রফিক আজাদের কবিতা

রফিক আজাদের কবিতা

ভাগ
PaidVerts

রফিক আজাদ একজন বাংলাদেশী কবি, মুক্তিযোদ্ধা ও সম্পাদক। রফিক আজাদ ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। প্রকৃতার্থে তারা ছিলেন তিন ভাই-দুই বোন। কিন্তু তার জন্মের আগে মারা যায় সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই মাওলা ও তৎপরবর্তী বোন খুকি। রফিক আজাদ যখন মায়ের গর্ভে তখন অকাল প্রয়াত বড় বোন অনাগত ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘জীবন’। রফিক আজাদ ‘জীবনের’ই আরেক নাম।

শিক্ষাজীবন:

১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রফিক ভাষা শহীদদের স্বরণে বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে মিছিল করেন। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে, আদর্শ মানুষ হিসেবে। ১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে ম্যাজিক শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়িতে পাঠান। কৈশোরে লাঠি খেলা শিখতেন নিকটাত্মীয় দেলু নামক একজনের কাছে। তিনি সম্পর্কে রফিক আজাদের দাদা। দেলু দাদা ছিলেন পাক্কা লাঠিয়াল। গ্রামে নানা কিংবদন্তির প্রচলন ছিল তার নামে। সলিম উদ্দিনের চেয়ে তিনি বয়সে বড় হলেও গা-গতর দেখলে পালোয়ান বলেই মনে হতো। দেলু দাদা খুব আদর করতেন রফিক আজাদকে। বার-বাড়িতে শিক্ষা দিতেন লাঠি খেলা। এছাড়া গুণী গ্রামের পাশেই মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হলেন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার মাইল দূরত্বে স্কুল। কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গেরস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। হামিদপুরে আগের মতো আর সেই বিধিনিষেধ নেই। কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তার। এই মাঈনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু। হামিদপুরে তার সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে। সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়ে ছিলেন কিশোর রফিক আজাদ। অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণীতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে আসে। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল করে বসল। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা। অবশেষে ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।

কর্মজীবন:

রফিক আজাদ বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার এর সম্পাদক ছিলেন। রোববার পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলার লেকচারার ছিলেন। রফিক আজাদের প্রেমের কবিতার মধ্যে নারীপ্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। রফিক আজাদ ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা৷ তিনি ১৯৭১ সালেকাদের সিদ্দিকীর সহকারী ছিলেন ৷

প্রকাশিত গ্রন্থ:

অসম্ভবের পায়ে
সীমাবদ্ধ জলেদ সীমিত সবুজে
চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া
পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি
প্রেমের কবিতাসমগ্র
বর্ষণে আনন্দে যাও মানূষের কাছে
বিরিশিরি পর্ব
রফিক আজাদ শ্রেষ্ঠকবিতা
রফিক আজাদ কবিতাসমগ্র
হৃদয়ের কী বা দোষ
কোনো খেদ নেই
প্রিয় শাড়িগুলো

পুরস্কার ও সম্মাননা:

বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১);
হুমায়ুন কবির স্মৃতি (লেখক শিবির) পুরস্কার (১৯৭৭);
আলাওল পুরস্কার (১৯৮১);
কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৭৯);
ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮২);
সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯);
কবি আহসান হাবীব পুরস্কার (১৯৯১);
কবি হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার (১৯৯৬);
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা (১৯৯৭)
একুশে পদক, (২০১৩)

ভাত দে হারামজাদা

ভীষণ ক্ষুধার্ত আছি : উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হ’তে থাকে Ñ প্রতিপলে Ñ সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।
অনাবৃষ্টি Ñ যেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রে Ñ জ্বেলে দ্যায়
প্রভূত দাহন Ñ তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ।

দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবি,
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায় :
বাড়ি, গাড়ি, টাকাকড়ি Ñ কারুবা খ্যাতির লোভ আছে;
আমার সামান্য দাবি : পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর Ñ
ভাত চাই Ñ এই চাওয়া সরাসরি Ñ ঠা-া বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই Ñ মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই;
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য সব দাবি।

অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি, নেই যৌনক্ষুধা Ñ
চাইনি তো : নাভিনি¤েœ-পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক Ñ যাকে ইচ্ছে তাকে দিয়ে দাও Ñ
জেনে রাখো : আমার ও-সবে কোনো প্রয়োজন নেই।

যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবি,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কা- ঘ’টে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুনÑ
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে;
থাকবে না কিছু বাকি Ñ চ’লে যাবে হ-ভাতের গ্রাসে।
যদিবা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে, ধরো, পেয়ে যাই Ñ
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ ক’রে।

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছাপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ ফুটপাত, নর্দমান জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী,
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি Ñ
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।

ভাত দে হারামজাদা, তা-না হ’লে মানচিত্র খাবো।।

নগর ধ্বংসের আগে

নগর ধ্বংস হ’লে, ভেঙে গেলে শেষতম ঘড়ি
উলঙ্গ ও মৃতদের সুখে শুধু ঈর্ষা করা চলে।
‘জাহাজ, জাহাজ’Ñ ব’লে আর্তনাদ সকলেই করিÑ
তবুও জাহাজ কোনো ভাসবে না এই পচা জলে।

সমুদ্র অনেক দূর, নগরের ধারে-কাছে নেই :
চারপাশে অগভীর অস্বচ্ছ মলিন জলরাশি।
রক্ত-পুঁজে মাখামাখি আমাদের ভালোবাসাবাসি;
এখন পাবো না আর সুস্থতার আকাঙ্খার খেই!

যেখানে রয়েছো স্থিরÑ মূল্যবান আসবাব, বাড়ি;
কিছুতে প্রশান্তি তুমি এ-জীবনে কখনো পাবে না।
শব্দহীন চ’লে যাবে জীবনের দরকারি গাড়িÑ
কেননা, ধ্বংসের আগে সাইরেন কেউ বাজাবে না।

প্রোথিত বৃক্ষের মতো বদ্ধমূল আমার প্রতিভাÑ
সাধ ছিলো বেঁচে থেকে দেখে যাবো জিরাফের গ্রীবা।।

মাধবী এসেই বলে : ‘যাই’

খ-িত ব্রিজের মতো নতমুখে তোমার প্রতিই
নীরবে দাঁড়িয়ে আছি : আমার অন্ধতা ছাড়া আর
কিছুই পারিনি দিতে ভীষণ তোমার প্রয়োজনে;
উপেক্ষা কোরো না তবু নারী,Ñ তোমার অনুপস্থিতি
করুণ, বেদনাময়Ñ বড়-বেশি মারাত্মক বাজে
বুকের ভেতরে কী যে ক্রন্দনের মত্ত রলরোলে!

দালি-র দুঃস্বপ্নে তুমি, আর্তো-র উন্মাদ মনোভূমে,
সবুজ মৎস্যের মতো অবচেতনের অবতলে
রঙিন শ্যাওলা-ঝাড়ে সুজাতার মতো সরলতা।
মুহূর্তের নীলিমায় তরুণ ধ্যানীর মনে হয় :
তুমি হও ছলাকলাহীন, রূপশালী ধান-ভানা
জীবনানন্দের মতো-বাংলার এক সাদাসিধে
নেহাৎ রূপসী! Ñতবু কেন প্রাণপাত পরিশ্রমে
যায় না তোমাকে পাওয়া?Ñ তুমি নেই মস্তিষ্কে, হৃদয়ে!

কখনো জ্যুরিখে তুমি, বনে, কিয়োটোতে, বাম-তীরে,
গ্রিনিচ পল্লীতে কিংবা রোমে প’ড়ে থাকো; কখনোবা
যোগ দাও পোর্ট-সৈয়দের নোংরা বেলেল্লাপনায়!
তোমার স্বভাব নয় স্থিরতায়Ñঅস্থির, অধীরÑ
তুমি আছো অনুভবে, তুমি আছো শিশুর স্বভাবে।

ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পরিশ্রমে গ’ড়ে-ওঠা রম্যÑ
অট্টালিকা, স্বভাবের ডালপালাÑবিশ্ব-চরাচর!
যেনবা কোথাও গ’র্জে উঠে ভয়াবহ অগ্নিগিরি
সোনালি লাভার ¯্রােতে ভ’রে দিলো গ্রাম ও নগর!
যেন গর্ভগৃহ থেকে নেমে ডিনামাইটের মতো
অসম্ভব তোলপাড় জুড়ে দিলো একটি শৈশব!

অবিশ্বাস্য উষ্ণতায়, চাপে দ্রুত গ’লে যেতে থাকে
ঘড়ির ডায়াল আর তোমার ও নিটোল অবয়ব!
তুমি সেই লোকশ্রুত পুরাতন অবাস্তব পাখি,
সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝ’রে পড়ে যার
চতুর্দিকে আনন্দ, টাকার থলি, ভীষণ সৌরভ!

রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে;
অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে
কেবল তোমার জন্যে ব’সে আছি উন্মুখ আগ্রহেÑ

সুন্দর শাম্পানে চ’ড়ে মাধবী এসেই বলে-‘যাই’।।

যদি ভালোবাসা পাই

যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো
জীবনের ভুলগুলি’;
যদি ভালোবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘ পথে
তুলে নেবো ঝোলাঝুলি।
যদি ভালোবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাবো;
যদি ভালোবাসা পাই পাহাড় ডিঙাবো আর
সমুদ্র সাঁতরাবো;
যদি ভালোবাসা পাই আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল;
যদি ভালোবাসা পাই জীবনে আমিও পাবো
মধ্য-অন্ত মিল।
যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো
জীবনের ভুলগুলি;
যদি ভালোবাসা পাই শিল্প-দীর্ঘ পথে
ব’য়ে যাবো কাঁথাগুলি।।

চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া

স্পর্শকাতরতাময় এই নাম
উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,
অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা,
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্টÑ কিন্তু ভেতরে-ভেতরে
খুব শক্তিশালী

মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব।
চুনিয়া তো ভালোবাসে শান্ত¯িœগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ,
চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধ-স্বভাবের নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতি;
চুনিয়া তো যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি।

চুনিয়া কখনো কোনো হিং¯্রতা দ্যখেনি।
চুনিয়া গুলীর শব্দে আঁতকে ওঠে কি?
প্রতিটি গাছের পাতা মনুষ্যপশুর হিং¯্রতা দেখে ‘না-না’ ক’রে ওঠে?
Ñ চুনিয়া মানুষ ভালোবাসে।

বৃক্ষদের সাহচর্যে চুনিয়াবাসীরা প্রকৃত প্রস্তাবে খুব
সুখে আছে।
চুনিয়া এখনো আছে এই সভ্যসমাজের
কারু-কারু মনে,
কেউ-কেউ এখনো তো পোষে
বুকের নিভৃতে এক নিবিড় চুনিয়া।

চুনিয়া শুশ্রƒষা জানে,
চুনিয়া ব্যান্ডেজ বাঁধে, চুনিয়া সান্ত¦না শুধুÑ
চুনিয়া কখনো জানি কারুকেই আঘাত করে না;
চুনিয়া সবুজ খুব, শান্তিপ্রিয়Ñশান্তি ভালোবাসে,
কাঠুরের প্রতি তাই স্পষ্টতই তীব্র ঘৃণা হানে।

চুনিয়া চীৎকার খুব অপছন্দ করে,
চুনিয়া গুলীর শব্দ পছন্দ করে না।

রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে
চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ;
চুনিয়া তো সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত
মারণাস্ত্রগুলো
ভূ-মধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে।
চুনিয়া তো চায় মানুষেরা তিনভাগ জলে
রক্ত-মাখা হাত ধুয়ে তার দীক্ষা নিক্।

চুনিয়া সর্বদা বলে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রগুলি
সুগন্ধি ফুলের চাষে ভ’রে তোলা হোক।
চুনিয়ারও অভিমান আছে,
শিশু ও নারীর প্রতি চুনিয়ার পক্ষপাত আছে;
শিশুহত্যা, নারীহত্যা দেখে-দেখে সে-ও
মানবিক সভ্যতার প্রতি খুব বিরূপ হয়েছে।

চুনিয়া নৈরাশ্যবাদী নয়, চুনিয়া তো মনেপ্রাণে
নিশিদিন আশার পিদিম জ্বেলে রাখে।
চুনিয়া বিশ্বাস করে :
শেষাবধি মানুষেরা হিংসা-দ্বেষ ভুলে
পরস্পর সৎপ্রতিবেশী হবে।।

প্রতীক্ষা

এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধ:ীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তের পাতা ঝরার শ্বদ শুনবো ব’লে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতেÑ
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে হয়তোবা ভবিষ্যতেও
অপেক্ষা করবো…

এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছিÑ
হয়তো কেউ বলেছিলো, “অপেক্ষা কোরো,
একসঙ্গে বেরুবো”।

এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিলো, “বাড়ি থেকো,
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেবো”।
হয়তোবা ওর মনের মধ্যে ছিলো
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো,
Ñআমি অপেক্ষায় থেকেছি…

যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয় বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে ব’লেছিলো, “জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুজ্বপীঠ পানশালা ছাড়া, চল, তোকে
দিনাজপুর নিয়ে যাবোÑ
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ ও মস্ত খোলা আকাশ দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরি থাকিসÑআমি আসবো”।
-আমি অপেক্ষায় থেকেছি;

আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি, শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছিÑ
কিন্তু তোমার জন্যে আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
প্রতীক্ষা করবো:
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যতেœ
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,

‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দÑ
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না?

আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো-
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমাণ-
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে আমার পায়ে
শিকড় গজাবে-
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…

তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে

তুমি যেসব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিলো। তোমার কথায় ছিলো গেঁয়ো টান, অনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ : ‘প্রমথ চৌধুরী’কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’; ‘জনৈক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে সর্বদাই ‘জৈনিক’ ব’লে ফেলতে। এমনি বহুতর ভয়াবহ ভুলে ভরা ছিলো তোমার ব্যক্তিগত অভিধান। কিন্তু সে-সময়, সেই সুদূর কৈশোরে ঐ মারাত্মক ভুলগুলো তোমার বড়-বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলুম। তোমার পরীক্ষার খাতায় সর্বদাই সাধু ও চলিত দূষণীয় মিশ্রণ ঘটাতে। ভাষা-ব্যবহারে তুমি বরাবরই খুব অমনোযোগী ছিলে। বেশ ভালো হাবাগোবা-গোছের লাজুক ও অবনতমুখী মেয়ে ছিলে তুমি। ‘শোকাভিভূত’ বলতে গিয়ে ব’লে ফেলতে ‘শোকভূত’। তোমার উচ্চারণের ত্রুটি, বাক্যমধ্যস্থিত শব্দের ভুল ব্যবহারে আমি তখন একধরণের মজাই পেতুম।
২০-বছর পর আজ তোমার বক্তৃতা শুনলুম। বিষয় : ‘নারী স্বাধীনতা’। এতো সুন্দর স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে, যে, শুনে অবাক ও ব্যথিত হলুম! আমার বুকের মধ্যে জেঁকে-বসা একটি পাথর বিশ বছর পর নিঃশব্দে থেমে গ্যালো।।

স্মৃতি, চাঁদের মতো ঘড়ি

ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ অবিচ্ছিন্ন চাঁদ,
তোমার জাদুতে মুগ্ধ এই আমি শতচ্ছিন্ন কাঁথার একায়
হিরন্ময় নক্ষতেও্রর মেল া এক সিয়েছি অবাস্তব স্বপ্নের বিন্যাসে :
একটা বয়সন আছে অবোধ শিশুর দল শতাধিক পুতুলে যখন
জননীর মতো সোহাগ বিলোতে চায়,Ñ
ন্যাকড়ার টুকরোয় তারা কী উজ্জ্বল জামা তৈরি করে,
চুমোয় আচ্ছন্ন করে সারি-সারি পুতুলের নির্বিকার মুখ;
শিশুদের মতো আমি,Ñ মুখাবয়বসর্বস্ব,Ñ ভাঙা এই একটি পুতুলে
আমারও আজন্ম খেলা, সারাবেলাÑ দুপুরে-রাত্রিতে।

ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ অলীক লণ্ঠন,
সর্বক্ষণ জ্ব’রে যাও তুমি, তোমার মুখশ্রীখানি
কী মসৃণ আলো ফ্যালে দুর্গন্ধে আমার!
অবাস্তব উটপাখি, তোমার পিঠের ’পরে চ’ড়ে
জরায়ুতে চ’লে যাই, ভষ্যিতে যাইÑ
খট্খটে মৃত্তিকায় শিকড় চারিয়ে দিই, কিংবা
আইয়োর-র শিংয়ের মতো বাঁকানো শৈশব ঘুরে আসি।
শিখাহীন অলৌকিক তোমার আগেুনে পুড়ে যায়Ñ
পরিত্যক্ত বাঁশঝাড়, গাছপালা, গোপন বাগান।

ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ পরানপুত্তলি,
তালের শাঁসের মতো রাতে আনো অপার বেদনা;
সাবানের মতো তুমি পিছলিয়ে যাও
ব্যক্তিগত বাথরুম থেকে যেন কোনো স্বর্গলোকে!
আমার বাস্তব-স্বপ্নে কখনো আসো না আর ফিরে।
তবে অশ্রুজল ছাড়া ঐ-পদপল্লবে
আর কী দেবার আছে? …কেবল চোখের জলে ভ’রে দিতে পারি
একটি অদৃশ্য, শুষ্ক বঙ্গোপসাগর।।

অন্তরঙ্গে সবুজ সংসার

অ্যাটম বোমার থেকে দু’বছর বড় এই আমি
ধ্বংস ও শান্তির মধ্যে মেরু-দূর প্রভেদ মানি না।
ক্ষীয়মাণ মূল্যবোধে, সভ্যতার সমূহ সংকটে
আমি কি উদ্বিগ্ন খুব?Ñউদ্বিগ্নতা আমাকে সাজে কি?

