন্ত ।

পুরস্কার : বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪); অলক্ত স্বর্ণপদক (১৯৯৭); নিহারঞ্জন পুরস্কার (১৯৯২) ।

নীলিমায় বিলীন একটি দৃশ্য

এক সঙ্গে দু’জন মানুষ হাতে হাত,
মাথার মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভুলের ভ্রমর গুঞ্জন-
হুল ফোটানো ব্যথায় কাতর শরীর
চোখে নিরঙ্কুশ নীলাঞ্জন;
লালাতে পরাগ গন্ধ
ভোরের কোমল অভ্রফুল।

লেলিহান আগুনের আঁচে
তে’তে ওঠা দু’জন মানুষ,
গনগনে লাল লোহার শরীর
তরঙ্গ চূড়ায় উঠে আবার আছড়ে পড়ে তটে।

ঝিল্লি­মন্ত্র

জীবনের যত জটিলতা তখন ক্রমশ
রাতভোরের স্টেশন ছুঁইছুঁই,
পাশ ফিরি স্বপ্নের সুবণরেখায় চকিতে,
তিমিরবিনাশী উতরোল হাওয়ায় শুনি শুধু:
অবিরাম হাঁকাহাঁকি দরদাম কলরব,
ফের ডুবে যাই; ট্রেন ছুটছে আঁধার কেটে

রেলের লানে ট্র্যাক বদলের তীব্র ঝনৎকার,
মাথার ভেতর ঝাঁঝাঁ রবের প্রবল ঝিল্লিমন্ত্র
এক পেয়ালা সধূম চা যে কী চমৎকার-
স্টেশনের পর স্টেশন যে যায় পেরিয়ে,
ট্রেন থামে না ট্রেন থামে না ঘুমের ভেতর
তৃষ্ঞামুখর অন্ধকারে ছড়ায় কেবল রক্ত-রঙা অগ্নিকণা।

স্বপ্নবাড়ি

দিন ফুরোবার আগেই কোথায় গেলে তুমি দিবাদশী
সূয্যমুখী,-খুঁজছি তোমায় তন্নতন্ন
রাঙামাটির পথের বাঁকে,তুমি তখন গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন
ঝুরঝুর একরাশ স্মৃতির রেণু পড়লো ঝরে ভূমিস্পর্শী

ও কি! কাজল মেঘ ঢেকে গেছে বৃহস্পতি,
হঠাৎ আকাশ ওঠে বিষম দমকা হাওয়া
হাত বাড়াতেই হড়কে যাওয়া
পলকমাত্র লুটিয়ে পড়ল বৃহৎ বনস্পতি!
স্বপ্নবাড়ির সিঁড়ির গোড়ায় দম দমাদ্দম
হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কত উল্কাপিন্ড জলজ্যান্ত,
ঝলসে যাচ্ছে দশ দিগন্ত আদ্যোপান্ত,
মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠায় বজ্রাহত বৃক্ষ এক জ্বলন্ত হতোদ্যম।

সেলাই-করা ছায়া

শহরতলি ছাড়িয়ে শোকালয়কে বহুদূরের ধু-ধু
বুক ভরে টাটকা সতেজ সবুজ নিশ্বাস নিতে নিতে
গহীন বনের কিনারায় এসে দেখি তাকে,
গৈরিক বসনাবৃত পরম নিবিষ্টচিত্ত একা একা বসে,
কে তিনি,পথিক না পরিব্রাজক?
প্রকট নৈরাজ্যের মাঝে রৌদ্রের দৌরাত্ম্য,
পেছনে দাঁড়িয়ে কৌতূহলভরে ছায়া ফেলে ঘাড়ে
চাক্ষুষ হয়,কী এক আশ্চয্য তৎপরতায় এ-ফোঁড় ও-ফোঁড়
সেলাই করে চলেছেন অদৃশ্য কোন আচ্ছাদন,
বুকে যেন তার উদভ্রান্ত অস্থির প্রতিবিম্বের ঝিরঝির নড়াচড়া
-পেছনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসির তাচ্ছিল্য ছিটিয়ে ভাবি
লোকটা কি পাগল না অন্য কিছু!
-পা বাড়াতেই হ্যাঁচকা টানে হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা,
এ আবার কোন গেরোরে বাবা,অযথা জড়িয়ে পড়লুম কি-সে না কি-সে!
কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেজে ওঠে গমগমে স্বর:
-রোস,সেলাই হয়ে গেছ তুমি,তোমার ছায়া
জরাজীর্ণ আমার এ কাঁথার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধন তার,
এখন থেকে আমরা পরস্পরের বংশবদ ও সখা;