রাষ্ট্র, রাষ্ট্রনীতি, নেতা, নানাবিধ আইন-কানুন
নিয়ন্ত্রিত ক’রে যাচ্ছে যথারীতি প্রকাশ্য জীবন,
ভিতর-মহল জেঁকে ব’সে আছে লাল বর্ণমালা।
সদরে-অন্দরে Ñঅনিবার্য সংঘর্ষের ফলেÑগড়ে
সবুজ সংসার। Ñস্বভাবত, সদর বিমুখ আমি
ভিতর-সন্ধানী-আলো ফেলি সান্ধ্য-শামুকের মুখে।
আমার জীবনে স্থায়ী কোনো সকাল-দুপুর নেই,
সারাক্ষণ ব্যেপে থাকেÑঅপরাহ্ণÑমনোধিম-লে।

সম্পূর্ণ বর্জন নয়, গ্রহণে-বর্জনে গ’ড়ে নিই
মানুষের বসবাসযোগ্য চিরস্থায়ী ঘর-বাড়ি;
বহিরঙ্গে নাগরিকÑঅন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক;
স্থান-কাল পরিপার্শ্বে নিজ হাতে চাষাবাদ করি
সামান্য আপন জমি, বর্গা-জমি চষি না কখনো।
বিস্তীর্ণ প্রেইরি নয় Ñ আপনার সীমিত সবুজে
পরম নিশ্চিন্তে চরে নীল-গাই, যূথবদ্ধ মেষ,
নিরীহ হরিণগুচ্ছ, নৃত্যপর জেব্রা ও জিরাফ।।

গান হ’তে বলি

গান হতে বলি আজ দীর্ঘশ্বাসগুলিকে আমার
সম্পূর্ণ লোকজ গীতি Ñ ভাওয়াইয়া কিংবা ভাটিয়ালিÑ
দেশজ, ঐতিহ্যময়, লোকায়ত গীতিকার মতো।

মন থেকে মনে, মনে-মনে, কৃষকের ঘরে-ঘরে,
দুঃখ-বেঁধা হৃদয়ে-হৃদয়ে ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি
মধুর শীতল স্পর্শে সন্ত¦নার ঠা-া হাত রাখে।
সকরুণ সুরের মূর্ছনা সম্পূর্ণত দেশোয়ালি Ñ
নীরবে দাঁড়িয়ে প’ড়ে শোনে এক ভিনদেশী ভাই
আবেগে এাত্ম হ’য়ে এই গানে, স্বজনের গলা।
আত্মমগ্ন গায়কের ভরা, বিষণœ, দরাজ গলা
ট্রানজিস্টারে Ñ সুরের সুতোয় গাঁথে পরস্পর
বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গ্রাম-জনপদ, যোগাযোগ ঘটে
আত্মায়-আত্মায়, নাগরিকে-গ্রাম্যজনে, Ñ গানে-গানে,
প্রাণে-প্রাণে; ভেদাভেদ ঘুচে যায় চাঁড়ালে-প-িতে।
সমৃদ্ধ লোকজ এই গীতি শিক্ষাভিমানীর মন
থেকে উৎপাটিত করে সংকীর্ণতা, লোক-লজ্জা, গ্লানি।
নাগরিক চেতনায় পরিশীলিত মনে, মনে Ñ
অনিদ্রা রোগীর চোখে আর মস্তিষ্কের কোষে-কোষে
ফুলের পাপড়ির মতো, অতি দ্রুত, ঘুম নেমে আসে,
ব’নে যায় নেহাৎ সরল, গেঁয়ো, অভিভূত-চাষা Ñ
ভুলে গিয়ে উপাজিৃত ঔচিত্য, অভ্যাাস Ñ আবেগের
উত্থান-পতন ঘটে দেশোয়ালি সুরের সহিত, Ñ
উত্থান-পতনে। যেন সে-ও, নাগরিক, চ’লে যায়
মোষের গাড়ির সাথে, উচ্চাবচ, নিধুয়া পাথারে Ñ
মইষালভাইসম; Ñ কিংবা সে-ও পাড়ি দিলো খুব
দিঘল পানির পথ : ভাদরের ভরাবর্ষা তার
চোখের সম্মুখে থৈ-থৈ জলে ভেসে-থাকা গ্রামগুলি
সবুজ শস্যের মতো জেগে থাকে, সুখ-স্বপ্নময়।