কাহিনীর নটে গাছটি মুড়িয়ে তাঁর চোখে চোখ রেখে দেখি
নির্নিমেষ তিনি আমারই দিকে,মাঝখানে নিতল,নিথর হিমবাহ এক!

ভাঙা গড়া

বুদ্ধুদ ওড়া রাতের শেষে প্রত্যূষা পার হয়ে জাগে ভোর
-যার মানে আরেকটা নতুন দিনের শুরু,
দিনগুলি আর রাতগুলি এভাবেই গড়িয়ে গড়িয়ে
রোরুদ্যমান সময়ের গর্ভে বিলীন,ৃ.
আবার প্রহরশেষের রাঙা আলো ভেঙে নামে সন্ধ্যা
চরাচর জেগে ওঠে চণ্দ্রকলা,কখনো নিকষ রাত্রি শুধু,
ফের আসে ভোর মনে ভোরের রঙিন শোভা
ঘোর অমাবস্যা জীবনের প্রান্তে,ক্রমশ ভোরের আলস্য
গড়ায় দুপুরে,তোলে হাই আবার দুপুর মরে অপরাহ্ণ
সায়াহ্ন দ্যুতিতে টগবগ করে বুক,যাবতীয় ব্যথা উপশমে
ঝরে ঝরঝর একরাশ যুঁই টাটকা সতেজ
আসন্ন নক্ষত্র সভার প্রাক্কালে টাঙিয়ে চাঁদোয়া,-
নামে রাত,ছাঁদনাতলায় ততক্ষণে রাত গড়িয়ে নিশুতি
তারই মাঝে ফাঁকফোকর উপচে কখনো প্রত্যূষ,কখনো গোধূলি
-ফের দিন,ফের রাত টুপটাপ একটানা ফেরেববাজি না
দিবাবসানের ঘোরে নেশতুর পড়ে থাকা শুধুৃ.

শালদা নদী

গভীর রাতের ঘুম চিরে কালো কড়কড় শব্দে
নেচে ওঠে অর্ধস্ফুট চৈতন্যের প্রচ্ছন্ন অতলে
মেঘের থির-বিজুরি-
সুমুখে দেখি খুলে যায় সটান
আঁকাবাঁকা স্মৃতিঘেরা অচেনা স্বর্গসোপান
অলীক শালদা নদী ঘুঙুর পায়ে নদী ময়ূরী
না কি পাথুরে বালির দেশে অতকির্ত
ফনীমনসার ফুল?
বাঁকাচোরা খরস্রোতা হাওয়ার ঘূণী
সন্ঞারে তীব্র নিখাদ
থেকে থেকে বহে দমকা ঝড়ের প্রবল জোয়ার
চন্দ্রাতুর শালদা নদী তখন কী গভীর,কী বিপুল
সাধে মরমিয়া গান,মর্মের অধিক ব্যাপ্তি তার-
কাঁখালে জড়ানো পাছাপেড়ে রণরঙ্গিনী
বর্ণিকাভঙ্গে
মৎস্যগন্ধা অভিসারে যেন অনন্ত বাসুকি
ধীরে বহে খলখল বালুময় রজত তরঙ্গরাশি।

পেরিয়ে মধ্যরাত দূরগামী স্বপ্নের ভৈরব নিনাদ
উঁকিঝুঁকি মারা ভরা চৈত্রের টালমাটাল শিমুল
বহে যায় ঝুপঝাপ পাড়-ভাঙ্গা দুরন্ত হিল্লোলে
সরব গতির স্পন্দন আলোড়িত সুদূর
শালদা নদীর গান।

মানুষের ডাহুকী ভাবনা

মানুসতো ডাহুক নয় অথচ ঢাহুকের বেদনার
ভেতরে মানুষ ডুবে যেতে পারে,ডুব দেয়
চিরকাল-এইভাবে মানুষের ডাহুকী ভাবনা
মুত্ররসে যেমন ভেসে যায় মানুষের
স্বভাবের নির্বিবেকী তাবৎ লোনা ও অম্লতা
তেমনি মানুষ ঢেলে দিতে পারে
ঐ ডাহুকী ভাবনার ভেতর মানুষের
যতো বেদনা,বিষতিক্ত সারাৎসার,
ডাহুক ও মানুষ যদিও পরস্পর বেদনার
এপিঠ-ওপিঠ,কিছুটা মানুষের,কিছুটা ডাহুকের
তবু মানুষ তো কখনো ডাহুক নয়
অথচ ডাহুক তার বেদনার সীমা-স্বর্গের কতোদূর,
কতোদূর-একজন মানুষকে নিয়ে যেতে পারে?

পশম-উৎসবের আমন্ত্রণলিপি

পশমে ভ’রে যাচ্ছে চারপাশ, হাওয়ায়-হাওয়ায়
বাজছে পশমের রণদামামা,পশম তুমি কোথায়?
পশমের নামে ঝ’রে যাচ্ছে অজস্র বাদামপাতা
শান-বাঁধা পথের ওপর টুপটাপ শব্দের মন্জুরী।
শীতার্ত এই রাতে পশম তুমি আমাকে তোমার
নাগালে রেখো;ওই তো দূরে কোথাও শুনতে পাচ্ছি
ক্রমাগত একনাগাড়ে ডেকে চলছে হাঁসবো-
বাবুদের বাগানের ঝিলে,আমি বারে বেরুতে
পারছি না কতোদিন-আমাকে তুমি নিয়ে চলো পশম,
আমার এক পাটি চটি হারিয়ে গেছে কোথায়
আমি খুঁজেছি তাকে আঁতিপাঁতি সারারাতভর

শিশির জড়ানো তৃণদলে,নাতলি ঘাসের সবুজ অরণ্যে
কুড়িয়ে পেয়েছি টিকিটবিহীন শাদা খাম
রাতদুপুরে তাই ছুটে গেছি বুড়ো দর্জির তাঁতকলে
অনেক যতেœ রঙিন সুতোয় নক্সা বুনে লিখে দিলো
পশমের ঠিকানা,পশম-অন্ত-প্রাণে আমি শুনেছি
হাওয়ায়-হাওয়ায় বাজছে পশমের রণদামামা-
গ্রামোফোনের গানের আড়ালে পশম তুমি কোথায়?
বাবুদের বাগানে আজ শুধু পশমের গান
রঙিন পাতলা কাগজের হ্যান্ডবিল উড়ছে খালি
ঝ’রে-পড়া পাতার ফাঁকে-ফাঁকে নড়াচড়া করছে ফর্ফর
পশম আসছে আমাদের পশম-উৎসবে আজ।

ডুবে আছি কেতকী কুসুমে

ডুবে আছি কেতকী কুসুমে চেয়ে দেখো
কি রকম উতরোল
হাওয়া আর ঢেউয়ে ফেনিল,রূপালি রণরোল
নিঃশেষে মুছে দিয়ে নীল নীলিমাসাধ
সৌর চলচ্ছবি যেন অবাধ,অগাধ;

জ্যোতির্ময় বলয় জুড়ে ব্যাপ্ত হ’য়ে আছি
কৃতদার পাতার হলুদে;পাতাৃ..
পাতাঝ’রে যায় বৃন্ত থেকে,মৃত মাছি
যেন টুপটাপ, অচ্ছোদসরসীনীরে ভাসে ভেলা,
হায় যুগলে সহায়!
ডুবে আছি কেতকী কুসুমে
বিস্মরণে ব্যাপ্ত নিদারুণ জাগরণ ও ঘুমে।