এদিকে গ্রামের সব ছেলে-বুড়ো-যুবা গান শোনে
গ্রাম্য গায়কের কণ্ঠে Ñ নিজেদের জীবনের গান;
সুরের বন্যায় ভেসে যায় নতুন নৌকোর মতো
আষাঢ়ে-শ্রাবণে, ভরা-ভাদরের জলের আদরে।
সহজ-সরল সেই গেঁয়ো গায়কের ভাটিয়ালি
সুরের বৈভব রঙিলা বাদাম তুলে উড়ে চলে
¯্রােতের উজানে, সমতল জলের উপরে দ্রুত
সঞ্চারিত হ’য়ে বিশাল বিস্তৃতি পায় চেতনার
পরিধিম-লে। এই গান মানুষে-মানুষে বাঁধে
মিলনের আবশ্যিক সেতু, অর্থময় ক’রে তোলে
প্রাত্রহিক জীবন-যাপন। বয়সের ভারে নত
বৃদ্ধেরও জীবনে কিছু অর্থ যোগ ক’রে দিতে পারে,
Ñ সঙ্গীতের আছে সে-ক্ষমতা। জীবনে আবার স্পৃহা
ফিরে পায় পরাজিত, পর্যুদস্ত সংসার-সৈনিক।
থেমে যায় হত্যায় উদ্যত হাত মহূর্তেই, আরÑ
শিথিল মুষ্টি থেকে খ’সে পড়ে খুনীর ভোজালি।

মননের মন্বন্তরে এই গান খাদ্যদ্রব্যবাহী
অসংখ্য জাহাজময় সুসংবাদ ব’য়ে নিয়ে আসে।

নদীর দু’কূল ছেয়ে উপেচে পড়ে দেশোয়ালি সুর,
লোকায়ত আত্মার নির্যাস। Ñ উচ্চাবচ পথে-পথে,
নদীর ঊষর বাঁকে-বাঁকে ঝ’রে পড়ে সুর-সুধা।
পরম আহ্লাদে ঝরে যেন নদীতে পাড়ের মাটি;
পলি মতন গান Ñ ভাওয়াইয়া কিংবা ভাটিয়ালি
প্রলেপে-প্রলেপে ভরে অনুর্বর মনের মৃত্তিকা।

নিষ্ফল ক্রন্দন নয়, Ñ দীর্ঘশ্বাসগুলিকে আমার
তাই গান হ’তে বলি Ñ ভাওয়াইয়া কিংবা ভাটিয়ালি।।

এই সিঁড়ি

এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,
সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছেÑ
বত্রিশ নম্বর থেকে
সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে
অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।

মাঠময় শস্য তিনি ভালোবাসতেন,
আয়ত দু’চোখ ছিলো পাখির পিয়াসী
পাখি তাঁর খুব প্রিয় ছিলোÑ
গাছ-গাছালির দিকে প্রিয় তাকাকের গন্ধ ভুলে
চোখ তুলে একটুখানি তাকিয়ে নিতেন,
পাখিদের শব্দে তার, খুব ভোরে, ঘুম ভেঙে যেতো।

স্বপ্ন তাঁর বুক ভ’রে ছিলো।
পিতার হৃদয় ছিলো, ¯েœহে-আর্দ্র চোখÑ
এদেশের যা-কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র
তার চোখ মূল্যবান ছিলোÑ
নিজের জীবনই শুধু তাঁর কাছে খুব তুচ্ছ ছিলো :
স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে প’ড়ে আছে
বিশাল শরীর …

তাঁর রক্তে এই মাটি উর্বর হয়েছে,
সবচেয়ে রূপবান দীর্ঘাঙ্গ পুরুষ :
তাঁর ছায়া দীর্ঘ হ’তে-হ’তে
মানচিত্র ঢেকে দ্যায় স¯েœহে, আদরে!
তাঁর রক্তে প্রিয় মাটি উর্বর হয়েছেÑ
তাঁর রক্তে সবকিছু সবুজ হয়েছে।

এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,
সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছেÑ
স্বপ্নের স্বদেশ ব্যেপে
সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে
অমল রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।।