শব্দ এবং আগুন

শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা
হয় না জানা নিজের কিংবা কারুর
একই আগুন জ্বলছে ধরো কিন্তু
বুওকর নিচে বুক না পেলে কেমন ক’রে
জানবো আমি তোমার শরীর তোমার আগুন
নেবো তুলে ঘামের লোনা মুখের লালা অন্য গরম
জানবে আমি তোমার শরীর আমার আগুন
মুখের মধ্যে দাঁতের ডগায় তীক্ষ ধার
শরীর দিয়েই শরীর আমি জানতে চাই
হোক না তা কাঠের কিংবা চর্বি মেদের
বুকের নিচে বুক না পেলে যায় কি ছোঁয়া
উষ্ঞ মধুর দেহের ওম উরুর ভারে অন্য আগুন
শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের
নিবিড় শরীর গভীর ক’রে দাঁতের কাটি
বুকে পিষি ঘাসের শরীর –আঁশটে গন্ধ
শরীর দিয়েই শরীর থেকে শব্দ এবং আগুন।

কানাকড়ির হিসেব

চোখ জুড়ে
ছিলে তুমি,শুধু তুমি,
বুক জুড়ে
ছিলো ঝড় আর ঝড়;
একটাও কথা কিন্তু
বলিনি আমরা,
শুধু আগুনের
শীতল শিখায়
বাড়িয়ে দিয়েছিলুম
দুই করতল।

এক মহিলার নকটার্ণ

দীর্ঘ রাত্রির শেষ যামে গভীর মগ্ন-সুষুপ্তি
ভাসমান তার শ্রান্ত শ্রাবণ-শরীর,
দ্বিধাবিভক্তির খন্ড-বিখন্ডিত টানে
দেখছে সে প্রারম্ভিক বসন্তের স্বপ্ন:
প্রখর রৌদ্রালোকে উড়ছে আঁতুর লবণ,
ও উজ্জ্বল রঙিন বেলুনের ঝাঁক
পরম সোহাগে আদরে-জড়ানো বিনুনির মতো
সোনালি সুতোর মোহন ফাঁস;
নগ্নতাকে আঙ্গুলে ঢেকে ফুলিয়ে তোলে স্তন
হেঁটে যায় বর্তুল স্ফীতি দুলিয়ে রক্তাক্ত কিংখাব;
হাতের আলতো আঙ্গুলে খসায়
উরুর মোহনায় পুজ্ঞিত লালচে চুলের জট।
কিন্তু কতো ক্ষণজীবী ঐ বেলুনেরা
নারীর স্বপ্নবিলাস
নিমেষেই উধাও অনন্তের শূন্যগর্ভ জলস্তম্ভ।
থেকে যায় শুধু স্বপ্ন,স্বপ্নের রেশ,
গোপনচারী অরণ্যের কিছু আদিম শিকড়-বাকড়
আর চেতনা-চেতনে জনেক বিদুষক।

সূয্যমুখী, তোমার জন্যে খেলনা-পুতুল

নির্জনতা থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে উপড়ে এনেছিলুম
বুকের ভেতর রাখবো ব’লে,
সংগোপনে নিজের কাছাকাছি
সমস্তক্ষন বুকের মধ্যে একা ভীষন দাপাদাপি
সূয্যমুখী আমার সহ্য হয় না সহ্য হয় না।
তোমার ঐ প্রচন্ড তাপ বিষম প্রখর
বুকের ভেতর রক্তে ভাঙে দারুন তোলপাড়
সমস্তদিন তোমার গন্ধে আকুল
অন্ধকারে বুকের মধ্যে কেবল প্রবল কলরোল
সূয্যমুখী মুখটি তোলো চুমু খামো সূয্য আমার
পাপড়ি মেলো ভেতরে যাবো ভেতরে যাবে সূয্য আমার
অনেক গভীর অন্ধকারে অন্ধকারে অন্ধকারে
জ্বলবে তোমার মন-চেতনা আমার পুড়বে সারা শরীর

সূয্যমুখী তুমি শুনবে অনন্ত প্রাণ,প্রাণের গভীর কলরোল
দেখবো আমি মৃত্তিকায় প্রোথিত অদূরের
উদ্দাম উদ্ভাস ও রক্তিম চঞ্চল উন্মীলন
সূয্যমুখী সূয্য আমার সূয্য আমার।

PaidVerts