তাতারারাবুগা ইচ্ছে করেছিলো, তাই…

খ্রিস্টেরও জন্মে অন্তত দু’াজার বছর আগে
আছিক দেবতাশ্রেষ্ঠ তাতারারাবুগা
ইচ্ছে করেছিলো, তাই
জিয়াং জিংফু এসেছিলো নিজের গোত্রের সঙ্গে।

শ্বাপদসঙ্কুল পাথুরে পাহাড় বেয়ে
পেরিয়ে তিব্বতভূমি
অবশেষে গারো পাহাড়েই গেড়েছিলো ডেরা,
সিনকিয়াং থেকে দীর্ঘ পথ ঘুরে বহুতর
রসদ ও নারীর ক্ষতি মেনে নিয়ে এই চলে আসা…
সেই থেকে গারো পাহাড়ের কোলে বেড়ে
উঠে থেকে গেছে অনেক প্রজন্ম…

খুব কাছাকাছি পূর্বপুরুষটি এসেছিলো নেমে
গারো পাহাড়ের সানুদেশ বেয়ে নিচে
মধুপুর গড়ে চুনিয়া নামক গ্রামে,
নাম তার তুং হো মারাকÑ
সে ছিলো বিখ্যাত বীর, রক্তে সর্বদাই
দ্রিমিক-দ্রিমিক-দ্রিমদ্রিম,
সজারুর মতো ছিলো খাড়াচুল, অতিশয় চ্যাপ্টা ছিলো নাক,
সর্বদাই রক্তচক্ষু, কঠিন শিলার মতো মর্মভেদী চোখÑ
নৃমু-শিকারী ছিলো আমাদের তুং হো মারাক।

আমিও আছিক এক অধুনা লামদানী,
তাতারারাবুগা ইচ্ছে করেছিলো, তাই আমি
পূর্বপুরুষের পথ ধরে বাঙলার পথে-পথে ঘুরি,
বাংলার নরম মাটি নদী-নালা-ঘাট
সাদরে দিয়েছে ঠাঁই বহুতর বহিরাগতরে!
বহিরাগত তো বটে রক্তচিহ্নে, তবে
ভুসুকুর মতো ‘আজি বাঙালী ভইলা’ ‘রফিক মারাক’।
নৃমু-শিকারীর রক্ত আছে আমারও শিরায়,
আমারও স্বপ্নের মধ্যে রণধ্বনি ওঠে
খা সাংমা, খা মারাক।

অর্ধঘুমে অর্ধজাগরণে অজান্তেই
আমার আছিক মুখ থেকে অবিরল
ঝ’রে যায় অ আ ক খ বলে এক কালজয়ী নদী…

আমার মূর্ধন্যগুলো

আমার রেফ্গুলো যদি তুমি বাজেয়াপ্ত করো
তবে আমি ‘বর্শ’ আঁকবো কী দিয়ে?
তোমার ঐ তেকোণা ‘র’গুলো দিয়ে?
তো, বর্শার তীক্ষè ফলাটা কোথায় পাবো?
আর আমার প্রিয় ‘বর্ষা’ লিখবো কী দিয়ে?
বৃষ্টির তীব্র ফোঁটাগুলো কি রেফ্ চাড়া আঁকা যাবে?
আমার খ- ত গুলেও কি নিয়ে নেবে?
Ñ তা-হলে তো আমার ‘ভবিষ্যৎ’-ই অন্ধকার!

আমার পূর্বপুরুষদের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল কোষাগারে
৫২টি দ্যুতিময় হীরকখ- ছিলোÑ
কালক্রমে তা থেকে ৩টি তো চিরতরে হারিয়েই গেছে;
সেই দুঃখ বুকে পুষে কেউ-কেউ আজো
শেকে মোহ্যমান আছি…

আমার মূর্ধন্যগুলো
রাখলে তুমি কোথায় লুকিয়ে!
কবিতা আঁকার প্রয়োজনে
ঐ বর্ণটি আমার বিশেষ দরকারÑ

রসিকতা আমারও অতীব প্রিয়Ñকিন্তু তাই ব’লে
সবসময় কি তা কারো ভাল্লাগে?
Ñআমার চোখের সামনে সর্বদাই দেখি
খেলা করছে ক’টি তরুণ খরগোশ,
কী সুন্দর দৌড়ে যাচ্ছে
একগুচ্ছ চিত্রল হরিণ,
কী উচ্ছল উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে
উদ্ভাসিত সব তরুণ-তরুণী…
আর এই সময়েই কিনা তুমি
লুঠ করে নিয়ে গেছ প্রিয় মূর্ধন্যটি!

এখন আমি এক দুঃস্বপ্নের নদীতীরে ব’সে
আর্ত অসহায় বন্ধ্যা নারীর মতন মাথা কুটছি শুধু,
আমাার চোখের সামনেই কারা যেন
আমার ৩টি ‘স’-এর মধ্যে দু’টিকে হত্য করলো
এখন তা হলে আমি আর ‘সবিশেষ’
লিখবো কেমন ক’রে?

আমার প্রিয় সম্পদগুলো একে একে অপহৃত হলো,
তবে কি আর আমার চোখের সামনে
খরগোশেরা খেলা করবে না,
হরিণেরা হরিণীর পাশে দাঁড়াবে না,
ভালোবেসে একে অপরের চোখে
তাকাবে না তরুণ-তরুণী?

আমার বন্ধু বাবাটুন্ডে

আমার বন্ধু স্যামুয়েল বাবাটুন্ডে
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীÑ
সে একজন কৃষ্ণকায় আফ্রিকান,
তার গায়ের মসৃণ কালো রং থেকে নিরন্তর
রূপসী রাত্রির উজ্জ্বলতা ঝ’রে পড়ে!
যেখানে বৈষম্য সেখানেই তার ক্ষিপ্র শরীর
নৃত্যপর প্রতিবাদ,
(তার প্রধান শিল্প-মাধ্যম হ’লো : নৃত্য,)
সে একজন প্রতিবাদী নৃত্যশিল্পী,
শরীরকে ব্যবহার করে সে বহুমাত্রিকতায়,
শাদাদের ভুল সভ্যতার বিরুদ্ধে সে
বুক চিতিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো দাঁড়ায়;
একবার সে তিনঘন্টাব্যাপী এক
একক নৃত্যানুষ্ঠানে
নামিবিয়াকে উপস্থাপিত ক’রেছিলোÑ
সমস্ত শরীর ব্যেপে তার
শেকল-ভাঙার গান বেজে উঠেছিলো, সেইদিন!
তার প্রতিবাদী সুঠাম শরীর
সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে তৎপর,
শোষণের বিরুদ্ধে তার সুন্দর শরীর
তরঙ্গায়িত হয়,
এবং সে তার শরীর জাগিয়ে রাখে
নিরন্তর
শান্তির স্বপক্ষে…

আমার বন্ধু স্যামুয়েল বাবাটুন্ডে
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীÑ
সে একজন প্রেমিক ও প্রতিবাদী কবি
তার প্রেমের কবিতাগুলি বাচ্চা-কবুতরের বুকের মতো
উষ্ণ আর নরম;
চাঁদ থেকে যেমন জ্যোৎ¯œা
তার কবিতা থেকে তেমনি মমতা
ঝ’রে পড়ে আফ্রিকার আর্দ্র ও উর্বর
গ্রস্ত-উপত্যকাব্যাপী;
তার দেশপ্রেম আফ্রিকার মিষ্টি জলের হ্রদগুলোয়
ঢেউ তুলে সারা দিনমান ব’য়ে যায়Ñ
‘আমার আফ্রিকা’ Ñকথাটি যখন সে উচ্চারণ ক’রে বলে
মুখের ম-লে তার জ্যোতিষ্মান হয় এক আভা :
তার হিরণœয় দাঁতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে
ভোরসকালের আলো;
দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে যখন সে উচ্চারণ করে
Ñস্বাÑধীÑনÑতাÑ
শ্রোতাদের চোখের সামনে তখন দুলতে থাকে
বর্ণচছটাময় অসংখ্য পতাকা,
তার কণ্ঠ থেকে সংখ্যাতীত শ্বেত কপোত
অবিরাম উড়তে থাকে সমস্ত আকাশময়…

আমার বন্ধু স্যামুয়েল বাবাটুন্ডে
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীÑ
সে একজন স্বাধীন ভাস্কর,
পাথরে, কংক্রিটে, ব্রোঞ্জে, কাঠে ও কাদামাটিতে
অনেক সুন্দর কাজ করেছে সেÑ
তার কথা কাজে বিভিন্নভাবে সে স্বাধীনতাকে
ফুটিয়ে তুলেছেÑ
ভাস্কর্যেও তার থিম ঐ একটাই : ‘স্বাধীনতা’ …
তার রক্তে, হাড়ে ও মজ্জায় Ñ স্বাধীনতা, স্বাধীনতা!

আমার বন্ধু স্যামুয়েল বাবাটুন্ডে
কৃষ্ণ আফ্রিকার এক স্বাধীন মানুষ।।

PaidVerts